Close
Showing posts with label দারসুল কোরআন. Show all posts
Showing posts with label দারসুল কোরআন. Show all posts

Tuesday, August 20, 2024

দারসুল কুরআন || সুরা লুকমান ১২ থেকে ১৯ নং আয়াত || লোকমান হাকীমের উপদেশবলী

দারসুল কুরআন || সুরা লুকমান ১২ থেকে ১৯ নং আয়াত || লোকমান হাকীমের উপদেশবলী

•আরবী ইবারত:

[১২]وَ لَقَدْ اٰتَیْنَا لُقْمٰنَ الْحِكْمَةَ اَنِ اشْكُرْ لِلّٰهِ١ؕ وَ مَنْ یَّشْكُرْ فَاِنَّمَا یَشْكُرُ لِنَفْسِهٖ١ۚ وَ مَنْ كَفَرَ فَاِنَّ اللّٰهَ غَنِیٌّ حَمِیْدٌ-

[১৩]وَإِذْ قَالَ لُقْمَانُ لابْنِهِ وَهُوَ يَعِظُهُ يَا بُنَيَّ لا تُشْرِكْ بِاللَّهِ إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ

[১৪]وَوَصَّيْنَا الإِنسَانَ بِوَالِدَيْهِ حَمَلَتْهُ أُمُّهُ وَهْناً عَلَى وَهْنٍ وَفِصَالُهُ فِي عَامَيْنِ أَنْ اشْكُرْ لِي وَلِوَالِدَيْكَ إِلَيَّ الْمَصِيرُ

[১৫]وَإِنْ جَاهَدَاكَ عَلى أَنْ تُشْرِكَ بِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلا تُطِعْهُمَا وَصَاحِبْهُمَا فِي الدُّنْيَا مَعْرُوفاً وَاتَّبِعْ سَبِيلَ مَنْ أَنَابَ إِلَيَّ ثُمَّ إِلَيَّ مَرْجِعُكُمْ فَأُنَبِّئُكُمْ بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ

[১৬]يَا بُنَيَّ إِنَّهَا إِنْ تَكُ مِثْقَالَ حَبَّةٍ مِنْ خَرْدَلٍ فَتَكُنْ فِي صَخْرَةٍ أَوْ فِي السَّمَوَاتِ أَوْ فِي الأَرْضِ يَأْتِ بِهَا اللَّهُ إِنَّ اللَّهَ لَطِيفٌ خَبِيرٌ

[১৭]يَا بُنَيَّ أَقِمْ الصَّلاةَ وَأْمُرْ بِالْمَعْرُوفِ وَانْهَ عَنْ الْمُنكَرِ وَاصْبِرْ عَلَى مَا أَصَابَكَ إِنَّ ذَلِكَ مِنْ عَزْمِ الأُمُورِ

[১৮]وَلا تُصَعِّرْ خَدَّكَ لِلنَّاسِ وَلا تَمْشِ فِي الأَرْضِ مَرَحاً إِنَّ اللَّهَ لا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ

[১৯]وَاقْصِدْ فِي مَشْيِكَ وَاغْضُضْ مِنْ صَوْتِكَ إِنَّ أَنكَرَ الأَصْوَاتِ لَصَوْتُ الْحَمِيرِ


বাংলা অনুবাদঃ

১২) আমি লুকমানকে দান করেছিলাম প্রজ্ঞা, যাতে সে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হয় ৷ যে ব্যক্তি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে তার কৃতজ্ঞতা হবে তার নিজেরই জন্য লাভজনক৷ আর যে ব্যক্তি কুফরী করবে, (জেনে রেখ)সে ক্ষেত্রে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ অমুখাপেক্ষী এবং নিজে নিজেই প্রশংসিত ৷

১৩) (স্মরণ করো) যখন লুকমান নিজের ছেলেকে উপদেশছলে বললো, “ হে পুত্র ! আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করো না৷ নিশ্চয়ই শিরক খুব মারাত্মক অন্যায়৷

১৪) আর প্রকৃতপক্ষে আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের জোর তাকিদ করেছি৷ তার মা কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে তাকে আপন গর্ভে ধারণ করে এবং দু’বছর লাগে তার দুধ ছাড়তে৷ (এ জন্য আমি তাকে উপদেশ দিয়েছি) আমার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো এবং নিজের পিতা-মাতার প্রতিও, (কেননা)আমার দিকেই তোমাকে ফিরে আসতে হবে৷

১৫) কিন্তু যদি তারা তোমার প্রতি আমার সাথে এমন কাউকে শরীক করার জন্য চাপ দেয় যার সম্পর্কে তুমি জানো না, তাহলে তুমি তাদের কথা কখনোই মেনে নিয়ো না৷ তবুও দুনিয়ায় তাদের সাথে সদ্ভাবে সহাবস্থান করতে থাকো। বরং মেনে চলো সে ব্যক্তির পথ যে আমার দিকে ফিরে এসেছে৷ তারপর তোমাদের সবাইকে ফিরে আসতে হবে আমারই দিকে৷ সে সময় তোমরা কেমন কাজ করছিলে তখন তা আমি তোমাদেরকে জানিয়ে দেবো৷

১৬) (আর লুকমান বলেছিল ) “ হে পুত্র! কোন জিনিস যদি সরিষার দানা পরিমাণও হয় এবং তা লুকিয়ে থাকে পাথরের মধ্যে , আকাশে বা যমিনের মধ্যে কোথাও , তাহলে আল্লাহ তাো বের করে নিয়ে আসবেন৷ কারণ তিনি সূক্ষ্মদর্শী এবং সবকিছু জানেন৷

১৭) হে পুত্র! নামায কায়েম করো, সৎকাজের হুকুম দাও, খারাপ কাজে নিষেধ করো এবং যত বিপদই আসুক সে জন্য সবর করো৷ একথাগুলোর জন্য অবশ্যই জোর তাকিদ করা হয়েছে৷

১৮) আর অহঙ্কারবশে মানুষকে অবজ্ঞা করোনা, পৃথিবীর বুকে উদ্ধত ভঙ্গিতে চলো না, আল্লাহ কোন দাম্ভিক ও অহংকারীকে পছন্দ করেন না৷

১৯) নিজের চালচলনে ভারসাম্য আনো এবং কণ্ঠস্বর নীচু করো৷ নিঃসন্দেহে গাধার আওয়াজই সব আওয়াজের মধ্যে সবচেয়ে অপ্রীতিকর৷


সূরা পরিচিতিঃ
-সুরা লোকমান
-মক্বী সূরা
-৩১ নং সূরা
-আয়াত সংখ্যা ৩৪
-রুকু সংখ্যা ৪
-পারা ২১

নামকরণঃ
এই সূরার দ্বিতীয় রুকুর ১২ নম্বর আয়াতে وَلَقَدْ آتَيْنَا لُقْمْنَ الْحِكْمَةَ হতে 'সূরা লুকমান' রাখা হয়েছে। এই সূরার দ্বিতীয় রুকুতে নিজে পুত্রের প্রতি লুকমান হাকীমের নসীহত ও উপদেশ সমূহের উল্লেখ করা হয়েছে। এই সম্পর্কের কারণেই এই সূরার নামকরণ করা হয়েছে 'লুকমান'।

•নাযিলের সময়কালঃ
অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে, সূরা লুক্বমান অবতীর্ণ হয়েছিল মক্বী যুগে সূরা আনকাবূতের আগে। এ সূরার বিষয়বস্তু সম্পর্কে চিন্তা করলে পরিষ্কার বুঝা যায়, এটি এমন সময় নাযিল হয় যখন ইসলামের দাওয়াতের কণ্ঠরোধ এবং তার অগ্রগতির পথরোধ করার জন্য জুলুম-নিপীড়নের সূচনা হয়ে গিয়েছিল এবং এ জন্য বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করা হচ্ছিল। কিন্তু তখনও বিরোধিতা তোড়জোড় ষোলকলায় পূর্ণ হয়নি। ১৪ ও ১৫ আয়াত থেকে এর আভাস পাওয়া যায়। সেখানে নতুন ইসলাম গ্রহণকারী যুবকদের বলা হয়েছে , পিতা-মাতার অধিকার যথার্থই আল্লাহর পরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু তারা যদি তোমাদের ইসলাম গ্রহণ করার পথে বাধা দেয় এবং শিরকের দিকে ফিরে যেতে বাধ্য করে তাহলে তাদের কথা কখনোই মেনে নেবে না। একথাটাই সূরা আনকাবুতেও বলা হয়েছে। এ থেকে জানা যায় যে, দুটি সূরাই একই সময় নাযিল হয়। কিন্তু উভয় সূরার বর্ণনা রীতি ও বিষয়বস্তুর কথা চিন্তা করলে অনুমান করা যায় সূরা লোকমান প্রথমে নাযিল হয়। কারণ এর পশ্চাতভূমে কোন তীব্র আকারের বিরোধিতার চিহ্ন পাওয়া যায় না। বিপরীত পক্ষে সূরা আনকাবুত পড়লে মনে হবে তার নাযিলের সময় মুসলমানদের ওপর কঠোর জুলুম নিপীড়ন চলছিল।

বিষয়বস্তু ও মূল বক্তব্যঃ
সূরা লুক্বমানের কেন্দ্রীয় আলোচ্য বিষয় হল আল্লাহ্‌র একত্ববাদ।
সত্যের পথ থেকে দূরে সরে যাওয়া মানুষের মনের সকল প্রশ্নের জবাব নিয়ে এ সূরা অবতীর্ণ হয়েছে। এ সূরায় লোকদের বুঝানো হয়েছে , শিরকের অসারতা ও অযৌক্তিকতা এবং তাওহীদের সত্যতা ও যৌক্তিকতা। এই সঙ্গে আহ্বান জানানো হয়েছে এই বলে যে, বাপ-দাদার অন্ধ অনুসরণ ত্যাগ করো, মুহাম্মদ (সা) সম্পর্কে উন্মুক্ত হৃদয়ে চিন্তা-ভাবনা করো এবং উন্মুক্ত দৃষ্টিতে দেখো, বিশ্ব- জগতের চারদিকে এবং নিজের মানবিক সত্তার মধ্যেই কেমন সব সুস্পষ্ট নিদর্শন এর সত্যতার সাক্ষ দিয়ে চলছে।

এ প্রসঙ্গে একথাও বলা হয়েছে, দুনিয়ায় বা আরবদেশে এই প্রথমবার মানুষের কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত একটি আওয়াজ উঠানো হয়নি। আগেও লোকেরা বুদ্ধি-জ্ঞানের অধিকারী ছিল এবং তারা একথাই বলতো যা আজ মুহাম্মদ (সা) বলছেন। তোমাদের নিজেদের দেশেই ছিলেন মহাজ্ঞানী লুকমান। তার জ্ঞানগরিমার কাহিনী তোমাদের এলাকায় বহুল প্রচলিত। তোমরা নিজেদের কথাবার্তায় তার প্রবাদ বাক্য ও জ্ঞানগর্ভ কথা উদ্বৃত্ত করে থাকো। তোমাদের কবি ও বাগ্মীগণ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তার কথা বলেন। এখন তোমরা নিজেরাই দেখো তিনি কোন ধরনের আকীদা- বিশ্বাস ও কোন ধরনের নীতি-নৈতিকতার শিক্ষা দিতেন।

•ব্যাখ্যা:

★১২ নং আয়াতের ব্যাখ্যা:

وَلَقَدْ آتَيْنَا لُقْمَانَ الْحِكْمَةَ
অর্থাৎ আমি লুকমানকে দান করেছিলাম প্রজ্ঞা।

★লুক্বমান হাকীমের পরিচয়-

জাহেলিয়াতের অন্ধকার যুগে কোন লিখিত ইতিহাসের অস্তিত্ব ছিল না। ঐতিহাসিক দৃষ্টিতে তাই লুকমানের পরিচয়ের ব্যাপারে ব্যাপক মতবিরোধ দেখা যায়-

শত শত বছর থেকে মুখে মুখে শ্রুত যেসব তথ্য স্মৃতির ভাণ্ডারে লোককাহিনী-গল্প-গাঁথার আকারে সংগৃহিত হয়ে আসছিল সেগুলোর ওপর ছিল এর ভিত্তি। এসব বর্ণনার প্রেক্ষিতে কেউ কেউ হযরত লকুমানকে আদ জাতির অন্তর্ভুক্ত ইয়ামনের বাদশাহ মনে করতো। মাওলানা সাইয়েদ সুলাইমান নদবী এসব বর্ণনার ওপর নির্ভর করে তার “আরদুল কুরআন” গ্রন্থে এ মত প্রকাশ করেছেন যে, আদ জাতির ওপর আল্লাহর আযাব নাযিল হবার পর হযরত হূদের (আ) সাথে তাদের যে ঈমানদার অংশটি বেঁচে গিয়েছিল লুকমান ছিলেন তাদেরই বংশোদ্ভূত। ইয়ামনে এ জাতির যে শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তিনি ছিলেন তার অন্যতম শাসক ও বাদশাহ।

কিন্তু কতিপয় প্রবীণ সাহাবী ও তাবেঈদের মাধ্যমে প্রাপ্ত অন্য বর্ণনাগুলো এর সম্পূর্ণ বিপরীত।

-ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, লুকমান ছিলেন একজন আবিসিনীয় গোলাম, যিনি কাঠ কাটার কাজ করতেন। হযরত আবু হুরাইরা (রা), মুজাহিদ, ইকরিমাহ ও খালেদুর রাব’ঈও একথাই বলেন। তাছাড়া ইবনে আবী শাইবাহ, আহমাদ, ইবনে জারীর, ইবনুল মুনযির প্রমুখ যুহদ নামক গ্রন্থে এরূপ বর্ণনা করেছেন।

-হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ আনসারী (রা) বলেন, তিনি ছিলেন নূবার অধিবাসী।

-সাঈদ ইবনে মুসাইয়েবের উক্তি হচ্ছে, তিনি মিসরের কালো লোকদের অন্তরভুক্ত ছিলেন।

এ তিনটি বক্তব্য প্রায় কাছাকাছি অবস্থান করছে। কারণ আরবের লোকেরা কালো বর্ণের মানুষদেরকে সেকালে প্রায়ই হাবশী বলতো। আর নূবা হচ্ছে মিসরের দক্ষিণে এবং সুদানের উত্তরে অবস্থিত একটি এলাকা। তাই তিনটি উক্তিতে একই ব্যক্তিকে নূবী, মিসরীয় ও হাবশী বলা কেবলমাত্র শাব্দিক বিরোধ ছাড়া আর কিছুই নয়। অর্থের দিক দিয়ে এখানে কোন বিরোধ নেই।

তা ছাড়া সুহাইলী আরো বিস্তারিত ভাবে বলেছেন যে, লুকমান হাকীম ও লুকমান ইবনে আদ দু’জন আলাদা ব্যক্তি। তাদেরকে এক ব্যক্তি মনে করা ঠিক নয়। (রওদুল আনাফ, ১ম খণ্ড, ২৬৬ পৃষ্ঠা এবং মাসউদী , ১ম খণ্ড, ৫৭ পৃষ্ঠা । )

তিনি ছিলেন লুক্বমান ইবনে আনকা ইবনে সুদূন। সুহাইলির(র.) মতে তাঁর পিতার নাম ছিল সা’রান।

★যেভাবে তাঁর কথা প্রসিদ্ধি লাভ করে-

তারপর রওদাতুল আনাফে সুহাইলির ও মরূজুয যাহাবে মাস’উদীর বর্ণনা থেকে এ সূদানী গোলামের কথা আরবে কেমন করে ছড়িয়ে পড়লো এ প্রশ্নের ওপরও আলোকপাত হয়। এ উভয় বর্ণনায় বলা হয়েছে, এ ব্যক্তি আসলে ছিলেন নূবী। কিন্তু তিনি বাসিন্দা ছিলেন মাদযান ও আইল (বর্তমান আকাবাহ) এলাকার। এ কারণে তার ভাষা ছিল আরবী এবং তার জ্ঞানের কথা আরবে ছড়িয়ে পড়ে।

★তাঁর শারীরিক গঠনঃ

হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহর(র) কাছে তাঁর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, লুক্বমান ছিলেন চ্যাপ্টা ও থ্যাবড়া নাক বিশিষ্ট বেঁটে আকৃতির লোক।

মুজাহিদ(র) এর মতে, তিনি ছিলেন ফাটা পা এবং পুরু ঠোঁট ওয়ালা।(ইবনে কাসীর)

★লুক্বমান হাকীম কি নবী ছিলেন?

