Close
Showing posts with label ইতিহাস ঐতিহ্য. Show all posts
Showing posts with label ইতিহাস ঐতিহ্য. Show all posts

Tuesday, March 11, 2025

১১ মার্চ: ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঐতিহাসিক শহীদ দিবস || শাহাদাতের পথ মাড়িয়ে নিরন্তর ছুটে চলা

১১ মার্চ: ঐতিহাসিক শহীদ দিবস— শাহাদাতের পথ মাড়িয়ে নিরন্তর ছুটে চলা।

১৯৮২ সালের ১১ মার্চ বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ইতিহাসে এক রক্তাক্ত অধ্যায়। এদিন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামবিরোধী শক্তির আঘাতে প্রাণ হারান আমাদের প্রিয় ভাই শহীদ শাব্বির, হামিদ, আইয়ুব ও জব্বার।

• ঘটনার সূত্রপাত:
১৯৮২ সালের ১১ মার্চ ছাত্রশিবিরের উদ্যোগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নবীনবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এর জন্য ছাত্রশিবিরের দায়িত্বশীল ও কর্মীরা ১০ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নবীনবরণের প্রচার কার্য চালানোর সময় সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের সন্ত্রাসীরা তাদের ওপর হামলা চালায়, এতে কয়েকজন শিবিরকর্মী আহত হন। শিবির তাদের শত উসকানি ধৈর্যের সঙ্গে মোকাবিলা করে।

• ১১ মার্চের রক্তাক্ত সকাল:
১১ মার্চ সকালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ইসলামী ছাত্রশিবিরের আহ্বানে নবাগত ছাত্রসংবর্ধনা অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। চারদিক থেকে শত শত ছাত্রশিবিরকর্মী গগনবিদারী শ্লোগান দিতে দিতে অনুষ্ঠানস্থলে আসতে থাকেন। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরাও পাশের শহীদ মিনারে সমবেত হতে থাকে। তাদের হাতে ছিল হকিস্টিক, রামদা, বর্শা, ফালা, ছোরা, চাইনিজ কুড়ালসহ বিভিন্ন ধারালো অস্ত্র।

শিবিরের সমাবেশের কার্যক্রম শুরু হলে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা বারবার অনুষ্ঠান পণ্ড করার জন্য উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড চালাতে থাকে। শিবির নেতৃবৃন্দ অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে সংঘর্ষ এড়িয়ে কর্মসূচি বাস্তবায়নের আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যান। কিন্তু সন্ত্রাসীদের মূল লক্ষ্য ছিল শিবিরকে স্তব্ধ করে দেওয়া। তথাকথিত বামপন্থার কেন্দ্রবিন্দু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের এ ধরনের বড় আয়োজন তারা কোনোভাবেই সহ্য করতে পারেনি। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী বিভিন্ন এলাকা থেকে বহিরাগত অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরাও শহীদ মিনারে সমবেত হতে থাকে।

একপর্যায়ে নবাগত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে চতুর্দিক থেকে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে। শিবিরকর্মীরা সাধারণ ছাত্রদের নিয়ে প্রাণপণ প্রতিরোধ গড়ে তোলে। দীর্ঘ সময় ধরে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া চলতে থাকে। এ সময় শহর থেকে ট্রাকভর্তি বহিরাগত অস্ত্রধারীরা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সন্ত্রাসীদের সঙ্গে যোগ দেয়।

সন্ত্রাসীদের আক্রমণের প্রচণ্ডতায় নিরস্ত্র ছাত্রশিবির কর্মীরা দিগ্বিদিক ছোটাছুটি শুরু করে। আত্মরক্ষার জন্য শিবিরকর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ভবন ও কেন্দ্রীয় মসজিদে আশ্রয় নেন। কিন্তু সেখানেও তারা সন্ত্রাসীদের নৃশংস আক্রমণ থেকে রেহাই পাননি।

সন্ত্রাসীরা পাশবিক কায়দায় হত্যাযজ্ঞ চালায়। শহীদ শাব্বির আহম্মেদ মাটিতে লুটিয়ে পড়লে সন্ত্রাসীরা তার বুকের ওপর পা রেখে মাথায় লোহার রড ঢুকিয়ে দেয় এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার পুরো শরীর ক্ষতবিক্ষত করে। হাসপাতালে নেওয়ার পর ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

শহীদ আব্দুল হামিদকে চরম নির্যাতনের সময় তিনি মাটিতে পড়ে গেলে সন্ত্রাসীরা একটি ইট মাথার নিচে দিয়ে আরেকটি ইট দিয়ে তার মাথায় একের পর এক আঘাত করে। এতে তার মাথার মগজ বের হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। তার রক্তাক্ত মুখমণ্ডল দেখে চেনার কোনো উপায় ছিল না। ১২ মার্চ রাত ৯টায় তিনি শাহাদাতের অমীয় পেয়ালা পান।

শহীদ আইয়ুব ভাই ১২ মার্চ রাত ১০টা ৪০ মিনিটে শাহাদাত বরণ করেন। দীর্ঘ কষ্ট ভোগের পর ২৮ ডিসেম্বর রাত ১১টা ৪০ মিনিটে নিজ বাড়িতে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন শহীদ আব্দুল জব্বার ভাই।

সন্ত্রাসীরা দীর্ঘ সময় ধরে মৃত্যুর বিভীষিকা সৃষ্টি করলেও মাত্র কিছু দূরত্বে অবস্থানরত পুলিশবাহিনী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ তো দূরের কথা, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতেও এগিয়ে আসেনি। বারবার অনুরোধের পরও বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভাইস চ্যান্সেলর মোসলেম হুদার প্রশাসন দীর্ঘ সময় ধরে এ হত্যাকাণ্ডে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এ ঘটনাসহ শিবিরবিরোধী প্রতিটি ঘটনায় বাম ও রামপন্থী শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভূমিকা ছিল ন্যক্কারজনক।

১১ মার্চের হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে তারা শিবিরকে উৎখাত করার উদ্দেশ্যে মরণকামড় দিয়েছিল, কিন্তু আল্লাহর অশেষ মেহেরবানিতে তাদের ষড়যন্ত্র বুমেরাং হয়েছে। তারাই তাদের ষড়যন্ত্রের ফাঁদে আটকে পড়ে। তারা আমাদের উৎখাত করতে পারেনি, বরং শহীদের রক্ত মতিহারের সবুজ চত্বরকে করেছে উর্বর, শহীদদের সাথীদের করেছে উজ্জীবিত।

মতিহারের সবুজ চত্বর হয়েছে শিবিরের একক মজবুত ঘাঁটি। হত্যা, জুলুম ও নির্যাতন ইসলামী আন্দোলনের অগ্রযাত্রাকে আরও বেগবান করেছে—এ সত্য আবারও প্রমাণিত হয়েছে।

আরো বিস্তারিত জানতে পড়ুন: 

Saturday, January 11, 2025

ইসলামী ছাত্রশিবিরের ৫২তম শহীদ কাজী মোশাররফ হোসাইন || ০৪ আগস্ট ১৯৭১ - ১২ জানুয়ারি ১৯৯৩


শাহাদাতের ঘটনা:

ইসলামের জন্য যুগ যুগান্তরে সাহসী মুজাহিদ ছিলেন এবং কিয়ামত পর্যন্ত থাকবেন। দ্বীনের পথে তেমনি একজন সাহসী সৈনিক মোশাররফ হোসাইন। তিনি ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা পিতার যোগ্যতম এক সন্তান। বাবা-চাচা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন দেশকে গণতন্ত্রের দিকে এগিয়ে নেয়ার জন্য। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী দলের ছাত্রসংগঠনের ফ্যাসিবাদী আচরণের নির্মম শিকার হন শহীদ কাজী মোশাররফ হোসাইন।

পারিবারিক পরিচয়:

শহীদ কাজী মোশাররফ হোসাইন ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া থানার জয়পুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তার বাবা কাজী সামছুল হুদা তার স্ত্রীকেসহ পরিবারকে সীমান্তের ওপারে ভারতের করিমাটিয়া রেখে দেশে চলে আসেন মুক্তি সংগ্রামে অংশগ্রহণের জন্যে। স্ত্রী হোসনে আরা তার একমাত্র কন্যা কাজী দিলারা আকতারকে নিয়ে ভারতে বসবাস করতে লাগলেন। কিছুদিন যেতে না যেতেই সামছুল হুদার পরিবারে নেমে আসে কালো মেঘের ছায়া, আদরের কন্যা ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে পড়ে। অনেক চেষ্টা করে বাঁচানো গেল না দিলার আকতারকে। মেয়ের শোকে ভেঙে পড়ে মা হোসেনে আরা। ঠিক সে মুহূর্তে অমবস্যার কালো আঁধারের মাঝে দেখা গেলো পূর্ণমিার চাঁদ। ৪ আগস্ট ১৯৭১। পৃথিবীতে আসলেন কাজী মোশাররফ হোসাইন। যাকে পেয়ে মা হোসনে আরা বেগম মেয়ের শোক কিছুটা কম অনুভব করতে লাগলেন। কিন্তু না; হোসনে আরা বেগমের সে আনন্দ বেশি স্থায়ী হতে দেয়নি মুজিববাদী ছাত্রলীগ। একদিন মোশাররফের মত নিষ্পাপ উদীয়মান তরুণকেও মুজিববাদী হায়েনাদের নির্মম ব্রাশফায়ারে শিকার হতে হয়েছে।

শিক্ষাজীবন:

শিক্ষার হাতে খড়ি পিতার কাছেই। ভর্তি করালেন শুভপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত প্রতি ক্লাসেই ১ম স্থান অধিকার করে কৃতিত্বের সাথে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হলেন। ভর্তি হলেন জয়পুর সরোজিনী উচ্চ বিদ্যালয়ে। ৬ষ্ঠ শ্রেণী থেকে ১০ম শ্রেণী পর্যন্ত মেধার সাক্ষ্য রাখলেন আগের মতই। এসএসসি পাস করলেন ১ম বিভাগে। ভর্তি হলেন ছাগলনাইয়া সরকারি কলেজে। শরিক হলেন শহীদী কাফেলায়। এইচএসসি পাস করে উচ্চ শিক্ষার জন্য ভর্তি হলেন ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ চট্টগ্রাম কলেজে। গণিত বিভাগের ছাত্র ছিলেন মোশাররফ হোসাইন। তিনি শুধু মেধাবী ছাত্রই ছিলেন না বরং সুবক্তা ছিলেন। তাইতো তার মুক্তিযোদ্ধা চাচা তাকে মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন সমাবেশে বক্তব্য দেয়ার জন্য নিয়ে যেতেন।

সাংগঠনিক জীবন:

কাজী মোশাররফ হোসাইন সংগঠনের কর্মী ছিলেন। ছাগলনাইয়া সরকারি কলেজে অধ্যায়নকালে সংগঠনে যোগ দেন। মেধাবী ছাত্র কাজী মোশাররফ হোসাইন পড়াশোনা ছাড়া অন্য সময়গুলো দাওয়াতি কাজে লাগাতেন। তার চরিত্র ছিল চুম্বকের মত আকর্ষণীয়। তিনি তার দাওয়াতি চরিত্র দিয়ে সহপাঠী বন্ধু বান্ধব সকলকে আকৃষ্ট করেছিলেন। শাহাদাতের তামান্নায় উজ্জীবিত হয়ে তিনি ইসলামী আন্দোলনের কাজ করতেন।

শাহাদাতের হৃদয়বিদারক ঘটনা:

১২ জানুয়ারি ১৯৯৩ এর সকালবেলা কাজী মোশাররফ হোসাইন তাঁর রুমমেটদের শোনালেন এক দুঃস্বপ্নের কথা। ছাত্রলীগের গুন্ডারা তার বাবাকে ধরে নিয়ে হত্যা করে লাশ হস্তান্তরে জন্য বিশ হাজার টাকা দাবি করে। হঠাৎ স্বপ্ন ভেঙ্গে যায়। সারাদিন আনমনে কেটে যায় তার। বিকালে কখনও ফুটবল না খেললেও সেদিন ফুটবল খেলতে নামেন প্যারেড ময়দানে। অনেকের চেয়ে ভাল খেললেন তিনি। মনও কিছুটা হালাকা হয়েছে তার। মাগরিবের নামাজ পড়ে সরলেন পড়ার টেবিলে। কিছুক্ষণ পর খবর এলো শিবির কর্মী জিয়াকে অপহরণ করে নিয়ে গেছে ছাত্রলীগ। প্রতিবাদে মিছিল বের হল। মিছিলে যোগদান করলেন মোশাররফ। মিছিল চলছিল সিরাজউদদৌলা রোড হয়ে আন্দরকিল্লার দিকে। সামনের সারিতে দৃঢ়পদে চললেন কাজী মোশাররফ । মিছিল যখন দেওয়ান বাজার সাব এরিয়ায় পৌঁছল তখন গলির অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা সন্ত্রাসীরা অতর্কিতভাবে ব্রাশফায়ার শুরু করল। বুলেটের আঘাতে ঝাঁঝরা হলো সামনে থাকা মোশাররফ, মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। পান করলেন শাহাদাতের অমিয় পেয়ালা। আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে গেলেন তিনি। অকালে ঝরে গেল একটি প্রাণ। প্রস্ফুটিত হওয়ার আগেই ঝরে গেল একটি তাজা গোলাপ। ইসলামী জীবনব্যবস্থা কায়েমের পথে অগ্র পথিক হয়ে রইলেন আমাদের মাঝে। শহীদের মৃত্যুতে ভেঙে পড়লেন সহপাঠী বন্ধু, শিক্ষক সবাই। তৎকালীন অধ্যক্ষ ড. আব্দুস সবর প্রিয় ছাত্রের মৃত্যুতে বক্তব্য রাখতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। শহীদের কফিন গ্রামের বাড়িতে পৌঁছলে মা প্রশ্ন করেন কোন অপরাধে তার সন্তানকে জীবন দিতে হল। যদি তার ছেলে অপরাধ না করে তবে তাকে ফিরিয়ে দিতে। মা সন্তানকে ফিরে পাবেন না, সে জন্য ব্যথিত হৃদয়ে আজীবন কাটাবেন। ছেলে কিন্তু ব্যথিত নয়। কারণ তার তিনি জীবন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে গল্প করছেন জান্নাতের সুবজ পাখিদের সাথে।
একনজরে শহীদ কাজী মোশাররফ হোসাইন:

-নাম: কাজী মোশাররফ হোসাইন
-পিতার নাম : মাস্টার কাজী সামছুল হুদা
-মাতার নাম : হোসনে আরা বেগম।
-ভাইবোনদের সংখ্যা : ২ ভাই, ৩ বোন
-ভাইবোনদের মাঝে অবস্থান : সবার বড়।
-স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম- জয়পুর, পো: শুভপুর, -থানা: ছাগলনাইয়া, জেলা: ফেনী।
-জন্মতারিখ : ৪ আগস্ট ১৯৭১
-শিক্ষাগত যোগ্যতা : অনার্স ২য় বর্ষ, গণিত বিভাগ, চট্টগ্রাম কলেজ
-শহীদ হওয়ার তারিখ : ১২.০১.১৯৯৩ সাল (১১ তারিখ সন্ধ্যায় আহত)
-শহীদ হওয়ার স্থান : দেওয়ান বাজার সাব এরিয়া, চট্টগ্রাম
-কবরস্থান : নিজবাড়ির আঙিনা
-যে শাখার শহীদ : চট্টগ্রাম মহানগরী
-সাংগঠনিক মান : কর্মী
-যাদের হাতে শহীদ : মুজিববাদী ছাত্রলীগ সন্ত্রাসী।


•শহীদের চাচার বক্তব্য:

শহীদের চাচা কাজী মোজাম্মেল হক বলেন, আমরা মুক্তিযোদ্ধা হয়ে কেন সন্তান হত্যার বিচার পেলাম না। আমরা কি জীবন বাজী রেখে যুদ্ধ করেছিলাম সন্তান হারাবার জান্য? সন্ত্রাস মদদ দানের জন্য? হোসনে আরা আজো কাঁদেন পুত্রশোকে। কেউ তাকে দেখতে গেলে ছেলের মতই ভাববেন তাদেরকে। এক সন্তানকে হারিয়ে লক্ষ সন্তানের মাতা আর সামছুর হুদা লক্ষ ছেলের পিতা হলেন। শহীদ মোশাররফ তার সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন। জান্নাত থেকে তাকিয়ে আছেন আমাদের দিকে। দায়িত্ব আমাদের এ জমিনে কালেমার পাতাকা উড়াবার। দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে কষ্ট পাবেন, অভিযোগ করবেন আমাদের বিরুদ্ধে। আমাদের দাঁড়াতে হবে আখেরাতের কাঠগড়ায়।

Sunday, December 29, 2024

ইবনে আল-হাইসাম: জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোকবর্তিকা ও আধুনিক বিজ্ঞানের পথিকৃৎ


ইবনে আল-হাইসাম (৯৬৫–১০৪০): সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

আবু আলী আল-হাসান ইবনে আল-হাইসাম, যিনি আলহাজেন (Alhazen) নামে বেশি পরিচিত, ছিলেন ইসলামের স্বর্ণযুগের একজন কিংবদন্তি বিজ্ঞানী। তার গবেষণায় অপটিক্স, জ্যামিতি, জ্যোতির্বিদ্যা, গণিত ও পদার্থবিজ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। ইরাকের বসরায় জন্মগ্রহণকারী এই বিজ্ঞানী তার গবেষণা ও আবিষ্কারের জন্য আজও সম্মানিত।

• ইবনে আল-হাইসামের বৈজ্ঞানিক অবদান

১. অপটিক্স ও আলোর গতি
ইবনে আল-হাইসামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ "কিতাব আল-মানাযির" (Book of Optics)। এতে তিনি আলোর প্রতিফলন ও প্রতিসরণ ব্যাখ্যা করেন।

চোখের গঠন ও দৃষ্টির ব্যাখ্যা: তিনি প্রথম ব্যাখ্যা করেন যে চোখ থেকে রশ্মি বের হয় না; বরং আলোর রশ্মি চোখে প্রবেশ করে চিত্র তৈরি করে।

পিনহোল ক্যামেরা আবিষ্কার: তার গবেষণা থেকেই আধুনিক ক্যামেরার ধারণা গড়ে ওঠে।

আলোর বক্রতা ও প্রতিবিম্ব: তিনি বক্র ও সমতল আয়নার মাধ্যমে আলোর প্রতিফলন এবং প্রতিবিম্বের বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করেন।

লেন্সের ধারণা: পরবর্তীতে এই গবেষণা থেকেই চশমা, টেলিস্কোপ ও মাইক্রোস্কোপের ভিত্তি তৈরি হয়।

২. গণিত ও জ্যামিতি:
পার্থিব জ্যামিতির ব্যবহার: ইবনে আল-হাইসাম পরিপ্রেক্ষিত ও আলোর গতি বোঝার জন্য জ্যামিতির ব্যবহার করেন।

অপরিবর্তনশীল রশ্মি: তার গবেষণাগুলো গণিতের ত্রিভুজ ও কোণের তত্ত্বে ব্যাপক প্রভাব ফেলে।

ইন্টিগ্রাল ক্যালকুলাসের ভিত্তি: গণিতের এই শাখায় তার কাজ আধুনিক গাণিতিক গবেষণার পথ দেখিয়েছে।

৩. জ্যোতির্বিদ্যা:
তিনি চাঁদের আলোর প্রতিবিম্ব ও গ্রহের গতি নিয়ে গবেষণা করেন।

তার আবিষ্কারগুলো ইউরোপের মধ্যযুগীয় জ্যোতির্বিদ্যায় বিশেষ ভূমিকা রাখে।

চাঁদের প্রকৃতি ও আলোক বিচ্ছুরণ নিয়ে তিনি পরীক্ষামূলক গবেষণা চালান।

৪. পদার্থবিজ্ঞান:
তরল পদার্থের চাপ ও গতিবিধি নিয়ে তিনি গবেষণা করেন।

তিনি পানির প্রবাহ বিশ্লেষণ করেন যা আধুনিক জলবিদ্যুৎ প্রকৌশলের ভিত্তি স্থাপন করে।

ভারসাম্য ও মাধ্যাকর্ষণ নিয়ে তার গবেষণাগুলো নিউটনের গতিসূত্রের ভিত্তি গড়ে তোলে।

৫. বিজ্ঞান পদ্ধতির জনক:
ইবনে আল-হাইসামই প্রথম বিজ্ঞানকে পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে যাচাইয়ের ধারায় নিয়ে আসেন।

তিনি পরীক্ষামূলক পদ্ধতির ওপর জোর দেন, যা আধুনিক বিজ্ঞানীদের জন্য পথপ্রদর্শক।

তার এই পদ্ধতি পরবর্তীতে গ্যালিলিও ও বেকনের 
গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।


• ইবনে আল-হাইসাম ও ইসলামিক দর্শন:
ইবনে আল-হাইসাম কুরআনের জ্ঞান ও চিন্তার নির্দেশনাকে অনুসরণ করে গবেষণায় ব্রতী হন।

১. কুরআনের প্রেরণা:
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"তারা কি দৃষ্টি দেয় না আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি বিষয়ে?" (সূরা আল-আ’রাফ: ১৮৫)

এ আয়াত তাকে মহাবিশ্বের রহস্য উদঘাটনে অনুপ্রাণিত করে।

২. জ্ঞান অর্জনের নির্দেশ:
"তোমরা বল, যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা কি সমান হতে পারে?" (সূরা যুমার: ৯)

এই আয়াত ইবনে আল-হাইসামকে সত্যের অনুসন্ধানে অনুপ্রাণিত করে।


• পশ্চিমা বিশ্বের শ্রদ্ধা ও স্বীকৃতি:
ইউরোপে তার প্রভাব:
১২ শতাব্দীতে ইবনে আল-হাইসামের গ্রন্থগুলো ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয়।

রজার বেকন, কেপলার, এবং গ্যালিলিও তার গবেষণা থেকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত হন।

তার "Book of Optics" ৭০০ বছরের বেশি সময় ধরে ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পাঠ্যবই হিসেবে পড়ানো হয়।

• আধুনিক সম্মাননা:
২০১৫ সালে ইউনেস্কো তার সম্মানে "International Year of Light" ঘোষণা করে।

নাসা তার নাম অনুসারে চাঁদে একটি গর্তের নাম রেখেছে—"Alhazen Crater"।

বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানী ও গবেষকরা তাকে ‘আধুনিক অপটিক্সের জনক’ বলে অভিহিত করেন।

উপসংহার:
ইবনে আল-হাইসাম শুধু একজন বিজ্ঞানী ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন চিন্তাবিদ এবং অনুসন্ধানী মননশীলতা ও কুরআনের নির্দেশনার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। তার গবেষণা এবং অবদান আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তি গড়েছে।

কুরআনের আয়াত দিয়ে শেষ করি:
"তোমরা বল, হে আমার রব! আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করুন।" (সূরা ত্বাহা: ১১৪)

ইবনে আল-হাইসাম আমাদের শিক্ষা দেন কীভাবে বিশ্বাস ও যুক্তির সমন্বয়ে আলোকিত ভবিষ্যৎ গড়া যায়। তার গবেষণা ইসলামের বিজ্ঞানমনস্ক ঐতিহ্য এবং আজকের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ভিত্তি স্থাপনের অন্যতম ভিত্তিপ্রস্তর।

Thursday, December 12, 2024

জান্নাতি পাখি || শহীদ আবদুল কাদের মোল্লা রহ.