ইবনে কাসীর(র) এবং ইমাম বাগাবী(র) বলেন, লুক্বমান যে নবী ছিলেননা, বরং ছিলেন বিশিষ্ট ফকীহ ও প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি, এ ব্যাপারে মনিষীগণ একমত। কেবল মাত্র ইকরামা(র) এর মতে, তিনি নবী ছিলেন। তবে তার বর্ণনাসূত্র অত্যন্ত দুর্বল।

কাতাদাহ(রা) থেকে একটি রেওয়ায়াতে উল্লেখ আছে, আল্লাহ্‌ পাক লুকমানকে নবুয়্যত এবং প্রজ্ঞার মধ্যে যে কোন একটি বেছে নেয়ার সুযোগ দিলে তিনি প্রজ্ঞাকেই বেছে নেন। কোন কোন বর্ণনায় আছে, নবুয়্যত গ্রহনের সুযোগ দেয়া হলে তিনি বলেন- এটা আপনার আদেশ হলে অবশ্যই শিরোধার্য। অন্যথায় আমাকে ক্ষমা করুন। হযরত কাতাদাহ(রাঃ) এর থেকে আরও বর্ণিত আছে যে, মনিষী লুকমানের কাছে এক ব্যক্তি নবুয়ত গ্রহন না করে প্রজ্ঞা গ্রহন করার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, নবুয়্যত একটি বিশেষ দায়িত্বপূর্ণ পদ। যদি আল্লাহ্‌ তা আমার ইচ্ছা ব্যতিতই দিতেন, তাহলে এর দায়িত্ব তিনি নিজেই নিতেন যেন আমি ভালোভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারি। আমি চেয়ে নিলে সে দায়িত্ব আমার উপর বর্তাত।(ইবনে কাসীর)

মোদ্দা কথা হল, একজন বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী হিসেবে আরবে লুকমান বহুল পরিচিত ব্যক্তিত্ব। জাহিলী যুগের কবিরা যেমন ইমরাউল কায়েস, লবীদ, আ’শা , তারাফাহ প্রমুখ তাদের কবিতায় তার কথা বলা হয়েছে। আরবের কোন কোন লেখাপড়া জানা লোকের কাছে “সহীফা লুকমান ” নামে তার জ্ঞানগর্ভ উক্তির একটি সংকলন পাওয়া যেতো।

হাদীসে উদ্ধৃত হয়েছে, হিজরাতের তিন বছর পূর্বে মদীনার সর্বপ্রথম যে ব্যক্তি নবী (সা) এর দাওয়াতের প্রভাবিত হন তিনি ছিলেন সুওয়াইদ ইবনে সামেত। তিনি হজ্ব সম্পাদন করার জন্য মক্কায় যান। সেখানে নবী করীম (সা) নিজের নিয়ম মতো বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত হাজীদের আবাসস্থলে গিয়ে ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেককে ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকেন। এ প্রসঙ্গে সুওয়াইদ যখন নবী (সা) এর বক্তৃতা শুনেন, তাকে বলেন, আপনি যে ধরনের কথা বলেছেন তেমনি ধরনের একটি জিনিস আমার কাছেও আছে। তিনি জিজ্ঞেস করেন, সেটা কি ৷ জবাব দেন সেটা লুকমানের পুস্তিকা । তারপর নবী করীমের (সা) অনুরোধে তিনি তার কিছু অংশ পাঠ করে তাকে শুনান। তিনি বলেন, এটা বড়ই চমৎকার কথা। তবে আমার কাছে এর চেয়েও বেশি চমৎকার কথা আছে। এরপর কুরআন শুনান। কুরআন শুনে সুওয়াইদ অবশ্যই স্বীকার করেন, নিসন্দেহে এটা লুকমানের পুস্তিকার চেয়ে ভালো।(সিরাতে ইবনে হিশাম, ২ খণ্ড, ৬৭-৬৯ পৃ; উসুদুল গাবাহ, ২ খণ্ড, ৩৭৮ পৃষ্ঠা)

الْحِكْمَة*َ শব্দটি কোরআন কারীমের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, যেমন- বিদ্যা, বিবেক, গাম্ভীর্য, নবুয়ত, মতের বিশুদ্ধতা ইত্যাদি।

আবু হাইয়ান বলেছেন- এটা দ্বারা এমন কিছু বাক্য সমষ্টিকে বুঝানো হয়, যা দ্বারা মানুষ উপদেশ গ্রহন করতে পারে, যা অন্তরকে প্রভাবান্বিত করে এবং যা মানুষ সংরক্ষণ করে অপরের কাছে পৌঁছায়।

★হযরত ইবনে আব্বাস(রাঃ) এর মতে, হিকমাহ অর্থ- বিবেক, প্রজ্ঞা, মেধা।

তবে অধিকাংশ মুফাসসির হিকমাহ শব্দের শাব্দিক অর্থ করেন প্রজ্ঞা এবং পারিভাষিক অর্থ- ‘কাজে পরিণত করার জ্ঞান’ বলে থাকেন। আর এটাই সবচেয়ে প্রসিদ্ধ মত।

أَنْ اشْكُرْ لِلَّهِ
অর্থাৎ যাতে সে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হয় ৷

এই বাক্যাংশের আগে ‘আমরা বললাম’ উহ্য রয়েছে বলে ধরে নেয়া হয়। তখন এর অর্থ হয়- আমি লুক্বমানকে প্রজ্ঞা প্রদান পূর্বক বললাম যে, আমার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। অনেক তাফসীর কারকগন বলে থাকেন যে, أَنْ اشْكُرْ স্বয়ং হিকমতেরই ব্যাখ্যা। অর্থাৎ লুক্বমানকে যে হিকমত দেয়া হয়েছিল, তা হল তার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা প্রদানের নির্দেশ, যা সে কাজে পরিণত করেছিল। তখন এর অর্থ দাঁড়ায়, মহান আল্লাহ্‌র দয়া এবং অনুগ্রহের জন্য তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশই সবচেয়ে বড় হিকমাহ বা প্রজ্ঞা।

*এখানে একটি প্রশ্ন এসে যায় যে, লুক্বমান হাকীম তো নবী ছিলেননা; তাহলে আল্লাহ্‌ কিভাবে তাকে শুকরিয়া আদায়ের আদেশ দিলেন? এর উত্তর হল- তাঁর প্রতি কোরআনে বর্ণিত যে নির্দেশ أَنْ اشْكُرْ لِلَّهِ তা ইলহামের মাধ্যমেও হতে পারে, যা আল্লাহ্‌র ওলীগণ লাভ করে থাকেন। তবে আল্লাহ্‌ই এ সম্পর্কে ভালো জানেন।

وَمَنْ يَشْكُرْفَإِنَّمَا يَشْكُرُ لِنَفْسِهِ

অর্থাৎ যে ব্যক্তি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে তার কৃতজ্ঞতা হবে তার নিজেরই জন্য লাভজনক৷

যেমন কোরানেরই অন্যত্র বলা হয়েছে, যারা সৎকর্ম করে, তারা নিজেদেরই জন্য রচনা করে সুখশয্যা।(৩০:৪৪) আরেক জায়গায় আল্লাহ্‌ বলেছেন, যদি তোমরা কৃতজ্ঞ হও, তবে আমি (নেয়ামত) অবশ্যই বাড়িয়ে দিব।

ধর্মীয় সম্পদের বৃদ্ধি ইহকাল-পরকাল, উভয় স্থানেই হয়। দুনিয়ায় নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করলে জ্ঞান এবং আমলের দক্ষতা বেড়ে যায়। আর পরকালের জন্য বিপুল সাওয়াবের অধিকারী হওয়া যায়।

وَمَنْ كَفَرَ فَإِنَّ اللَّهَ غَنِيٌّ حَمِيدٌ

আর যে ব্যক্তি কুফরী করবে, (জেনে রেখ)সে ক্ষেত্রে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ অমুখাপেক্ষী এবং নিজে নিজেই প্রশংসিত ৷

অর্থাৎ যে ব্যক্তি কুফরী করে তার কুফরী তার নিজের জন্য ক্ষতিকর। এতে আল্লাহর কোন ক্ষতি হয় না। তিনি অমুখাপেক্ষী । কারো কৃতজ্ঞতার মুখাপেক্ষী নন। কারো কৃতজ্ঞতা তার সার্বভৌম কর্তৃত্বে কোন বৃদ্ধি ঘটায় না। বান্দার যাবতীয় নিয়ামত যে একমাত্র তার দান করো অকৃতজ্ঞতা ও কুফরী এ জাজ্জ্বল্যমান সত্যে কোন পরিবর্তন ঘটাতে পারে না। কেউ তার প্রশংসা করুক বা নাই করুক তিনি আপনা আপনিই প্রশংসিত। বিশ্ব-জাহানের প্রতিটি অণু-কণিকা তার পূর্ণতা ও সৌন্দর্য এবং তার স্রষ্টা ও অন্নদাতা হবার সাক্ষ দিচ্ছে এবং প্রত্যেকটি সৃষ্ট বস্তু নিজের সমগ্র সত্তা দিয়ে তার প্রশংসা গেয়ে চলছে।




★১৩ নং আয়াতের ব্যাখ্যা-

লুক্বমান হাকীম তাঁর পুত্রকে ৪ ধরণের উপদেশ দিয়েছিলেন, যা ১৩-১৯ নং আয়াতে এসেছে। এসব জ্ঞানগর্ভ কথাগুলোর মধ্যে সর্বাগ্রে এসেছে আক্বিদার পরিশুদ্ধতা। যার মধ্যে প্রথম উপদেশ তাওহীদ সম্পর্কে। আল্লাহ্‌কে এক ও অদ্বিতীয় হিসেবে মেনে নিয়ে তাঁর ক্ষমতার সাথে কাউকে সমকক্ষ মনে করা যাবেনা। যেমন তিনি বলেছেন-

وَإِذْ قَالَ لُقْمَانُ لابْنِهِ وَهُوَ يَعِظُهُ يَا بُنَيَّ لا تُشْرِكْ بِاللَّهِ

অর্থাৎ (স্মরণ করো) যখন লুকমান নিজের ছেলেকে উপদেশছলে বললো, “ হে পুত্র ! আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করো না৷

লুকমানের পাণ্ডিত্যপূর্ণ উপদেশমালা থেকে এ বিশেষ উপদেশ বাণীটিকে এখানে উদ্ধৃত করা হয়েছে দুটি বিশেষ সম্পর্কের ভিত্তিতে। এক, তিনি নিজ পুত্রকে এ উপদেশটি দেন। আর একথা সুস্পষ্ট, মানুষ যদি দুনিয়ায় সবচেয়ে বেশি কারো ব্যাপারে আন্তরিক হতে পারে তাহলে সে হচ্ছে তার নিজের সন্তান। এক ব্যক্তি অন্যকে ধোঁকা দিতে পারে, তার সাথে মুনাফিকী আচরণ করতে পারে কিন্তু সবচেয়ে নিকৃষ্ট প্রকৃতির লোকটিও নিজ পুত্রকে এ নসীহত করা অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, তার মতে শিরক যথার্থই একটি নিকৃষ্ট কাজ এবং এ জন্যই তিনি সর্বপ্রথম নিজের প্রাণাধিক পুত্র কে এ গোমরাহীটি থেকে দূরে থাকার উপদেশ দেন। দুই, মক্কার কাফেরদের অনেক পিতা-মাতা সে সময় নিজের সন্তানদেরকে শিরকী ধর্মের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকার এবং মুহাম্মদ (সা) এর তাওহীদের দাওয়াত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবার জন্য বাধ্য করছিল। সামনের দিকের একথা বর্ণনা করা হয়েছে। তাই সেই অজ্ঞদেরকে শুনানো হচ্ছে, তোমাদের দেশেরই বহুল পরিচিতি জ্ঞানী পণ্ডিত তো তার নিজের পুত্রের মঙ্গল করার দায়িত্বটা তাকে শিরক থেকে দূরে থাকার নসিহত করার মাধ্যমেই পালন করেন। এখন তোমরা যে তোমাদের সন্তানদেরকে শিরক করতে বাধ্য করছো, এটা কি তাদের প্রতি শুভেচ্ছা না তাদের অমঙ্গল কামনা ৷

إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ

অর্থাৎ নিশ্চয়ই শিরক খুব মারাত্মক অন্যায়৷

জুলুমের প্রকৃত অর্থ হচ্ছে , কারো অধিকার হরণ করা এবং ইনসাফ বিরোধী কাজ করা। শিরক এ জন্য বৃহত্তর জুলুম যে, মানুষ এমন সব সত্তাকে তার নিজের স্রষ্টা, রিযিকদাতা ও নিয়ামতদানকারী হিসেবে বরণ করে নেয়, তার সৃষ্টিতে যাদের কোন অংশ নেই তাকে রিযিক দান করার ক্ষেত্রে যাদের কোন দখল নেই এবং মানুষ এ দুনিয়ায় যেসব নিয়ামত লাভে ধন্য হচ্ছে সেগুলো প্রদান করার ব্যাপারে যাদের কোন ভূমিকাই নেই। এটা এত অন্যায়, যার চেয়ে বড় কোন অন্যায়ের কথা চিন্তাই করা যায় না। তারপর মানুষ একমাত্র তার স্রষ্টারই বন্দেগী ও পূজা-অর্জনা করে তার অধিকার হরণ করে। তারপর স্রষ্টা ছাড়া অন্য সত্তার বন্দেগী ও পূজা করতে গিয়ে মানুষ যে কাজই করে তাতে সে নিজের দেহ ও মন থেকে শুরু করে পৃথিবী ও আকাশের বহু জিনিস ব্যবহার করে। অথচ এ সমস্ত জিনিস এক লা-শরীক আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন এবং এর মধ্যে কোন জিনিসকে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো বন্দেগীতে ব্যবহার করার অধিকার তার নেই। তারপর মানুষ নিজেকে লাঞ্ছনা ও দুর্ভোগের মধ্যে ঠেলে দেবে না, তার নিজের ওপর এ অধিকার রয়েছে। কিন্তু সে স্রষ্টাকে বাদ দিয়ে সৃষ্টির বন্দেগী করে নিজেকে লাঞ্ছিত ও অপমানিতও করে এবং এই সঙ্গে শাস্তির যোগ্যও বানায়। এভাবে একজন মুশরিকের সমগ্র জীবন একটি সর্বমুখী ও সার্বক্ষণিক জুলুমে পরিণত হয়। তার কোন একটি মুহূর্তও জুলুমমুক্ত নয়।

হযরত আব্দুল্লাহ(রাঃ) থেকে বর্ণিত, যখন এই আয়াতখানা নাযিল হল- “যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের ঈমানের সাথে যুলুম মিশ্রিত করেনি” (৬:৮৬); সাহাবাদের কাছে এই কথা খুব কঠিন মনে হয়। তারা জিজ্ঞেস করলেন, আমাদের মধ্যে কে এমন আছে, যে যুলুম করেনা? তখন আল্লাহ্‌র রাসুল(সাঃ) বললেন- তোমরা যা মনে করছ, তা নয়। তোমরা কি হযরত লুক্বমানের কথা শোননি? অতঃপর তিনি উপরের আয়াতটি তেলাওয়াত করেন।(ইবনে কাসীর)

এছাড়া কোরআনের অন্যত্র এসেছে, নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ তায়ালা সকল প্রকার অন্যায় ক্ষমা করে দেবেন, তবে শিরক ছাড়া।(৪;১১৬)

عَنْ أَبِي ذَرٍّ ـ رضى الله عنه ـ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏"‏ أَتَانِي آتٍ مِنْ رَبِّي فَأَخْبَرَنِي ـ أَوْ قَالَ بَشَّرَنِي ـ أَنَّهُ مَنْ مَاتَ مِنْ أُمَّتِي لاَ يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا دَخَلَ الْجَنَّةَ ‏"‏‏.‏ قُلْتُ وَإِنْ زَنَى وَإِنْ سَرَقَ قَالَ ‏"‏ وَإِنْ زَنَى وَإِنْ سَرَقَ ‏"‏‏.‏

আবূ যার্‌ (গিফারী) (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ একজন আগন্তুক [জিব্‌রীল (আলাইহিস সালাম)] আমার রব-এর কাছ থেকে এসে আমাকে খবর দিলেন অথবা তিনি বলেছিলেন, আমাকে সুসংবাদ দিলেন, আমার উম্মাতের মধ্যে যে ব্যাক্তি আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরীক না করা অবস্থায় মারা যাবে, সে জান্নাতে দাখিল হবে। আমি বললাম, যদিও সে যিনা করে থাকে এবং যদিও সে চুরি করে থাকে? তিনি বললেনঃ যদিও সে যিনা করে থাকে এবং যদিও সে চুরি করে থাকে। (বুখারী - ১৩৬৫)


★১৪ নং আয়াতের ব্যাখ্যা-

وَوَصَّيْنَا الإِنسَانَ بِوَالِدَيْهِ
অর্থাৎ আর প্রকৃতপক্ষে আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের জোর তাকিদ করেছি৷এটি লুক্বমানের পক্ষ থেকে স্বীয় পুত্রের প্রতি প্রথম উপদেশের দ্বিতীয় অংশ- পিতা মাতার প্রতি ইহসান এবং সদ্ব্যবহার করা। আল্লাহ নিজের পক্ষ থেকে লুকমানের উক্তির অতিরিক্ত ব্যাখ্যা হিসেবে একথা বলেছেন।

আল্লাহ্‌ তায়ালা অন্যত্র বলেছেন- তোমার প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদাত না করতে এবং পিতা মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করতে। (১৭:২৩)

এখানেও আরও অনেক জায়গার মত আল্লাহ্‌র ইবাদাতের সাথে সাথে পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহারের ব্যাপারটি এসেছে। এটি দ্বারা এর গুরুত্ব বুঝা যায়।

حَمَلَتْهُ أُمُّهُ وَهْناً عَلَى وَهْنٍ
অর্থাৎ তার মা কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে তাকে আপন গর্ভে ধারণ করে।

وَهْنٍ শব্দের অর্থ কষ্ট, শ্রম, দুর্বলতা; حَمَل বা গর্ভ ধারণ অবস্থায় যা মা সহ্য করেন।

وَفِصَالُهُ فِي عَامَيْن
অর্থাৎ এবং দু’বছর লাগে তার দুধ ছাড়তে৷

এ শব্দগুলো থেকে ইমাম শাফে’ঈ (র), ইমাম আহমাদ (র), ইমাম আবু ইউসুফ (র) ও ইমাম মুহাম্মাদ (র) এ অর্থ গ্রহণ করেছেন যে, শিশুর দুধ পান করার মেয়াদ ২ বছরে পূর্ণ হয়ে যায়। এ মেয়াদকালে কোন শিশু যদি কোন স্ত্রীলোকের দুধপান করে তাহলে দুধ পান করার “হুরমাত” (অর্থাৎ দুধপান করার কারণে স্ত্রীলোকটি তার মায়ের মর্যাদায় উন্নীত হয়ে যাওয়া এবং তার জন্য তার সাথে বিবাহ হারাম হয়ে যাওয়া ) প্রমাণিত হয়ে যাবে। অন্যথায় পরবর্তীকালে কোন প্রকার দুধ পান করার ফলে কোন “হুরমাত” প্রতিষ্ঠিত হবে না। এ উক্তির স্বপক্ষে ইমাম মালেকেরও একটি বর্ণনা রয়েছে। কিন্তু ইমাম আবু হানীফা (র) অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করার উদ্দেশ্যে এ মেয়াদকে বাড়িয়ে আড়াই বছর করার অভিমত ব্যক্ত করেন। এই সঙ্গে ইমাম সাহেব একথাও বলেন, যদি দু’বছর বা এর চেয়ে কম সময়ে শিশুর দুধ ছাড়িয়ে দেয়া হয় এবং খাদ্যের ব্যাপারে শিশু কেবল দুধের ওপর নির্ভরশীল না থাকে, তাহলে এরপর কোন স্ত্রীলোকের দুধ পান করার ফলে কোন দুধপান জনিত হুরমাত প্রমাণিত হবে না। তবে যদি শিশুর আসল খাদ্য দুধই হয়ে থাকে তাহলে অন্যান্য খাদ্য কম বেশি কিছু খেয়ে নিলেও এ সময়ের মধ্যে দুধ পানের কারণে হুরমাত প্রমাণিত হয়ে যাবে। কারণ শিশুকে অপরিহার্যভাবে দু’বছরেই দুধপান করাতে হবে, আয়াতের উদ্দেশ্য এটা নয়। সূরা বাকারায় বলা হয়েছে,

” মায়েরা শিশুদেরকে পুরো দু’বছর দুধ পান করাবে, তার জন্য যে দুধপান করার মেয়াদ পূর্ণ করতে চায় ।” (২৩৩ আয়াত )

ইবনে আব্বাস (রা) থেকে এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন এবং উলামায়ে কেরাম এ ব্যাপারে তার সাথে একমত হয়েছেন যে, গর্ভধারণের সর্বনিম্ন মেয়াদ ছ’মাস। কারণ কুরআনের অন্য এক জায়গায় বলা হয়েছে, “তার পেটের মধ্যে অবস্থান করা ও দুধ ছেড়ে দেয়ার কাজ হয় ৩০ মাসে। (আল আহকাফ, আয়াত ১৫) এটি একটি সূক্ষ্ণ আইনগত বিধান এবং এর ফলে বৈধ ও অবৈধ গর্ভের অনেক বিতর্কের অবসান ঘটে।

أَنْ اشْكُرْ لِي وَلِوَالِدَيْكَ إِلَيَّ الْمَصِيرُ

অর্থাৎ (এ জন্য আমি তাকে উপদেশ দিয়েছি) আমার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো এবং নিজের পিতা-মাতার প্রতিও, (কেননা)আমার দিকেই তোমাকে ফিরে আসতে হবে৷

মায়ের এই কষ্টের কথা এজন্যই মনে করিয়ে দেয়া হচ্ছে যে, সন্তান মায়ের এই মেহেরবানীর কথা মনে করে মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, আনুগত্য ও ইহসান করে। যেমন, অন্যত্র আল্লাহ্‌ বলছেন- “বলো, প্রভু! তাদের দুজনের(পিতামাতার) প্রতি দয়া করুন, যেভাবে শৈশবে তাঁরা আমাকে লালন পালন করেছিলেন”।(১৭:২৪)

এখানে মহিমান্বিত আল্লাহ্‌ বলেছেন, তোমাদের প্রত্যাবর্তন তো আমারই কাছে। সুতরাং তোমরা যদি এ আদেশ মেনে নাও, তবে আমিই তোমাদেরকে এর সর্বোচ্চ প্রতিদান দিব।

★১৫ নং আয়াতের ব্যাখ্যা-

وَإِنْ جَاهَدَاكَ عَلى أَنْ تُشْرِكَ بِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلا تُطِعْهُمَا
অর্থাৎ কিন্তু যদি তারা তোমার প্রতি আমার সাথে এমন কাউকে শরীক করার জন্য চাপ দেয় যার সম্পর্কে তুমি জানো না, তাহলে তুমি তাদের কথা কখনোই মেনে নিয়ো না৷

এখানে পিতা মাতার আনুগত্যের সীমা রেখা বলে দেয়া হয়েছে। জীবিত থাকা অবস্থায় তাঁদের সাথে সর্বোচ্চ আনুগত্য ও ভালো আচরণ করতে হবে।

যেমন একটি হাদিসে এসেছে- “জিবরীল(আঃ) বললেন, যে নিজের পিতা মাতাকে জীবিত অবস্থায় পেল; অথচ (তাঁদের সন্তুষ্টির মাধ্যমে) জান্নাত নিশ্চিত করতে পারলনা, যে ধ্বংস হোক। রাসুলুল্লাহ(সাঃ) বললেন- আমীন।(বুখারি ও মুসলিম)”

কিন্তু এই আনুগত্যের সীমা রেখা হল- শরীয়ত। অর্থাৎ পিতামাতার আনুগত্য করা ফরয। কিন্তু ইসলাম বিরোধী কোন কাজের ব্যাপারে তারা বাধ্য করতে চাইলে, সেই পিতা মাতার কথা মানাই আবার হারাম হয়ে যাবে।

হযরত সা’দ ইবনে মালিক(রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- এই আয়াতটি আমারই সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। আমি আমার মায়ের খুবই খেদমত করতাম এবং পূর্ণ অনুগত থাকতাম। আল্লাহ্‌ তায়ালা যখন আমাকে ইসলামের পথে হেদায়াত দান করলেন, আমার মা আমার উপর অসন্তুষ্ট হল। সে আমাকে বলল- “তুমি এই নতুন দ্বীন পেলে কোথায়? জেনে রেখ, আমি তোমাকে নির্দেশ দিচ্ছি যে তোমাকে অবশ্যই এই নতুন দ্বীন পরিত্যাগ করতে হবে। নাহলে আমি পানাহার বন্ধ করে দেব এবং এভাবেই না খেয়ে মারা যাব”। আমি ইসলাম পরিত্যাগ করলাম না। আমার মা’ও খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দিল। ফলে চতুর্দিকে আমার নামে বদনাম ছড়িয়ে পড়ল যে, আমিই আমার মায়ের হন্তাকারক। আমার মন খুব ছোট হয়ে গেল। মায়ের খেদমতে হাযির হয়ে আমি অনুনয় বিনয় করে তাকে বুঝিয়ে বললাম- “তুমি তোমার হঠকারিতা বন্ধ কর। জেনে রেখ, এই সত্য দ্বীন ছেড়ে দেয়া আমার পক্ষে আমার পক্ষে অসম্ভব”। আমার মা এভাবে তিন দিন অতিক্রম করল এবং তার অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় হয়ে পড়ল। আমি আবারো তার কাছে গিয়ে বললাম- “আম্মা, তুমি আমার কাছে প্রাণপ্রিয় বটে, তাই বলে আমার দ্বীনের চেয়ে বেশি প্রিয় নও। আল্লাহ্‌র কসম, তোমার একটি জীবন কেন, এরকম শত শত জীবনও যদি ক্ষুধা, পিপাসায় কাতর হয়ে একে একে দেহ থেকে বের হয়ে যায় তবুও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমি দ্বীন ইসলামকে পরিত্যাগ করবনা”। এই কথায় আমার মা নিরাশ হয়ে আবার পানাহার শুরু করল। (হাদিসটি ইমাম তিবরানী তাঁর আশারাহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)