মিথ্যার দেয়াল তুলে ধ্রুব সত্যকে কখনো আড়াল করা যায় না। সত্য উদ্ভাসিত হয় তার নিজস্ব আলোয়। রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় ফাঁসী দেয়া হয় জামায়াতে ইসলামীর অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি জেনারেল সাংবাদিক নেতা শিক্ষাবিদ আব্দুল কাদের মোল্লাকে। সরকার যুদ্ধাপরাধী সাজিয়ে ফাঁসী দিলেও শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লা আজ স্মরণীয় শত কোটি প্রাণে; ইসলামের জন্য জীবন উৎসর্গকারী এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি সত্যপ্রেমীদের হৃদয় থেকে কখনো মুছে যাবেন না, আলোর পথের যাত্রীদের প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবেন যুগ যুগ ধরে।

১৯৪৮ সালের ২রা ডিসেম্বর ফরিদপুর জেলাস্থ সদরপুর উপজেলার চরবিষ্ণুপুর ইউনিয়নের ডাঙ্গী গ্রামে নিজ মাতুলালয়ে সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম সানাউল্লাহ মোল্লা ও মাতার নাম বাহেরুন্নেসা বেগম। আব্দুল কাদের মোল্লা ছিলেন নয় ভাইবোনের মাঝে ৪র্থ। তার জন্মের কিছুকাল পরে তার পিতা-মাতা সদরপুরেরই আমিরাবাদ গ্রামে এসে বাড়ি করে স্থায়ী ভাবে বসবাস শুরু করেন।

প্রাথমিক শিক্ষাঃ 
তিনি মেধাবী একজন ছাত্র হিসেবে ১৯৫৯ ও ১৯৬১ সালে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা বৃত্তি লাভ করেন। ১৯৬৪ সালে আমিরাবাদ ফজলুল হক ইনিষ্টিটিউট থেকে প্রথম শ্রেণীতে মাধ্যমিক পরীক্ষায় কৃতকার্য হন। ফরিদপুরের বিখ্যাত রাজেন্দ্র কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে ১৯৬৬ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরিক্ষায় উত্তীর্ন হন। ১৯৬৮ সালে তিনি একই কলেজ থেকে বিএসসি পাশ করেন। কিন্তু প্রবল আর্থিক সংকটের কারনে এরপর তাকে শিক্ষকতা পেশায় আত্মনিয়োগ করতে হয়। পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়া হয়নি তখন আর। ফরিদপুরের শিব সুন্দরী (এস এস) একাডেমি নামক একটি স্কুলে তিনি শিক্ষকতা করেন কিছু কাল।

উচ্চশিক্ষাঃ 
১৯৬৯ সালে পদার্থ বিজ্ঞানে এমএসসি করার জন্যে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ণকালে তিনি ড. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন।মুক্তিযুদ্ধের কারনে ১৯৭১ সালে তিনি মাস্টার্স পরীক্ষা না হওয়ায় তিনি বাড়ি চলে যান। পরবর্তীতে তিনি ১৯৭২ এর নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসেন। যুদ্ধের সময় প্র্যাকটিকাল পরীক্ষা না হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই আরো অনেকের মত আবদুল কাদের মোল্লার লেখাপড়াতেও ছন্দ পতন ঘটে। ১৯৭৪ সালে তিনি পুনরায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইআর (ইন্সিটিউট অব এডুকেশনাল রিসার্চ) বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৭৫ সালে তিনি শিক্ষা প্রশাসনের ডিপ্লোমায় অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। পরে আবার ১৯৭৭ সালে শিক্ষা প্রশাসন থেকে মাস্টার্স ডিগ্রীতে প্রথম শ্রেনীতে প্রথম হন।

কর্মজীবনঃ 
আব্দুল কাদের মোল্লা ১৯৭৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ঢাকার বিখ্যাত বিদ্যাপীঠ উদয়ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসাবে যোগদান করেন। এমএড পরীক্ষার রেজাল্টের পরে তিনি বাংলাদেশ রাইফেলস পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজের সিনিয়র শিক্ষক হিসাবে যোগ দেন এবং পরে তিনি একই প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি ইসলামী ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ এ সংস্কৃতি কর্মকর্তা হিসাবে যোগ দেন। ১৯৭৮ সালে রিসার্চ স্কলার হিসাবে বাংলাদেশ ইসলামী সেন্টারে যোগ দেন। গৌরব-সাফল্যের ধারাবহিকতায় উদয়ন উচ্চ বিদ্যালয়, রাইফেল পাবলিক স্কুল এবং মানারাত স্কুলের শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ১৯৮১ সালে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ পত্রিকায় সাব-এডিটর পদে যোগদান করেন তিনি। শিক্ষকতা পেশায় যে সত্যের পরশ পেয়েছিলেন, তা মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিতে তিনি সাংবাদিকতার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেন। অত্যন্ত অল্প সময়ের ব্যবধানে তিনি পত্রিকাটির নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব পান। এ সময়ে তাঁর ক্ষুরধার ও বস্তুনিষ্ঠ লেখা প্রকাশ হতে থাকে দেশের জাতীয় দৈনিকসমূহে। বীক্ষণ ছদ্মনামে তার লেখা আর্টিকেল গুলো সচেতন পাঠক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং জনপ্রিয়তা লাভ করে।

বৈবাহিক জীবনঃ 
জনাব মোল্লা দিনাজপুর নিবাসী বেগম সানোয়ার জাহানের সাথে ১৯৭৭ সালের ৮ অক্টোবর তারিখে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বেগম সানোয়ার জাহান ইডেন কলেজ থেকে পড়াশুনা করেছেন। তিনিও শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লার মত বাম রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন ও ইডেন কলেজের ছাত্রী ইউনিয়নের জিএস ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে বেগম সানোয়ার জাহান তার বাবার সাথে কুষ্টিয়াতে ছিলেন ও সক্রিয় ভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেছিলেন। বেগম সানোয়ার জাহানদের বাসা থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে খাবার যেত। দুই পুত্র ও চার কন্যার সুখী সংসার তাদের। সব সন্তানই দেশে-বিদেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে উচ্চ শিক্ষা গ্রহন করেছেন। পরিবারের সকলেই ইসলামী আন্দোলনের সাথে জড়িত। বেগম সানোয়ার জাহান জামায়াতের রুকন ও দায়িত্বশীলা ।

সাংবাদিক কাদের মোল্লাঃ 
সেসময়েরই একজন নির্ভীক সাংবাদিক শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লা। বর্ণাঢ্য জীবন নাটকের শেষ দৃশ্যে তিনি আমাদের কাছে একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত হলেও জীবনের সবচেয়ে গৌরবোজ্জল সময়টা অতিবাহিত করেছেন একজন নির্ভীক সাংবাদিক হিসেবে।
সামরিক স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে যে প্রত্রিকাগুলো তখন গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করে সর্বমহলের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করেছিল তাদের মধ্যে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আর এ পত্রিকাটিতে দক্ষ হাতে দায়িত্ব পালনের ফলে শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লা ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সদস্য মনোনীত হন। সাংবাদিকতা ও লেখালেখির পাশাপাশি জড়িয়ে পড়েন সাংবাদিকদের দাবী আদায়ের সংগ্রামে। ফলে শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লা ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন ও জাতীয় প্রেসক্লাবের সদস্য মনোনীত হন। সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ১৯৮২ ও ১৯৮৪ সালে পরপর দু’বার তিনি ঐক্যবদ্ধ ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সহ-সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। অন্তরে দ্রোহ আর বিপ্লবের চেতনা লালন করেও সদা হাস্যোজ্জল এ মানুষটি ছিলেন সাংবাদিক আড্ডার প্রাণ-ভ্রমরা। তার রসময় গল্পকথার সজীবতায় ভরে উঠতো গনমানুষের চেতনার প্রতীক জাতীয় প্রেসক্লাব।

কিন্তু একজন সাংবাদিকের জীবন সাধারণভাবেই কুসুমাস্তীর্ণ হয় না। কখনো সমাজের বিপথগামী অংশ, কখনো কায়েমি স্বার্থান্বেষী মহল, আবার কখনওবা প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তির রোষানলে পড়তে হয় তাকে। সত্য-মিথ্যার চিরন্তন দন্দ্বে উৎসর্গিত হয় সাংবাদিকের জীবন। চারপাশের চেনাজন, পরিচিত বন্ধুমহল একসময়ে পরিণত হয় তার শত্রুতে। হানে প্রাণঘাতি ছোবল। যে ছোবলের রূপ হয় নানারকম। মানসিক যন্ত্রণায় বিপন্নতা, শারিরিক আঘাতে পঙ্গুত্ববরণ, প্রাণঘাতি হামলায় মৃত্যু, কারাবন্দিত্বের নিঃসঙ্গ যাতনা কিংবা প্রহসনের বিচারে জীবনাবসান। এসবই ছিল যুগে যুগে সাংবাদিক জীবনের অনিবার্য উপাদান। শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লার জীবনেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি।

সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ায় একসময় সাংবাদিকতার পেশাকে বিদায় জানাতে হয় তাঁকে। কিন্তু যে পেশা তার জীবনকে সমৃদ্ধ করেছে এর মহত্বকে তিনি ধারণ করতেন সবসময়। তাইতো তিনি জাতীয় প্রেসক্লাবের একজন সম্মানিত সদস্য হিসেবে ছিলেন সাংবাদিক সমাজের অকৃত্রিম বন্ধু হয়ে। দৈনিক সংগ্রাম অফিসের প্রতিটি ধুলিকণা এখনো বহন করে বেড়াচ্ছে কাদের মোল্লার স্মৃতি ।

রাজনৈতিক জীবনঃ 
শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লার রয়েছে সংগ্রামী রাজনৈতিক ক্যারিয়ার। অষ্টম শ্রেণীতে অধ্যায়ন কালেই তিনি কম্যূনিজমের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দেন। ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত তিনি এ সংগঠনের সাথে যুক্ত থাকার পর তাফহীমুল কুরআনের হৃদয়স্পর্শী ছোঁয়ায় তিনি ইসলামের প্রতি প্রবল আকর্ষিত হন এবং আলোকিত জীবনের সন্ধান পেয়ে ছাত্র ইউনিয়ন ছেড়ে তিনি ছাত্রসংঘের তৎকালিন পূর্ব পাকিস্তান শাখায় যোগদান করেন। ১৯৭০ সালে তিনি এ সংগঠনের সদস্য হন। ছাত্রসংঘের শহিদুল্লাহ হল শাখার সভাপতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি, ঢাকা মহানগরীর সেক্রেটারী ও একই সাথে কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭৯ সালের মে মাসে জামায়াতের রুকন হন। তিনি অধ্যাপক গোলাম আযমের ব্যাক্তিগত সেক্রেটারি এবং ঢাকা মহানগরীর শূরা সদস্য ও কর্মপরিষদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে অল্পদিনের ব্যাবধানেই জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিশ-এ-শূরার সদস্য হন। ১৯৮২ সালে তিনি ঢাকা মহানগরী জামায়াতের সেক্রেটারী ও পরবর্তীতে ১৯৮৬ সালের প্রথম দিকে ঢাকা মহানগরীর নায়েব-এ-আমীর, অতঃপর ১৯৮৭ সালে ভারপ্রাপ্ত আমীর এবং ১৯৮৮ সালের শেষ ভাগে তিনি ঢাকা মহানগরীর আমীর ও কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন যা বাতিলের মাথা ব্যাথার কারণ হয়ে দাড়ায়।

১৯৯১ সালের প্রথম দিকে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে তিনি জামায়াতের প্রধান নির্বাচনী মুখপাত্র হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৯১ সালে কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক ও ২০০০ সালে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের এসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে মনোনীত হন। তিনি ২০০৪ সালের মার্চ মাসে স্বল্প সময়ের জন্য ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্ব পালন করেন। উক্ত দায়িত্বের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ সরকার বিরোধী আন্দোলনে তিনি চারদলীয় জোটের লিয়াজো কমিটির গুরুত্বপূর্ন সদস্য হিসাবে নিয়োজিত ছিলেন।

স্বাধীন বাংলাদেশর প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অগ্রনী ভূমিকা পালন করেন শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লা। বিশেষ করে ৯০এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তিনি জামায়াতের প্রতিনিধি হিসেবে লিয়াঁজো কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি। তখন কমিটিতে গৃহীত আন্দোলনের কর্মসূচি সম্পর্কে ব্রিফিং করতেন আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ নাসিম এবং তা বিভিন্ন পত্রিকায় ছাপানোর ব্যবস্থা করতেন শহীদ আবদুল কাদের মোল্লা। লিয়াঁজো কমিটিতে বিভিন্ন সময়ে নানা দায়িত্ব পালন করার কারনে বিএনপি দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা সহ উভয় দলের সিনিয়র নেত্রীবৃন্দের সাথে আন্দোলনের নীতি নির্ধারণী সভাতে মিলিত হতেন তিনি।

জনাব মোল্লাকে বিভিন্ন মেয়াদে চার চারবার জেলে যেতে হয়। আইয়ুব সরকারের নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালনের দায়ে ১৯৬৪ সালে প্রথম বারের মত তিনি বাম রাজনীতিক হিসেবে গ্রেপ্তার হন। ১৯৭১ সালে তিনি আবার গ্রেপ্তার হন। কিন্তু স্থানীয় জনতার বিক্ষোভের মুখে পুলিশ তাকে স্থানীয় পুলিশ স্টেশন কাস্টোডী থেকেই ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। জেনারেল এরশাদের শাসনের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের কারনে আব্দুল কাদের মোল্লাকে আবারও আটক করে রাখা হয় ১৯৮৫ সালের ২২শে এপ্রিল থেকে ১৪ই অগাস্ট । প্রায় চারমাস আটক থাকার পরে উচ্চ আদালত তার এ আটকাদেশকে অবৈধ ঘোষণা করলে তিনি মুক্ত হন। এরপর ১৯৯৬ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারী তত্তাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমদের সাথে একই দিনে গ্রেফতার হন। সাত দিন পরে তিনি মুক্ত হন।

শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লার কূটনীতিকদের সাথে ছিল গভীর সম্পর্ক। সদা হাস্যোজ্জল ও রসময় কাদের মোল্লার কথা ছাড়া কোন প্রোগ্রাম জমজমাট হতো না। জামায়াতের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি নানা কূটনীতিক প্রোগ্রামে সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। জনাব মোল্লা বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ভ্রমন করেছেন। তিনি আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জাপান, সিঙ্গাপুর, পাকিস্তান, ভারত সহ নানা দেশ সফর করেছেন।

জনাব মোল্লা সক্রিয় ভাবে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংস্থার সাথে যুক্ত ছিলেন। যার মধ্যে বাদশাহ ফয়সাল ইন্সটিটিউট, ইসলামিক এডুকেশন সোসাইটি ও এর স্কুল, সাইয়্যেদ আবুল আ’লা মওদূদী রিসার্চ একাডেমী, সদরপুর মাদরাসা ও এতিমখানা, ফরিদপুর জেলার হাজিডাঙ্গি খাদেমুল ইসলাম মাদরাসা ও এতিমখানা, সদরপুর আল-আমিন অন্যতম। এছাড়াও তিনি ঢাকার গুলশানের মানারাত ইন্টারন্যাশনাল স্কুল ও কলেজের প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারি ছিলেন।

জনাব মোল্লা দেশ বিদেশের সমসাময়িক বিষয়ের উপর একাধিক কলাম ও প্রবন্ধ লিখেছেন। দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক সংগ্রাম, পালাবদল, মাসিক পৃথিবী, কলম ইত্যাদি নানা জায়গায় তার লেখা ছাপা হয়েছে। প্রত্যাশিত শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে দেশে বিদেশে তিনি বিভিন্ন সেমিনার সিম্পোজিয়ামে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছেন। ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ের উপরে তার গুরুত্বপূর্ণ লেখা পাওয়া যায়। তার লেখা কলাম ও প্রবন্ধ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক পত্রিকা ও ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া ও বস্তুবাদ ও কম্যূনিজমের উপরে তার বৈজ্ঞানিক সমালোচনা শিক্ষিত মহলের কাছে ব্যাপক সমাদৃত হয়েছে। দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকায় তিনি প্রথমে আব্দুল কাদের নামে লেখা শুরু করেন।পরবর্তীতে তিনি বীক্ষণ ছদ্মনামে লেখা শুরু করেন ও উনার লেখা গুলো খুবই জনপ্রিয়তা অর্জন করে। আন্তর্জাতিক ও দেশীয় রাজনীতি, সমাজ ব্যবস্থা, শিক্ষা ব্যবস্থা, সমসাময়িক সমস্যা ইত্যাদি নানা বিষয়ে তার লেখা মানুষের চিন্তা-চেতনার জগতে ঢেউ তুলতে শুরু করে।

জনাব মোল্লা নিয়মিত কুরআন পড়তে ও কুরআন তেলাওয়াত শুনতে পছন্দ করতেন। তিনি সাংগঠনিক ব্যস্ত সময় মধ্যেও তিনি বিভিন্ন বিখ্যাত লেখক, কবি যেমন আল্লামা ইকবাল, সাইয়্যেদ আবুল আলা মওদূদী, সাইয়্যেদ কুতুব ইত্যাদি নানা লোকের লেখা পড়তে পছন্দ করতেন।

শাহাদাতঃ 
২০১০ সালের ১৩ জুলাই সরকার তাকে রাজনৈতিক মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করে এবং পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে ষড়যন্ত্রমূলক মামলা দায়ের করে। ট্রাইবুনালের রায়ে তাকে যাবজ্জীবন কারাদ- দেয়া হয়। এরপর সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় শাহবাগে স্থাপিত গণজাগরণ মঞ্চের দাবি অনুযায়ী সরকার আইন সংশোধন করে আপিল দায়ের করে। সংশোধিত আইনের ভিত্তিতে তাকে ফাঁসির আদেশ প্রদান করা হয়। আবদুল কাদের মোল্লা ফাঁসির আদেশের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ পাননি। এমনকি রিভিউ আবেদন খারিজের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পূর্বেই তড়িঘড়ি করে ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর রাত ১০টা ১ মিনিটে তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়। তাঁকে ফাসি দেয়ার প্রায় দেড় বছর পর তার রিভিউ আবেদন খারিজের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। এসব ঘটনা থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, তিনি বিচারের নামে কত বড় প্রহসনের শিকার হয়েছেন!

Sunday, December 8, 2024

বইনোট : ইসলামী রাষ্ট্র কিভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় (ইসলামী বিপ্লবের পথ) || সাইয়্যেদ আবুল আ'লা মওদুদী রহ.



এটি ১৯৪০ সনের বক্তৃতা, জামায়াতে ইসলামী তখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। 
[বইয়ের মুল নাম: ইসলামী হুকুমাত কিসতারাহ কায়েম হোতি হ্যাঁয়]

• ভূমিকা:
ইসলামী বিপ্লবের পথ বইটির মূল কথা হল 'ইসলামী রাষ্ট্র কিভাবে প্রতিষ্ঠা হবে' এই লক্ষ্যে বইটির লেখক মরহুম মাওলানা মওদুদী (র) ১৯৪০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভারতের আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্ট্রেচী হলে এ সম্পর্কে এক অনুপম বক্তব্য পেশ করেন। বক্তব্যের শিরোনাম ছিল '
ইসলামী হুকুমাত কিসতারাহ কায়েম হোতি হ্যাঁয়' এর অর্থ হল ইসলামী রাষ্ট্র কিভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

• মূল আলোচনা:
বইটির মূল আলোচনাকে ৮টি অংশে বিভক্ত করা হয়েছে। যথা.
১. ইসলামী রাষ্ট্র কিভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়
২. রাষ্ট্র ব্যবস্থার স্বাভাবিক বিবর্তন
৩. আদর্শিক রাষ্ট্র
৪. আল্লাহর সার্বভৌমত্ব এবং মানুষের প্রতিনিধিত্ব ভিত্তিক রাষ্ট্র।
৫. ইসলামী বিপ্লবেরপদ্ধতি বা পন্থা
৬. অবাস্তব কল্পনা বা ধারনা
৭. ইসলামী আন্দোলনের সঠিক কর্মপন্থা
৮. সংযোজন

 ইসলামী রাষ্ট্র কিভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়:
১. বর্তমানে ‘ইসলামী রাষ্ট্র’ নাম শিশুদের হাতের খেলনায় পরিণত হয়েছে।
২. যারা ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চান তারা এটা জানেন না কিভাবে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হয় এবং জানার চেষ্টাও করেন না।
৩. যারা ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায় তারা যে প্রস্তাব দেয় মোটর সাইকেলে যেমন আমেরিকায় পৌঁছানো সম্ভব নয় তেমনি তাদের প্রস্তাবে মূল লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

• রাষ্ট্র ব্যবস্থার স্বাভাবিক বিবর্তন:
“কৃত্রিম ও অস্বাভাবিক উপায়ে কোন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয় না।”
১. একজায়গা থেকে তৈরি করে এনে অন্য জায়গায় প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।
২. কোন একটি সমাজের মধ্যকার নৈতিক চরিত্র, চিন্তা-চেতনা, মন-মানসিকতা, সভ্যতা-সংস্কৃতি এবং ইতিহাস-ঐতিহ্যগত কার্যকারণের সমন্বিত কর্মপ্রক্রিয়ার ফলশ্রতিতে।
৩. সম্পূর্ণ স্বাভাবিক নিয়মে জন্মলাভ করে ইসলামী রাষ্ট্র।
৪. সামাজিক উদ্যম, উদ্দীপনা, ঝোঁক-প্রবণতা প্রভৃতি নিবিড় সম্পর্ক রাষ্ট্র গঠনের পূর্বশর্ত।
৫. প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নেতৃত্ব প্রয়োজন।
৬. সামাজিক কার্যক্রম ও পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।
৭. দীর্ঘ প্রানান্তকর চেষ্টা (যেমন বীজ হতে ফল)।

• আদর্শিক রাষ্ট্র:
১. ইসলামী রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য

(i) ইসলামী রাষ্ট্র একটি আদর্শিক রাষ্ট্র।
(ii) সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের প্রভাবমুক্ত।

২. ফরাসী বিপ্লবের আদর্শিক রাষ্ট্রের ক্ষীণ রশ্মি দেখা গেলেও জাতীয়তাবাদের প্রভাবে চাপা পড়ে তা বিলুপ্ত হয়। 
(i) রাশিয়ার কম্যুনিজম ও সমাজতন্ত্রের মৌলিক নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত হলেও অতিসত্ত্বর তা আদর্শচ্যুত হয়। 
(ii) মুসলিম দেশের কতৃত্বশীল লোকেরা জাতীয়তাবাদের আখড়ায় পড়ে ইসলামী ভাবধারা ও আদর্শভিত্তিক রাষ্ট্রের ধারণা হারিয়ে ফেলেছে। 

৩. আদর্শ রাষ্ট্র বাস্তবায়নের প্রয়োজন:
ক) ভিত্তি স্থাপন হতে চূড়ান্ত পর্যায় পর্যন্তপ্রায় অস্তিত্ব রক্ষা করা। উত্তরোত্তর শক্তি বৃদ্ধি করা।
খ) জাতীয়তাবাদী চিন্তা-পদ্ধতি সংগঠন প্রণালী পরিহার করা।

৪. আদর্শভিত্তিক রাষ্ট্রের লক্ষ্যে:
ক) জাতি-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সকলের কাছে এর আদর্শ পেশ করা। 
খ) সেই আদর্শ অনুযায়ী সমাজ এবং রাষ্ট্র গঠন করে কল্যাণ সাধন।

• আল্লাহর সার্বভৌমত্ব এবং মানুষের প্রতিনিধিত্ব ভিত্তিক রাষ্ট্র:
(ক) ইহার বৈশিষ্ট্যঃ
১. ইসলামী রাষ্ট্রের মূল বুনিয়াদ
২. নিখিল বিশ্ব জগৎ আল্লাহতাআলার রাজ্য। তিনি ইহার প্রভূ, শাসক ও বিধানদাতা।
৩. মানুষ এই দুনিয়ায় আল্লাহরপ্রতিনিধি।
৪. খেলাফতের এই দায়িত্বের জন্য প্রত্যেককেই আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।

(খ) ইসলামী রাষ্ট্রের স্বরূপঃ
১. এটা ধর্মহীন রাষ্ট্র হতে সম্পূর্ণ আলাদা।
২. এটা পরিচালনার জন্য এক বিশেষ মনোবৃত্তি বিশেষ প্রকৃতি এবং বিশেষ ধরনের নির্ধারন আবশ্যক।
৩. ধর্মহীন রাষ্ট্রের জজ ও প্রধান বিচার প্রতি ইসলামী রাষ্ট্রের কেরানী হওয়ার যোগ্যতা রাখে না।
৪. ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিটি বিভাগের জন্য খোদাভীতি, নিজ কর্তব্য পালন ও সেজন্য আল্লাহরকাছে জবাব দিহির তীব্র অনুভূতি ও উন্নত চরিত্রের অধিকারী লোকের প্রয়োজন।

(গ) ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনা কারীদের বৈশিষ্ট্যঃ
• পৃথিবীর বিপুল পরিমান সম্পত্তি হস্তগত থাকলেও তারা তার পূর্ন আমানতদার।
• রাজশক্তি করায়ত্ত হলেও সুখ নিদ্রা ত্যাগ করে জনস্বার্থে রক্ষণাবেক্ষণ।
• যুদ্ধে বিজয়ী দেশে হিংসাত্মক কাজে লিপ্ত না হয়ে তাদের ইজ্জত আব্রর হেফাজতকারী।
• নিজেদের স্বার্থকে ধুলিস্যাৎ করে অপরের স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়া।
• আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তারা এমন মর্যাদার অধিকারী হবে যে, তাদের সততা, সত্যবাদীতা, ন্যায়পরয়নতা, নৈতিক ও চারিত্রিক, মূল নীতির অনুসরণ এবং প্রতিশ্রুতিও চুক্তি পালনের ব্যাপারে গোটা বিশ্ব তাদের উপর আস্থাশীল হবে।

• ইসলামী বিপ্লবের পদ্ধতি বা পন্থা:
১. ইসলামী রাষ্ট্রের অলৌকিক আবির্ভাব ঘটনা
• ইসলামী জীবন দর্শন চরিত্র ও প্রকৃতির বিশেষ মাপকাঠি অনুযায়ী গঠিত ব্যাপক আন্দোলন সৃষ্টি করা। নেতা ও কর্মীদের এই বিশিষ্ট আদর্শে আত্মগঠন করা।
• সমাজ জীবনে অনুরূপ মনোবৃত্ত ও নৈতিক উদ্দীপনা জাগ্রত করা।
• ইসলামী আদর্শে নাগরিকদের গড়ে তুলতে একটি অভিনব শিক্ষা পদ্ধতি চালু করা।
• জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রত্যেকটি শাখায় ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে চিন্তা ও কাজ করতে সক্ষম এমন লোক গড়ে তোলা।
• ইসলামী আদর্শের চিন্তা-চেতনা ও কর্ম জীবনের একটি পরিপূর্ণ পরিকল্পনা প্রণয়ন।
• ইসলামী আন্দোলন চতুপার্শ্বে যাবতীয় অবাঞ্চিত জীবন-ধারার বিরূদ্ধে প্রকাশ্যে সংগ্রাম করবে।