সৃষ্ট জীবের মধ্যে মানুষের মধ্যে মানুষের ওপর মা-বাপের হক হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। কিন্তু সেই মা- বাপই যদি মানুষকে শিরক করতে বাধ্য করে তাহলে তাদের কথা মেনে নেয়া উচিত নয়। কাজেই এ ক্ষেত্রে অন্য কারো কথায় মানুষের এ ধরনের শিরক করার কোন প্রশ্নই ওঠে না। তারপর শব্দগুলি হচ্ছেঃ ‘ওয়া ইন জাহাদাকা’ অর্থাৎ যদি তারা দু’জন তোমাকে বাধ্য করার জন্য তাদের পূর্ণশক্তি নিয়োগ করে । এ থেকে জানা গেল , কম পর্যায়ের চাপ প্রয়োগ বা বাপ-মায়ের মধ্য থেকে কোন একজনের চাপ প্রয়োগ আরো সহজে প্রত্যাখান করার যোগ্য। এই সঙ্গে ——-“যাকে তুমি আমার শরীক হিসেবে জানো না” বাক্যাংশটিও অনুধাবনযোগ্য। এর মধ্যে তাদের কথা না মানার সপক্ষে একটি শক্তিশালী যুক্তি প্রদান করা হয়েছে। অবশ্যই এটা পিতা-মাতার অধিকার যে, ছেলেমেয়েরা তাদের সেবা করবে, তাদেরকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করবে এবং বৈধ বিষয়ে তাদের কথা মেনে চলবে। কিন্তু তাদেরকে এ অধিকার দেয়া হয়নি যে, মানুষ নিজের জ্ঞানের বিরুদ্ধে তাদের অন্ধ অনুসরণ করবে। শুধমাত্র বাপ-মায়ের ধর্ম বলেই তাদের ছেলে বা মেয়ের সেই ধর্ম মেনে চলার কোন কারণ নেই। সন্তান যদি এ জ্ঞান লাভ করে যে, তার বাপ-মায়ের ধর্ম ভুল ও মিথ্যা তাহলে তাদের ধর্ম পরিত্যাগ করে তার সঠিক ধর্ম গ্রহণ করা উচিত এবং তাদের চাপ প্রয়োগের পরও যে পথের ভ্রান্তি তার কাছে সুস্পষ্ট হয়ে গেছে সে পথ অবলম্বন করা তার উচিত নয়। বাপ-মায়ের সাথে যখন এ ধরনের ব্যবহার করতে হবে তখন দুনিয়ার প্রত্যেক ব্যক্তির সাথেও এ ব্যবহার করা উচিত। যতক্ষণ না কোন ব্যক্তির সত্য পথে থাকা সম্পর্কে জানা যাবে ততক্ষণ তার অনুসরণ করা বৈধ নয়।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাণীও বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট ও শক্তিশালী করেন, তিনি বলেন,

« لا طاعة لأحد في معصية الله ، إنما الطاعة في المعروف »

“আল্লাহর নাফরমানিতে কোন মাখলুকের আনুগত্য চলবে না। আনুগত্য-তো হবে একমাত্র ভালো কাজে।”

وَصَاحِبْهُمَا فِي الدُّنْيَا مَعْرُوفاً وَاتَّبِعْ سَبِيلَ مَنْ أَنَابَ إِلَيَّ

অর্থাৎ তবুও দুনিয়ায় তাদের সাথে সদ্ভাবে সহাবস্থান করতে থাকো। বরং মেনে চলো সে ব্যক্তির পথ যে আমার দিকে ফিরে এসেছে৷

এখানে ইসলামের একটি অনন্য ন্যায়নীতি শিক্ষা দেয়া হয়েছে। পিতা মাতা যদি শিরক করতে বাধ্য করেন, তবে তা মানা হারাম হয়ে যায়। এ অবস্থায় স্বভাবতঃ মানুষ সবসময় সীমার মধ্যে থাকতে পারেনা। এ সময় সন্তানের পক্ষ থেকে বাবা মা’র প্রতি কটু বাক্য প্রয়োগ, অশোভন আচরণের আশঙ্কা থেকে যায়। তাই ঐ মুহূর্তেও তাদের অনানুগত্যের পাশাপাশি সদাচরণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। একই সাথে সেক্ষেত্রে হেদায়াতপ্রাপ্ত ব্যক্তির অনুসরণের আদেশ দেয়া হয়েছে।

ثُمَّ إِلَيَّ مَرْجِعُكُمْ فَأُنَبِّئُكُمْ بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ

অর্থাৎ তারপর তোমাদের সবাইকে ফিরে আসতে হবে আমারই দিকে৷ সে সময় তোমরা কেমন কাজ করছিলে তখন তা আমি তোমাদেরকে জানিয়ে দেবো৷

এ দুনিয়ার আত্মীয়তা এবং আত্মীয়দের অধিকার কেবলমাত্র এ দুনিয়ার সীমা-ত্রিসীমা পর্যন্তই বিস্তৃত। সবশেষে পিতা-মাতা ও সন্তান সবাইকে তাদের স্রষ্টার কাছে ফিরে যেতে হবে। সেখানে তাদের প্রত্যেকের জবাবদিহি হবে তাদের ব্যক্তিগত দায়িত্বেও ভিত্তিতে। যদি পিতা-মাতা সন্তানকে পথভ্রষ্ট করে থাকে তাহলে তারা পাকড়াও হবে। যদি সন্তান পিতা-মাতার জন্য পথ ভ্রষ্টতা গ্রহণ করে থাকে তাহলে তাকে শাস্তি পেতে হবে। আর সন্তান যদি সঠিক পথ অবলম্বন করে থাকে এবং পিতা-মাতার বৈধ অধিকার আদায় করার ক্ষেত্রেও কোন প্রকার ত্রুটি না করে থাকে কিন্তু পিতা-মাতা কেবলমাত্র পথভ্রষ্টতার ক্ষেত্রে তাদের সহযোগী না হবার কারণে তাকে নির্যাতন করে থাকে, তাহলে তারা আল্লাহর পাকড়াও থেকে বাঁচতে পারবে না।


★১৬ নং আয়াতের ব্যাখ্যা-

يَا بُنَيَّ إِنَّهَا إِنْ تَكُ مِثْقَالَ حَبَّةٍ مِنْ خَرْدَلٍ فَتَكُنْ فِي صَخْرَةٍ أَوْ فِي السَّمَوَاتِ أَوْ فِي الأَرْضِ يَأْتِ بِهَا اللَّهُ إِنَّ اللَّهَ لَطِيفٌ خَبِيرٌ

অর্থাৎ (আর লুকমান বলেছিল ) “ হে পুত্র! কোন জিনিস যদি সরিষার দানা পরিমাণও হয় এবং তা লুকিয়ে থাকে পাথরের মধ্যে , আকাশে বা যমিনের মধ্যে কোথাও , তাহলে আল্লাহ তাো বের করে নিয়ে আসবেন৷ কারণ তিনি সূক্ষ্মদর্শী এবং সবকিছু জানেন৷

এটি মহাত্মা লুক্বমানের দ্বিতীয় উপদেশ, যা আকাইদ সম্পর্কে। এতে বলা হচ্ছে, আল্লাহর জ্ঞান ও তার পাকড়াও এর বাইরে কেউ যেতে পারে না। পাথরের মধ্যে ছোট্ট একটি কণা দৃষ্টির অগোচরে থাকতে পারে কিন্তু তার কাছে তা সুস্পষ্ট । আকাশ মণ্ডলে একটি ক্ষুদ্রতম কণিকা তোমার থেকে বহু দূরবর্তী হতে পারে কিন্তু তা আল্লাহর বহু নিকটতর। ভূমির বহু নিম্ন স্তরে পতিত কোন জিনিস তোমার কাছে গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত । কিন্তু তার কাছে তা রয়েছে উজ্জ্বল আলোর মধ্যে। কাজেই তুমি কোথাও কোন অবস্থায়ও এমন কোন সৎ বা অসৎ কাজ করতে পারো না যা আল্লাহর অগোচরে থেকে যায়। তিনি কেবল তা জানেন তাই নয় বরং যখন হিসেব-নিকেশের সময় আসবে তখন তিনি তোমাদের প্রত্যেকটি কাজের ও নড়াচড়ার রেকর্ড সামনে নিয়ে আসবেন।আল্লাহ্‌ পাক অন্যত্র বলছেন-

“আমি(কিয়ামতের দিন) ইনসাফের পাল্লা রেখে দিব। সুতরাং কোন নফসের প্রতি বিন্দুমাত্র যুলুম করা হবেনা”।(২১:৪৭)

আরেক জায়গায় তিনি বলেছেন-

“কেউ ধূলিকণা পরিমাণ ভালো কাজ করলে (কিয়ামতের দিন) তা দেখতে পাবে। আর কেউ ধূলিকণা পরিমাণ খারাপ কাজ করলে তাও দেখতে পাবে”।(৯৯:৭-৮)

কেউ কেউ বলেন- صَخْرَةٍ দ্বারা এমন পাথরকে বুঝানো হয়, যা ৭ স্তর মাটির নিচে থাকে। মূলত, পৃথিবীর অশ্মমণ্ডলের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে যার প্রধান উপাদান কালো রংবিশিষ্ট গ্রানাইট পাথর।হযরত আবু সাঈদ খুদরী(রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলে আকরাম(সাঃ) বলেছেন- যদি তোমাদের মধ্যে কোন লোক এমন কোন পাথরের মধ্যেও কোন আমল করে, যার কোন দরজা, জানালা এমনকি কোন ছিদ্রও নেই; তবুও আল্লাহ্‌ সেই আমল প্রকাশ করে দেবেন, তা ভালো কিংবা মন্দ হোক। (ইবনে কাসীর)


★১৭ নং আয়াতের ব্যাখ্যা-

يَا بُنَيَّ أَقِمْ الصَّلاة

অর্থাৎ হে পুত্র! নামায কায়েম করো।

অতীব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হচ্ছে সালাত। মাক্কী ও মাদানী যুগে নাজিলকৃত বহু আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামিন সালাতের তাকিদ দিয়েছেন। আলোচ্য আয়াতটিতেও আমরা একই রূপ তাকিদ দেখতে পাই। পূর্ববর্তী সব নবী রাসুলই নামাজ আদায় করতেন, যদিও তা আদায়ের পদ্ধতি ছিল আলাদা আলাদা। মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নবুওয়াত প্রদানের সঙ্গে সঙ্গেই জিবরিল (আ) কে পাঠিয়ে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামিন তাঁকে সালাত আদায়ের পদ্ধতি শিখিয়ে দেন। এটি এমন এক প্রক্রিয়া যার অনুশীলন মুমিনদের মাঝে অনুপম নৈতিক শক্তি সৃষ্টি করে। যেমন আল্লাহ্‌ বলেন- “নিশ্চয়ই নামাজ সকল অশ্লীল ও খারাপ কাজ থেকে দূরে রাখে”।

নামাজ কায়েম করা অর্থ শুধু নামাজ পড়ে নেয়া নয়; বরং নামাজের যাবতীয় নিয়মাবলী পরিপূর্ণভাবে এবং সময়মত আদায় করা। অতঃপর এর উপর অবিচল থাকা।

وَأْمُرْ بِالْمَعْرُوفِ وَانْهَ عَنْ الْمُنكَرِ

অর্থাৎ সৎকাজের হুকুম দাও, খারাপ কাজে নিষেধ করো।

হাদিসে এসেছে, রাসুল(সাঃ) বলেছেন-

«من رأى منكم منكراً فليغيره بيده ، فإن لم يستطع فبلسانه ، فإن لم يستطع فبقلبه ، وذلك أضعف الإيمان»

অর্থ:“তোমাদের কেউ যদি কোন অন্যায় কাজ সংঘটিত হতে দেখে, তখন সে তাকে তার হাত দ্বারা প্রতিহত করবে। আর যদি তা সম্ভব না হয়, তবে তার মুখ দ্বারা। আর তাও যদি সম্ভব না হয়, তাহলে সে অন্তর দিয়ে ঘৃণা করবে। আর এ হল, ঈমানের সর্বনিম্নস্তর।”

ِ وَاصْبِرْ عَلَى مَا أَصَابَكَ

অর্থাৎ যত বিপদই আসুক সে জন্য সবর করো৷

এর মধ্যে এদিকে একটি সূক্ষ্ণ ইঙ্গিত রয়েছে যে, সৎকাজের হুকুম দেয়া এবং অসৎকাজে নিষেধ করার দায়িত্ব যে ব্যক্তিই পালন করবে তাকে অনিবার্যভাবে বিপদ আপদের মুখোমুখি হতে হবে। এ ধরনের লোকের পেছনে দুনিয়া কোমর বেঁধে লেগে যাবে এবং সব ধরনের কষ্টের সম্মুখীন তাকে হতেই হবে।

সূরা আল ‘আনকাবুতের ২ ও ৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামিন বলেন,

اَحَسِبَ النَّاسُ اَنْ يُّتْرَكُوْآ اَنْ يَّقُوْلُوْآ امَنَّا وَهُمْ لاَ يُفْتَنُوْنَ 0 وَلَقَدْ فَتَنَّا الَّذِيْنَ مِنْ قَبْلِهِمْ فَلَيَعْلَمَنَّ اللهُ الَّذِيْنَ صَدَقُوْا وَلَيَعْلَمَنَّ الْكَاذِبِيْنَ0

‘লোকেরা কি মনে করেছে যে ‘আমরা ঈমান এনেছি’ এই কথা বললেই তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হবে এবং তাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না? অথচ তাদের পূর্ববর্তীদেরকে আমি পরীক্ষা করেছি। আল্লাহকে তো জানতে হবে ঈমানের দাবিতে কারা সত্যবাদী আর কারা মিথ্যাবাদী।’

সবর অতীব গুরুত্বপূর্ণ একটি গুণ। মুমিনদেরকে এই গুণে গুণান্বিত হওয়ার জন্য আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামিন বারবার তাকিদ করেছেন। আল হাদিসেও এই বিষয়ে তাকিদ রয়েছে।

★রোগ-ব্যাধির কষ্ট বরদাশত করার নাম সবর।

★দুঃখ-বেদনায় ভেঙে না পড়ার নাম সবর।

★অনভিপ্রেত কথা ও আচরণে উত্তেজিত না হওয়ার নাম সবর।

★পাপের পথে গিয়ে লাভবান হওয়ার চেয়ে পুণ্যের পথে থেকে ক্ষতিকে মেনে নেয়ার নাম সবর।

★মিথ্যা প্রচারণার মুখে অবিচলিত থাকার নাম সবর।

★ভীতিপ্রদ পরিস্থিতিতেও সঠিক পথে দৃঢ়পদ থাকার নাম সবর।

★লক্ষ্য হাসিলের জন্য দুঃখ-কষ্ট সহ্য করার নাম সবর।

★লক্ষ্য অর্জন বিলম্বিত হচ্ছে দেখে হতাশ বা নিরাশ না হওয়ার নাম সবর।

★বিরোধিতার বীরোচিত মোকাবেলার নাম সবর। ইত্যাদি।

রাসূল সা. বলেন,

«المؤمن الذي يخالط الناس ويصبر على أذاهم ، أفضل من المؤمن الذي لا يخالط الناس ولا يصبر على أذاهم».

“যে ঈমানদার মানুষের সাথে উঠা-বসা ও লেনদেন করে এবং তারা যে সব কষ্ট দেয়. তার উপর ধৈর্য ধারণ করে, সে— যে মুমিন মানুষের সাথে উঠা-বসা বা লেনদেন করে না এবং কোন কষ্ট বা পরীক্ষার সম্মুখীন হয় না—তার থেকে উত্তম।”

إِنَّ ذَلِكَ مِنْ عَزْمِ الأُمُورِ

অর্থাৎ একথাগুলোর জন্য অবশ্যই জোর তাকিদ করা হয়েছে৷

এর দ্বিতীয় অর্থ হতে পারে, এটি বড়ই হিম্মতের কাজ। মানবতার সংশোধন এবং তার সংকট উত্তরণে সাহায্য করার কাজ কম হিম্মতের অধিকারী লোকদের পক্ষে সম্ভব নয়। এসব কাজ করার জন্য শক্ত বুকের পাটা দরকার।


★১৮ নং আয়াতের ব্যাখ্যা-

وَلا تُصَعِّرْ خَدَّكَ لِلنَّاسِ

অর্থাৎ আর অহঙ্কারবশে মানুষকে অবজ্ঞা করোনা।

صَعِّر বলা হয় আরবী ভাষায় একটি রোগকে। এ রোগটি হয় উটের ঘাড়ে। এ রোগের কারণে উট তার ঘাড় সবসময় একদিকে ফিরিয়ে রাখে। এর মর্মার্থ এই যে, লোকের সাথে সাক্ষাত বা কথোপকথনের সময় মুখ ফিরিয়ে রেখোনা, যা তাদের প্রতি উপেক্ষা ও অবজ্ঞার নিদর্শন এবং শিষ্টাচার পরিপন্থী। এটি অহঙ্কারের প্রকাশ।

আল্লামা ইবনে কাসীর রহ. বলেন, ‘যখন তুমি কথা বল অথবা তোমার সাথে মানুষ কথা বলে, তখন তুমি মানুষকে ঘৃণা করে অথবা তাদের উপর অহংকার করে, তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখবে না। তাদের সাথে হাস্যোজ্জ্বল হয়ে কথা বলবে। তাদের জন্য উদার হবে এবং তাদের প্রতি বিনয়ী হবে।’কারণ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

تبسمك في وجه أخيك لك صدقة .

“তোমার অপর ভাইয়ের সম্মুখে তুমি মুচকি হাসি দিলে, তাও সদকা হিসেবে পরিগণিত হবে।”

وَلا تَمْشِ فِي الأَرْضِ مَرَحاً

অর্থাৎ পৃথিবীর বুকে উদ্ধত ভঙ্গিতে চলো না।

এর মানে হচ্ছে, ক্ষমতাগর্বী ও অহংকারীদের মতো আচরণ করো না । এ নির্দেশটি ব্যক্তিগত কর্মপদ্ধতি ও জাতীয় আচরণ উভয়ের ওপর সমানভাবে প্রযোজ্য । এ নির্দেশের বদৌলতেই এ ঘোষণাপত্রের ভিত্তিতে মদীনা তাইয়েবায় যে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয় তার শাসকবৃন্দ, গভর্নর ও সিপাহসালারদের জীবনে ক্ষমতাগর্ব ও অহংকারের ছিঁটেফোটাও ছিল না । এমনকি যুদ্ধরত অবস্থায়ও কখনো তাদের মুখ থেকে দম্ভ ও অহংকারের কোন কথাই বের হতো না । তাদের ওঠা বসা, চাল চলন, পোশাক- পরিচ্ছদ, ঘর- বাড়ি, সওয়ারী ও সাধারণ আচার – আচরণের নম্রতা ও কোমলতা বরং ফকিরী ও দরবেশীর ছাপ স্পষ্ট দেখা যেতো । যখন তারা বিজয়ীর বেশে কোন শহরে প্রবেশ করতেন তখনও দর্প ও অহংকার সহকারে নিজেদের ভীতি মানুষের মনে বসিয়ে দেবার চেষ্টা করতেন না

আল্লাহ্‌ তায়ালা কোরআন শরীফের আরেক স্থানে বলেছেন-

“যমীনে দম্ভভরে চলাফেরা করোনা। যেহেতু না তুমি যমিনকে ধ্বংস করতে পারবে, না পাহাড়ের উচ্চতায় পৌঁছুতে পারবে”।(১৭:৩৭)

অহঙ্কারের পরিচয়ে রাসূল(সাঃ) বলেছেন- “অহঙ্কার এরই নাম যে, তুমি সত্যকে ঘৃণা করবে এবং লোকদেরকে তুচ্ছ জ্ঞান করবে”।(ইবনে কাসীর)

إِنَّ اللَّهَ لا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ

অর্থাৎ আল্লাহ কোন দাম্ভিক ও অহংকারীকে পছন্দ করেন না৷

مُخْتَالٍ মানে হচ্ছে, এমন ব্যক্তি যে নিজেই নিজেকে কোন বড় কিছু মনে করে। আর فَخُورٍ তাকে বলে ,যে নিজের বড়াই করে অন্যের কাছে। মানুষের চালচলনে অহংকার, দম্ভ ও ঔদ্ধত্যের প্রকাশ তখনই অনিবার্য হয়ে উঠে , যখন তার মাথায় নিজের শ্রেষ্ঠত্বের বিশ্বাস ঢুকে যায় এবং সে অন্যদেরকে নিজের বড়াই ও শ্রেষ্ঠত্ব অনুভব করাতে চায় ৷


★১৯ নং আয়াতের ব্যাখ্যা-

وَاقْصِدْ فِي مَشْيِكَ

অর্থাৎ নিজের চালচলনে ভারসাম্য আনো।

কোন কোন মুফাসসির এর এই অর্থ গ্রহণ করেছেন যে, “দ্রুতও চলো না এবং ধীরেও চলো না বরং মাঝারি চলো।” কিন্তু পরবর্তী আলোচনা থেকে পরিষ্কার জানা যায়, এখানে ধীরে বা দ্রুত চলা আলোচ্য বিষয় নয়। ধীরে বা দ্রুত চলার মধ্যে কোন নৈতিক গুণ বা দোষ নেই এবং এ জন্য কোন নিয়মও বেঁধে দেয়া যায় না। কাউকে দ্রুত কোন কাজ করতে হলে সে দ্রুত ও জোরে চলবে না কেন। আর যদি নিছক বেড়াবার জন্য চলতে থাকে তাহলে এ ক্ষেত্রে ধীরে চলায় ক্ষতি কি ৷ মাঝারি চালে চলার যদি কোন মানদণ্ড থেকেই থাকে, তাহলে প্রত্যেক অবস্থায় প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য তাকে একটি সাধারণ নিয়মে পরিণত করা যায় কেমন করে ৷ আসলে এখানে উদ্দেশ্য হচ্ছে, প্রবৃত্তির এমন অবস্থার সংশোধন যার প্রভাবে চলার মধ্যে দম্ভ অথবা দীনতার প্রকাশ ঘটে। বড়াই করার অহমিকা যদি ভেতরে থেকে যায় তাহলে অনিবার্যভাবে তা একটি বিশেষ ধরনের চাল-চলনের মাধ্যমে বের হয়ে আসে। এ অবস্থা দেখে লোকটি যে কেবল অহংকারে মত্ত হয়েছে, একথাই জানা যায় না, বরং তার চাল-চলনের রং ঢং তার অহংকারের স্বরূপটিও তুলে ধরে। ধন-দওলত, ক্ষমতা-কর্তৃত্ব, সৌন্দর্য, জ্ঞান, শক্তি এবং এ ধরনের অন্যান্য যতো জিনিসই মানুষের মধ্যে অহংকার সৃষ্টি করে তার প্রত্যেকটির দম্ভ তার চাল-চলনে একটি বিশেষ ভঙ্গি ফুটিয়ে তোলে। পক্ষান্তরে চাল-চলনে দীনতার প্রকাশ ও কোন না কোন দূষণীয় মানসিক অবস্থার প্রভাবজাত হয়ে থাকে। কখনো মানুষের মনের সুপ্ত অহংকার একটি লোক দেখানো বিনয় এবং কৃত্রিম দরবেশি ও আল্লাহ প্রেমিকের রূপ লাভ করে এবং এ জিনিসটি তার চাল-চলনে সুস্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। আবার কখনো মানুষ যথার্থই দুনিয়া ও তার অবস্থার মোকাবিলায় পরাজিত হয় এবং নিজের চোখে নিজেই হেয় হয়ে দুর্বল চালে চলতে থাকে। লুকমানের উপদেশের উদ্দেশ্য হচ্ছে, নিজের মনের এসব অবস্থার পরিবর্তন করো এবং একজন সোজা-সরল- যুক্তিসঙ্গত ভদ্রলোকের মতো চলো, যেখানে নেই কোন অহংকার ও দম্ভ এবং কোন দুর্বলতা, লোক দেখানো বিনয় ও ত্যাগ।

এ ব্যাপারে সাহাবায়ে কেরামের রুচি যে পর্যায়ের গড়ে উঠেছিল তা এ ঘটনাটি থেকেই অনুমান করা যেতে পারে। হযরত উমর (রা) একবার এক ব্যক্তিকে মাথা হেঁট করে চলতে দেখলেন। তিনি তাকে ডেকে বললেন, “মাথা উঁচু করে চলো। ইসলাম রোগী নয়।” আর একজনকে তিনি দেখলেন যে কুঁকড়ে চলছে। তিনি বললেন, “ওহে জালেম! আমাদের দীনকে মেরে ফেলছো কেন ৷ এ দুটি ঘটনা থেকে জানা যায় , হযরত উমরের কাছে দীনদারীর অর্থ মোটেই এটা ছিল না যে, পথ চলার সময় রোগীর মতো আচরণ করবে এবং অযথা নিজেকে দীনহীন করে মানুষের সামনে পেশ করবে। কোন মুসলমানকে এভাবে চলতে দেখে তার ভয় হতো, এভাবে চললে অন্যদের সামনে ইসলামের ভুল প্রতিনিধিত্ব করা হবে এবং মুসলমানদের মধ্যেই নিস্তেজ ভাব সৃষ্টি হয়ে যাবে। এমনি ঘটনা হযরত আয়েশার (রা) ব্যাপারে একবার ঘটে। তিনি দেখলেন একজন লোক কুঁকড়ে মুকড়ে রোগীর মতো চলছে। জিজ্ঞেস করলেন, কি হয়েছে ৷ বলা হলো, ইনি একজন কারী (অর্থাৎ কুরআন অধ্যয়ন ও অধ্যাপনা করেন এবং শিক্ষাদান ও ইবাদত করার মধ্যে মশগুল থাকেন) এ কথা শুনে হযরত আয়েশা (রা) বললেন, “উমর ছিলেন কারীদের নেতা। কিন্তু তার অবস্থা ছিল, পথে চলার সময় জোরে জোরে হাঁটতেন। যখন কথা বলতেন, জোরে জোরে বলতেন। যখন মারধর করতেন খুব জোরেশোরে মারধর করতেন।”

কিন্তু চিন্তার বিষয় হচ্ছে , মানুষের চলার মধ্যে এমন কি গুরুত্ব আছে যে কারণে এই বিষয়ে তাকিদ দেয়া হয়েছে ৷ এ প্রশ্নটিকে যদি একটু গভীর দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করা হয় তাহলে বুঝা যায় যে , মানুষের চলা শুধুমাত্র তার হাঁটার একটি ভংগীর নাম নয় বরং আসলে এটি হয় তার মন-মানস , চরিত্র ও নৈতিক কার্যাবলীর প্রত্যক্ষ প্রতিফলন। একজন আত্মমর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তির চলা , একজন গুণ্ডা ও বদমায়েশের চলা , একজন স্বৈরাচারী ও জালেমের চলা , একজন আত্মম্ভরী অহংকারীর চলা , একজন সভ্য-ভব্য ব্যক্তির চলা , একজন দরিদ্র-দীনহীনের চলা এবং এভাবে অন্যান্য বিভিন্ন ধরনের লোকদের চলা পরস্পর থেকে এত বেশী বিভিন্ন হয় যে, তাদের প্রত্যেককে দেখে কোন ধরনের চলার পেছনে কোন ধরনের ব্যক্তিত্ব কাজ করছে তা সহজেই অনুমান করা যেতে পারে। এ কারণেই লুক্বমানের উপদেশের মধ্যে এই বিষয়টি উঠে এসেছে।

وَاغْضُضْ مِنْ صَوْتِكَ

অর্থাৎ এবং কণ্ঠস্বর নীচু করো৷

যার মানে হল, কণ্ঠস্বরকে প্রয়োজনাতিরিক্ত উচ্চ করা যাবেনা এবং হট্টগোল করা যাবেনা।

হযরত হুসাইন(রাঃ) বর্ণনা করেন, আমি আমার পিতা আলী(রাঃ) কে রাসুলুল্লাহ(সাঃ) এর মানুষের সাথে উঠাবসা, মেলামেশার সময় তাঁর আচার ব্যবহার ও প্রকৃতি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করায় তিনি বললেন- নবীজি(সাঃ) সবসময় প্রসন্ন ও হাস্যোজ্জ্বল মনে হত; তাঁর চরিত্রে নম্রতা এবং আচার ব্যবহারে বিনয় বিদ্যমান ছিল। তাঁর স্বভাব মোটেই রুক্ষ ছিলনা, কথাবার্তাও নিরস ছিলনা। তিনি উচ্চস্বরে বা অশ্লীল কথা বলতেননা, কারো প্রতি দোষারোপও করতেননা। কৃপণতা প্রকাশ করতেননা। যেসব জিনিস মনপুত না হত, সেগুলোর প্রতি আসক্তি প্রকাশ করতেননা। কিন্তু (সেগুলো হালাল হলে, তার প্রতি কারো আকর্ষণ থাকলে) তা থেকে কাউকে নিরাশ করতেননা এবং সে সম্পর্কে কোন মন্তব্যও করতেননা, তিনটি বিষয় তিনি সবসময় পরিহার করতেন- ঝগড়া বিবাদ, অহঙ্কার এবং অপ্রয়োজনীয় ও অর্থহীন কাজে আত্মনিয়োগ করা।(শামায়েলে তিরমিজী)