২. ইহাতে নিম্নোক্ত ফল পাওয়া যাবে:
• পরীক্ষার অগ্নিদহনে উত্তীর্ণ ত্যাগী লোক তৈরি হবে।
• এ আন্দোলনে এমনসব লোক পর্যায়ক্রমে যোগদান করবে যাদের প্রকৃতিতে সত্য-ন্যায়ের উপাদান অন্তর্নিহিত রয়েছে।
• সর্বশেষে কাঙ্খিত রাষ্ট্র ব্যবস্থার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে।

৩. যে কোন ধরনের বিপ্লব সৃষ্টি করার জন্য প্রয়োজন:
• একটি বিশেষ ধরনের আন্দোলন।
• বিশেষ ধরনের সামাজিক চেতনা সম্পন্ন নৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ সৃাষ্ট। উদাহরণ, রুশ বিপব, জার্মানির সমাজতন্ত্রের বিপব।

• অবাস্তবকল্পনা বা ধারনা:
১. কিছু লোকের ধারণা মুসলিম জাতিকে একটি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অধীনে একই পাটফর্মে সংগঠিত ও পরিচালিত করতে পারলেই ইসলামী রাষ্ট্র আপনা আপনিই প্রতিষ্ঠিত হবে। 
২. মুসলমানদের বর্তমান নৈতিক ও ধর্মীয় অবস্থার স্বরূপ যেমন- চরিত্রগত দিক থেকে দুনিয়ার মুসলিম ও অমুসলিম জাতিগুলোর সবগুলোর অবস্থা প্রায় একই। উদাহরণঃ আদালতে মিথ্যা সাক্ষী দেওয়া, ব্যবসা-বাণিজ্যে দুর্নীতি, রোজার দিনে একই সাথে খাওয়া, সুদ, ঘুষ, জেনা ইত্যাদির সাথে লিপ্ত হওয়া।

• ইসলামী আন্দোলনের সঠিক কর্মপন্থা:
হযরত মুহাম্মদ (সা) এর কর্মপন্থাই হচ্ছে ইসলামী আন্দোলনের সঠিক কর্মপন্থা। তার অনুসৃত বিশিষ্ট কর্মপন্থাগুলো নিম্নরূপ:

১. ইসলাম হলো সেই আন্দোলনের নাম যা মানব জীবনের গোটা ইমারত নির্মান করতে চায় এক আলাহর সার্বভৌমত্বের দৃষ্টিভঙ্গির উপর।
২. ইসলামী আন্দোলনের লক্ষ্য কোন ইস্যুকে কেন্দ্র করে নয়।
৩. মূল লক্ষ্য আলাহর একত্ব ও সার্বভৌমত্বের দাওয়াত দেওয়া।

• ইসলামী আন্দোলনের সঠিক কর্মনীতির চারটি দিক রয়েছেঃ
ক) আলাহর সার্বভৌমত্ব মেনে নেওয়ার আহবান।
খ) অগ্নী পরীক্ষায় নিখাঁদ প্রমানিত হওয়া।
গ) নেতা ছিলেন আদর্শের মডেল।
ঘ) আদর্শের কার্যকর স্বাভাবিক বিপব।

ক) আল্লাহর সার্বভৌমত্ব মেনে নেওয়ার আহবান:
১. বুদ্ধিমান ও বাস্তববাদী হয়ে থাকা তবে বুদ্ধিমত্তা ও বাস্তববাদীতার দাবী হলো সেই মহান সম্রাটের হুকুমের সম্মুখে মাথা নত করে দাও তার একান্ত আনুগত্য দাস হয়ে যাও।
২. গোটা জাতির একজনই সম্রাট মালিক এবং সার্বভৌম কর্তা রয়েছেন। অন্য কারো কতৃত্ব করার কোন অধিকার নাই।
৩. আলাহ ছাড়া আমি সকলের বিরূদ্ধে বিদ্রোহী এবং যারা আলাহকে মানে তারা ব্যতিত] ৪. এই ঘোষণা উচ্চারণ করার সাথে সাথে বিশ্ববাসী আপনার শত্রুহবে এবং চতুর্দিক থেকে সাপ, বিচ্ছু আর হিংস্র পশুরা আপনাকে নির্মমভাবে আক্রমণ করছে।

খ) অগ্নি পরীক্ষায় নিখাঁদ প্রমাণিত হওয়াঃ
১. লা ইলাহা ইলালাহ এই ঘোষণা হওয়ার সাথে সাথে পোপ (খৃস্টান) ঠাঁকুরদের সকল শক্তি ঐক্যবদ্ধ হলো এগুলো গঠন করে হলো ঐক্যজোট।
২. তাদের উপর নেমে আসে কঠিন অত্যাচার এবং এর ফলেই ইসলামী আন্দোলন মজবুত হয় এবং ক্রমবিকাশ ও প্রসার লাভ করে।
৩. এর ফলেই সমাজের মনি-মুক্তাগুলো আন্দোলনে শরিক হয়।
৪. একদিকে এই বিপ্লবী কাফেলায় যারা শরিক হচ্ছিল বাস্তবে ময়দানে তাদের হতে থাকে যথার্থ প্রশিক্ষণ।
৫. কিছু লোক দিনের পর দিন মার খাচ্ছে এ দেখে কিছু মানুষ উৎসাহী হয় এরা কি কারণে মার খাচ্ছে।

গ) নেতা ছিলেন আদর্শের মডেলঃ
১. বর্তমান ইসলামী আন্দোলনের নেতা কর্মীদের সেই মহান নেতার নেতৃত্ব আদর্শ, সহানুভূতি এবং সার্বিকভাবে তার মডেলকে অনুসরণ করা একান্ত দরকার।
২. এই নেতার স্ত্রী ছিলেন বিপুল ঐশ্বর্যের মালিক।
৩. কালিমার দাওয়াত কবুল ও মানুষকে এ দাওয়াত দেওয়ার সাথে সাথে তাদের সম্পদ শেষ হয়ে যায়।
৪. নেতা ছিলেন অত্যন্ত ধৈর্যশীল ও সহনশীল।
৫. সমকালীন সময়ে তাকে ইসলামী আন্দোলনের কাজ না করার প্রতিফল হিসাবে আরব জাহানের বাদশাহী এবং আরবের শ্রেষ্ঠ সুন্দরী নারী দিতে চেয়ে ছিল। কিন্তু তিনি তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করেন এবং তিরস্কার আর প্রস্তাব্যগত সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করেন।
৬. অত্যন্ত গরমের সময় মরুভূমির মধ্য দিয়ে পায়ে হেঁটে দ্বীনের দাওয়াত দিতেন সাথীদের সাথে নিয়ে।
৭. হাশেমী গোত্রের লোকেরা এই আন্দোলনের প্রতি অনীহা ছিল।

ঘ) আদর্শের কার্যকর স্বাভাবিক বিপ্লব:
ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য একদল লোককে সম্পূর্ণভাবে তৈরি করা হয়েছিল যারা ইসলামের পূর্ণ প্রশিক্ষণ পেয়ে এতটা যোগ্য হয়েছিল যে তারা যেকোন অবস্থা ও পরিস্থিতিতে মুসলমান হিসেবে দায়িত্ব পালনে সক্ষম ছিল। উদাহরণ, মদীনায় একটি ইসলামী রাষ্ট্র।

একথা সত্য যে, একাজের জন্য প্রযোজন ঈমান, ইসলামীক চেতনা, ঐকান্তিক নিষ্ঠা, মজবুত ইচ্ছাশক্তি এবং ব্যক্তিগত আবেগ, উচ্ছাস ও স্বার্থের নিঃশর্ত কুরবাণী। 

 

একাজের জন্য এমন একদল দুঃসাহসী যুবকের প্রয়োজন যারা সত্যের প্রতি ঈমান এনে তার উপর পাহাড়ের মত অটল হয়ে থাকবে। অন্যকোন দিকে তাদের দৃষ্টি নিবন্ধ হবে না। পৃথিবীতে যা-ই ঘটুকনা কেন, তারা নিজেদের লক্ষ্য- উদ্দেশ্যের পথ থেকে এক ইঞ্চিও বিচ্যুত হবে না।

Tuesday, October 29, 2024

আধুনিক সভ্যতার সূতিকাগার || আবুল আসাদ || একুশ শতকের এজেন্ডা


সেই ষাটের দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির ক্লাসে প্রথম শুনি যে, ধর্ম-জ্ঞান, গবেষণা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিরোধী। তারপর এই কথা নানাভাবে আরও অনেকের কাছে শুনেছি। লেখা-পড়া যাদের মূর্খ বানিয়েছে, তারা এখনও এসব কথা বলে থাকেন সুযোগ পেলেই। এদের রাগ ইসলামের উপরই বেশি। খ্রিস্টান ধর্ম প্রধানত পাশ্চাত্যের এবং হিন্দুধর্ম ভারতের, তাই এসব ধর্ম ওদের কাছে প্রগতিশীল। কিন্তু মুসলিম দেশগুলো অনুন্নত ও দরিদ্র বলে ইসলামকেও ওরা জ্ঞান-বিজ্ঞান বিমুখ ও অনুন্নয়নের প্রতীক বলে চলছে। অথচ ইসলাম সবচেয়ে বিজ্ঞানমুখী ও সবচেয়ে প্রগতিশীল ধর্ম। ইতিহাসের সাক্ষ্যও এটাই। Prof. Joseph Hell বলেন, "মানব জাতির ইতিহাসে স্বীয় ছাপ মুদ্রিত করা সব ধর্মেরই প্রধান বৈশিষ্ট্য। কিন্তু ইসলাম যতটা দ্রুতবেগে ও অকপটভাবে বিশ্ব মানবের হৃদয় স্পর্শকারী মহা পরিবর্তন সাধন করেছে, জগতের অন্যকোন ধর্ম তা পারেনি।" এই কথাই আরও স্পষ্ট করে বলেছেন ঐতিহাসিক O. J. Thatcher Ph. D এবং F. Schwill Ph. D তাদের ইতিহাস গ্রন্থে, "পয়গম্বর মোহাম্মদের মৃত্যুর পর পাঁচশ' বছর তার অনুগামিরা এমন এক সভ্যতার পত্তন ঘটায় যা ইউরোপের সবকিছু থেকে বহুগুণ অগ্রগামী।" আর Meyrs তার Mediaeval and Modern History' তে বলেন, "সেখানে এমন এক সভ্যতার উত্থান ঘটে, দুনিয়া যা দেখেছে এমন সবকিছুকেই তা অতিক্রম করে যায়।"


সত্যই ইসলামের উত্থানের সাথে সাথে জ্ঞান-বিজ্ঞানের জগতে এবং সভ্যতার গতিধারায় এক বিস্ময়কর পরিবর্তন সূচিত হয়। ইউরোপ যখন অজ্ঞতা, অশিক্ষা, কুসংস্কার ও স্বৈরাচারের গভীর ঘুমে অচেতন তখন এশিয়া-আফ্রিকায় ইসলামের আলোকধারা জ্ঞান ও সভ্যতামণ্ডিত নতুন এক বিশ্বের জন্ম দেয়। মানবাধিকার, গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক সুবিচার ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নয়ন সবদিক থেকেই মানব জাতিকে ইসলাম এক অন্যান্য সভ্যতা দান করে।

পাশ্চাত্যের ওরা এখন গণতন্ত্র ও গণতন্ত্রের সাংঘাতিক প্রবক্তা সেজেছেন। আর ইসলামকে বলা হচ্ছে মানবতা বিরোধী, অসহিষ্ণু ইত্যাদি। এসব কথা বলার সময় তারা অতিতের দিকে তাকায় না এবং নিজের চেহারার উপর একবারও নজর ফেলেনা। যে গ্রীক ও রোমান সভ্যতা আজকের পাশ্চাত্য সভ্যতার দার্শনিক ভিত্তি, সে সভ্যতায় গণতন্ত্রতো দূরের কথা কোনপ্রকার সহিষ্ণুতা ও সহাবস্থানের কোন স্থান নেই। আভ্যন্তরীণভাবে তাদের নীতি ছিল 'সারভাইভেল অব দা ফিটেস্ট/ এবং আন্তর্জাতিকভাবে তারা অনুসারী ছিল 'মাইট ইজ রাইট'। গ্রীকরা বলতো 'যারা গ্রীক নয় তারা গ্রীকদের কৃতদাস হবে এটা প্রকৃতির ইচ্ছা।' আর রোমানরা মনে করতো, তারাই পৃথিবীর মালিক, পৃথিবীর সব সম্পদ তাদের জন্যই। ইউরোপের এই অন্ধকার যুগে মানবাধিকার বলতে কোন ধারণার অস্তিত্ব ছিল না। পরাজিত ও ভাগ্যাহতদের নিহত হওয়া অথবা চিরতরে দাসত্বের নিগড়ে বন্দী হওয়াই ছিল ভবিতব্য। নারীদের অর্থনৈতিক ও অন্যবিধ অধিকার থাকা দূরের কথা তারা পূর্ণ মানুষ কিনা তা নিয়েই ছিল বিতর্ক। শত্রু ও বাদী জাতীয় লোকদের কোন মানবিক অধিকার স্বীকৃত ছিলনা।

এই দুঃসহ অন্ধকারের হাত থেকে ইসলাম মানুষকে মুক্ত করে, পৃথিবীকে নিয়ে আসে আইনী শাসনের আলোকে। চৌদ্দশ' বছর আগে ইসলাম ঘোষণা করে, বংশ, বর্ণ, জাতি, দেশ নির্বিশেষে সব মানুষ সমান। এই নীতি হিসেবে ইসলাম সব মানুষকেই আইনের অধীনে নিয়ে এসেছে এবং মানুষকে রক্ষা করেছে যথেচ্ছচার থেকে। শত্রু ও পরাজিত বন্দীদেরকেও ইসলাম মানুষ হিসাবে দেখতে বলে। কোন যুদ্ধবন্দীকে হত্যা করা ইসলাম নিষিদ্ধ করেছে এবং তাদের স্থানে মানবসুলভ, মেহমানসুলভ ব্যবহার করতে বলেছে। নির্দেশ দেয়া হয়েছে বন্দীদের সুখাদ্য দিতে হবে, বন্দীদের উত্তাপ ও শৈত্য থেকে রক্ষা করতে হবে, কোন কষ্ট অনুভব করলে দ্রুত তা দূর করতে হবে, বন্দীদের মধ্যে কোন মাতাকে তার সন্তান থেকে, কোন আত্মীয়কে অন্য আত্মীয় থেকে আলাদা করা যাবে না। বন্দীদের মান-মর্যাদা রক্ষাসহ তাদের কাছ থেকে জবরদস্তী কোন কাজ নেয়া যাবে না। যুদ্ধবন্দী সংক্রান্ত এ নীতিমালা ইসলাম দেয় চৌদ্দশ' বছর আগে, পাশ্চাত্য এই শিক্ষা, আংশিকভাবে, গ্রহণ করে মাত্র ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের এক প্রস্তাব আকারে। ইসলাম চৌদ্দশ' বছর আগে বিধান দেয় যে, চিকিৎসা পুরাপুরি মানবীয় সেবা। চিকিৎসক ও সেবাদানকারীদের কোন অনিষ্ট করা যাবে না। ইসলামের এই শিক্ষা গ্রহণ করেই পাশ্চাত্য মাত্র ১৮৬৪ সালে রেডক্রস গঠনের মাধ্যমে চিকিৎসা সুযোগকে শত্রু-মিত্র বিবেচনার উর্ধ্বে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে। মানবতা বিরোধী দাস প্রথা বিলোপের ব্যবস্থা করে ইসলাম চৌদ্দশ' বছর আগে। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দাস প্রথা বিলুপ্ত হয় ১৮৬৩ সালে। ইসলামে পুরুষের মতই নারী শিক্ষা বাধ্যতামূলক ইসলামের এই শিক্ষার পরও ১১শ' বছর পর্যন্ত পাশ্চাত্য নারীদের শিক্ষার উপযুক্ত ভাবেনি। অবশেষে ১৮৩৫ সালে মার্কিন মেয়েরা প্রথম স্কুলে যাবার সুযোগ পায়। আর নিজ নামে সম্পত্তি ভোগের অধিকার পায় ১৮৪৮ সালে। অথচ ইসলাম নারীদের এ অধিকার দেয় চৌদ্দশ' বছর আগে। পাশ্চাত্য যেখানে ১৯৪৮ সালের জেনেভা কনভেনশনের আগ পর্যন্ত বিজিত দেশের মানুষকে দাস মনে করতো এবং এখনও লুটতরাজের যোগ্য মনে করে, সেখানে ইসলাম বিজিত দেশের মানুষকে সম্মানিত নাগরিক হিসেবে দেখে। খিলাফতে রাশেদার যুগে কোন নতুন ভূখণ্ড মুসলমানদের দখলে এলে সেখানকার মানুষকে আর শত্রুর দৃষ্টিতে দেখা হতোনা। মুক্ত মানুষ হিসাবে তাদের এ অধিকার দেয়া হতো যে, তারা একবছর সময়কালের মধ্যে যেন সিদ্ধান্ত নেয় যে, তারা পছন্দের কোন দেশে চলে যাবে, না মুসলিম দেশের নাগরিক হিসাবে বসবাস করবে।

মানবতাকে ইসলাম সম্মান করে বলেই ইসলাম ও মুসলমানরা সহিষ্ণুতার প্রতীক। একটা উদাহরণ এখানে যথেষ্ট। ক্রুসেডের যুদ্ধে খ্রিস্টানরা যখন মুসলমানদের হাত থেকে জেরুজালেম দখল করে, তখন তারা ৭০ হাজার নাগরিককে হত্যা করে। আর মুসলমানরা যখন খ্রিস্টানদের হাত থেকে জেরুজালেম উদ্ধার করে, তখন একজন খ্রিস্টানের গায়েও হাত দেয়া হয়নি। চৌদ্দশ' বছর ইসলাম যে বিচার ব্যবস্থা পত্তন করে, বিশ্ব সভ্যতায় তা অন্যান্য সংযোজন। ইসলামের বিচার ব্যবস্থায় মানুষে মানুষে কোন পার্থক্য করা হয়নি। শুরু থেকেই ইসলাম শাসন বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে আলাদা করেছে। ইসলামি রাষ্ট্রের প্রধান বিচারপতিদের নিয়োগ করতেন, কিন্তু বিচারপতিরা শাসন-কর্তৃত্বের অধীন হতেন না। ইসলামি রাষ্ট্রের প্রধান কিংবা শাসনকর্তারা অভিযুক্ত হলে তারা সাধারণ আসামিদের মতই কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বিচারের সম্মুখিন হতেন। অনেক মামলায় নিরপেক্ষ সাক্ষীর অভাবে খলিফারা হেরেছেন। এবং এই হেরে যাওয়াকে তারা মাথা পেতে নিয়েছেন।

মানবাধিকারের মত সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও ইসলাম বিশ্ব সভ্যতায় অনন্য এক কল্যাণ ধারার সৃষ্টি করে। পাশ্চাত্য ব্যবস্থায় তখন পর্যন্ত ক্ষমতাসীন ব্যক্তিস্বার্থ সমূহের পদতলে সামষ্টিক স্বার্থ নিক্ষেপ হতো। ইসলাম ব্যক্তি স্বার্থ ও সামষ্টিক স্বার্থ উভয়কেই সমান গুরুত্বপূর্ণ বলে অভিহিত করে এবং উভয়ের মধ্যে কল্যাণকর এক ভারসাম্য বিধান করে। সমাজের একক ইউনিট হিসেবে ইসলাম পরিবার ব্যবস্থাকে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে। তারপর পরিচয় ও সহযোগিতার জন্য বংশ ও সামাজিকতাকে এবং শাসন ব্যবস্থার জন্য রাষ্ট্রকে গুরুত্বপূর্ণ আখ্যায়িত করেছে। আর অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অর্থনীতির বিতরণধর্মীতা ও পুঁজিগঠন উভয়কেই সমান গুরুত্ব দিয়েছে। তবে ইসলামে ম্যাক্রো অর্থনীতি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মাইক্রো অর্থনীতি। ব্যক্তিগত বৈধ সম্পত্তির ব্যাপারে কোন হস্তক্ষেপ ইসলাম করেনি, কিন্তু শর্ত দিয়েছে প্রতিবেশী কেউ যেন না খেয়ে না থাকে এবং সঞ্চয়ের বদলে সম্পদ যেন বিনিয়োগমুখী হয়। চৌদ্দশত বছর আগের ইসলামের এই অর্থনীতি আজকের আধুনিক অর্থনীতির চেয়েও আধুনিক ও কল্যাণকর।

সবশেষে আগে জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে বিশ্ব সভ্যতায় ইসলামের অবদানের কথা।

ইসলাম জ্ঞান ও যুক্তি নির্ভর ধর্ম বলেই জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ইসলাম বিশ্বসভ্যতাকে নতুন সাজে সজ্জিত করেছে। খ্রিস্টায় এগার শতক থেকে সপ্তদশ শতক পর্যন্ত বিজ্ঞান চর্চার অপরাধে পাশ্চাত্য যেখানে প্রায় ৩৫ হাজার মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করেছে, সেখানে অষ্টম শতক থেকে ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত কাল ছিল মুসলমানদের বিজ্ঞান চর্চা ও আবিষ্কারের স্বর্ণযুগ। বিজ্ঞানের ইতিহাসকার জর্জ মার্টন তার পাঁচ খণ্ডে সমাপ্ত বিজ্ঞানের ইতিহাসে বিজ্ঞান ও আবিষ্কারে ইসলামের অবদানকে সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত করেছেন। ৪ তাঁর এই ইতিহাস বলে, ৭৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১১০০ খ্রিস্টাব্দ- নিরবচ্ছিন্ন এই ৩৫০ বছর জ্ঞান-বিজ্ঞানে মুসলমানদের চূড়ান্ত আধিপত্যের যুগ। এই সময় যেসব 
মুসলিম বিজ্ঞানী পৃথিবীকে আলোকিত করেছেন, তাদের মধ্যে রয়েছেন জারীর, খাওয়ারিজাম, রাজী, মাসুদী, ওয়াফা, বিরুনী, ইবনে সিনা, ইবনে আল হাইয়াম এবং ওমর খৈয়াম। এই বিজ্ঞানীরা যখন পৃথিবীতে আলো ছড়াচ্ছিল, তখন সে আলোকে স্নাত হচ্ছিল অন্ধকার ও ঘুমন্ত ইউরোপ। ইউরোপীয় ছাত্ররা তখন স্পেন ও বাগদাদের মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মুসলিম বিজ্ঞানীদের পদতলে বসে জ্ঞান আহরণ করছিল। মুসলিম বিজ্ঞানীদের এই ইউরোপীয় ছাত্ররাই জ্ঞানের আলোক নিয়ে ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। এরই ফল হিসেবে ১১০০ খ্রিস্টাব্দের পর ইউরোপে ক্রিমোনোর জেরার্ড, রজার বেকন- এর মত বিজ্ঞানীদের নাম সামনে আসতে থাকে। বিজ্ঞানের ইতিহাসকার জর্জ মাটনের মতে ১১০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দু'শ পঞ্চাশ বছরের এ সময়ে বিজ্ঞানে অবদান রাখার সম্মানটা মুসলমানরা ও ইউরোপ ভাগাভাগি করে নেয়। এই সময়ের মুসলিম বিজ্ঞানীদের মধ্যে রয়েছেন নাসিরউদ্দিন তুসী, ইবনে রুশদ এবং ইবনে নাফিসের মত বিজ্ঞানীরা। ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দের পর মুসলমানদের বিজ্ঞান চর্চায় গৌরবপূর্ণ সূর্য অস্তমিত হয় এবং পাশ্চাত্যের কাছে হারতে শুরু করে মুসলমানরা। অবশ্য এর পরেও মুসলমানদের মধ্যে বৈজ্ঞানিক চমক কখনও কখনও দেখা গেলেও (যেমন ১৪৩৭ সালে সমরখন্দে আমির তাইমুর পৌত্র উলুগ বেগের দরবার এবং ১৭২০ সালে মোগল সম্রাটের দরবারে জীজ মোহাম্মদ শাহীর সংকলন) তা ছিল খুবই ক্ষণস্থায়ী।

তবে বিজ্ঞানে ছয়'শ বছরের যে মুসলিম অবদান তা ছিল আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তি এবং বিজ্ঞান-রেনেসাঁর জনক। মুসলমানরা ছিল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থারও জনক। 'ইউরোপ যখন গির্জা ও মঠ ব্যতীত অপর সকল শিক্ষালয়ের কথা কল্পনাও করেনি, তার শত শত বছর আগে মুসলমানরা বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেছিল, যেখানে হাজারো ছাত্র উন্নত পরিবেশে পাঠগ্রহণ করতো। গ্রন্থাগার ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়নও ইসলামি সভ্যতার অবদান। মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ছিল লাখো গ্রন্থে ঠাসা। ব্যক্তিগত লাইব্রেরীর তখন ব্যাপক উন্নয়ন ঘটেছিল। ঐতিহাসিক Dosy-এর মতে স্পেনের আলমেরিয়ার ইবনে আব্বাসের ব্যক্তিগত লাইব্রেরীতে অসংখ্য পুস্তিকা ছাড়া শুধু গ্রন্থের সংখ্যাই ছিল ৪ লাখ। এসব মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় ও গ্রন্থাগারটি ছিল বিজ্ঞান-