إِنَّ أَنكَرَ الأَصْوَاتِ لَصَوْتُ الْحَمِيرِ

অর্থাৎ নিঃসন্দেহে গাধার আওয়াজই সব আওয়াজের মধ্যে সবচেয়ে অপ্রীতিকর৷

এর মানে এ নয় যে, মানুষ সবসময় আস্তে নীচু স্বরে কথা বলবে এবং কখনো জোরে কথা বলবে না। বরং গাধার আওয়াজের সাথে তুলনা করে কোন ধরনের ভাব-ভঙ্গিমা ও কোন ধরনের আওয়াজে কথা বলা থেকে বিরত থাকতে হবে তা পরিষ্কার করে বলে দেয়া হয়েছে। ভঙ্গী ও আওয়াজের এক ধরনের নিম্নগামিতা ও উচ্চগামিতা এবং কঠোরতা ও কোমলতা হয়ে থাকে স্বাভাবিক ও প্রকৃত প্রয়োজনের খাতিরে। যেমন কাছের বা কম সংখ্যক লোকের সাথে কথা বললে আস্তে ও নীচু স্বরে বলবেন। দূরের অথবা অনেক লোকের সাথে কথা বলতে হলে অবশ্যই জোরে বলতে হবে। উচ্চারণভঙ্গীর ফারাকের ব্যাপারটাও এমনি স্থান-কালের সাথে জড়িত। প্রশংসা বাক্যের উচ্চারণভঙ্গী নিন্দা বাক্যের উচ্চারণভঙ্গী থেকে এবং সন্তোষ প্রকাশের কথার ঢং এবং অসন্তোষ প্রকাশের কথার ঢং বিভিন্ন হওয়াই উচিত। এ ব্যাপারটা কোন অবস্থায়ই আপত্তিকর নয়। হযরত লুকমানের নসীহতের অর্থ এ নয় যে, এ পার্থক্যটা উঠিয়ে দিয়ে মানুষ সবসময় একই ধরনের নীচু স্বরে ও কোমল ভঙ্গীমায় কথা বলবে। আসলে আপত্তিকর বিষয়টি হচ্ছে অহংকার প্রকাশ, ভীতি প্রদর্শন এবং অন্যকে অপমানিত ও সন্ত্রস্ত করার জন্য গলা ফাটিয়ে গাধার মতো বিকট স্বরে কথা বলা।

হযরত আবু হুরায়রা(রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী করীম(সাঃ) বলেছেন-

»إذا سمعتم أصوات الديكة ، فسلوا الله من فضله ، فإنها رأت ملكاً ، وإذا سمعتم نهيق الحمار فتعوذوا بالله من الشيطان ، فإنها رأت شيطاناً» .

যখন তোমরা মোরগের ডাক শুনবে, তখন আল্লাহ্‌ তায়ালার কাছে অনুগ্রহ প্রার্থনা করবে। আর যখন গাধার ডাক শুনবে, তখন শয়তানের কাছ থেকে তাঁর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করবে। কেননা সে শয়তানকে দেখতে পায়। (নাসাঈ)



•শিক্ষাঃ

★১) এসব জ্ঞানগর্ভ উপদেশসমুহের সর্বাগ্রে হল আকীদার পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে- আল্লাহ্‌ তায়ালার সাথে কাউকে শরীক করা যাবেনা। মাতা পিতার সাথে সদ্ব্যবহার ও তাদের আনুগত্য করা ফরজ। তবে তারা যদি শিরক করতে বাধ্য করতে করতে চান, তবে সে কথা মানা হারাম হয়ে যাবে। তথাপি দুর্ব্যবহার না করে সাধ্যমত ভালো আচরণ করতে হবে।

★২) দ্বিতীয় উপদেশ আকাইদ সম্পর্কে- মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তুকণা আল্লাহ্‌ রাব্বুল আলামিনের আওতাধীন। তিনি চাইলে কাছের দূরের যে কোন বিষয় আমাদের সামনে নিয়ে আসতে পারেন, যেমনটি তিনি বিচার দিবসে করবেন।

★৩) তৃতীয় উপদেশ কর্মের পরিশুদ্ধতা সম্পর্কে- নামাজ প্রতিষ্ঠা করা।

★৪) চতুর্থ উপদেশ চরিত্র সংশোধন সম্পর্কে- সৎ কাজের আদেশ ও খারাপ কাজে বাঁধা দেয়া, বিপদে ধৈর্য ধারণ করা।

★৫) পঞ্চম উপদেশ সামাজিক শিষ্টাচার সম্পর্কে- কোন মানুষকে অবজ্ঞা করা যাবেনা, চলাফেরায় কথা বার্তায় অহঙ্কার প্রকাশ করা যাবেনা, সংযতভাবে কথা বলতে হবে।

Friday, March 1, 2024

দারসুল কুরআন: সুরাতুল বাক্বারাহ || ১৮৩নং থেকে ১৮৬নং আয়াত || মাহে রমজান এর গুরুত্ব, তাৎপর্য ও নিয়মাবলি


মাহে রমজান এর গুরুত্ব, তাৎপর্য ও নিয়মাবলি

দারসুল কুরআন | সুরা আল বাক্বারাহ | ১৮৩নং থেকে ১৮৬নং আয়াত
•আরবি ইবারত:
১৮৩:
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا كُتِبَ عَلَیْكُمُ الصِّیَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِیْنَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُوْنَۙ
১৮৪:
اَیَّامًا مَّعْدُوْدٰتٍ١ؕ فَمَنْ كَانَ مِنْكُمْ مَّرِیْضًا اَوْ عَلٰى سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِّنْ اَیَّامٍ اُخَرَ١ؕ وَ عَلَى الَّذِیْنَ یُطِیْقُوْنَهٗ فِدْیَةٌ طَعَامُ مِسْكِیْنٍ١ؕ فَمَنْ تَطَوَّعَ خَیْرًا فَهُوَ خَیْرٌ لَّهٗ١ؕ وَ اَنْ تَصُوْمُوْا خَیْرٌ لَّكُمْ اِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ
১৮৫:
شَهْرُ رَمَضَانَ ٱلَّذِىٓ أُنزِلَ فِيهِ ٱلْقُرْءَانُ هُدًى لِّلنَّاسِ وَبَيِّنَـٰتٍ مِّنَ ٱلْهُدَىٰ وَٱلْفُرْقَانِ‌ۚ فَمَن شَهِدَ مِنكُمُ ٱلشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ‌ۖ وَمَن كَانَ مَرِيضًا أَوْ عَلَىٰ سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِّنْ أَيَّامٍ أُخَرَ‌ۗ يُرِيدُ ٱللَّهُ بِكُمُ ٱلْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ ٱلْعُسْرَ وَلِتُكْمِلُواْ ٱلْعِدَّةَ وَلِتُكَبِّرُواْ ٱللَّهَ عَلَىٰ مَا هَدَٮٰكُمْ وَلَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ
১৮৬:
 فَإِنِّى قَرِيبٌ‌ۖ أُجِيبُ دَعْوَةَ ٱلدَّاعِ إِذَا دَعَانِ‌ۖ فَلْيَسْتَجِيبُواْ لِى وَلْيُؤْمِنُواْ بِى لَعَلَّهُمْ يَرْشُدُونَ


•সরল বাংলা অনুবাদ:
১৮৩:
 হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোযা ফরয করে দেয়া হয়েছে যেমন তোমাদের পূর্ববর্তী নবীদের অনুসারীদের ওপর ফরয করা হয়েছিল। এ থেকে আশা করা যায়, তোমাদের মধ্যে তাকওয়ার গুণাবলী সৃষ্টি হয়ে যাবে।
১৮৪:
এ কতিপয় নির্দিষ্ট দিনের রোযা। যদি তোমাদের কেউ হয়ে থাকে রোগগ্রস্ত অথবা মুসাফির তাহলে সে যেন অন্য দিনগুলোয় এই সংখ্যা পূর্ণ করে। আর যাদের রোযা রাখার সামর্থ আছে (এরপরও রাখে না) তারা যেন ফিদিয়া দেয়। একটি রোযার ফিদিয়া একজন মিসকিনকে খাওয়ানো। আর যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় ও সানন্দে কিছু বেশী সৎকাজ করে, তা তার জন্য ভালো। তবে যদি তোমরা সঠিক বিষয় অনুধাবন করে থাকো তাহলে তোমাদের জন্য রোযা রাখাই ভালো।
১৮৫:
রমযানের মাস, এ মাসেই কুরআন নাযিল করা হয়েছে, যা মানবজাতির জন্য পুরোপুরি হিদায়াত এবং এমন দ্ব্যর্থহীন শিক্ষা সম্বলিত, যা সত্য-সঠিক পথ দেখায় এবং হক ও বাতিলের পার্থক্য সুস্পষ্ট করে দেয়। কাজেই এখন থেকে যে ব্যক্তি এ মাসের সাক্ষাত পাবে তার জন্য এই সম্পূর্ণ মাসটিতে রোযা রাখা অপরিহার্য এবং যে ব্যক্তি রোগগ্রস্ত হয় বা সফরে থাকে, সে যেন অন্য দিনগুলোয় রোযার সংখ্যা পূর্ণ করে। আল্লাহ তোমাদের সাথে নরম নীতি অবলম্বন করতে চান, কঠোর নীতি অবলম্বন করতে চান না। তাই তোমাদেরকে এই পদ্ধতি জানানো হচ্ছে, যাতে তোমরা রোযার সংখ্যা পূর্ণ করতে পারো এবং আল্লাহ‌ তোমাদের যে হিদায়াত দান করেছেন সেজন্য যেন তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করতে ও তার স্বীকৃতি দিতে এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারো।
১৮৬:
আর হে নবী! আমার বান্দা যদি তোমার কাছে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, তাহলে তাদেরকে বলে দাও, আমি তাদের কাছেই আছি। যে আমাকে ডাকে আমি তার ডাক শুনি এবং জবাব দেই, কাজেই তাদের আমার আহবানে সাড়া দেয়া এবং আমার ওপর ঈমান আনা উচিত একথা তুমি তাদের শুনিয়ে দাও, হয়তো সত্য-সরল পথের সন্ধান পাবে। 

নামকরণ:
সূরায়ে বাকারায় অষ্টম রুকুতে বণী ইসরাইলদের প্রতি- إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تَذْبَحُوا بَقَرَةً - নির্দেশ দেয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এ সূরার নামকরণ করা হয়।
 

শানে নুযূল: 
হযরত সালমা ইবনুল আকওয়া (রাঃ) বর্ণনা করেন যে-
 وَعَلَى الَّذِيْنَ يُطَيْقُونَهُ فَدْيَةٌ শীর্ষক আয়াতটি নাযিল হয়, তখন আমাদেরকে এ মর্মে ইখতিয়ার দেয়া হয়েছিল, যার ইচ্ছা হয় সে রোযা রাখতে পারে আর যে রোযা রাখতে না চায় ফিদিয়া দিয়ে দেবে। এরপর যখন পরবর্তী আয়াত فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ নাযিল হলো, তখন ফিদিয়া দেয়ার ইখতিয়ার রহিত হয়ে সুস্থ সামর্থ্যবান লোকদের ওপর শুধুমাত্র রোযা রাখাই জরুরী সাব্যস্ত হয়ে গেল এবং বলা হলো যে, রোযা শুধুমাত্র তোমাদের উপরই ফরয করা হয়নি বরং পূর্ববর্তী উম্মতদের উপরও ফরয ছিলো। অতএব তোমাদের যার জীবনেই এটা পাবে অবশ্যই তাকে রোযা রাখতে হবে।

এ সূরাটি নাযিল হওয়ার আরো উল্লেখযোগ্য কারণ হল প্রথমতঃ ইহুদীদের ইতিহাস বর্ণনা করে তাদের সামনে ইসলামের মূলনীতি উপস্থাপন। 
দ্বিতীয়তঃ মুসলমানদের জন্য ইসলামী রাষ্ট্রের মূলনীতি ঘোষণা। 
তৃতীয়তঃ কাফেরদের সর্বাত্মক বিরোধীতার মোকাবিলার পদ্ধতি। 
চতুর্থঃ মুনাফিকদের চরিত্র বিশ্লেষণ।

আলোচ্য বিষয়:
১. 'সাওম' ইসলামের মৌলিক ইবাদত, এ অংশে তার গুরুত্ব ও বিধি বিধান শিক্ষা দেয়া হয়েছে।
২ সিয়াম সাধনার মাধ্যমে 'তাকওয়া' অর্জন করে কুরআন বুঝার প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জন।
৩. কুরআন নাজিলের কারণেই যে রমযান মাসের এত গুরুত্ব সে ব্যাপারে আলোচনা করা হয়েছে।

•শাব্দিক অর্থ ও তার ব্যাখ্যা:
كتب (কুতিবা) ফরয করে দেয়া হয়েছে। লিখে দেয়া হয়েছে। আবশ্যকীয় করে দেয়া হয়েছে, বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

الصَّيَامُ এটা صَوْمٌ সাওম শব্দের বহুবচন। আর সাওম শব্দের অর্থ হচ্ছে বিরত থাকা, কোন কিছুকে পরিত্যাগ করা। ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় 'সুবহেসাদেক হতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সকল প্রকার পানাহার, ভোগ-বিলাস থেকে বিরত থাকা-সাথে সাথে সকল প্রকার রিপু বন্ধ রেখে আল্লাহ্ ও রাসূলের যাবতীয় নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকা।

قلكُمْ তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের, অতীত জমানার লোকদের, পূর্বেকার যুগের লোকদের। এখানে অন্যান্য নবীগণের উম্মতদেরকে উদ্দেশ্য করা হয়েছে।