চর্চা ও বৈজ্ঞানিক সৃষ্টির সুতিকাগৃহ। বিজ্ঞানের সকল শাখাতেই ছিল মুসলমানদের গৌরবজনক বিচরণ। গণিত শাস্ত্রে রয়েছে মুসলমানদের মৌলিক অবদান। আমরা যে ৯ পর্যন্ত নয়টি সংখ্যা ব্যবহার করি, তার অস্তিত্ব আগে থেকেই ছিল। কিন্তু 'শূন্য' (Zero)-এর বিষয়টি সম্পূর্ণ অপরিচিত ছিল। দ্বাদশ শতাব্দীতে মোহাম্মদ ইবনে মুসা সর্বপ্রথম 'শূন্য' আবিষ্কার করেন। গণিত শাস্ত্রে ইনিই সর্বপ্রথম 'দশমিক বিন্দু' (decimal notation) ব্যবহার করেন। সংখ্যার স্থানীয় মান' (value of position) তারই আবিষ্কার। বীজগণিত বা 'এলজেব্রা' মুসলমানদের সৃষ্টি। মুসলিম গণিতজ্ঞ আল জাবের-এর নাম অনুসারে'এলজেব্রা' নামকরণ হয়। শিঞ্জিনী (sine), সার্শ-জ্যা (tangent) ও প্রতি স্পর্শ-ক্যক (co-tangent) প্রভৃতি আবিষ্কার করে বর্তুলাকার ক্রিকোণমিতির উন্নতি করেন মুসলিম বিজ্ঞানীরা। আলোক বিজ্ঞানে focus' নির্ণয়, চশমা আবিষ্কার মুসলিম বিজ্ঞানী আল হাজানের কীর্তি। কিন্তু রজার বেকন এই আবিষ্কার পাশ্চাত্যে আমদানি করে নিজেই এর আবিষ্কারক সেজেছেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানে 'মানমন্দির' (observatory) ব্যবহার মুসলিম বিজ্ঞানীদের আবিষ্কার। এর আগে 'মানমন্দির' সম্পর্কে কোন ধারণা কারও ছিল না। গণনা দ্বারা রাশি- চক্রের কোণ (angle of the ecliptic), সমরাত্রি দিনের প্রাগয়ন (pre- cission of the equinoxes), Almanac (পঞ্জিকা), Azimuth (দিগন্তবৃত্ত), Zenith (মন্ত্রকোর্দ্ধ নভোবিন্দু), Nadir (অধঃস্থিত নভোবিন্দু), প্রভৃতির উদ্ভাবন মুসলিম বিজ্ঞানীদের কীর্তি। মুসলিম বিজ্ঞানীরাই চিকিৎসার বিজ্ঞানকে প্রকৃত বিজ্ঞানে রূপ দান করেন।
ইউরোপ যখন খ্রিস্টান গির্জা ঔষধের ব্যবহার নিষিদ্ধ করে ধর্মানুষ্ঠান দ্বারা রোগের ব্যবস্থা দিতেন, তখন চিকিৎসা বিজ্ঞান মুসলমানদের হাতে এক নতুন যুগে প্রবেশ করে। চিকিৎসা বিজ্ঞানীয় আল রাজীর চিকিৎসা বিষয়ক 'বিশ্বকোষ' দশখণ্ডে সমাপ্ত। এই চিকিৎসা বিশ্ব-কোষ ও ইবনে সিনা'র ব্যবস্থা' ইউরোপী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্য ছিল। বিজ্ঞানের অন্যতম শাখা কেমিস্ট্রির নামকরণই হয় মুসলিম বিজ্ঞানী 'আল কেমী'র নাম অনুসারে। কেমিস্ট্রি'-এর সুবাসার (Alcohol), কাঠ ভষ্ম-ক্ষারের ধাতার্বকমূল (patassium), পারদ বিশেষ (corrosive sublimate), কার্ষকি (Nitrate of silver, যবক্ষার দ্রাবক (Nitric Acid) গন্ধক দ্রাবক (Sulphuric Acid), জুলাপ (Julep), অন্তসার (Elixer), কপূর (Caurphar), এবং সোমামুখী (senna), প্রভৃতি। মুসলিম বিজ্ঞানীদের আবিষ্কার। ভূগোল শাস্ত্রে মুসলমানদের অবদান অবিস্মরণীয়। ইউরোপ যখন মনে করতো পৃথিবী সমতল, তখন বাগদাদে গোলাকার পৃথিবীর পরিধী নির্ণিত হয়েছিল। চন্দ্র যে সূর্যের আলোকে আলোকিত হয়, একথা মুসলিম বিজ্ঞানীরা জানতেন। মুসলিম বিজ্ঞানীরাই চন্দ্র, সূর্য ও অন্যান্য গ্রহের কক্ষ নির্ধারিত করেন। অতি গুরুত্বপূর্ণ কম্পাস যন্ত্র মুসলিম বিজ্ঞানির আবিষ্কার। মুসলমানরা নকশার বৈচিত্র ও সৌন্দর্য এবং শিল্প কৌশলের পূর্ণতা বিধানে ছিলো অপ্রতিদ্বন্দ্বি। স্বর্ণ, রৌপ্য, তাম্র, পিতল, লৌহ, ইস্পাত, প্রভৃতির কাজে তারা ছিলো দক্ষ। বস্ত্র শিল্পে এখনও মুসলমানদের কেউ অতিক্রম করতে পারেনি। উত্তম কাচ, কালী, মাটির পাত্র, নানা প্রকার উৎকৃষ্ট কাগজ প্রস্তুত করাসহ রং পাকা করার কৌশল ও চর্ম-সংস্কারের বহুবিধ পদ্ধতি সম্পর্কে মুসলিম কুশলীরা ভালোভাবে অবহিত ছিলেন। তাদের এসব কাজ ইউরোপে খুব জনপ্রিয় ছিল। সিরাপ ও সুগন্ধি দ্রব্য তৈরিতে মুসলমানদের ছিল একাধিপত্য। মুসলমানদের কৃষি পদ্ধতি ছিল খুবই উন্নত। তারা স্পেনে যে কৃষি পদ্ধতির প্রচলন করেন, ইউরোপের জন্য তা তখনও বিস্ময়। পানি সেচ পদ্ধতি তাদের উৎকৃষ্ট ছিল। মাটির গুণাগুণ বিচার করে তারা ফসল বপন করতেন। সারের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে তারা জানতেন। 'কলম' করা ও নানা প্রকার ফল-ফুলের উৎপাদন কৌশল উদ্ভাবনে তারা ছিলেন খুবই অভিজ্ঞ।

বহু শতাব্দী পর্যন্ত মুসলমানরা বাণিজ্য-জগতের ছিল একচ্ছত্র সম্রাট। নৌ যুদ্ধে তারা ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তারা ছিলেন অতুলনীয় সমুদ্রচারী। তাদের জাহাজ ভূমধ্যসাগর, আটলান্টিক মহাসাগর, ভারত সাগর ও চীন সাগরে এককভাবে চষে ফিরত। মুসলিম নাবিকদের ছাত্র হিসাবেই ইউরোপীয়রা গভীর সমুদ্রে প্রথম পদচারণা করে। ভন ক্রেমার বলেন, আরব নৌবহর ছিল বহু বিষয়ে খ্রিস্টানদের আদর্শ।' মুসলমানদের যুদ্ধ-পদ্ধতি ও যুদ্ধ বিদ্যাও ইউরোপকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে। ইউরোপের Chivalry স্পেনীয় মুসলিম বাহিনীর অনুকরণ।


মোট কথা, বলা যায়, মুসলমান ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্রসহ জ্ঞান-বিজ্ঞানের সকল শাখার যে অবদান রাখেন, তা এক নতুন সভ্যতার জন্ম দেয়, বিশ্ব সভ্যতাকে করে নতুন এক রূপে রূপময় যা চিন্তা, চেতনা, আচার-আচরণ, জীবন-যাপন, জীবনাপোকরণ সবদিক দিয়েই আধুনিক। ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দে সভ্যতার এই নতুন-উত্থান- যাত্রা থেমে না গেলে আরও কয়েকশ' বছর অগেই বিশ্ব আধুনিক বিজ্ঞান যুগে প্রবেশ করতো। কিন্তু তা হয়নি। না হলেও তাদেরই ছাত্র ইউরোপীয় বিজ্ঞানীরা আরও কয়েকশ' বছর পরে হলেও মুসলমানদের কাজ সম্পন্ন করেছে। ইসলামি সভ্যতাকে বাদ দিলে বা মুসলমানদের অবদান মাইনাস করলে ইউরোপীয় রেনেসাঁ আর থাকে না, তার সভ্যতাও অন্ধকারে তলিয়ে যায়।


লিওনার্দো এজন্যই লিখেছেন, "আরবদের মধ্যে উচ্চ শ্রেণীর সভ্যতা, জ্ঞানচর্চা, সামাজিক ও মানসিক সমৃদ্ধি এবং অভ্রান্ত শিক্ষা-প্রথা বিদ্যমান না থাকলে ইউরোপকে আজও অজ্ঞতার অন্ধকারে নিমগ্ন থাকতে হতো।


রেফারেন্স:
১। S. Khuda Bakhsh, M. A. BCL. Bar-at Law, প্রণীত 'Arab civilization গ্রন্থে উদ্ধৃত, পৃ. ১৬
২। 'A general History of Europe, Vol-1 Page-172 ৩। Mayers, 'Mediaeval and Modern History' Page-54
৪। নোবেল বিজ্ঞানী আবদুস সালাম' এর 'Ideas and Realities' গ্রন্থে উদ্ধৃত
(বাংলা অনুবাদঃ 'আদর্শ ও বাস্তবতা,' পৃষ্ঠা, ২৬৮ ৫। Mayers, "Mediaeval and Modern History, Page, 56
৬। Dozy, Spanish Islam'. Page 610
৭। Thateher Ph. D and F. Schwill Ph. D. 'A general History Europe', vol-1 page, 173
৮। Von Kremar এই উক্তি S. khuda Bakhsh এর 'Arab civilization' এর উদ্বৃত, Page, 72
৯। Thatcher and F. Schwill, 'A general History of Europe, Vol-1 pages, 174-188

Wednesday, October 9, 2024

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ হতে যুগান্তকারী ‘রাষ্ট্র সংস্কার প্রস্তাবনা’



৯ অক্টোবর বুধবার দুপুরে ঢাকার গুলশানস্থ হোটেল ওয়েস্টিনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ‘রাষ্ট্র সংস্কার প্রস্তাবনা’ জাতির সামনে উপস্থাপন করা হয়। আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান দেশের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী, সম্পাদক, সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও গবেষকদের সামনে স্বাগত বক্তব্য পেশ করেন। আমীরে জামায়াতের পক্ষ থেকে ‘রাষ্ট্র সংস্কার প্রস্তাবনা’ উপস্থাপন করেন নায়েবে আমীর ও সাবেক এমপি ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোঃ তাহের।

কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য এবং প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি মতিউর রহমান আকন্দ-এর সঞ্চালনায় সভায় উপস্থিত ছিলেন নায়েবে আমীর ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মুজিবুর রহমান ও মাওলানা আ ন ম শামসুল ইসলাম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মাছুম, মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, জনাব হামিদুর রহমান আযাদ সাবেক এমপি, এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের ও মাওলানা আবদুল হালিম, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য জনাব সাইফুল আলম খান মিলন ও জনাব মোবারক হোসাইন, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমীর জনাব নূরুল ইসলাম বুলবুল, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমীর জনাব সেলিম উদ্দিন, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি মঞ্জুরুল ইসলাম প্রমুখ।

শুভেচ্ছা বক্তব্যে আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “আমরা সকলেই জানি দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছর একটি দল ও তাদের দোসররা ক্ষমতায় ছিলেন। তারা দেশকে যে শাসন উপহার দিয়েছিলেন তা বাংলাদেশের মানুষকে অতীষ্ঠ করে তুলেছিল। এর লক্ষ্যবস্তু বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিক হয়েছিলেন। তাদের অপশাসনের হাত থেকে কেউই রেহাই পায়নি। এমনকি রাস্তার ভিক্ষুকও তাদের হাত থেকে রেহাই পায়নি। শিশু-বৃদ্ধ সকলেই এই কুশাসনের নজরে পড়েছিলেন। গত জুলাই মাসে ছাত্ররা বৈষম্যবিরোধী কোটা পদ্ধতি বাতিলের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলে। পরবর্তীতে এ আন্দোলন ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনে রূপ নেয় এবং সরকারের পতন ঘটে। বহু মানুষ জীবন দিয়েছেন, আহত হয়েছেন, পঙ্গু হয়েছেন, চোখ হারিয়েছেন। অনেকেই হাজারো মামলায় পড়েছেন, ঘরবাড়ি ছাড়া হয়েছেন, অনেকের ওপর আঘাত এসেছে, আমরা তাদের সকলের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই।

আমরা মনে করি সকলের সম্মিলিত প্রয়াসেই দেশে এমন একটি কাক্সিক্ষত পরিবর্তন এসেছে। যার সূচনা হয়েছিল ২০০৯ সালের ১০ জানুয়ারির পর। তার পূর্ণতা পেয়েছে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। এটা ঠিক রাজনৈতিক দল এবং পক্ষ দফায় দফায় নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। আর সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত দলের নাম বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এই দলের ১১ জন শীর্ষ নেতাকে মিথ্যা অযুহাতে সাজানো আদালতের মাধ্যমে সাজা দিয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, তাদের অপশাসনের প্রতিবাদ করেছেন এমন হাজারো মানুষকে দুনিয়া থেকে তুলে নেয়া হয়েছে। অসংখ্য মানুষকে গুম করা হয়েছে। আয়নাঘর নামক কুখ্যাত কূপখানায় থাকতে বাধ্য করা হয়েছে অসংখ্য মানুষকে। তাদেরকে দিনের পর দিন নয়, সপ্তাহের পর সপ্তাহ নয়, মাসের পর মাস নয়, বছরের পর বছর ধরে আটকিয়ে রাখা হয়েছে। তাদের পরিবার জানতো না, আদৌ তারা বেঁচে আছেন নাকি দুনিয়া থেকে চলে গেছেন। যদি তারা চলে গিয়ে থাকেন তাহলে তাদের লাশটি কোথায়? কখন কীভাবে তাদেরকে দাফন করা হয়েছে কিছুই তারা জানেন না। খুব অল্প সংখ্যক সৌভাগ্যবান মানুষ ফিরে এসেছেন সেই কুখ্যাত আয়নাঘর থেকে। বাকীদের ভাগ্যে কী ঘটেছে এ জাতি জানে না এবং তাদের আপনজনও জানে না। এইসব ব্যথিত আপনজনদের সাথে আমরাও সমানভাবে ব্যথিত।

তিনি আরও বলেন, অপশাসনের কালো অধ্যায় আল্লাহ তাআলা তার মেহেরবানী দিয়ে সাহায্য করে অপসারিত করেছেন গত ৫ আগস্ট। এজন্য মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করছি আরেকবার আলহামদুলিল্লাহ। শেষ পর্যন্ত আমাদের তরুণ-তরুণীদের হাতে এই আন্দোলন চূড়ান্ত পরিণতি পেয়েছে। আমি আরেকবার তাদের ভালবাসা, শ্রদ্ধা এবং শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করছি।

উপস্থিত প্রিয় সাংবাদিক এবং দেশের সম্মানিত ব্যক্তিবর্গের উদ্দেশে তিনি বলেন, আমাদের প্রিয় সংগঠনের পক্ষ থেকে আপনাদের এবং জাতির জন্য আমাদের ভালবাসা। আমরা মৌলিক কী কী সংস্কার প্রয়োজন মনে করি সেই ভাবনা এখনই আপনাদের সামনে তুলে ধরব ইনশাআল্লাহ। আমাদের ভাবনাগুলো অনলাইনের মাধ্যমে আপনাদের হাউজ-এ আমরা পৌঁছাব। আমরা আপনাদের প্রতি আবারো শুভেচ্ছা এবং কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ‘রাষ্ট্র সংস্কার প্রস্তাবনা’ জাতির উদ্দেশে তুলে ধরা হলো:

“রাষ্ট্র সংস্কার প্রস্তাবনা
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী
৯ অক্টোবর ২০২৪

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

স্বৈরশাসনের কবল থেকে মুক্ত বাংলাদেশে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রস্তাবনা তুলে ধরার সুযোগ পেয়ে মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি- আলহামদুলিল্লাহ। গত জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণআন্দোলনে যারা জীবন দিয়েছেন মহান রাব্বুল আলামীন তাদেরকে শহীদ হিসেবে কবুল করুন। যারা আহত হয়েছেন তাদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করছি। নিহত ও আহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি।

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর তৎকালীন সেনা সমর্থিত সরকারের সাথে সমঝোতা করে অবৈধভাবে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা দখল করে। তারা দেশকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য সংবিধানসহ সিভিল প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচার বিভাগকে কুক্ষিগত করে একনায়কতন্ত্র কায়েম করে।তারা নিজেদের সুবিধামত সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদ পরিবর্তন করে। ২০১১ সালের ৩০ জুন পঞ্চদশ সংশোধনী পাশ করা হয়। এ সংশোধনীর মাধ্যমে কেয়ারটেকার সরকার পদ্ধতি বাতিল করে দেয়া হয়। নিজেদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার জন্য নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ, নির্বাচন ব্যবস্থা, সাংবিধানিক এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহ, শিক্ষা, সংস্কৃতি, দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং ধর্মীয় মূল্যবোধকে ধ্বংস করে দেয়। রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিরোধীমত দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়।দুর্নীতি, ব্যাংক লুটপাট, শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি ও বিদেশে অর্থ পাচারের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে দেয়। হত্যা, গুম এবং মিথ্যা, সাজানো ও ষড়যন্ত্রমূলক মামলার মাধ্যমে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মামলা দায়ের করে জেল-জুলুম ও নির্যাতন চালানো হয়।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে দেড় সহস্রাধিক প্রাণের বিনিময়ে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা ৫ আগস্ট পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে চলে যান। ৮ আগস্ট গঠিত হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এই সরকারের প্রধান দায়িত্ব হলো স্বল্পতম সময়ের মধ্যে মৌলিক সংস্কার সম্পন্ন করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও অর্থবহ করার জন্য নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানের ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন। সংস্কার ব্যতীত নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হতে পারে না। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ও প্রধান প্রধান সেক্টরের সংস্কারের জন্য প্রস্তাবনা তুলে ধরা হলো।

ডা. শফিকুর রহমান
আমীর
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।


১। আইন ও বিচার

● উচ্চ আদালতে বিচারপতি নিয়োগের জন্য সুষ্ঠু ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।

● বিচার বিভাগ থেকে দ্বৈত শাসন দূর করতে হবে।

● বিচার বিভাগ নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথকীকরণের কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

● আইন মন্ত্রণালয় থেকে আলাদা করে সুপ্রিম কোর্টের অধীনে পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

● ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার স্বার্থে বিদ্যমান আইনসমূহের প্রয়োজনীয় সংশোধনী ও গণমানুষের মূল্যবোধের সাথে সামঞ্জস্যশীল আইন প্রণয়ন করতে হবে।

● ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন-২০২৩’ওসকল কালো আইন বাতিল করতে হবে।

● বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা কমাতে বিভাগীয় পর্যায়ে হাইকোর্ট বেঞ্চ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

● নিম্ন আদালতের যথাযথ স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য পৃথক বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠন করতে হবে।

● সকল ফৌজদারি মামলা তদন্তের জন্য স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে।

● দেওয়ানি মামলার জন্য সর্বোচ্চ ৫ বছর এবং ফৌজদারি মামলাসমূহ সর্বোচ্চ ৩ বছরের মধ্যে নিষ্পত্তি করার বিধান করতে হবে।




২। সংসদ বিষয়ক সংস্কার

● সংসদের প্রধান বিরোধীদল থেকে একজন ডেপুটি স্পিকার মনোনীত করতে হবে।

● সংসদীয় বিরোধী দলীয় নেতার নেতৃত্বে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

● সংসদে বিরোধী দলীয় সদস্যদের পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে।




৩। নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার

● জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক ব্যবস্থা (Proportional Representation-PR) চালু করতে হবে।

● সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নির্বাচন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে স্থায়ীভাবে সন্নিবেশিত করতে হবে।

● নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন দেশে প্রত্যাখ্যাত ইভিএম ভোটিং ব্যবস্থা বাতিল করতে হবে।

● কোনো সরকারি চাকরিজীবী তাদের চাকরি ছাড়ার কমপক্ষে ৩ বছরের মধ্যে কোনো ধরনের নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না।

● স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয়ভাবে সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করতে হবে।

● অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক ২০০৮ সালে প্রবর্তিত রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন প্রথা বাতিল করতে হবে।

● নির্বাচন কমিশনারসহ অন্যান্য কমিশনার নিয়োগের জন্য প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা ও প্রধান বিচারপতির সমন্বয়ে সার্চ কমিটি গঠিত হবে।

● জাতীয় সংসদ নির্বাচন একাধিক দিনে অনুষ্ঠিত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

● NID-ব্যবস্থাপনা নির্বাচন কমিশনের অধীনে আনতে হবে।




৪। আইনশৃঙ্খলা সংস্কার

ক) পুলিশ বাহিনীর সংস্কার

● ১৮৬১ সালে ব্রিটিশ সরকার প্রণীত পুলিশ আইন পরিবর্তন এবং পুলিশের জন্য একটি পলিসি গাইডলাইন তৈরি করতে হবে।

● পুলিশ সদস্যদের নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি এবং চাকরিচ্যূতির জন্য স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন করতে হবে।

● নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি এবং চাকরিচ্যূতির ক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক ব্যক্তির সুপারিশের সুযোগ রাখা যাবে না তথা সর্বপ্রকার দলীয় ও ব্যক্তিগত প্রভাব বা হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে।

● পুলিশ ট্রেনিং ম্যানুয়ালের মধ্যে ধর্মীয় শিক্ষা ও নৈতিক অনুশাসন অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

● পুলিশের মধ্যে মারণাস্ত্রের ব্যবহার বাতিল করতে হবে।

● রিমান্ড চলাকালে জিজ্ঞাসাবাদের ক্ষেত্রে আসামি পক্ষের আইনজীবীর উপস্থিতি এবং মহিলা আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাদের অভিভাবকের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে।

● বিচার বিভাগীয় সদস্যদের দ্বারা পুলিশ ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিধান থাকতে হবে।

● পুলিশের ডিউটি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা উন্নত করতে হবে।

● ‘পুলিশ আইন’ পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও পরিমার্জনের মাধ্যমে আধুনিকায়ন করতে হবে।




খ) র‌্যাব বিষয়ক সংস্কার

● র‌্যাব ও অন্যান্য বিশেষায়িত বাহিনীর প্রতি জনসাধারণের আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পন্ন করতে হবে।

● গত সাড়ে ১৫ বছর যারা র‌্যাবে কাজ করেছে তাদেরকে স্ব স্ব বাহিনীতে ফিরিয়ে আনতে হবে এবং তাদেরকে পুনরায় র‌্যাবে নিয়োগ দেয়া যাবে না।

● বিচারবহির্ভূত সকল প্রকার হত্যাকা- বন্ধ করতে হবে।

● র‌্যাবের সামগ্রিক কার্যক্রম মনিটরিং-এর জন্য সেল গঠন করতে হবে। কোনো র‌্যাব সদস্য আইনবহির্ভূত কোনো কাজে জড়িত হলে এই সেল তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করবে।

● মিডিয়ার ক্ষেত্রে নীতিমালা প্রণয়ন ও অনুসরণ নিশ্চিত করতে হবে।




৫। জনপ্রশাসন সংস্কার

● জনবল নিয়োগ, বদলি, পদায়নে তদবির, সুপারিশ ও দলীয় আনুগত্যের পরিবর্তে যোগ্যতা, দক্ষতা ও সততাকে প্রাধান্য দিতে হবে।

● যে কোনো চাকরির নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি থেকে শুরু করে নিয়োগ পর্যন্ত সময়ক্ষেপণ না করে যৌক্তিক সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে।

● সরকারি চাকরিতে আবেদন বিনামূল্যে করতে হবে।

● চাকরিতে আবেদনের বয়সসীমা আগামী ২ বছরের জন্য ৩৫ বছর ও পরবর্তী বয়সসীমা স্থায়ীভাবে ৩৩ বছর এবং অবসরের বয়সসীমা ৬২ বছর নির্ধারণ করতে হবে।

● চাকরির আবেদনে সকল ক্ষেত্রে বয়সসীমার বৈষম্য নিরসন করতে হবে।

● সকল সরকারি দপ্তরে দুর্নীতি নিরোধকল্পে বিশেষ ব্যবস্থা তৈরি করা যাতে করে কেউ দুর্নীতি করার সুযোগ না পায়। এ জন্য প্রয়োজনীয় মনিটরিং-এর ব্যবস্থা করতে হবে।

● চাকরিতে বিরাজমান আন্তঃক্যাডার বৈষম্য দূর করতে হবে।

● বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে সরকারি চাকরিতে যারা প্রশ্নপত্র ফাঁস, দুর্নীতি, জালিয়াতি ও দলীয় বিবেচনায় চাকরি পেয়েছে তাদের নিয়োগ বাতিল করতে হবে।




৬। দুর্নীতি

● দুর্নীতি দমন কমিশনে পরীক্ষিত সৎ, ন্যায়পরায়ণ, দক্ষ ও যোগ্য লোক নিয়োগ দিতে হবে।

● রাষ্ট্রের সকল সেক্টরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।

● দুর্নীতি দমন কমিশনকে শক্তিশালী করে নিরপেক্ষভাবে কাজ করার স্বাধীনতা দিতে হবে।

● বিগত সরকারের আমলে দেশ থেকে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার উপযুক্ত বিধান প্রণয়ন ও তা কার্যকর করার পদক্ষেপ নিতে হবে।

● মন্ত্রণালয় ভিত্তিক দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন করতে হবে।

● দুর্নীতি দমন কমিশনের আইনসংস্কার, জনবল ও পরিধি বৃদ্ধি করতে হবে।

● রাষ্ট্রীয় ও জনগণের সম্পদ অবৈধভাবে ভোগ দখলকারীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সুস্পষ্ট আইন প্রণয়ন করতে হবে।




৭। সংবিধান সংস্কার

● রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য রাখার বিধান সংযুক্ত করতে হবে।

● একই ব্যক্তি পরপর দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না।




৮। শিক্ষা ও সংস্কৃতি সংস্কার

ক) বিরাজমান সমস্যার আলোকে শিক্ষা সংস্কার প্রস্তাব

● ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত মাধ্যমিক এবং একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিকে উচ্চমাধ্যমিক হিসেবে বলবৎ রাখতে হবে। অষ্টম শ্রেণির পাবলিক পরীক্ষা বাতিল করে পূর্বের পরীক্ষা পদ্ধতি ফিরিয়ে আনতে হবে।

● পাঠ্যপুস্তকে ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস গুরুত্বের সাথে তুলে ধরতে হবে।

● সকল শ্রেণির পাঠ্যপুস্তকে ধর্মীয় মূল্যবোধবিরোধী উপাদান বাদ দিতে হবে।

● সকল শ্রেণিতে নবী করিম সা. এর জীবনীসহ মহামানবদের জীবনী সংবলিত প্রবন্ধ সংযোজন করতে হবে।

● স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বিদ্যমান স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদরাসাগুলোকে সরকারিকরণ করতে হবে।

● প্রতিটি জেলায় কমপক্ষে একটি করে কামিল মাদরাসাকে সরকারিকরণ করতে হবে।

● কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষাকে সাধারণ শিক্ষার মূলধারায় যুক্ত করতে হবে।

● Department of Higher Education নামে একটি স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠন করতে হবে।

● শিক্ষা সংস্কারের লক্ষ্যে গঠিত শিক্ষা কমিশনের সকল ধারা তথা সাধারণ, আলিয়া, কওমীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে।




খ) সংস্কৃতি সংস্কার

● জাতির ঐতিহাসিক আন্দোলন-সংগ্রাম ও মূল্যবোধের আলোকেবিভিন্ন ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে হবে।

● জাতির ঐতিহাসিক দিনগুলোকে স্মরণীয় করার লক্ষ্যে বিশেষ দিবস হিসেবে ঘোষণা করে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় তা পালনের ব্যবস্থা করতে হবে।

● নাটক, সিনেমাসহ বিভিন্ন বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানগুলো অশ্লীলতামুক্ত করতে হবে। নাটক, সিনেমা ও বিভিন্ন কন্টেন্টে বিভিন্ন ধর্ম, বিশেষ করে ইসলামকে হেয় করা থেকে বিরত থাকার বিধান প্রণয়ন করতে হবে।

● প্রাণীর মূর্তিনির্ভর ভাস্কর্য নির্মাণ না করে দেশীয় প্রকৃতি, ঐতিহ্যকে বিভিন্ন চিত্রাঙ্কন-ভাস্কর্যে তুলে আনতে হবে।

● সকল গণমাধ্যমে শিক্ষামূলক প্রোগ্রাম প্রচার নিশ্চিত করতে হবে।




৯। পররাষ্ট্র বিষয়ক সংস্কার

● পররাষ্ট্রীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে সকল গণতান্ত্রিক দেশের সাথে সাম্য ও নায্যতার ভিত্তিতে পারস্পরিক সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।

● জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় চীন, নেপাল, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার আন্তর্জাতিক নদীসমূহের পানিবণ্টন চুক্তির উদ্যোগনিতে হবে।

● আসিয়ানভুক্ত দেশসমূহের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৃদ্ধি করতে হবে।

● অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে বিগত সরকারের আমলে সম্পাদিত সকল চুক্তি রিভিউ করতে হবে। এক্ষেত্রে একটিরিভিউ কমিশন গঠন করতে হবে।

● বাংলাদেশকে আসিয়ান জোটভুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

● শক্তিশালী SAARC পুনর্গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

● কোনো দেশের সাথে চুক্তি অথবা সমঝোতা চুক্তি হলে পরবর্তী সংসদঅধিবেশনে সেসব চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক উত্থাপন করে বিস্তারিত আলোচনা পূর্বক তা অনুমোদন করতে হবে।




১০। ধর্ম মন্ত্রণালয় সংস্কার

● ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশকে (ইফাবা) রাষ্ট্রের কল্যাণে অর্থবহ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

● ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমিকে স্বতন্ত্র সংস্থা বা দপ্তরে রূপান্তর করতে হবে, যাতে তারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে।

● ইসলামিক মিশনকে সরাসরি মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্বতন্ত্র সংস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

● হজ্জব্যবস্থাপনার জন্য স্বতন্ত্র অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

● হজ্জ ও উমরার খরচ কমানোর জন্য কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

● ইসলামিক ফাউন্ডেশনে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যেখানে দেশের বরণ্যে আলেমগণ সম্পৃক্ত থাকবেন।

● বিতর্কিত সকল বই বাতিল ও প্রকাশনা বন্ধ করতে হবে।

● সকল ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

Tuesday, July 9, 2024

মকবুল আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ : জীবন ও কর্ম

মকবুল আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ : জীবন ও কর্ম

ফেনী জেলার অন্তর্গত দাগনভূঞা উপজেলার ৩নং পূর্বচন্দ্রপুর ইউনিয়নের ছায়াঘেরা, পাখি ডাকা সবুজের সমারোহে বেষ্টিত এক সুন্দর গ্রামের নাম ওমরাবাদ। যার পূর্ব পাশ ঘেঁষে বয়ে যাচ্ছে সিলোনিয়া নদী। এ নদীর পশ্চিম পাশে অবস্থিত গ্রামের সম্ভ্রান্ত মুসলিম জোতদার পেশায় সার্ভেয়ার (আমিন) জনাব নাদেরুজ্জমানের বাড়ী। সে বাড়ীতে ১৯৩৯ সালের ৮ আগস্ট জনাব নাদেরুজ্জামান ও জনাবা আঞ্জিরের নেছার ঘর আলোকিত করে এক শিশু জন্মগ্রহণ করে। তারা এ প্রিয় সন্তানটির নাম রাখেন মকবুল আহমাদ। এ মকবুল আহমাদ ছিলেন ৫ ভাই ৩ বোনের মধ্যে পঞ্চম আর ভাইদের মধ্যে দ্বিতীয়। সে শিশুটি কালক্রমে বাংলাদেশের রাজনীতি ও ইসলামী আন্দোলনের ইতিহাসে একসময় যে বিখ্যাত হয়ে উঠবে সেদিন মা-বাবা, ভাই-বোন বা গ্রামবাসী কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। কিন্তু সেটাই আজ বাস্তব সত্য।

ওমরাবাদ গ্রামের নাম ওমরাবাদ কেন হলো সে ইতিহাস জানা নেই। তবে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর ফারুক (রা.) এর নামে নামকরণের পেছনে সে গ্রামের ভূমিপুত্রদের কেউ ইনসাফ আর আদলে সে গ্রামকে অনন্য হিসেবে অত্যুজ্জল ইতিহাস রচনায় কালের সাক্ষী করে রাখার মানসে করেছেন কিনা কে জানে? ওমরাবাদ গ্রামের সকল অধিবাসীই মুসলিম। সে গ্রামের শিশু মকবুল আহমাদ তার শৈশব, কৈশর, যৌবন আর বার্ধক্যের ক্রান্তিকালসহ পুরো জীবন ব্যাপী হযরত ওমরের মত ঈমানী দৃঢ়তা, অসীম সাহসীকতা, কঠিন আমানতদারী, ইনসাফ-আদল আর মানব কল্যাণে ভূমিকা রেখে ওমরের আদর্শকে আবাদ করে গেছেন এ জমিনে। এ মকবুল আহমাদের কারণে হয়তোবা ওমরাবাদ নামকরণের সার্থকতা একদিন ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকবে। রাহবারের পাঠকদের উদ্দেশ্যে জনাব মকবুল আহমাদের জীবন ও কর্ম সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলো:

শিক্ষা জীবন:
জনাব মকবুল আহমাদের যখন প্রাইমারী স্কুলে যাওয়ার বয়স তখন চলছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। বর্তমান বাংলাদেশ তখন ব্রিটিশ কলোনী। আর ফেনীতে ছিল ব্রিটিশদের বৃহৎ বিমান বন্দর। সে বিমান বন্দর এখন নেই। কিন্তু বিমান বন্দরের রানওয়ে আর হ্যাঙ্গারগুলো কালের স্বাক্ষী হয়ে আছে। এ বন্দর থেকে প্রতিনিয়ত বোমা নিয়ে উড়ে যাচ্ছে ব্রিটিশ বিমান। এখানে ওখানে বোমা পড়ছে, আকাশ লড়াইয়ে বিমান বিধ্বস্ত হচ্ছে। বিমানের ধ্বংসাবশেষ এদিক সেদিক ছিটকে পড়ছে। সে এক কঠিন পরিস্থিতি। এর মাঝে আবার সে সময় সুনসান পাকা রোড-ঘাট ছিল না। স্কুল ছিল অনেক দূরে দূরে। ভাগ্যবান ছাড়া বেশী শিশু স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পেত না সে সময়। আর যারা এসব দূর-দূরান্তের স্কুলে যেত তাদের ভরসা ছিল স্রষ্টার দেয়া দু'টি পা। মাইলকে মাইল মেঠো পথে ধুলো কাদা মাড়িয়ে সংগ্রাম করেই লেখা পড়া করতে হতো। মকবুল সাহেবের বাড়ীর পাশে নদীর উপর তখনকার সময় ভাল কোন পুল কালভার্ট ছিল না। এসব প্রাকৃতিক বাধা আর যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মকবুল সাহেবের প্রাইমারী শিক্ষা বর্তমানের শিশুদের চাইতে সম্ভবত দেরীতে শুরু হয়েছিল। তাই মকবুল সাহেব সংগ্রামী জীবন অতিক্রম করে প্রাইমারী শিক্ষা শেষ করেছেন পারিবারিক পরিসরে ও গ্রামীন স্কুলে।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর এক সময়কার অফিস সম্পাদক জনাব অধ্যাপক মাযহারুল ইসলাম ছিলেন মকবুল সাহেবের দীর্ঘ দিনের দ্বীনি আন্দোলনের সহকর্মী। তিনি স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে লিখেন- "পূর্বচন্দ্রপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয়। প্রাথমিক শিক্ষা শেষে দাগনভূঞার কামাল আতাতুর্ক হাইস্কুলে ভর্তি হন। অতঃপর তিনি ফেনী পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হন।" কিন্তু তিনি নবম শ্রেণিতে পাইলট হাইস্কুলে ভর্তি হয়েও সেখান থেকে ম্যাট্টিক পরীক্ষা দেননি। কারণ বাড়ী থেকে পাইলট হাইস্কুলে পায়ে হেটে ক্লাস করতে কি পরিমাণ কষ্টকর ছিল তা শুধু বর্তমানে কল্পনাই করা যায়। বর্তমান সময়ে মোটর সাইকেলে ফেনী থেকে মকবুল সাহেবের বাড়ী যেতে ৩০/৪০ মিনিটের বেশী সময় লাগে। যা হোক সে কারণে তিনি স্কুল পরিবর্তনে বাধ্য হয়ে জায়লস্কর হাইস্কুলে ভর্তি হন এবং ১৯৫৭ সালে কৃতিত্বের সাথে এ স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। তিনি ১৯৫৯ সালে ফেনী কলেজ থেকে ইন্টারমেডিয়েট পাস করেন এবং ১৯৬২ সালে বি.এ পাস করেন। এখানে মকবুল সাহেবের জাগতিক শিক্ষার সমাপ্তি। কিন্তু দ্বীনি শিক্ষা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।

কর্ম জীবন:
বি.এ পাশ করার পর তিনি শিক্ষকতার মত মহান পেশাকে গ্রহণ করেন। এ ব্যাপারে জনাব অধ্যাপক আবু ইউসুফ লিখেন- “প্রথমে তিনি ফেনী উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত ঐ সময়ের স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরিষাদি উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। কথিত আছে যে, উক্ত বিদ্যালয়ে বিভিন্ন নিয়ম কানুন শক্তভাবে পালন করা হতো। মকবুল সাহেব তখন জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করার কারণে তার আচার আচরণে ইসলামের রীতিনীতির প্রতিফলন ঘটেছিল। তাই উক্ত বিদ্যালয়ের ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারী জনাব আবদুল খালেককে তিনি নাম ধরে না ডেকে খালেক ভাই বলে সম্বোধন করার কারণে তাঁর বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানের নিয়মনীতির বিপরীত আচরণের অভিযোগ উঠলে তাৎক্ষণিক প্রধান শিক্ষক তাঁকে বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেন তখন তিনি উত্তরে বলেছিলেন আবদুল খালেক ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারী হলেও সে তো আমাদের মতোই একজন মানুষ। সুতরাং তাকে ভাই ডাকতে সমস্যা কোথায়? তিনি সরিষাদি উচ্চ বিদ্যালয়ে ৪ বছর শিক্ষকতা করেছিলেন। পরবর্তীতে বর্ণিত ঘটনার জের ধরে তিনি উক্ত বিদ্যালয়ের চাকুরী ত্যাগ করেন এবং শহরে অবস্থিত ফেনী সেন্ট্রাল হাইস্কুলে চাকুরী গ্রহণ করেন। ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ফেনী সেন্ট্রাল হাইস্কুলে শিক্ষকতা করেন।

সাংবাদিকতায় মকবুল আহমাদ:
অধ্যাপক মাযহারুল ইসলাম লেখেন- "১৯৭০ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত জাতীয় দৈনিক 'দৈনিক সংগ্রাম' পত্রিকার ফেনী মহকুমার নিজস্ব সংবাদদাতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সত্তর দশকের দিকে 'বাংলাদেশের হোয়াইটগোল্ড' শিরোনামে বাংলাদেশের কক্সবাজারের চিংড়ি মাছের উৎপাদনের ওপর তার লেখা একটি প্রতিবেদন ব্যবসায়ী জগতে বিশেষ আলোড়ন সৃষ্টি করে। বিষয় ছিল 'বাংলাদেশের হোয়াইট গোল্ড' (চিংড়ি

সম্পদ) সৌদি আরবের 'তরল সোনা (পেট্রোল)' কে হার মানাবে।" তিনি সুযোগ পেলে পত্র পত্রিকা বা সাময়িকীতে লেখালেখি করতেন এবং প্রতিভাবানদের লেখালেখি ও সাংবাদিকতায় উৎসাহিত করতেন। মিড়িয়ার গুরুত্ব তাঁর কাছে পরিষ্কার ছিল। তাই তাঁর পরিচিত কেউ সাংবাদিকতায় ঢুকলে এ পেশায় টিকে থাকার জন্য তাকে প্রণোদনা দিতেন। যত বাধা আসুক এ পেশা পরিত্যাগ করতে নিরুৎসাহিত করতেন।

সাংগঠনিক জীবন:

১৯৬২ সালে : জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান।

১৯৬৬ সালে : জামায়াতে ইসলামীর রুকন শপথ নেন।

১৯৬৭-৬৮ সালে : ফেনী শহর নাযেমের দায়িত্ব পালন।

১৯৬৮-৭০ সাল : ফেনী মহকুমা সভাপতির দায়িত্ব পালন।

১৯৭০ সালে : ফেব্রুয়ারী মাস থেকে ১৯৭১ সালের জুন মাস পর্যন্ত নোয়াখালী জেলা আমীরের দায়িত্ব পালন।

১৯৭১ সালে : বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত তিনি সংগঠনের চট্টগ্রাম বিভাগের দায়িত্ব পালন করেন। তখন চট্টগ্রাম বিভাগ ছিল চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, কুমিল্লা ও সিলেট এর বৃহত্তর জেলা নিয়ে। বিভাগ হিসেবে তখন দেশের এ বিভাগ ছিল সবচেয়ে বড়।

১৯৭৯ সাল : থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত তিনি সংগঠনের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৮৯ সাল : থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত তিনি সহকারী সেক্রেটারী জেনারেলের দায়িত্ব পালন করেন।

২০০৪ সালে : ২০১০ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

২০১০ সালের : ৩০ জুন থেকে ২০১৬ সালের ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত জামায়াতের তৎকালীন আমীরে জামায়াত মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীকে গ্রেফতার করা হলে ভারপ্রাপ্ত আমীরে জামায়াত হিসেবে সংকটকালীন সময়ে নেতৃত্ব দেন।

২০১৬ সালের : ১৭ অক্টোবর তিনি আমীর নির্বাচিত হন এবং ২০১৯ সালের ১২ নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর তৃতীয় নির্বাচিত আমীরে জামায়াত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।


বিভিন্ন সংস্থায় দায়িত্ব পালন:

১৯৮৪ সালে : তিনি ঢাকায় অবস্থিত জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান “ফালাহ- ই-আম ট্রাস্টের" চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।

১৯৯৭ সাল : থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত তিনি ইসলামী আন্দোলনের পতাকাবাহী জাতীয় পত্রিকা দৈনিক সংগ্রামের মালিকানা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পাবলিকেশন্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান ছিলেন। এছাড়া তিনি দৈনিক সংগ্রাম ট্রাস্টি বোর্ডের একজন ডাইরেক্টর ছিলেন।

২০০৪ সাল : তিনি বাংলাদেশ ইসলামিক ইনস্টিটিউটের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।


বিদেশ সফর:

১৯৭৬ ও ৭৯ সালে তিনি "রাবেতা আলম আল ইসলামীর” মেহমান হিসাবে দু'বার পবিত্র হজ্জব্রত পালনের জন্য সৌদী আরব সফর করেন।

• জাপান ইসলামী সেন্টারের দাওয়াতে জাপান সফর করেন।

কুয়েতে প্রবাসী ভাইদের দাওয়াতে তিনি একবার কুয়েত সফর করেন।


সামাজিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা:

> তাঁর সহযেগিতায় সিলোনিয়া মাদ্রাসা সংলগ্ন 'আল ফালাহ মসজিদ' ও 'উম্মুল মু'মেনীন আয়েশা (রা.) মহিলা মাদরাসা' প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

➤ ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ২০১৬ পর্যন্ত তিনি ফেনীর বিখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শাহীন একাডেমী স্কুল এন্ড কলেজ ফেনী এর নিয়ন্ত্রক ট্রাস্ট 'ফেনী ইসলামিক সোসাইটি'র চেয়ারম্যান ছিলেন।

১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত 'আঞ্জুমানে ফালাহিল মুসলেমিন' নামক ট্রাস্টের তিনি ফাউন্ডার ও আজীবন মেম্বার ছিলেন। এ ট্রাস্টের অধীনে পরিচালিত হয় দেশের টপটেন মাদরাসার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান 'আল-জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদরাসা ফেনী' এবং ফেনী সদর উপজেলার 'লক্ষীপুর বাইতুল আমিন দাখিল মাদরাসা'।

১৯৮৮ সালে দাগনভূঞা সিরাজাম মুনিরা সোসাইটির সভাপতি ছিলেন।

> দেশের অন্যতম বৃহৎ ইসলামী সাহিত্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান আধুনিক প্রকাশনী বি.আই ট্রাস্টের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

> এছাড়া তিনি ঢাকা রহমতপুরস্থ ডা. আবদুস সালাম কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত আশ-শেফা আর রাহমাহ নামক সমাজ কল্যাণ প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেন।


সমাজকল্যাণমূলক কার্যক্রম:

* অধ্যাপক মাযহারুল ইসলাম লেখেন- "ছাত্রজীবন থেকেই তিনি সমাজকল্যাণমূলক কাজের সাথে জড়িত ছিলেন। তার জীবনের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হলো মানুষের সেবা করা। ১৯৬২ সালে যুবকদের সহযোগিতায় নিজ গ্রাম ওমরাবাদে "ওমরাবাদ পল্লীমঙ্গল সমিতি" নামের একটি সমিতি গঠন করেন। তিনি উক্ত সমিতির ১০ (দশ) বছর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। সমিতির সভাপতি হিসেবে তিনি স্থানীয় অনেক রাস্তাঘাট নির্মাণ ও মেরামতের ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং গরিব ও অসহায় লোকদের সাহায্য-সহযোগিতা প্রদান করেন।

* ১৯৭৬ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত তিনি গজারিয়া হাফেজিয়া মাদরাসার ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।


রাজনৈতিক জীবন:

১৯৭০ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে জামায়াতের দলীয় প্রার্থী হিসেবে নিজ এলাকায় প্রতিদ্বন্ধিতা করেন।

১৯৮৬ সালে জামায়াতের দলীয় প্রতীক দাঁড়িপাল্লা নিয়ে ফেনী ২নং আসন থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন।

১৯৯১ সালে তিনি জামায়াতের দলীয় প্রার্থী হিসেবে আরও একবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন।

২০১০ সালের জুন মাসের শেষ দিকে জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমীর নিযুক্ত হয়ে দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য গঠিত ২০ দলীয় জোট গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

২০১৬ সালের ১০ অক্টোবর জামায়াতের আমীর নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে থেকে ২০১৯ সালের ১২ নভেম্বর পর্যন্ত দেশের কঠিনতম পরিস্থিতিতে জামায়াতের আমীর ও ২০ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতা হিসাবে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সরকারের স্বৈরাচারী আচরণের প্রতিবাদ, জনগণের ভোটাধিকার পুনরুদ্ধার, এদেশে ইসলামী কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং গণমানুষের আধিকার আদায়ের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।

পারিবারিক জীবন: জনাব মকবুল আহমাদ ১৯৬৬ সালে লক্ষীপুর জেলা নিবাসী প্রখ্যাত আলেম ও শিক্ষাবিদ ঢাকা আরমানিটোলা সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান মাওলানা ওহিদুল হকের কন্যা মুহতারামা সুরাইয়া বেগমের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তিনি ৩ ছেলে ও ২ মেয়ে সন্তানের জনক। তাঁর স্ত্রী একজন রুকন। ছেলে-মেয়েরাও ইসলামী আন্দোলনের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সংশ্লিষ্ট।

মৃত্যু:
মৃত্যু মানব জীবনের অনিবার্য পরিণতি। কোন মনিষী এমনকি নবী-রাসুলগণও অমরত্ব লাভ করেননি। সে কারণে একটি পরিণত বয়সে খলিফাতুল্লাহ হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে আল্লাহর একান্ত প্রিয় এ গোলাম ১৩ এপ্রিল ২০২১ইং, মঙ্গলবার, দুপুর ১.০০টায়, ইবনে সীনা হাসপাতালে চিকিৎসাধিন অবস্থায় মহান মনিবের দরবারে হাজিরা দেন। সেদিন ছিল ১৪৪২ হিজরীর ২৯ শে শাবান। দিন শেষে পহেলা রমজানের প্রস্তুতি, সালাতুত তারবীহ। পরদিন থেকে শুরু হচ্ছে করোনা পরিস্থিতির কারণে সর্বাত্বক কঠোর লক ডাউন। তাই ঐ দিন গভীর রাতে নামাজে জানাজা শেষে ওমরাবাদ গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে মরহুমকে সমাহিত করা হয়। জানাযায় ইমামতি করেন বর্তমান আমীরে জামায়াত জনাব ডা. শফিকুর রহমান।

মহান আল্লাহ মরহুমের কবরকে জান্নাতের টুকরায় পরিণত করুন, তাঁর নেক আমলগুলো কবুল করুন, ভুলত্রুটিগুলো নিজ অনুগ্রহে ক্ষমা করে দিন। তাঁর শোক সন্তপ্ত পরিবারকে সবরে জামিল ইখতিয়ারের তাওফিক দিন। তাঁর উত্তরসূরীদের আরো বেশী দক্ষতা ও যোগ্যতার সাথে বাংলাদেশের ইসলামী আন্দোলনকে কামিয়াবীর মঞ্জিলে পৌঁছে দেয়ার তাওফিক দিন। আমীন, ইয়া রাব্বাল আ'লামীন।

Wednesday, June 5, 2024

“কবে আমার একরামের স্বপ্নের ইসলামী সরকার হবে, কবে হবে খুনিদের বিচার?” -শহীদ একরামুল হক ভাইয়ের মায়ের আকাঙ্খা






“কবে আমার একরামের স্বপ্নের ইসলামী সরকার হবে, কবে হবে খুনিদের বিচার?”