تَتَّقُوْن (তাত্তাকুন) তাওয়া অর্জন করবে, খোদাভীরু হবে, পরহেজগারী অবলম্বন করবে, আল্লাহভীতি অর্জন করবে, সংযমশীল হবে।

أَيَّامًا مَّعْدُودَات গনা কয়েকদিন, কতেক দিন, নির্দিষ্ট দিন, সুনির্ধারিত দিন। এখানে 'আইয়ামাম মা'দুদাত' বলে রমযান মাসের নির্ধারিত দিনগুলোকে বুঝানো হয়েছে।

مريضًا (মারিদান) রুগ্নাবস্থা, অসুস্থ, এমন অসুস্থতা যাতে সাওম পালন করার কারণে তার রোগ বৃদ্ধি পেতে পারে। ডাক্তার সাওম না রাখার পরামর্শ দিতে পারে।

سفر (সাফারিন) সফর অবস্থা, ভ্রমণ অবস্থায়, ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় মুসাফির ঐ ব্যক্তিকে বলে, যিনি ৪৮ মাইল বা ৭৩ কিঃ মিঃ (প্রায়) পথ অতিক্রম করেন।

فَعِدَّةٌ مِنْ أَيَّامٍ أُخْرَ উপরোক্ত দু'অবস্থা তার যতদিন থাকবে, আল্লাহর নির্দেশ হলো সে অন্য মাসে ততদিন রোযা রাখবে।

فدْيّة বদলা, পরিবর্তে যা দেয়া হয়। এখানে রোজা না রাখলে তার' বদলা তথা ফিদিয়া দেয়ার কথা বলা হচ্ছে। وَعَلَى الَّذِيْنَ يُطِيْقُوْنَهُ থেকে আয়াতের শেষাংশটুকু ইসলামের প্রাথমিক যুগে লোকজনের রোযায় অভ্যস্ত করানোর উদ্দেশ্যে অবতীর্ণ হয়েছিলো। পরবর্তী পর্যায়ে এর পরের আয়াত (১৮৫ নং আয়াত) অবতীর্ণ করে উপরোক্ত হুকুম রহিত করা হয়।
الزل নাযিল করা হয়েছে। অবতীর্ণ করা হয়েছে, এখানে انزل বলতে এক সাথে লওহে মাহফুজ থেকে দুনিয়ার আকাশে অবর্তীর্ণ করার কথা বুঝানো হচ্ছে।
بینت (বাইয়েনাত) দলিল প্রমাণসমূহ, বিস্তারিত, বিশ্লেষণ, হিদায়াতের নির্দেশিকা বা নীতিমালা।

الْفَرْقَانِ (আলফুরক্বান) পার্থক্য সূচনাকারী গ্রন্থ, যে গ্রন্থ সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করে। এখানে মহাগ্রন্থ আলকুরআনকে বুঝানো হচ্ছে। এটা কুরআন এর একটি নামও বটে।

فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ (ফামানশাহেদা মিনকুম) অতঃপর তোমাদের মধ্য হতে যে কেউ এ মাসের সাক্ষাৎ পাবে। এ মাসে উপস্থিত থাকবে। রমযান মাস পাবে।

ٱلْيُسْرَ (ইউসরা) মূল ধাতু হচ্ছে 'ইউসরুন', অর্থ-সহজ আরামদায়ক, সহনশীল, ভারসাম্যপূর্ণ, সরল ইত্যাদি।

ٱلْعُسْرَ (উসুরুন) কাঠিন্যতা, এর বিপরীত শব্দ অর্থ সহজ-সরল নয় বরং কঠিন, সাধ্যের বাইরে।

لِتُكْمِلُوا الْعَدَّةَ যাতে তোমরা কাজা রোযার দিন পরবর্তীতে পুরো করে নিতে পারো। এজন্য কাজা করার সিস্টেম করা হয়েছে।

وَتُتُكْبَرُوا اللَّهُ যাতে করে তোমরা আল্লাহর মহত্ব ও বড়ত্ব ঘোষণা করতে পারো। আল্লাহ্র শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করতে পারো।

•রমজান (রোজা) সম্পর্কিত আলোচনা:

১. সাউম সংক্রান্ত শরয়ী বিধান:
ক) সাউম কাকে বলে: রোযাকে আরবী ভাষায় 'সাউম' বহুবচনে সিয়াম বলা হয়। এর আভিধানিক অর্থ হলো কোন কিছু থেকে বিরত থাকা বা কোন কিছুকে পরিত্যাগ করা।
ইসলামী শরিয়াতের পরিভাষায় সাউম হলো সুবহে সাদেক হতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সকল প্রকার পানাহার ও যৌনক্রিয়া থেকে বিরত থেকে আল্লাহ্ ও রাসূলের নিষিদ্ধ যাবতীয় কাজ থেকে বিরত থাকা।

খ) সাউম এর প্রকারভেদ: ইসলামী শরীয়াতের নিয়মানুযায়ী প্রাথমিকভাবে সাউম দুই প্রকার-

এক. ইতিবাচক (Positive)
দুই. নেতিবাচক (Nagative)

এক. ইতিবাচক সাউম আবার চার প্রকার-
ক) ফরয, খ) ওয়াজিব, গ) সুন্নাত, ঘ) নফল,

ক. ফরয : যা পবিত্র মাহে রমযানের (চন্দ্রমাস) একমাস আদায় করা হয়।
খ. ওয়াজিব: মান্নত বা কাফফারার সাউম।
গ. সুন্নাত: নবীকরীম (সাঃ) যা নিজে করতেন এবং উম্মাতের প্রতি পালনের নির্দেশ দিয়েছেন যেমন আশুরার, আরাফার দিনে ও আইয়ামে বীযের ইত্যাদি।
ঘ. নফল: উল্লেখিত তিন প্রকার ব্যতীত সকল ইতিবাচক সাউমই নফল। যেমন শাওয়াল মাসের ছয়টি রোযা।

দুই. নেতিবাচক সাউম দুই প্রকার:
ক) মাকরুহ, খ) হারাম,

ক. মাকরুহ: যে কোন একদিন নির্দিষ্ট করে সাউম পালন করা। স্বামীর অনুমতি ছাড়া স্ত্রীর নফল সাউমও মাকরুহ।
খ. হারাম: বছরের পাঁচ দিন সাউম পালন করা হারাম। দুই ঈদের দুই দিন ও আইয়ামে তাশরীকের তিন দিন। আইয়ামে তাশরীক হলো ১১, ১২, ও ১৩ই জিলহাজ্ব।

গ. সাওম ফরয হওয়ার সময়-কাল: হযরত মুহাম্মদ (স) মক্কা থেকে হিজরত করে মদীনায় উপনীত হলেন তখন তিনি আশুরার রোযা পালন করেন এবং সাহাবীগণকে তা পালন করার নির্দেশ দেন। অতঃপর দ্বিতীয় হিজরীর শাবান মাসে রমযানের রোযা ফরয হয়। রমযানের রোয়া ফরয হওয়ার পূর্বে 'আশুরার' রোযা ফরয ছিল। হিজরতের পর 'আইয়ামুল বিয' এর রোযা ফরয করা হয়েছে। এরপর রমযান মাসের রোযা ফরয হওয়ায় 'আশুরার' ও 'আইয়ামুল বিযের' রোযা মানসুখ হয়ে গিয়েছে। উহা এখন সুন্নাতরূপে পরিগণিত।

. সাউম কেন ফরয করা হলো: সূরায় বাকারার ১৮৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন ঘোষণা করেছেন-
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُوْنَ .
'হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর সিয়াম ফরয করা হয়েছে, যেমনিভাবে ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যাতে করে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে সক্ষম হও।
উক্ত আয়াতের আলোকে আমরা জানতে পেরেছি দুই কারণে সাউম ফরয করা হয়েছে।

প্রথমত: অতীতের সকল নবীর উম্মতের উপর সাউম এর ইবাদত ফরয ছিল তাই।
দ্বিতীয়ত: তাকওয়া বা খোদাভীতি অর্জনের লক্ষ্যে সাউম ফরয হয়েছে।
সাওমের ইহকালীন ও পরকালীন কল্যাণ ও মর্যাদা বিস্তারিত আলোচনার দাবি রাখে।

এই স্বল্প পরিসরে সাউমের ফজিলত বা গুরুত্ব আলোচনা করা সম্ভব নয়। সংক্ষিপ্তভাবে কয়েকটি হাদীসের অনুবাদ উল্লেখ করে শেষ করতে চাই।
قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كُلُّ عَمَلِ ابْنِ آدَمَ يُضَاعَفُ الْحَسَنَةُ بِعَشْرِ أمْثَالِهَا إلى سبع مائة ضعف قَالَ اللهُ تَعَالى الا الصَّوْمَ فَإِنَّهُ لِي وَأَنَا أَجْزِى به .
(بخاری ، مسلم)
রাসূল (সা) বলেছেন- বনী আদমের সকল আমলের বিনিময় দশ থেকে সাতশতগুণ পর্যন্ত দেয়া হবে। (কিন্তু সাওম ব্যতিক্রম)
আল্লাহ্ বলেন- (বনী আদমের সকল আমল তার নিজের) কিন্তু সাউম আমার জন্য তাই আমি নিজেই তাকে এর প্রতিদান দেবো। (বোখারী ও মুসলিম)
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللَّهِ صَلَّى عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيْمَانًا وَاحْسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ . (بخاری ، مسلم)
যে ব্যক্তি ঈমান ও ইহতেসাবের সাথে মাহে রমযানের সিয়াম সাধনা করবে তার অতীতের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে। (বোখারী ও মুসলিম)

قَالَ رَسُوْلُ اللَّهِ صَلَّى عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الصَّيَامُ جُنَّةٌ . (بخاری) 
সাউম ঈমানদারদের জন্য ঢাল স্বরূপ। (বোখারী)

এ ধরনের অসংখ্য হাদীসে রাসূলের মাধ্যমে সাওমের ফজিলত বর্ণনা করা হয়েছে। গভীর অধ্যয়ন ও চিন্তা-ভাবনার মাধ্যমে আমরা সাউমের কল্যাণ লাভ করতে পারবো। ইন্‌শাআল্লাহ্।

২. মাহে রমযানের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যঃ

ক) তাকওয়া অর্জনই মাহে রমযানের উদ্দেশ্য: আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন সূরায় বাকারার ১৮৩ নম্বর আয়াতে (সাউম ফরয হওয়ার উদ্দেশ্য সম্পর্কে) ঘোষণা করেছেন-
يأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِيْنَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُوْنَ .
হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোযা ফরয করা হয়েছে, যেমনিভাবে ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী (উম্মতদের) উপর, যাতে করে তোমরা তাকওয়া, খোদাভীতি ও খোদাপ্রেম অর্জন করতে পারো।

তাই নামায যেমনিভাবে মুমিনদেরকে দৈনিক পাঁচবার আল্লাহ্র দরবারে উপস্থিত হয়ে দাসত্বের স্বীকৃতি দানের মাধ্যমে চরিত্র গঠন ও নিয়ম-শৃঙ্খলা শিক্ষা দিয়ে থাকে, ঠিক তেমনিভাবে শারীরিক ইবাদত সাউম একমাস পূর্ণ ঈমান ও ইহতেসাবের সহিত পালন করলে অবশ্যই খোদাভীতি ও খোদাপ্রেম অর্জিত হবে। এই জন্য আল্লাহ্ পাক এরশাদ করেছেন- 'সাউম আমার জন্যই, যার প্রতিদানও আমি নিজেই' অর্থাৎ ইবাদাত লোক দেখানোর জন্য হতে পারে; কিন্তু সাউম এমন কি ইবাদত, যা একমাত্র আল্লাহ্র ভয়ে আল্লাহর জন্যেই হয়ে থাকে।

খ) রমযানের সাথে কোরআনের সম্পর্ক: আমরা সাধারণত: প্রত্যেক বছর রমযান মাস এলেই ঈমাম, আলেমেদ্বীন ও জুময়ার খোতবার মাধ্যমে রমযান মাসের বিশেষ ফাজিলত ও গুরুত্ব সম্পর্কে শুনে থাকি। এজন্য মুসলিম মিল্লাত রমযান মাসের বিশেষ মূল্য দিয়ে থাকে। কিন্তু আমরা কি ভেবে দেখেছি, রমযান মাসের এত গুরুত্ব ও মর্যাদা কেন হয়েছে? আসুন আমরা রমযানের সাথে কোরআনের আলোচনা করে উক্ত প্রশ্নের সঠিক উত্তর গ্রহণ করি।

আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন সূরায় বাকারার ১৮৫ নম্বর আয়াতে ঘোষণা করেছেন شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِلنَّاسِ وَبَيِّنَتِ مِنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ

মাহে রমযান তো সেই মাস, যে মাসে কুরআন নাযিল করা হয়েছে মানুষের চলার পথের দিক নির্দেশক হিসেবে, যার মাঝে হেদায়াতের দলিল প্রমাণাদি সহ বিস্ত ারিত বিবরণ রয়েছে। আরো রয়েছে ন্যায়-অন্যায় ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যের বিষয়সমূহ। সূরায়ে কদরে আল্লাহ্ তায়ালা বলেছেন-
إِنَّا اَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ -
"নিশ্চয় আমি এই কুরআনকে কদরের রাত্রিতে নাযিল করেছি।"

সুতরাং উল্লেখিত দু'টি আয়াতের মর্মানুযায়ী আমরা অতি সহজেই বুঝতে পারি, কুরআন নাযিলের কারণেই রমযানের এত কদর এত গুরুত্ব হয়েছে। আর কুরআন নাযিলের কারণেই রমযানের সিয়াম সাধনা ফরয করা হয়েছে। অতএব রমযানের সাথে কুরআনের সম্পর্ক আমাদের কাছে এখন সুস্পষ্ট।

গ) তাকওয়া কাকে বলে: তাকওয়া শব্দটি ধাতুগত উৎপত্তির দিক থেকে চিন্তা করলে আরবী ভাষায় এর অর্থ শুধু খোদাভীতি বা খোদাপ্রেম হবে না। আল- কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে যেভাবে তাকওয়ার আলোচনা হয়েছে তাতে মূল উদ্দেশ্য এক হলেও দু'ধরনের অর্থ করতে হবে। যেমন সূরা তাহরীম- এর দুই নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-
قُوْ انْفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا.
(হে ঈমানদারগণ) তোমরা নিজেদেরকে এবং পরিবার পরিজনকে দোযখের আগুন থেকে বাঁচাও।