-শহীদ একরামুল হক ভাইয়ের মায়ের আকাঙ্খা



একনজরে শহীদ পরিচিতি

•নাম : মুঃ একরামুল হক খাঁন
•পিতা : মৃত সামছুল হক খাঁন
•ভাইবোন : ২ ভাই, ৫ বোনের মধ্যে ৪র্থ
•সাংগঠনিক মান : সাথী
•ঠিকানা : গ্রাম: সফরপুর, পোস্ট : কুদ্দুস মিয়ার হাট। থানা : সোনাগাজী, জেলা : ফেনী 
•শাহাদাত কালে : এম. এ. ফলপ্রার্থী।
•শহীদ হওয়ার স্থান : চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ 
•যাদের আঘাতে নিহত : ছাত্রদল 
•যে শাখার শহীদ : চট্টগ্রাম মহানগরী উত্তর 
•শাহাদাত : ৫ই জুন, ১৯৯৫ইং।

⇨শাহাদাতের ঘটনা

তখন আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ২য় বর্ষের ছাত্র। শাহজালাল হলের গেস্টরুমে পাঠচক্রের প্রোগ্রাম। পাঠচক্রের সদস্যদের সাথে একে অপরের পরিচয় হচ্ছে। কার-বাড়ি কোথায় কোন সাবজেক্টে পড়াশুনা আমার ও একরাম ভাইয়ের পরিচয় জানার পর একটু ঘনিষ্ঠ হয়ে কাছাকাছি বসলাম। কারণ দুজনের বাড়ি একই জেলায় আবার দুজনের বিভাগীয় অফিসও পাশাপাশি। উল্লেখ্য আমি দর্শন বিভাগের ছাত্র আর একরাম ভাই ইতিহাস বিভাগের ছাত্র। পাঠচক্রের প্রোগ্রাম যথাযথ সময়ে শেষ হওয়ার পর দু’জনে দীর্ঘক্ষণ আলাপ হল। ব্যক্তিগত, সাংগঠনিক, বিশেষ করে ফেনী জেলার কাজকর্মের ব্যাপারে।

এরপর থেকেই একরাম ভাইকে ফ্যাকাল্টিতে দেখলেই কাছে ছুটে যেতাম। প্রথম আলাপেই কেমন যেন ভক্ত হয়ে গেলাম। তিনি যদিও আমার এক বৎসরের সিনিয়র ছিলেন তবুও দু’জন বন্ধুর মতো ব্যবহার করতাম। উনি আমান বাজারে লজিং থাকতেন এবং সাংগঠনিক দায়িত্ব সেখানেই পালন করতেন তাই কোন প্রোগ্রাম উপলক্ষে বা ফ্যাকাল্টিতে ক্লাসের ফাঁকে দেখা হতো। দেখা হলেই কাছে ছুটে যেতাম। এ বিশাল হৃদয়ের মানুষটার কাছে গেলে মনে হতো অনেক দুঃখের কথা ভুলে যেতাম। মনে বড় সান্ত্বনা পেতাম হাস্যোজ্জ্বল চেহারাটা দেখে এবং সাহস পেতাম দৃঢ় চিত্তের ব্যক্তিত্ব দেখে। অপূর্ব সাহসী ছিলেন সদস্য প্রার্থী হয়েছে শুনে কোলাকুলি করলেন। অনার্স পরীক্ষা এবং পারিবারিক কিছু সমস্যার কারণে তিনি সদস্য হতে পারেননি এ জন্য দুঃখ প্রকাশ করে বলতেন, “এগিয়ে যান তাড়াতাড়ি সদস্য হয়ে যাওয়া দরকার। পারিবারিক সমস্যার কারণে আমি তো পারলাম না” আমি বললাম, কেন কী হল সময়তো এখনো আছে। তিনি একটু হেসে বললেন কই আর সময়! অনার্সের রেজাল্ট হয়ে গেছে ইতোমধ্যে মাস্টার্সের ক্লাস শুরু হয়ে গেছে, কয় দিন পর মাস্টার্স পরীক্ষা শুরু হবে। তাছাড়া পারিবারিক অনেক সমস্যা। অনার্সের রেজাল্ট এর কথা শুনে কি রেজাল্ট জিজ্ঞাসা করতেই হেসে বললেন, এই দুই ডান্ডা আর কি, সাথে সাথে তার এক বন্ধু (এই মুহূর্তে নামটি স্মরণে আসছে না) বললেন সেকেন্ড ক্লাস সেকেন্ড হয়েছে। আগামীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং রস করে বললেন তখন স্যার স্যার বলে আমরা পেছনে পেছনে হাঁটবো। একরাম ভাই দুষ্টুমি করে বললেন, “আমি বেতন নিয়ে তোমাদের পিটাব” এটা বলেই অট্টহাসি দিয়ে আমার সাথে হাত মিলিয়ে বিদায় নিলেন দু’জন। এভাবে মাঝে মধ্যে দেখা হতো, কথা হতো।

আরেক দিনের ঘটনা। একদিন ফ্যাকাল্টিতে দেখা হল তিনি সিঁড়ি দিয়ে নামছেনএবং আমি উঠছি এমন সময় জড়িয়ে ধরলেন। বললেন শুনেছি সদস্য হয়েছেন এবং হল সেক্রেটারি। আমি বললাম সে তো অনেক পুরোনো কথা, তবে আপনি তো কি ব্যাপারে ছাত্রজীবন শেষ করলেন নাকি? তিনি একটু হেসে স্বভাবসুলভ দুষ্টুমিতে বললে হ্যাঁ মাস্টার্স পরীক্ষা এই তো শেষ করলাম। আমি বললাম তাতো জানি আমি সাংগঠনিক ছাত্রজীবনের কথা বলছি। তাঁর পারিবারিক সমস্যার কথা জানতাম বলে আর কিছু জিজ্ঞাসা না করে বললাম এখন কি করার চিন্তা করছেন। উত্তরে বললেন, দেখা যাক, আপাতত বাড়িতে আছি। একটা কলেজে ঢুকার চেষ্টা করছি। বললাম কি ব্যাপার এম.ফিল করবেন না? তিনি একটু হেসে বললেন দেখা যাক রেজাল্ট এর তো অনেক দিন বাকি এ সময়টায় কিছু একটা করি। আমিও তখন বললাম আসলে সুযোগ পেলে ঢুকে যাওয়া দরকার। তিনি বললেন দোয়া করবেন। এটা বলেই হাত মিলালেন, কে জানতো এটাই ছিলো একরাম ভাইয়ের সাথে আমার জীবনের শেষ দেখা।

যদি জানতাম তাহলে সে দিন তাঁকে ছাড়তাম না প্রাণ ভরে আরো কথা বলতাম যার কোন শেষ হতো না। এর কয়দিন পরেই আবার দেখা হয়েছে তাঁর সাথে তবে আগে সে একরাম নয়। আল্লাহর একজন অতি সম্মানিত মেহমান হিসেবে নূরানী জ্যোতিতে উদ্ভাসিত এক যুবক। তখন আগের মতো কুশল বিনিময় হয়নি তবে হয়েছে আত্মিকভাবে কথোপকথন। আগের মতো কথা বলতে পারিনি শ্রদ্ধার নত হয় আসছিল- ৫ই জুন’৯৫ সকাল ১০টায় ফ্যাকাল্টিতে সাথী মোশাররফ ভাই (একরাম ভাইয়ের বিভাগের ছাত্র ও আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু) বললেন একরাম ভাইয়ের অবস্থা খুবই খারাপ সোনাগাজীতে ছাত্রদলের সন্ত্রাসীরা হামলা করে আহত করেছে। চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে আছে। ডিপার্টমেন্টের অনেকেই দেখতে যাবে আপনি যাবেন? আমি কোন আকরাম ভাই জিজ্ঞাসা করতেই মোশাররফ ভাই বলে উঠলেন, “আরে সাথী ছিলেন যে অনার্স সেকেন্ড ক্লাস সেকেন্ড হয়েছেন, এবার মাস্টার্স পরীক্ষা দিলেন আমি আঁতকে উঠে বললাম কি বলেন? আমার সাথে মাত্র ৫দিন পূর্বে উনার সাথে দেখা হল কবে বাড়ি গেলেন? মোশাররফ ভাই বললেন আমার সাথে ওতো একদিন আগেই দেখা হল। আমি বললাম দেখা যাক হলে যাই তারপর সিদ্ধান্ত নিব।

হলে ঢুকতেই দু-তিন জন সাথী কর্মী এসে বলল মতিন ভাই একরাম ভাইকে চিনেন নাকি, সোনাগাজীর? হ্যাঁ শুনেছি আহত হয়েছেন। একজন বলে উঠল না এই মাত্র ফোন আসলো উনি শাহাদাত বরণ করেছেন। ইন্নালিল্লাহি পড়ে দ্রুত রুমে গেলাম, চেয়ারে বসে পড়লাম। পুরো দুনিয়াটা অন্ধকার মনে হল। চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরে পড়ছে, কারো সাথে কোন কথা বলতে পারলাম না। কিছুক্ষণ পর হল সভাপতি রহমান ভাই এসে আমাকে খুঁজছে, আমি চোখ মুছে বের হতেই বললেন মতিন ভাই খবরটা পেয়েছেন? আমি অশ্রুসজল চোখে মাথা নাড়ালাম তিনি বললেন মিছিল হবে লোকজন খবর দেন। এর পরপরই বিশাল মিছিল বের হল।

মিছিলের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস নিয়ে হাসপাতাল পৌঁছি। সেখানে পূর্ব থেকে চট্টগ্রাম মহানগরীর কিছু জনশক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্র এবং তার নিজ এলাকার কয়েকজন লোককে দেখতে পেলাম। সকলের কান্নায় আকাশ ভারী হয়ে উঠল, আমরা লাশ ঘরে জোর করেই ঢুকে গেলাম। লাশ দেখে কেঁদে উঠলো সকলের মন। পরে যখন হাসপাতালের পাশে বসে আছি, মনে পড়তে লাগলো পুরনো সব স্মৃতির কথা, করিডোরের কথা, ফ্যাকাল্টিতে প্রোগ্রামের কথা বা সিঁড়িতে শেষ দেখার কথা। নিজের অজান্তেই অশ্রুতে বুক ভিজে গেল। এরপর আর একরাম ভাইয়ের চেহারা দেখিনি। দেখার মতো অবস্থাও আমার ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়ে জানাযা এবং সোনাগাজী যানাযা শেষে চিরদিনের জন্য যখন সাড়ে তিন হাত মাটির নিচে রেখে আসছিলাম। এভাবে শহীদ একরামকে রেখে সবাই চট্টগ্রাম রওয়ানা হলাম। কাফেলার সবাই ছিল শুধু ছিল না একজন যিনি একদম পৃথিবীকে ছেড়ে মহান প্রভুর দরবারে পৌছে গেছেন।

এরপর জেলা সভাপতি হয়ে ফেনী আসার পর যতবার শহীদের বাড়ি গিয়েছি বারবার মনে পড়েছে প্রথম পরিচয় এবং সর্বশেষ দেখার কথা। খালাম্মা প্রশ্ন করেন করে আমার একরামের স্বপ্নের ইসলামী সরকার হবে, কবে হবে খুনিদের বিচার। তখন ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকি আর অতীতের একরাম ভাইকে যেন শাহজাহাল হলের গেষ্টরুমে বা আর্টস ফ্যাকাল্টিতে সিঁড়িতে দেখতে থাকি। সাদা ধবধবে নূরানী জ্যোতিতে উদ্ভাসিত এক পবিত্র যুবক সাথীদের হৃদয় ফাটানো আর্ত চিৎকার যা কোন দিন শেষ হবার নয়, ভুলার নয়। নিজের অজান্তেই তখন দু'চোখ ভিজে ওঠে।


⇨শহীদের আচরণ

আমাদের দেশে কুচকুচে কালো পাখি কোকিল। বসন্তকালের কোকিল খুব সুন্দর গান শোনায়, কিন্তু কোকিল দেখার পর মনে হবে না সে এত সুন্দর গান শোনাতে পারে। শহীদ একরামের গায়ের রং খুব সুন্দর ছিল না। কিন্তু চেহারা ছিল সুন্দর মায়াবী, আর মুখের ভাষা ছিল মিষ্টি বড় ও ছোটদের মাঝে তিনি যোগ্যতম সমান আর স্নেহ-ভালবাসা প্রদর্শন করতেন। তার সাথে যখনই ছোট কারো দেখা হতো খুবই স্নেহের সাথে হাত বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করতেন কেমন আছ? তিনি ভাবুক ছিলেন। এলাকার গরিব দুঃখীদের নিয়ে তাইতো তিনি গরিব দুঃখীদের সাহায্যার্থে এলাকার একটি সমিতি গঠন করেছিলেন সেখান থেকে অভাবীদের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতেন। তিনি এলাকার গরিব দুঃখীসহ সকল মানুষের প্রিয়জন । তার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল তিনি যেদিন শাহাদাতবরণ করেছিলেন। সেইদিন থেকেই তিন দিন পর্যন্ত এলাকার সর্বস্তরের মানুষ কালো ব্যাজ ধারণ করে ঘৃণা প্রকাশ করেছেন।

কী অপরাধ ছিল তার? কী অপরাধে হত্যা করা হলো, জনগণের বন্ধু আর ইসলামী আন্দোলনের নিরপরাধ এই কর্মীকে? তার তো এছাড়া আর কোন অপরাধ ছিল না যে, তিনি আল্লাহর দীন কায়েমের জন্য শপথ নিয়েছিলেন আর মহান আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছিলেন।


⇨যেভাবে ঘটনা ঘটলো

৩রা জুন ১৯৯৫। পড়ন্ত বিকেলে তিনি স্থানীয় একটি পাঠাগার বসে পত্রিকা পড়ছিলেন, অমনি মাস্তান বাহিনী খুনের নেশায় উন্মাত্ত হয়ে এসেই তাঁর মাথায় আঘাত করে, তার সাথে সাথে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তিনি জানতেন না তাকে এমন একটি পরিস্থিতির শিকার হতে হবে। মাত্র দু’দিন আগে বাড়িতে ফিরেছিলেন শিক্ষাজীবনের পরীক্ষা দিয়ে, তিন দিন আগেই তার মাস্টার্স পরীক্ষা শেষ হয়েছিল। পরীক্ষা শেষে মায়ের আদরে ধন মায়ের কাছেই এসেছিলেন, সোহাগী বোনের কাছে এসেছিলে বুকভরা সোহাগ নিয়ে। তার চোখে বিরাট আশার স্বপ্ন, মাত্র একবছর আগে বাবা মারা যাওয়ার পর তিনিই ছিলেন পরিবারের বড়। স্বাভাবিকভাবে পরিবারের সকল দায়িত্ব তার ওপরই বর্তায়। এজন্য তার চেতনা ছিল পরিবারের জন্য কিছু করতে হবে। বাড়িতে এসেই মাকে বলেছিলেন মা পরীক্ষা দিয়ে এসেছি, ভালই হয়েছে, দোয়া করবেন। মা এবার চাকরি করে বোনগুলোকে বিয়ে দিয়ে দেব আর পরিবারে অভাব পূরণ করবো। কিন্তু তার সকল স্বপ্ন শুধু স্বপ্নই থেকে গেল তা আর বাস্তাবতার মুখ দেখেনি এবং কখনো দেখবেও না। আহ! কী নিষ্ঠুর এই পৃথিবী। আসলে এভাবে অনেক কিছুর স্বপ্ন দেখেই সবাইকে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে।

আহত হওয়ার সোনাগাজী হাসপাতলে নেয়া হলে ডাক্তার সেখান থেকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে স্থানাস্তর করলেন। আমরা আল্লাহর কাছে দোয়া করতে লাগলাম তাকে যেন সুস্থ শরীরে ফিরিয়ে আনেন। আমরা চেয়েছিলাম তিনি সুস্থ হয়ে বাড়িতে এসে আবার আন্দোলনের কাজ করবেন। কিন্তু আমাদের সেই চাওয়া বৃথাই গেল। তিনি বাড়িতে এসেছে ঠিকই কিন্তু জীবিত নয় কফিনে।


⇨শাহাদাতের ঘটনা

সোনাগাজীর সফরপুর মিয়ার বাজারে ছাত্রদলের সন্ত্রাসীরা এক নিরীহ ছাত্রকে আটকিয়ে মারধর করে ও চাঁদা দাবি করে। এর প্রতিবাদ করায় ছাত্রদলের সন্ত্রাসীরা তার উপর চড়াও হয়। সারা শরীরে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে প্রথমে সোনাগাজী হাসপাতালে ও পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে দুই দিন অচেতন অবস্থায় থেকে সবাইকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে দেন।


-কেন্দ্রের অফিসিয়াল পেজ হতে সংগৃহীত 

Wednesday, March 13, 2024

বিজ্ঞানে মুসলমানদের অবদান || ড. আ জ ম ওবায়েদুল্লাহ || প্রবন্ধ সংকলন-আইসিএস পাবলিকেশন্স

বিজ্ঞানে মুসলমানদের অবদান || ড. আ জ ম ওবায়েদুল্লাহ || প্রবন্ধ সংকলন-আইসিএস পাবলিকেশন্স
বিজ্ঞানে মুসলমানদের অবদান
ড. আ জ ম ওবায়েদুল্লাহ
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানুষকে 'আশরাফুল মাখলুকাত' এর মর্যাদায় অভিষিক্ত করার জন্য তাকে 'জ্ঞান' 'বিবেক' ও ইচছার স্বাধীনতা প্রদান করেছেন এবং জ্ঞানের আকর বিজ্ঞানময় আল-কুরআনকে চূড়ান্ত 'হেদায়াত' এর উৎস হিসেবে প্রেরণ করেছেন। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ ও নবী, জ্ঞানী ও শাসক, শিক্ষক ও ত্রাণকর্তা হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) কে নবুওয়ত প্রদানের সংবাদ স্বরূপ অহি মারফত আল্লাহ যে ঘোষণা দেন তা হলো:
"পড় তোমার প্রভুর নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। মানুষকে যিনি সৃষ্টি করেছেন এক ফোঁটা নাপাক বীর্য থেকে। পড়; আর তোমার প্রভু সবচেয়ে সম্মানিত। যিনি কলমের মাধ্যমে লিখতে শিখিয়েছেন। আর মানুষকে শিখিয়েছেন যা সে জানত না।"
মানবতার মহান শিক্ষক হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বলেছেন- "জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক নর-নারীর উপর ফরজ",- দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত জ্ঞান তালাশ করো।" নবী করীম (সাঃ) এর সময়কালে চীন ছিল বৈজ্ঞানিক উন্নয়নে অগ্রসর। হয়ত তাই তিনি উম্মতকে বলেছেন - "জ্ঞান অর্জন করো যদি সুদূর চীনেও যেতে হয়।"
বিখ্যাত তাফসীরকার মালিক আকবর আলী কোরআনে জ্ঞান ও হিকমাহর (প্রযুক্তি) সহাবস্থানের কথা উল্লেখ করেছেন অর্থাৎ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি/তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক জ্ঞান পরস্পর সংযুক্ত।
আল্লার নবী (সাঃ) বলেছেন- 'প্রযুক্তি বিশ্বাসীদের হারানো সম্পদ, যেখানে সে তা পাবে সেখান থেকেই সে তা কুড়িয়ে নেবে। আল-কুরআনে ৯২টি আয়াতে 'ইলম,' ৩০টি আয়াতে 'হিকমাত্র; কথা এসেছে এবং ৩২টি আয়াতে জ্ঞানীদের দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন ও জ্ঞানহীনদের 'অন্ধ' বলা হয়েছে।

খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীতে জন্ম নিয়ে ৭ম শতাব্দীর প্রথম পদে নবুওয়ত লাভ করে ২৩ বছরের অক্লান্ত সাধনায় হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) ইসলামকে একটি বিজয়ী জীবন বিধান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সমর্থ হন। তিনি ও তার পরবর্তী খলিফাগণ ইসলামের একটি অন্যতম কর্মসূচি হিসেবে জ্ঞানচর্চা, নয়া নয়া প্রযুক্তি আবিষ্কার ও মানবতার কল্যাণের জন্য সে সবের ব্যবহারের উপর জোর দেন। ইউরোপীয় ইতিহাসের যে অধ্যায়টি গির্জা ও বিজ্ঞানের দ্বন্দ্বের ফলে 'অন্ধকার যুগ' বলে চিহ্নিত সেই যুগে ইসলামের বিজ্ঞান মনস্কতার কারণে জ্ঞান-বিজ্ঞানে, কলা ও প্রযুক্তির সৃষ্টিশীলতায় একটি 'রেনেসার' জন্ম লাভ করে।

হিজরি প্রথম শতকে ইসলামী রাষ্ট্রের বিস্তৃতি ঘটে পশ্চিমে আফ্রিকার আটলান্টির অববাহিকা থেকে পূর্বে চীনের গ্রেট ওয়াল পর্যন্ত, আফ্রিকার ভূমধ্যসাগরের বেলাভূমি থেকে সাহারা পর্যন্ত। ইতোমধ্যে তা আন্দালুসিয়া হয়ে পিরিনিজ পর্বতমালা এমনকি পরিব্রাজকের বেশে ফ্রান্স পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। ইতোমধ্যে তা আন্দালুসিয়া হয়ে পিরিনিজ পর্বতমালা এমনকি পরিব্রাজকের বেশে ফ্রান্স পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। সম্পূর্ণ জাজিরাতুল আরব, ইরান, আফগানিস্তান, সিন্ধু, পাঞ্জাব হয়ে কয়েক শতকের মাঝে তা গোবি হয়ে ছড়িয়ে পড়ে মধ্য এশিয়ায়।

বিজ্ঞানে মুসলমানদের অবদানের সোনালি সময় হচ্ছে ৭ম শতাব্দী থেকে একাদশ শতাব্দী পর্যন্ত। যদিও সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত কিছু কিছু মুসলিম বিজ্ঞানীর অবদান নজরে পড়ে। আজ বিশ্ব জ্ঞান বিজ্ঞানে এক অত্যাশ্চর্য উচচতায় এগিয়ে গেছে, বর্তমান সময়ে বিজ্ঞানে মুসলমানদের উল্লেখযোগ্য কোন অবদান চোখে পড়ছে না বরং শিক্ষা-দীক্ষা ও বিজ্ঞানে তাদের পশ্চাদপদতা অন্যদের হাসির খোরাকে পরিণত করেছে একথা সত্য কিন্তু আবার পৃথিবীকে কল্যাণময়তায় ভরিয়ে দেয়ার ক্ষমতা মুসলমানরাই রাখে। জ্ঞানে-বিজ্ঞানে মুসলমানদের যে বিপুল অবদান তা ইতিহাস বিকৃতির পাল্লায় পড়ে সবাই ভুলে আছে অথচ ঐসব অবদানই আজকের বিজ্ঞানের মূল ভিত্তি।
এ প্রবন্ধে বিজ্ঞানে মুসলিম অবদানের একটি চিত্র তুলে ধরার প্রয়াস থাকলো যাতে আগামী প্রজন্ম এর বিস্তৃত জানার উৎসাহ লাভ করে এবং এসব উৎসাহী পাঠকদের মাঝ থেকে নতুন সময়ের ইমাম জাফর সাদিক, জাবির ইবনে হাইয়ান, আল বেরুনী, ইবনে সিনা, আর খাওয়ারিজিমী, ওমর খৈয়াম প্রমুখ দিকপাল বিজ্ঞানীর জন্ম হয়।
•বিজ্ঞানের মৌল উপাদান সমূহ: মুসলিম বিজ্ঞানীরা যার সূচনা করেন
ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রখ্যাত খ্রিস্টান ধর্মতত্ত্ববিদ, সংস্কারক বিজ্ঞানী রজার বেকন (Regerbecon) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'Opus Majus' এ 'Scientiac Experimentalis' বা 'Experimental Science' অর্থাৎ 'পরীক্ষালব্ধ বিজ্ঞানসমূহ' অনুজ্ঞাটি প্রথম ব্যবহার করেন। এটি নিঃসন্দেহে বিখ্যাত আরবি পরিভাষা Al-Ulum at- Tajribiyan এর অনুবাদ। তাঁর Scientiac ব্যবহৃত হয় Ulum এর স্থলে এবং Experimentalis ব্যবহৃত হয় Tajribiyah এর স্থলে। আধুনিক বিজ্ঞানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা (Experiment) ব্যতিরেকে কোন কিছুকে গ্রহণ করা হয় না অর্থাৎ পরীক্ষালব্ধ বিজ্ঞানই আধুনিক বিজ্ঞান। ইসলামের ৪র্থ খলিফা, মহান জ্ঞানী হযরত আলী (রাঃ) রসায়ন সূত্রের প্রথম প্রণেতা হিসেবে বিবেচিত। তাঁর নাতি ইমাম জাফর সাদিক (৬৯৯ ৭৬৫ খ্রিঃ) ছিলেন এক্ষেত্রে তার সার্থক উত্তরাধিকারী। ইমাম জাফরের সাগরেদ জাবির ইবনে হাইয়ান (৭২২-৭৭৭ খ্রিঃ) রসায়নের মায়া শাস্ত্রকে (Magic Art) কার্যকর বিজ্ঞানে রূপ দেন। জাবির তাঁর ছাত্রদেরকে বলতেন নিজ হাতে কোন কিছুকে পরীক্ষাপূর্বক সত্য হিসাবে না পেলে তাকে সত্য বলে গ্রহণ না করতে। সম্ভবতঃ এজন্য তিনিই প্রথম বিজ্ঞানী যিনি জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে তাজরিবা বা পরীক্ষা-গবেষণা পদ্ধতি চালু করেন।

প্রথাগত পদ্ধতিতে আল ফারাবী তাঁর 'ইহসা আল উলুম' 'ইখওয়ান আল সাফা রিসালাত আল সানাই আল ইলমিয়াহ' এবং ইবনে সিনা তাঁর 'রিসালাহ ফি আকসাম আল উলুম আল আকলিয়া' গ্রন্থে বিজ্ঞানকে কতিপয় ভাগে শ্রেণীকরণ করেন। ইখওয়ান আল সাফা ও আল ফারাবী বলেছেন তিন শ্রেণীর বিজ্ঞানের কথা যেমন: অঙ্কশাস্ত্রীয় (Mathematical), মানব রচিত বিধানসমূহ (Man made laws) এবং প্রকৃত দার্শনিক (Real Philosophical), অপরদিকে ইবনে সিনা সাধারণ মানবিক জ্ঞানের আওতায় তাঁর সময়কার ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানকে (Islamic Sciences) আনেননি। অপর একদল, যাদের মাঝে ইবনে আল নাদিম তার বই 'ফিহরিস্ত' (ক্যাটালগ, তালিকা)-এ তাঁর সময় পর্যন্ত আবিষ্কৃত বিজ্ঞানকে ১০ ভাগে শ্রেণীকরণ করেন, ইবনে হাজাম দুইভাগে ভাগ করেন, প্রথম ভাগ ছিল ইসলামী আইন (কোরআন, হাদিস, জুরিসপ্রুডেন্স, ব্যাকরণ, ভাষা ও ইতিহাস) এবং বিভিন্ন জাতির জন্য সাধারণ বিজ্ঞান। (অঙ্ক, দর্শন, চিকিৎসাশাস্ত্র, কবিত্ব, বাগ্মিতা ও ন্যায়শাস্ত্র) দ্বিতীয় ভাগে ছিল-যাদুবিদ্যা, রসায়ন ও জ্যোতির্বিদ্যা ইত্যাদি। ইবনে খালদুন তাঁর মুকাদ্দমায় বিজ্ঞানকে ২ ভাগে ভাগ করেছেন। প্রথমভাগে ঐ সমস্ত বিষয় যা ব্যক্তি নিজের মন ও ক্ষমতা দ্বারা বুঝতে পারে। এতে ৪টি অত্যাবশ্যকীয় বিজ্ঞান থাকে- বুদ্ধি ও দর্শনের বিজ্ঞান, যেমন- যুক্তিবিদ্যা, প্রাকৃতিক বিজ্ঞান, যেমন-চিকিৎসাশাস্ত্র, কৃষি, নভো-বিদ্যা, রসায়ন ইত্যাদি; প্রত্যাদিষ্ট বিজ্ঞান; এবং সংখ্যাবিজ্ঞান, যেমন-সংখ্যাতত্ত্ব, জ্যামিতি, জ্যোতির্বিদ্যা ও সঙ্গীত। অপর অংশে রয়েছে কুরআন ব্যাখ্যার পদ্ধতি কুরআন পাঠ ইত্যাদি। তাসকুবরাহ জাদাহকে বলা হয় বিজ্ঞান শ্রেণীকরণে শ্রেষ্ঠ মুসলিম পণ্ডিত। তিনি বিজ্ঞানকে ৭ ভাগে ভাগ করেন।

ইসলামের প্রথম দিকের বিজ্ঞানীরা অনেকেই উপরোল্লিখিত বিজ্ঞান শাস্ত্রের একাধিক শাস্ত্র নিয়ে গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। জাবির ইবনে হাইয়ান মূলতঃ রসায়নশাস্ত্রের জনক বিবেচিত হলেও তিনি চিকিৎসাশাস্ত্র, ভাষা, দর্শন, জ্যামিতি, জ্যোতির্বিজ্ঞান, লজিক ও কবিতা বিষয়ে গ্রন্থ রচনা করেন। আবু আলী আল হোসাইন ইবনে আব্দুল্লাহ যিনি ইবনে সিনা নামে সমধিক পরিচিত, মূলতঃ চিকিৎসাশাস্ত্রের বিজ্ঞানী হলেও বিজ্ঞানের অন্য ৯৮ শাখা নিয়েও কাজ করেছেন। প্রফেসর সাকাও এর মতে আল বিরুনী পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী ব্যক্তি (Al beruni was the greatest intellect that ever lived on this earth.)। গণিত, জ্যোতিষ, পুরাতত্ত্ব, দর্শন, ন্যায়, সভ্যতার ইতিহাস, দিনপঞ্জির তালিকা ও ইতিহাস, ধর্মতত্ত্ব, ভূগোল, প্রাকৃতিক বিজ্ঞান, রসায়ন, জীবতত্ত্ব, উদ্ভিদতত্ত্ব, ভূতত্ত্ব, চিকিৎসাশাস্ত্র ইত্যাদি যাবতীয় বিষয়ে তাঁর বৈজ্ঞানিক হস্তক্ষেপের নিদর্শন বর্তমান। প্রায় সব বিষয়েই তিনি গ্রন্থ প্রণয়ন করেছেন।

একথা অনস্বীকার্য যে এসব মুসলিম বিজ্ঞানীরা যখন এতসব বিষয়ে দিকদর্শন দিয়ে গ্রন্থ রচনা করেছেন তখন পাশ্চাত্যে বিজ্ঞান চর্চা নিষিদ্ধ এবং বিজ্ঞানের পক্ষ নেয়ার গ্যালিলিও'র মতো বিজ্ঞানীও তার কয়েকশত বছর পর চার্চের কাছে আনত মস্তক হয়ে বলতে হয়েছে "আমি আমার দাবির জন্য অনুতপ্ত ও ক্ষমাপ্রার্থী বরং ঘোষণা করছি পৃথিবী ঘুরছে না।"

•ইসলামী সরকারসমূহের জ্ঞান-বিজ্ঞানে পৃষ্ঠপোষকতা :
বদর যুদ্ধে ইসলামের প্রথম বিজয় ও ৭০ জন কাফিরের গ্রেফতারের পর নবী করীম (সাঃ) ঘোষণা করেন যে, যে মুশরিক ১০ জন মুসলিমকে পড়তে ও লিখতে শিখাবে সে আজাদ হতে পারবে। এভাবেই শিক্ষার ব্যাপারে তাঁর আগ্রহ প্রকাশ পায়। পরবর্তী খলিফাগণও জ্ঞান চর্চার এ ধারা অব্যাহত রাখেন।

হিজরি ২১৫ সালে আব্বাসীয় খলিফা মামুন ২০০,০০০ দিনার (প্রায় ৭ মি. ডলার) ব্যয়ে বাগদাদে একটি বিজ্ঞান কেন্দ্র গড়ে তোলেন যার নাম দেন 'বায়তুল হিকমাহ' এর সাথে ছিল একটি জ্যোতির্বিদ্যার মানমন্দির ও গণ-পাঠাগার। তিনি সেখানে বহুসংখ্যক পণ্ডিত ব্যক্তিকে নিয়োগ দিয়ে তাদেরকে বিভিন্ন দেশে পাঠিয়ে বিজ্ঞান, চিকিৎসাশাস্ত্র, দর্শন, গণিত ও সাহিত্যের গ্রন্থাবলি সংগ্রহ করেন, যার পরিমাণ প্রায় ১০০ উটের বোঝা।

গুস্তাব লি বোঁ (gustab le bou) তাঁর 'ইসলাম ও আরবী সভ্যতার ইতিহাস' বইতে লিখেছেন- 'ইউরোপে যখন বই ও পাঠাগার ছিল। সত্যিকার অর্থে বাগদাদের 'বায়তুল হিকমায়' চল্লিশ লক্ষ, কায়রোর সুলতানের পাঠাগারে দশ লক্ষ, সিরিয়ার ত্রিপোলী পাঠাগারে তিরিশ লক্ষ গ্রন্থ ছিল। অপরদিকে মুসলমানদের সময় কেবল স্পেনে প্রতি বছর ৭০ থেকে ৮০ হাজার বই প্রকাশিত হতো।"

ডঃ ম্যাক্স মেয়রহোফ লিখেন-" ইস্তাম্বুলের মসজিদগুলোর জন্য ৮০টি পাঠাগার ছিল। প্রতিটি লাইব্রেরিতে দশ হাজার বই ও প্রাচীন পাণ্ডুলিপি ছিল। দামেস্ক, মসুল, বাগদাদ, ইরান ও ভারতের শহরসমূহে অনুরূপ সমৃদ্ধ লাইব্রেরি আছে।"

ড. ওস্তাব তাঁর বইতে আরও অগ্রসর হয়ে বলেন, "মুসলমানরা কোন শহর অধিকারে নিলে প্রথমেই প্রতিষ্ঠা করতো একটি মসজিদ ও একটি কলেজ। বাগদাদ, কায়রো, this কর্ডোভা ও অন্যান্য স্থানে পরীক্ষাগার, মানমন্দির, বিরাট পাঠাগার ও জ্ঞান সাধনার অন্যান্য সুযোগ সুবিধা সমৃদ্ধ বিখ্যাত সব বিশ্ববিদ্যালয় ছিল। কেবল আন্দালুসিয়ায় তত্ত্ব ছিল ৭০টি গণপাঠাগার। কর্ডোভার আল হাজাম পাঠাগারে ৬০০,০০০ বই ছিল। অথচ চার শতাব্দী পরে চার্লস দি জাস্ট বিবলিওথিক ন্যাশনাল অব প্যারিস শুরু করেন ৯০০ বই দিয়ে যার এক-তৃতীয়াংশই ছিল ধর্মের উপর রচিত।"

পণ্ডিত নেহেরু তার 'A Glimpse at World History' তে লিখেন "কর্ডোভায় ১০ লক্ষের বেশি লোক বাস করতো, যেখানে ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ পাবলিক পার্ক ছিলো, ৪০ কিলোমিটারব্যাপী তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় ৬০০০ প্রাসাদ ও বড় বড় বাড়িঘর; ২০০,০০০ সুন্দর আবাস বাড়ি, দোকানপাট, ৩০০ মসজিদ, ৭০০ হাম্মামখানা (ঠাণ্ডা ও গরম পানির সরবরাহ) ছিল। অসংখ্য পাঠাগার ছিল যার মাঝে রাজকীয় পাঠাগারে ৪০০,০০০ বই ছিল। ইউরোপ ও পশ্চিম এশিয়ায় বিখ্যাত ছিল কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয়। পাশাপাশি সকল দরিদ্রের জন্য শিক্ষার ব্যবস্থা ছিল।"

ড. মরিস বুকাইলি তাঁর গ্রন্থ "The Bible, The Quran and Science"এ উল্লেখ করেন ৮ম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীতে ইসলাম জ্ঞান বিজ্ঞানকে অনেক ঊর্ধ্বে তুলে ধরে। যখন খ্রিস্টীয় জগতে বৈজ্ঞানিক উন্নয়নের উপর নিষেধাজ্ঞা চলছিল তখন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালসমূহে বহু সংখ্যক গবেষণা ও আবিষ্কার সাধিত হয়। কর্ডোভার রাজকীয় পাঠাগারে ৪০০,০০০ বই ছিল। ইবনে রুশদ তখন সেখানে গ্রীক, ভারতীয় ও পারস্য দেশীয় বিজ্ঞানে পাঠদান করতেন। যার কারণে সারা ইউরোপ থেকে পণ্ডিতেরা কর্ডোভায় পড়তে যেতেন যেমন আজকের দুনিয়ার মানুষ তাদের শিক্ষার পরিপূর্ণতার জন্য আমেরিকায় যায়। আমরা আরব সংস্কৃতির কাছে বহুলভাবে ঋণী, গণিত (বীজগণিত একটি আরব আবিষ্কার), জ্যোতির্বিদ্যা, পদার্থবিদ্যা, ভূতত্ত্ব, উদ্ভিদবিদ্যা, চিকিৎসাশাস্ত্র ইত্যাদি এর জন্য। মধ্যযুগের ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রথম বিজ্ঞানকে আন্তর্জাতিক চরিত্র দান করে। এ সময় মানুষ অনেক বেশি ধর্মপ্রাণ ছিলো কিন্তু ইসলামী দুনিয়ায় মানুষকে একই সাথে বিশ্বাসী ও বিজ্ঞানী হতে বাধা দেয়নি। বরং বিজ্ঞান ছিল ধর্মের যমজ ভাই।"

•চিকিৎসা বিজ্ঞান
Dr. Mayerhof তাঁর বই "The Legacy of Islam" এ লিখেন মুসলিম ডাক্তারগণ ক্রুসেড যুদ্ধে আগত মেডিক্যাল এটেনডেন্টদের অগোছালো ও প্রাথমিক পর্যায়ের ব্যবস্থাপনা দেখে হাসতেন। ইউরোপীয়গণ সে সময়ে ইবনে সিনা, জাবির, হাসান বিন হাইসাম বা রাজির বইসমূহের সুবিধা গ্রহণ করতে পারেনি। অবশ্য পরবর্তীতে ল্যাটিন ভাষায় তাদের বইগুলো অনূদিত হয়। এসব অনুবাদ এখনও বর্তমান কিন্তু কোথাও অনুবাদকের নাম নেই। ষোড়শ শতাব্দীতে ইবনে রুশদ (Averroes) ও ইবনে সিনার (Avicenna) বইসমূহ ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ করে ইটালি ও ফ্রান্সের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে পাঠদানের মৌলিক উপাদান হিসাবে ব্যবহার করা হয়।"

একই গ্রন্থের ১১৬ পৃষ্ঠায় তিনি আরও লিখেন "রাজির মৃত্যুর পর ইবনে সিনা রাজিকে গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করেন। চিন্তা, দর্শন ও সাধারণ বিজ্ঞানে তার প্রভাব ছিল অসাধারণ। বিশেষ করে চিকিৎসাবিজ্ঞানে তাঁর অবদান (সমরকন্দের লাইব্রেরিতে প্রাপ্ত গ্যালনের রচনাবলির আরবি অনুবাদ এর ভিত্তিতে গড়ে উঠা) ব্যাপক সাড়া জাগাতে সক্ষম হয়। এছাড়া অন্যান্য চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মাঝে ছিলেন আন্দালুসিয়ার আবুল কায়েস, ইবনে যাহর, ইরানের আব্বাস, মিসরের আলী ইবনে রেজভান, বাগদাদের ইবনে ইসাউ, মসুলের আম্মার, আন্দালুসিয়ার আবু রুশদ। এদের বইয়ের ল্যাটিন অনুবাদ ইউরোপের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য ছিল।

মুসলমানগণ যখন স্পেন জয় করে ইউরোপ তখন কলেরার ব্যাকটেরিয়া সম্পর্কে কিছুই জানতো না। লোকেরা মনে করতো এ রোগটি হচেছ পাপের প্রায়শ্চিত্য স্বরূপ একটি আসমানী আজাব। মুসলিম চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করলেন যে কেবল কলেরা নয় এমনকি প্লেগও একটি সংক্রামক ব্যাধি বই কিছু নয়।"

বলা হয়ে থাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের যখন অস্তিত্ব ছিল না হিপোক্রিটিস তাকে অস্তিত্বে জানেন; যখন তা হারিয়ে যায় গ্যানে তা পুনঃপ্রবর্তন করেন; যখন এ শাস্ত্রটি হযবরল ও এলোমেলো হয়ে যায় আল-রাজি তা পুনর্বিন্যাস করেন এবং এরপরও যখন তা অসম্পূর্ণ রয়ে গেল ইবনে সিনার মহান প্রয়াস তাকে সম্পূর্ণ ও সম্পন্ন করে। Dr. Maverhof এ বিষয়ে লিখেন "ইবনে সিনার বিখ্যাত গ্রন্থ কানুন (The Canoon) চিকিৎসাবিজ্ঞানের মাস্টারপিস হিসাবে এত প্রসিদ্ধি লাভ করে যে পঞ্চদশ খ্রিস্টাব্দের শেষ দিকে এর ১৬টি সংস্করণ মুদ্রিত হয়, যার ১৫টি ল্যাটিন ও ১টি আরবি। বিজ্ঞানের অমূল্য গ্রন্থ হিসাবে ষোড়শ শতাব্দীতে এর শত শত মুদ্রণ হয়। ১৭শ ও ১৮শ শতাব্দীতে এটিই ছিল সর্বাধিক পরিচিত চিকিৎসাগ্রন্থ। এখনও চিকিৎসাশাস্ত্রের অনেক বিষয়ে এ গ্রন্থের সহায়তা নেয়া হয়।" ত্রয়োদশ থেকে সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত প্রায় ৬০০ বছর এ বইটি ছিল ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার চিকিৎসাবিজ্ঞানে একমাত্র মূল টেক্সট।

উইল ডুরান্ট (Will Durant) লিখেন যে মুহাম্মদ ইবনে জাকারিয়া রাজি মুসলিম চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মাঝে অগ্রসর ছিলেন। তিনি দুই শতাধিক গ্রন্থের রচয়িতা যা আজও ব্যাপকভাবে পঠিত হয়। তার বিশেষ অবদান হচ্ছে:

১। "শুটি বসন্ত ও হাম" (Smallpox and Measles): এটি ১৪৯৭ থেকে ১৮৬৬ সালের মাঝে ল্যাটিন ও অন্যান্য ইউরোপীয় ভাষায় ৪০ বার মুদ্রিত হয়। ২। "মহান বিশ্বকোষ" (The Great Encyclopedia): এটি ২০ খণ্ডের বিশাল বিশ্বকোষ যা বর্তমানে দুষ্প্রাপ্য। এই বিশ্বকোষের ৫ খণ্ড ছিলো চক্ষু বিজ্ঞানের উপর। ১২৭৯ সালে এটির ল্যাটিন অনুবাদ হয় এবং কেবলমাত্র ১৫৪২ সালে এর ৫টি সংস্করণ মুদ্রিত হয়। শত বছর ধরে চোখ, চোখের রোগ ও তার চিকিৎসাক্ষেত্রে এ গ্রন্থগুলো প্রধান উৎস হিসাবে বিবেচিত হতো। ১৩৯৪ সালে প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয় তার চিকিৎসাবিজ্ঞান কোর্সের ৯টির ১টি হিসাবে এটিকে গ্রহণ করে। মুসলিম ডাক্তারগণ সার্জারিতেও অনেক দূর এগিয়ে যান। তারা এনেসথেসিয়ার প্রয়োগও করতেন যদিও ধারণা করা হয় এটি সাম্প্রতিক সময়ের আবিষ্কার। রাজির অন্যান্য আবিষ্কারের মাঝে ছিলো- জ্বর রোগে ঠাণ্ডা পানির ব্যবহার, ক্ষত সারানোর ব্যাপারে পারদ ও পশুর ব্যবহার ইত্যাদি।

মুসলিম চিকিৎসাবিজ্ঞানীগণই প্রথম আঙ্গুলের নখ দেখে যক্ষ্মা রোগ নির্ণয়, জন্ডিস রোগের সুচিকিৎসা, ক্ষরণ বন্ধ করার ব্যাপারে ঠাণ্ডা পানির ব্যবহার, কিডনি ও ব্লাডারের পাথর সরানোর জন্য তা ভাঙ্গা, হার্নিয়া রোগের শল্যচিকিৎসা ইত্যাদি বিষয় আবিষ্কার করেন। বিখ্যাত ইসলামী শল্যচিকিৎসক ছিলেন আন্দালুসিয়ার আবুল কাসেম। তিনি বহু সংখ্যক শল্য-যন্ত্রপাতির উদ্ভাবক ও এ বিষয়ের গ্রন্থকার। তাঁর এসব বই ১৮১৬ সাল পর্যন্ত ল্যাটিন ভাষার ব্যাপক সংস্করণে মুদ্রিত হয়।

•ঔষধশাস্ত্র (Pharmacology)
চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই অন্যতম শাখায় মুসলমানদের অবদান অসামান্য। গুস্তাব লি বোঁ লিখেন" টাইফয়েড রোগের চিকিৎসার জন্য ঠাণ্ডা পানির ব্যবহার ইউরোপ যা একবার মুসলমানদের কাছ থেকে গ্রহণ করে ফেলে দিয়েছিলো এবং আবার যা তারা কয়েক শতাব্দী পর সাগ্রহে গ্রহণ করছে- এছাড়াও মুসলমানদের অনেক উদ্ভাবনের কাছে তারা ঋণী। মুসলমানরাই প্রথম রাসায়নিক ঔষধসমূহকে পিল ও মিকশ্চার হিসেবে ব্যবহার শুরু করে যা বর্তমানেও অনেক ক্ষেত্রে প্রচলিত আছে। এসবের অনেকগুলোকেই বর্তমান সময়ের রসায়নবিদগণ নতুন আবিষ্কার বলে চালিয়ে দিতে চান; এর কারণ অবশ্য এসবের ইতিহাস সম্বন্ধে তাদের অজ্ঞতা। মুসলমানদের ডিসপেন্সারিগুলোতে রোগীরা চিকিৎসাপত্র নিয়ে গেলে পর্যাপ্ত ঔষধ পেতো, যেখানে কোন হাসপাতাল সুবিধা ছিল না ডাক্তারগণ তাদের যন্ত্রপাতিসহ রোগীর সেবায় ছুটে যেতেন।" জর্জি যাইদেন (Georgi Zeidan) লিখেন "ইউরোপের আধুনিক ঔষধ বিজ্ঞানীগণ তাদের পেশায় ইতিহাস ঘাটতে গিয়ে দেখেছেন শতবর্ষ আগে মুসলিম ডাক্তারগণ আধুনিক ও কার্যকর উপায় উপাদান ব্যবহার করেছেন: তারা একটি ফার্মাকোলজি বা ঔষধশাস্ত্র গড়ে তোলেন ও জটিল রোগের চিকিৎসা করতে সমর্থ হন এবং আধুনিক মডেলের ফার্মেসি গড়ে তোলেন।

কেবল বাগদাদ শহরে ৬০টি ঔষধালয় থেকে খলিফার খরচে বিনে পয়সায় ঔষধ দেয়া হতো। ইউরোপেও অনেক ঔষধের নামে আরবি, ভারতীয় ও ফার্সী মূলের প্রয়োগ দেখা যায় যেমন- এলকোহল, এলকালি, এলকানের, এপ্রিকোট, আরসেনিক ইত্যাদি।

•হাসপাতাল (Hospital)
জর্জি যাইদেন বর্ণনা করেন "রাসূল (সা.)-এর মৃত্যুর দুইশত বছরের আগেই মক্কা, মদীনাসহ সকল বড় বড় মুসলিম শহরে হাসপাতাল গড়ে ওঠে, আব্বাসীয় গভর্নরগণ তাদের নিজ নিজ এলাকায় শ্রেষ্ঠ হাসপাতাল গড়ে তোলার প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠেন। কেবল বাগদাদেই ছিল ৪টি বড় ও গুরুত্বপূর্ণ হাসপাতাল। তৃতীয় হিজরিতেই গভর্নর আব্দুদ্দৌলা দেই লামী আদুদী হাসপাতাল গড়ে তোলেন, যেখানে ২৪ জন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ছিলেন। তখনকার দিনে এটি ছিল সর্বশ্রেষ্ঠ হাসপাতাল কিন্তু অল্প সময়ের মাঝেই তার চেয়ে ভাল হাসপাতাল তৈরি হয়।

এসব হাসপাতালে রোগীরা ধর্ম-বর্ণ-পেশা নির্বিচারে সমান যত্ন ও সেবা লাভ করতো। বিভিন্ন রোগের জন্য ভিন্ন ভিন্ন ওয়ার্ড ছিলো। এসব হাসপাতালে ছাত্ররা তত্ত্বের পাশাপাশি রোগী পর্যবেক্ষণ করতো। তাছাড়া কতিপয় ভ্রাম্যমাণ হাসপাতাল ছিল যেসবের ডাক্তার ও যন্ত্রপাতি বিভিন্ন জেলায় নিয়ে যাওয়া হতো। সেলজুকি সুলতান মাহমুদ এর সাথে এমন একটি ভ্রাম্যমাণ হাসপাতাল ছিল যা বহন করে নিতে ৪০টি উট লাগতো। ডঃ গুস্তাবলি বোঁ লিখেন "মুসলিম হাসপাতালসমূহে প্রতিষেধক ঔষধ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার এমন উন্নত ব্যবস্থা ছিলো যে সেখানে মৃতদের ছাড়া সবারই রোগ আরোগ্য হতো। সেখানে আলো বাতাসের প্রাচুর্য ও প্রবহমান পানির সুব্যবস্থা থাকতো। সুলতান মুহাম্মদ বিন জাকারিয়া রাজিকে বাগদাদের উপকণ্ঠে সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর স্থান খুঁজে বের করার নির্দেশ দিলে তিনি বহু পরীক্ষা করে ব্যাকটেরিয়ামুক্ত স্থান বাছাই করেন। এসব হাসপাতালে বড় সাধারণ ওয়ার্ড এবং ব্যক্তিদের জন্য পাইভেট ওয়ার্ডের ব্যবস্থা ছিল। ছাত্ররা এখানে রোগ নির্ণয়, পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতা অর্জন করতো। এছাড়া ছিল বিশেষ ধরনের মানসিক হাসপাতাল এবং বিনামূল্যে ঔষধ বিতরণের জন্য ঔষধালয়।"

মার্ক ক্যাপ (Mark Kapp) লিখছেন, "কায়রোতে একটি বড় হাসপাতাল ছিল যেখানে জীবন্ত ঝর্না ছিল, বিশাল ফুলের বাগান ছিল এবং ৪০টির বেশি উঠোন ছিলো। সেখানে রোগীদের সাদরে গ্রহণ করা হতো ও সুস্থ হয়ে গেলে ৫টি স্বর্ণমুদ্রাসহ তাকে ফেরত পাঠানো হতো তার ঘরে। সে সময়ে কর্ডোভা নগরীতে ৬০০ মসজিদ, ৯০০ গণশৌচাগার (হাম্মাম) এর পাশাপাশি ৫০টি হাসপাতাল ছিল।"

মুসলমানরা যখন এসব সুউচচ ও প্রসারিত হাম্মামখানায় সাবান ও সুগন্ধি ব্যবহার করতো, প্রবহমান পানিতে গোসল করতো আধুনিক আমেরিকা তখন জঙ্গল আর গুহা থেকে বেরোয়নি, শিখেনি কিভাবে গোসল করতে হয়। ইউরোপ তখন সভ্যতা, সংস্কৃতির জন্য অক্সফোর্ড ছেড়ে কার্ডোভার দিকে ছুটছিলো।

•রসায়নশাস্ত্র
ইমাম জাফর সাদিকের শিষ্য জাবির ইবনে হাইয়্যান 'রসায়নশাস্ত্রের জনক' হিসেবে বিশ্বখ্যাতি অর্জন করেন। তিনি আরব রসায়নশাস্ত্রের জনক। পশ্চিমা রসায়নশাস্ত্র ও আলেকেমির উপর তার প্রভাব হিলো ব্যাপক ও দীর্ঘস্থায়ী। তাঁর কয়েকশত অবদান সর্বজন স্বীকৃত এবং এখনও টিকে আছে। সাবেক ইরাকী শিক্ষামন্ত্রী মরহুম সৈয়দ হেবাতউদ্দিন শাহরিস্তানী লিখেন, "আমি জাবিরের ৫০টিরও বেশি গবেষণাপত্র দেখতে পাই যা তার শিক্ষক ইমাম জাফরকে উৎসর্গ করা। তাঁর ৫০০টি গবেষণাকর্ম মুদ্রিত অবস্থায় প্যারিস ও বার্লিনের জাতীয় পাঠাগারে পাওয়া যায়। ইউরোপের জ্ঞানীরা তাঁকে আদর করে ডাকে 'বুদ্ধিমত্তার অধ্যাপক' (Wisdoms Professor) এবং তারা স্বীকার করে যে তিনি ১৯টি মৌলিক পদার্থের আবিষ্কারক। জাবের বলেন যে কোন বস্তুকে আলো ও আগুনের সাহায্যে এমন অণুতে পরিণত করা সম্ভব যা বস্তুর অদৃশ্যমান ক্ষুদ্রতম ইউনিট। জাবের এর এ তত্ত্বটি আধুনিক পারমাণবিক বিজ্ঞানের অতি নিকটবর্তী।" নাদিম রচিত ফিহরিস্ত ও অন্যান্য তালিকায় জাবির রচিত রসায়ন গ্রন্থের পরিমাণ ২৭৭ খানা যার পৃষ্ঠা সংখ্যা ২৬৭০। তার গ্রন্থের পৃষ্ঠা সংখ্যা ২ থেকে ১০০-র মধ্যে সীমাবদ্ধ। দুই বা দেড় পৃষ্ঠার এসব বই এক একটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব। তাঁর চিকিৎসা সংক্রান্ত বই ৫০০, জ্যোতির্বিজ্ঞান সংক্রান্ত ১, দার্শনিকের যুক্তি খণ্ডনের বই ৫০০ ইত্যাদি।

জাবির ইবনে হাইয়ান রসায়নের শুদ্ধতম ভিত্তি রচনা করেন। তিনি হাতে কলমে পরীক্ষামূলক কাজের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণের উপর জোর দেন। কিতাবুত তাজ, কিতাবুল মাওয়াজিন, কিতাবুর রাহমাস্স্সাগির, কিতাবুল খাওয়াস ও কিতাবুল হুদুদে তিনি এ বিষয়ে তাঁর মত ব্যক্ত করেন।

রসায়নশাস্ত্রের যেসব প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরীক্ষা চালাতে হয় তিনি সেসব রপ্ত করেন ও নিজের আবিষ্কৃত পরীক্ষা প্রক্রিয়াসমূহের সাথে মিলিয়ে এসবের উন্নয়ন করেন। তিনি পাতন, ঊর্ধ্বপাতন, পরিস্রাবণ, দ্রবণ, কেলাসন, ভষ্মীকরণ, গলান, বাষ্পীভবন প্রভৃতি রাসায়নিক প্রক্রিয়াগুলোর উপর বিশদ লেখালেখি করেন। এসব প্রক্রিয়ার ব্যাপারে তাঁর বর্ণনা ছিল বৈজ্ঞানিকভাবে বিশুদ্ধ ত্রুটিমুক্ত।

জাবির টিন, সীসা, তামা, লৌহ, স্বর্ণ, রৌপ্য ইত্যাদি তৈরির পন্থা আবিষ্কার করেন। তার ব্যবহারিক ও ফলিত রসায়নের মাঝে ইস্পাত তৈরি করার পন্থা, কাপড় ও চামড়া রং করার প্রণালী, লোহা এবং ওয়াটার প্রুফ কাপড়ের বার্নিস করার উপায়, কাচ তৈরি করার জন্য ম্যাঙ্গানিজ ডাই-অক্সাইডের ব্যবহার, সোনার জলে নাম লিখাবার জন্য লৌহের ব্যবহার ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। বস্তুর রং করা, খনিজ দ্রব্য ও ধাতব পদার্থের উৎপাদন ইস্পাত প্রস্তুতি ট্যানিং ইত্যাদি কারখানা কৌশল মুসলমানরাই প্রথম আবিষ্কার করে। তারাই নাইট্রিক এসিড, সালফিউরিক এসিড, নাইট্রো গ্লিসারিন, হাইড্রোক্লোরিক এসিড, পটাশিয়াম, একুয়া নাইট্রেট, এলকোহল, এলকালি অরপিমেন্ট, অরপিসেন্ট ইত্যাদি আবিষ্কার করেন। বোরাক্সও তাদের আবিষ্কার।

আব্বাসীয় খলিফাদের যুগে পাতন, বাষ্পীকরণ, পরিস্রাবণ প্রক্রিয়া এবং সোডিয়াম, কার্বন, পটাসিয়াম কারবোনেট, ক্লোরাইড ও এমোনিয়ার ব্যাপক ব্যবহার ছিল।

•পদার্থ বিজ্ঞান
ইবন আল হাইসাম (আল হাজেন, ৯৬৫-১০৩৯ খ্রিস্টাব্দে) ছিলেন সর্বকালের একজন শ্রেষ্ঠ পদার্থবিজ্ঞানী। তিনি পদার্থ বিজ্ঞানে উন্নত পর্যায়ের পরীক্ষামূলক অবদান রাখেন। প্রফেসর আব্দুস সালামের মতে, "তিনিই প্রথম বলেন যে আলোক রশ্মি কোন মাধ্যম অতিক্রম করার সময় সহজ ও দ্রুততর পথ বেছে নেয়। এভাবে তিনি বহু শতাব্দী আগেই ফারমেটস্ এর সর্বনিম্ন সময় তত্ত্ব (Principle of Least time) অনুরূপ তত্ত্ব প্রদান করেন।

তিনি সর্বপ্রথম জড়তা তত্ত্ব (Law of Inertia) প্রদান করেন যা পরবর্তীতে Newton এর 'ল অব মোশন' হিসেবে খ্যাতি লাভ করে। তিনিই প্রথম আলোর প্রতিসরণের তত্ত্ব প্রদান করেন যা পরবর্তীতে নিউটনের হাতে পুনরাবিষ্কৃত ও বিস্তৃতি লাভ করে।"

পশ্চিমা পরীক্ষামূলক বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান বিশাল, বিরাট। তাঁর সমসাময়িক আল বেরুনীর সহযোগিতায় তিনি বিজ্ঞান, পদার্থবিদ্যা ও জ্যোতির্বিদ্যায় পরীক্ষামূলক পদ্ধতির প্রবর্তন করেন। আধুনিক ইউরোপের শিক্ষা ও বিজ্ঞানের অবিসংবাদিত পথিকৃৎ রজার বেকন এর আকাশচুম্বী সৃষ্টি (Opus Majus এর পঞ্চম অধ্যায় বাস্তবিক অর্থে ইবনে আল হাইসামের আল মানাজির (Optics) এর নকলমাত্র। যদিও পশ্চিমা বিশ্ব তা স্বীকার করে না।

আল বিরুনী (৯৭৩ - ১০৪৮ খ্রিঃ) ভারত ও আফগানিস্তানে অনেক কাজ করেন। বহু পূর্বেই তিনি প্রকৃতির আইন আবিষ্কার করেন। তিনি বলেন, পদার্থবিদ্যার যে বিধান পৃথিবীতে ক্রিয়াশীল। আকাশের কক্ষপথসমূহেও ক্রিয়াশীল। মুসলিম পদার্থ বিজ্ঞানী আবুল হাসান সর্বপ্রথম দূরবীক্ষণ যন্ত্র আবিষ্কার করেন, গ্যালিলিও তার উন্নত সংস্করণ তৈরি করেন মাত্র। অথচ বর্তমান বিশ্ব জানে গ্যালিলিওই দূরবীক্ষণ যন্ত্রের আবিষ্কারক। ইবনুল হাইসাম তাঁর গ্রন্থ মাকালাতু ফি মারাকাজুল আস্কাল' গ্রন্থে বস্তুর পরস্পরের আকর্ষণের কথা উল্লেখ করেছেন। দ্বাদশ শতাব্দীর কবি ও দার্শনিক মাওলানা রুমি কবিতায় মাধ্যাকর্ষণ তত্ত্বের ধারণা দেন। সম্ভবতঃ সেই পথ ধরে পরবর্তীতে স্যার আইজ্যাক নিউটন এ বিষয়ক একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা ও তত্ত্ব দাঁড় করান।

•শিল্প কারখানা
আব্বাসীয় খলিফা হারুন-অর-রশীদ এইক্সের চারলেম্যানের কাছে বাগদাদ থেকে একটা ঘড়ি পাঠান উপঢৌকন হিসেবে যা ঘণ্টায় ঘণ্টায় বেজে উঠতো। এটি দেখে সদ্য সিংহাসনে আসীন রোমান শাসক ও তার সভাসদগণ চমৎকৃত ও আনন্দিত হলেন। আন্দালুসিয়ায় খ্রিস্টানদের ধ্বংসলীলার ফলে মুসলিম শাকসকদের সময়কার বড় বড় কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যায় এবং বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, কলা, কৃষ্টি ও সভ্যতার অন্যান্য উপাদানে স্থবিরতা নেমে আসে। দক্ষ রাজমিস্ত্রিদের অভাবে শহরের অবকাঠামো নষ্ট হয়ে যেতে লাগলো। মাদ্রিদের জনসংখ্যা ৪ লাখ থেকে ২ লাখে নেমে এলো। যে সেভাইলে ১৬০০ শিল্পকারখানা ছিল সেখানে ৩০০ কারখানা টিকলো এবং ১,৩০,০০০ শ্রমিক চাকরি হারালো অথচ জনসংখ্যা তখন ৭৫% কমে গেছে। মুসলমানরাই প্রাচীন চর্ম-কাগজের পরিবর্তে তুলার তৈরি কাগজের প্রচলন করে এবং এতে করেই ইউরোপে মুদ্রণ শিল্পের বিকাশ হলো। অবশ্য মুদ্রণ পদ্ধতি আসে প্রাচীন চীন থেকে। এ থেকেই বই পুস্তুক এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের রেনেসাঁর সূচনা হয়। কাগজ আবিষ্কারের ফলেই প্রাচীন ধর্মীয় গ্রন্থরাজির পুনর্লেখন সম্ভব হলো।

ফিলিপ হিট্টি (Philop Hitti) তাঁর History of the Arabs এ লিখেন 'সড়ক তৈরির প্রযুক্তি মুসলমানদের হাতে এতটা উন্নত হয় যে কর্ডোভায় মাইলের পর মাইল পাকা সড়ক ছিল যার দুপাশে রাতে বাতি জ্বলতো যাতে লোকেরা নিরাপদে পথ চলতে পারে, অথচ সেই একই সময়ে লন্ডন বা প্যারিসের পথে বৃষ্টিস্নাত রাতে বের হলে হাঁটু পর্যন্ত জলমগ্ন ও কর্দমাক্ত হতে হতো। এ অবস্থা কর্ডোভায় পাকা রাস্তা আসার সাতশত বছর পরও ছিলো। অক্সফোর্ডের লোকেরা তখন মনে করতো গোসল করা একটা অপকর্ম যখন কর্ডোভার ছাত্রগণ বিলাস-বহুল হাম্মামখানা ব্যবহার করতো।

•অঙ্কশাস্ত্র
আধুনিক বিজ্ঞানে অঙ্ককে বলা হয় মা। কম্পিউটার এর আবিষ্কার ও এর উন্নতি কেবলই অঙ্কনির্ভর। Legacy of Islam গ্রন্থের 'Astronomy and Mathematics অধ্যায়ে Baron Carra de Vaus বলেন, "এলজেবরা হচেছ আরবি আলজবর কথাটির ল্যাটিনরূপ। আল জবর অর্থ শক্তি, ভাগ্য বা অসংগতি। এটিকে এক কথায় সংক্ষিপ্তকরণ বলা যায়। এটি বর্ণের পরিবর্তে সংখ্যা বা সংখ্যার পরিবর্তে বর্ণের ব্যবহার। কুরআনে ব্যবহৃত হরুফে 'মুকাত্তায়াতি' এর মতো এর প্রয়োগ। অংকের ভাষায় এটি ভগ্নাংশকে পূর্ণসংখ্যায় রূপান্তর করা; জটিল সংখ্যাকে সহজতর ভাষা বা সংকেতে উপস্থাপন করা। বিজ্ঞান আজ যেসব সংখ্যা ব্যবহার করছে তা আরবি সংখ্যা। বর্তমানে ব্যবহৃত কম্পিউটার প্রযুক্তির মূল ভিত্তি হচেছ হিন্দু প্রতীক থেকে '৩' বা শূন্যের যে মূল্যমান আরবরা গ্রহণ করেছে তা। '০' বা Zero এর নিকটতম শব্দ Chiper যা কিনা আরবি ka sefr এর প্রতিলিপিকরণ বই নয়।" De vaux আরো লিখেন: Chiper ব্যবহার করে আরবগণ নিত্যব্যবহার্য গণিতের পথপ্রদর্শক হন। তারা বীজগণিতকে একটি প্রকৃত বিজ্ঞানে রূপ দেন ও উন্নয়ন ঘটান, তারাই বিশ্লেষণাত্মক জ্যামিতির ভিত্তি রচনা করেন, তারাই ত্রিকোণমিতির একমাত্র স্থপতি। এলগোরিদম কথাটি আসে এর আবিষ্কারক খিত্ এর বাসিন্দা আল খারেজমির নাম থেকে। আরবগণ বিজ্ঞানের উৎকর্ষতার চরম পর্যায়ে যখন, তখন ইউরোপ চরম বর্বরতায় নিমজ্জিত ছিল। "আল খারেজমী প্রথম আলজাবর ওয়াল মোকাবিলা পদ্ধতির ব্যবহার করতে থাকেন। বস্তুর সংখ্যাতাত্ত্বিক পরিমাপ ও কঠিন বস্তুর এবস্ট্রাকট ফরমুলেশানের নিয়ম (হাদ্দ বা তাহদিদ) তিনি প্রণয়ন করেন। খারেজমী মনে করতেন বিজ্ঞান ও দর্শনের মূল শক্তি হচেছ গণিত। সূক্ষ ও বিশুদ্ধ গণনার জন্য বর্তমানে ব্যবহৃত প্রক্ষেপণ নীতি The formula of interpolation কে নিউটনের আবিষ্কার বলে চালালেও তাঁর জন্মের বহু পূর্বে আলবেরুনী শুধু একে আবিষ্কারই করেননি তিনি একে ব্যবহার করে সাইন (Sine) তালিকা প্রণয়ন করেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানে পৃথিবীর আকার, পরিধি ইত্যাদি বিষয়ে যে আলোচনার অবতারণা হয় তাতে সর্বশেষ অবদান রাখেন মুসলিম বিজ্ঞানী বনি মুসা ভ্রাতৃদ্বয় এবং আলবেরুনী। আলবেরুনীর কানুনে মাসউদীর ৪র্থ খণ্ডে প্রধানত জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্বন্ধে আলোচনা হয়েছে। তিনি দ্রাঘিমা, অক্ষরেখা, সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত, দিক নির্ণয়, গ্রহ-নক্ষত্রাদির অবস্থানজ্ঞাপক সংজ্ঞা নির্দেশ করার সহজ বিজ্ঞানসম্মত উপায় নির্ধারণ করেন। জ্যোতির্বিদগণের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আবিষ্কারক আল বাত্তানীও একজন মুসলিম। স্থানাঙ্কের যেকোন ২টি বিষয়ে জানতে পারলে অন্যগুলি নির্ধারণের যে সহজ ফর্মুলা আলবেরুনী দিয়েছেন তা সত্যিই বিস্ময়কর।

আবু রায়হান বিরনী তাঁর কিতাবুত তাফহিম ফি সানয়াতে তানজিম গ্রন্থে লিখেছেন, "যে ব্যক্তি ৪টি বিজ্ঞানে পারদর্শিতা লাভ না করেছে তাকে জ্যোতিষী বলা যেতে পারে না। এ ৪টি বিজ্ঞান হলো- অঙ্কশাস্ত্র (Mathematics), গণিত (Arithmetic), বিশ্ব গঠনতন্ত্র (Cosmography), বিধিবদ্ধ আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত জ্যোতিষী (Judicial Astrology)। আলবিরুনী ছিলেন সর্ববিচারে একজন সার্থক জ্যোতিষী ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী।"

নভোমণ্ডলী, নভোবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিদ্যা, স্থানের অবস্থান, শহর নগরের আয়তন ইত্যাদি সম্বন্ধীয় সাধারণ গণনা সম্পর্কীয় গ্রন্থ: আলোর গতি সম্পর্কীয় গ্রন্থ: এস্ট্রোল্যাব সহযন্ত্রাদি ও সে সবের ব্যবহার সম্পর্কিত গ্রন্থ, কাল ও সময় সম্পর্কিত গ্রন্থ; উল্কা ও কুজঝটিকা বিষয়ক, জ্যোতির্বিজ্ঞানবিষয়ক গ্রন্থ শিরোনামে তাঁর ৭৯টিরও বেশি বৈজ্ঞানিক গ্রন্থাদি রয়েছে।

আমরা যাকে কেবল রুবাইয়াতের কবি হিসেবে চিনি সেই ওমর খৈয়াম ছিলেন একজন বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক ও অঙ্কশাস্ত্রের পণ্ডিত। নিউটনের বহু আগে তিনি আবিষ্কার করেন "বাইনোমিয়াল থিউরাম।" এ পদ্ধতিতে তিনি সূর্যের চারিদিকের পৃথিবীর সময় মান ঠিক করে জালালি ক্যালেন্ডার প্রণয়ন করেন।

•ভূগোল
প্রথম কয়েক শতাব্দীর মাঝেই আরব মুসলিমগণ ইসলামের সুমহান বাণী ছড়িয়ে দেন মরক্কো থেকে মিন্দানাও পর্যন্ত। আরব্য রজনীর সিন্দাবাদকে আমরা দেখি চীন, জাপান আর ইন্দোনেশিয়ান দারুচিনি দ্বীপের দেশে ঘুরতে। তাতেই মনে হচেছ আরবরা আগে থেকেই ভূগোল, ভূবিদ্যা ইত্যাদিতে পারদর্শী ছিলো।

কিন্তু দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পাশাপাশি আরব নাবিকগণ আফ্রিকার পূর্বতীর থেকে রাশিয়ার দূরবর্তী এলাকা পর্যন্ত কৃষ্ণ সাগর পাড়ি দিয়ে পৌঁছে যান। আফ্রিকান মুসলমানগণ কলম্বাসের বহু আগেই আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে আমেরিকা পৌঁছায়। ভারতে আসার সমুদ্র পথও প্রথম আবিষ্কার করেন জ্যোতির্বিদ্যা, জাহাজ পরিচালনা বিজ্ঞান, মহাসাগরের বৈজ্ঞানিক বর্ণনাকারী এবং সাগরের প্রাণী সম্পর্কে বহু গ্রন্থের প্রণেতা মুসলিম বিজ্ঞানী আহমদ বিন মজীদ।

বিখ্যাত মুসলিম ভূগোলবিদ ইবনে হক্কাল (৯৭৫ খ্রিঃ) তার গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছেন, "আমি এই পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানের দ্রাঘিমা, অক্ষরেখা ও অক্ষাংশ সম্বন্ধে লিখেছি, এর সকল দেশ, সকল সীমানা এবং ইসলামী রাষ্ট্রসমূহ সম্পর্কে লিখেছি। আমি এসবের মানচিত্র এঁকেছি সযত্ন প্রয়াসে এবং সেখানে শহরসমূহ, নদীসমূহ, হ্রদ, ফসলাদি, কৃষ্টির ধরন, রাস্তাঘাট, একস্থান থেকে অন্যস্থানের দূরত্ব, বাণিজ্যিক দ্রব্যসমূহ এবং এ জাতীয় অন্যান্য বিষয় যা রাজন্যবর্গ ও তাদের সহযোগী ও সাধারণ মানুষের কাজে লাগতে পারে তা নির্দেশ করেছি। সম্ভবতঃ এটিই পৃথিবীর সর্বপ্রথম সম্পূর্ণ মানচিত্র। মুসলিম পরিব্রাজক আবু রায়হান আল বিরুনী, ইবনে বতুতা ও আবুল হোসাইন ঐসব লোকদের মাঝে অনন্য যারা ভূবিদ্যার ইতিহাস রচনার জন্য কষ্টকর অভিযাত্রা আর অসাধারণ পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত তথ্যাদি রেখে গেছেন। বিজ্ঞানের দ্বিগ্বিদিক জয়যাত্রায় তাদের অবদানকে খাটো করে দেখার কোন অবকাশ নেই।

••হায় অতীত! সোনালি অতীত!
উপরের সংক্ষিপ্ত আলোচনা যেকোন মুসলিম তরুণের হৃদয়ে একটি নতুন ভাবনার জন্ম দেবে। কি সুন্দর, গৌরবময় ঐতিহ্যশালী আমাদের অতীত। পৃথিবীর জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নতির ইতিহাসে কি স্বর্ণোজ্জ্বল আমাদের অবদান! কিন্তু এ যে কেবলই অতীত। বিগত কয়েকশত বছর পর্যন্ত বিজ্ঞানে কোন উল্লেখযোগ্য অবদান আমাদের নেই। আমরা কি কেবলই অতীতের স্মৃতিচারণ করে জাবর কাটবো? না; কক্ষণোই নয়।
আজ প্রতিটি মুসলিম তরুণকে বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাওয়া মুসলিম ইতিহাসের পাতায় চোখ ফেলতে হবে। পাশ্চাত্য অরিয়েন্টালিস্ট পণ্ডিতদের ষড়যন্ত্রের কবলে পড়ে আমাদের ইতিহাস ও পণ্ডিতবর্গের নামের যে বিপুল বিকৃতি ঘটেছে তার হাত থেকে উদ্ধার করতে হবে প্রকৃত সত্য। আর তা ছড়িয়ে দিতে হবে সর্বত্র।
আফসোস আর হতাশার কৃষ্ণ-পর্বতে উদ্‌ভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়াবার কোন অবকাশ আমাদের নেই। এখন সময় সিদ্ধান্তের। নতুন যুগের আলবেরুনী, খারেজমী, জাবির ইবনে হাইয়ানদের এগিয়ে আসার দিন।

উঠুন, জেগে উঠুন, অন্ততঃ রজার বেকনের মতো জেগে উঠুন। অক্সফোর্ডের ছাত্র রজার বেকন কর্ডোভায় গিয়ে মুসলিম জ্ঞান-বিজ্ঞান ও মনীষার সংস্পর্শে থেকে সব উপকরণ বগলদাবা করে যদি নব্য ইউরোপের রেনেসাঁর জন্ম দিতে পারে, বিশ্বের ১৩০ কোটি মুসলমানের মাঝে কি এমন একজনও নেই যে আবার ফিরিয়ে আনবে আমাদের সোনালি অতীত?

লেখক:
ড. আ জ ম ওবায়েদুল্লাহ
সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি 
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির 


•গ্রন্থ নির্দেশনা :
1. Western Civilisation through Muslim Eyes; Sayid Mujtaba Rukni Musawilari, 1978 Iran.
2. Origin And Development of Experimental science; Dr. Muin-Ud-Din Ahmad Khan; BIIT, 1998.
3. Classification of Sciences in Islamic Thought; Al Najjar; AJISS; volume 13, Number-1 Washington DC. 1996. (প্রবন্ধ)
4. আলবেরুনী; এম আকবর আলী ই. ফা. বা প্রকাশনা; ১৯৮২.
5. জাবির ইবনে হাইয়ান; এম. আকবর আলী ই, ফা, বা প্রকাশনা; ১৯৮২।