অতএব তাকওয়ার এক অর্থ যেমন খোদাভীতি অর্জন, মুত্তাকী হওয়া। অর্থাৎ আল্লাহ্র নির্দেশ মানা ও নিষিদ্ধ কাজ থেকে দূরে থাকাই খোদাভীতি। আরেক অর্থ বাঁচা, মুক্তি লাভ করা, নিষ্কৃতি পাওয়া, বিজয় লাভ করা।

সুতরাং বুঝা যাচ্ছে দু'অর্থের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই এবং একটি অন্যটির সম্পূরক। সাউমের উদ্দেশ্য বলতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন যাতে করে তোমরা খোদাভীতি বা তাকওয়া অর্জন করতে পারো। অর্থাৎ এর মাধ্যমে তোমরা প্রকৃতপক্ষে পরিত্রাণ পাবে বা মুক্তি লাভ করবে।

ঘ) তাকওয়ার বাস্তব অবস্থা: এখানে তাকওয়ার বাস্তব অবস্থাটা বা তাকওয়ার সুফল আল-কুরআন থেকে সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরা হচ্ছে। যেমন আল্লাহ্ বলেছেন- وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ لَيَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقُهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ

যারা আল্লাহ্ ভীতির মাধ্যমে জীবন যাপন করে, আল্লাহ্ তাদের চলার পথ খুলে দেন। আর তাদেরকে এমন জায়গা থেকে রিঙ্ক এর ব্যবস্থা করে দেন, যা তারা কোনদিন চিন্তাও করতে পারে না। (তালাক-২-৩)

সূরা আলে-ইমরানের ১২০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ্ ঘোষণা করেছেন যদি তোমরা ধৈর্য ধারণ করো এবং খোদাভীতির মাধ্যমে জীবন যাপন করো তাহলে তোমাদের শত্রুদের কোন ষড়যন্ত্র বা কলাকৌশল তোমাদের কোনই ক্ষতিসাধন করতে পারবে
وَانْ تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوْا لَا يَضُرُّكُمْ كَيْدُهُمْ شَيْئًا . -
অতএব তাওয়ার অর্থ বুঝে তার আলোকে একজন মুমিন যদি তার সঠিক চরিত্র গঠন করে এবং জীবনকে তাওয়া ভিত্তিতে পরিচালনার শপথ গ্রহণ করে তাহলে ব্যক্তিগতভাবে যেমন সুবিধা পাবে, তেমনি সামষ্টিকভাবে ইহ ও পরকালে সুবিধার কথা উল্লেখিত আয়াতসমূহে বর্ণনা করা হয়েছে। তাই আমাদের বাস্তব জীবনে তাওয়ার সুফল বয়ে আনবো, এটাই সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত।

ঙ) তাকওয়ার মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ছয়টি। যথা:
১। সত্যের সন্ধান;
২। সত্য গ্রহণ;
৩। সত্যের উপর সুদৃঢ় ও সুপ্রতিষ্ঠিত থাকা;
৪। আল্লাহভীতি;
৫। দায়িত্বানুভূতি;
৬। আল্লাহর নির্দেশ পালন।
এ বৈশিষ্ট্য আমাদের সকলের অর্জন করা একান্ত প্রয়োজন। তাহলেই কেবল তাকওয়াবান হওয়া যাবে।

৩. রমযানের সাথে কুরআন ও তাকওয়ার সম্পর্ক:
ইতিপূর্বে আমরা তাওয়ার অর্থ পরিচিতি ও বাস্তব দিক আলোচনা করেছি। এখন রমযান ও কুরআন তাওয়া অর্জনে কি ভূমিকা রাখে, তা সংক্ষেপে আলোচনা করছি।

সূরা ফাতিহা আমরা আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের দরবারে প্রার্থনা করেছি এই বলে যে, হে রব, আমাদেরকে সিরাতুল মুস্তাকিমের উপর পরিচালিত কর। এর উত্তরে রাব্বুল আলামীন সূরা বাকারার প্রথমেই সিরাতুল মুস্তাকিমের উপর চলার শর্ত উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ্ বলেন-
ذلك الْكِتَابُ لأَرَيْبَ فِيهِ - هُدًى لِّلْمُتَّقِينَ .
ইহা এমন এক কিতাব, যার মধ্যে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। যারা মুত্তাকী তাদেরকে সঠিক পথের সন্ধান দিবে।

অতএব বুঝা যাচ্ছে, কুরআন থেকে হিদায়াত পেতে হলে মুত্তাকী হওয়। শর্ত। সাউম ফরয করা হয়েছে- তাকওয়া অর্জন করার জন্য এবং কুরআন নাযিলের কারণেই রমযান মাসের এতো গুরুত্ব হয়েছে।

সুতরাং আল-কুরআন মানব জাতির জন্য একমাত্র নির্ভুল জীবন বিধান। আল- কুরআন বুঝতে হলে তাওয়া অর্জন করতে হবে আর তাকওয়ার প্রশিক্ষণের জন্যই একমাত্র সিয়াম ফরয করা হয়েছে। তাই রমযানের প্রশিক্ষণ কুরআন বুঝে তা বাস্তবায়নের জন্য এক বিশেষ প্রশিক্ষণ।
অতএব আল-কুরআন, মাহে রমযান ও তাওয়ার পূর্ণতা অর্জন পরস্পর বিচ্ছিন্ন নাম নয়, বরং পরিপূরক।

•শিক্ষাঃ 
আলোচ্য দারসের শিক্ষাগুলো নিম্নে দেয়া হচ্ছে:
১. পবিত্র রমযান মাসের সিয়াম সাধনা প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর উপর ফরয। রোয়া ফরয করার উদ্দেশ্য হচ্ছে তাকওয়া অর্জন করা। 

২. অসুস্থ অবস্থায়, মুসাফির, মহিলাদের শরয়ী ওযর ও অক্ষম বৃদ্ধদের জন্য এ মাসে রোযা না রাখার অনুমতি রয়েছে। (এ ব্যাপারে শরয়ী দৃষ্টিভঙ্গী ও নির্দেশ অনুসরণ করতে হবে)

৩. মাহে রমযানের যথাযথ দায়িত্ব পালন বা মর্যাদা দিতে হলে আল- কুরআনকে বুঝতে হবে। আল্লাহ তাঁর বিধানকে সহজ করেছেন; কঠিন করেন নাই।

৪. কুরআন যে মানব জাতির জন্য হিদায়াত হিসেবে নাযিল করছেন তা যথাযথ উপলব্ধি করে সে মোতাবেক জীবন চলার শপথ নিতে হবে।

৫. 'রমযান, কুরআন, হিদায়াত ও লায়লাতুল কদর' বিষয়গুলো মজবুত ঈমানের সাথে বুঝে শুনে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

৬. উল্লেখিত শিক্ষাগুলো পরিপূর্ণ বাস্তবায়নে ই'তেকাফের গুরুত্বও কম নয়। তাই যথাসাধ্য আত্মগঠন ও তাকওয়া অর্জনের জন্য ই'তেকাফে অংশ গ্রহণের চেষ্টা থাকতে হবে।

দারস সংকলনে:
www.ArmansDiary.com

Tuesday, January 16, 2024

দারসুল কুরআন : সূরা আল-মুদ্দাস্সির : ১-৭



【 দারসুল কুরআন : সূরা আল-মুদ্দাস্সির : ১-৭ 】
বিষয় : মহান রবের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণায় আমাদের তৎপরতা
- প্রফেসর মো. শফিকুল ইসলাম
---------------------------------------------------
يَآ أَيُّهَا الْمُدَّثِّرُ (১) قُمْ فَأَنْذِرْ (২) وَرَبَّكَ فَكَبِّرْ (৩) وَثِيَابَكَ فَطَهِّرْ (৪) وَالرُّجْزَ فَاهْجُرْ (৫) وَلَا تَمْنُنْ تَسْتَكْثِر (৬) وَلِرَبِّكَ فَاصْبِرْ. (৭)
✦ সরল অনুবাদ
১. হে কম্বল মুড়ি দিয়ে শায়িত ব্যক্তি ২. উঠুন এবং সতর্ক করুন ৩. এবং আপনার রবের শ্রেষ্ঠত্ব বা মহত্ত্ব ঘোষণা করুন ৪. আর আপনার পোশাক পবিত্র রাখুন ৫. প্রতিমা থেকে দূরে থাকুন ৬. অধিক প্রাপ্তির আশায় কারো প্রতি অনুগ্রহ করবেন না ৭. এবং আপনার রবের জন্য ধৈর্য অবলম্বন করুন। (সূরা আল-মুদ্দাস্সির : ১-৭)

✦ নামকরণ
প্রথম আয়াতের ‘আল-মুদ্দাস্সির’ (الْمُدَّثِّرُ) শব্দটিকে এ সূরার নাম হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। ‘আল-মুদ্দাস্সির’ (الْمُدَّثِّرُ) অর্থ বস্ত্র বা কম্বল আচ্ছাদনকারী। এখানে ‘আল-মুদ্দাস্সির’ (الْمُدَّثِّرُ) শব্দ দ্বারা রাসূলুল্লাহ সা.-কে সম্বোধন করা হয়েছে।

✦ নাযিল হওয়ার সময়কাল

সূরা আল-মুদ্দাসসির দু’টি অংশে নাযিল হয়। প্রথম অংশে সূরার প্রথম সাতটি আয়াত নাযিল হয়। এটি সর্বপ্রথম নাযিলকৃত সূরাহ আলাকের পর নাযিল হয়। অর্থাৎ সম্ভবত এ আয়াতগুলো ৬১০ খ্রি. শাওয়াল মাসে নাযিল হয়।
দ্বিতীয় অংশে অষ্টম আয়াত থেকে শেষ পর্যন্ত নাযিল হয়। এটি প্রকাশ্যভাবে ইসলামের প্রচার শুরু হওয়ার পর প্রথমবার মক্কায় হজের মওসুম সমাগত হলে নাযিল হয়।

✦ সূরার বিষয়বস্তু

- সূরার প্রথম সাতটি আয়াতে নবুওয়াতের প্রাথমিক দায়িত্ব ও কর্মনীতি বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ মহান রবের শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণা বা তাওহিদের প্রতি আহ্বান এবং আহ্বানের ক্ষেত্রে রাসূল সা.-এর শারীরিক ও আত্মিক প্রস্তুতি বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
- ৮-৫৩ আয়াতে সত্য দ্বীন অমান্যকারীদের স্বরূপ বিশ্লেষণ করে কিয়ামতের দিবসে তাদের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
- ৫৪-৫৬ আয়াতে বলা হয়েছে, এ কুরআন হচ্ছে মানুষের জন্য উপদেশ। কিন্তু এ উপদেশ কবুল করার জন্য আল্লাহ কাউকে বাধ্য করেন না। যে গ্রহণ করবে সে-ই উপকৃত হবে; আর যে গ্রহণ করবে না সে-ই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

✦ নির্বাচিত আয়াতসমূহের আলোচ্য বিষয়

সূরাহ আল-মুদ্দাস্সিরের প্রথম সাতটি আয়াতে নবুওয়াতের প্রাথমিক দায়িত্ব ও কর্মনীতি সংক্রান্ত ছয়টি নির্দেশনা প্রদান হয়েছে।
প্রথম নির্দেশ : قُمْ فَأَنْذِر অর্থাৎ উঠুন এবং বিশ্ববাসীকে স্বেচ্ছাচারী জীবন যাপনের ভয়াবহ পরিণাম সম্পর্কে সতর্ক করুন।
দ্বিতীয় নির্দেশ : وَرَبَّكَ فَكَبِّرْ অর্থাৎ মহান রবের বড়ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করুন ও প্রতিষ্ঠা করুন।
তৃতীয় নির্দেশ : وَثِيَابَكَ فَطَهِّرْ অর্থাৎ পোশাক, দেহ, অন্তর ও মনকে পবিত্র করুন।
চতুর্থ নির্দেশ : وَالرُّجْزَ فَاهْجُرْ অর্থাৎ প্রতিমা পূজা ও যাবতীয় পাপাচার থেকে দূরে থাকুন।
পঞ্চম নির্দেশ : وَلَا تَمْنُنْ تَسْتَكْثِرُ অর্থাৎ পার্থিব প্রতিদানের আশায় কাউকে দান ও অনুগ্রহ করা থেকে বিরত থাকুন।
ষষ্ঠ নির্দেশ : وَلِرَبِّكَ فَاصْبِرْ অর্থাৎ সর্বাবস্থায় রবের জন্য ধৈর্য অবলম্বন করুন।

✦ নির্বাচিত আয়াতসমূহের ব্যাখ্যাঃ

» প্রথম আয়াতের ব্যাখ্যা
: يَا أَيُّهَا الْمُدَّثِّرُ “ওহে বস্ত্র আচ্ছাদিত ব্যক্তি।”
আরবীতে কাউকে ডাকার জন্য ‘হরফে নিদা’ (حرف ندا) ব্যবহার করা হয়। এখানে ‘ইয়া আইয়ুহা’ (يَا أَيُّهَا) ‘হরফে নিদা’। আর যাকে ডাকা হয় বা সম্বোধন করা হয় সেটি মুনাদা। এ আয়াতে মুহাম্মাদ সা.-কে ‘আল-মুদ্দাস্সির’ (الْمُدَّثِّرُ) তথা ‘ওহে বস্ত্রাচ্ছাদিত ব্যক্তি’ বলে সম্বোধন করা হয়েছে। এটি প্রীতিপূর্ণ সম্বোধন। মহান আল্লাহ অন্য সকল নবীকে আহ্বান করার সময় নাম ধরেই সম্বোধন করেছেন। কিন্তু মুহাম্মাদ সা.-কে কখনও ‘ইয়া মুহাম্মাদ’ বলেননি, বরং তাঁকে অতি আদর করে সম্বোধন করেছেন। এটি রাসূলুল্লাহ সা.-এর প্রতি বিশেষ সম্মান।
সূরাহ আলাক নাযিলের পর কিছুকাল পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ সা.-এর ওপর অহি নাযিল বন্ধ থাকে। এ সময়কে ‘ফাতরাতুল অহি’ বলে। সে সময় রাসূলুল্লাহ সা. এতো কঠিন মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছিলেন। অহি নাযিলের বিরতির শেষভাগে একদিন রাসূল সা. পবিত্র মক্কায় পথ চলাকালে ওপর দিক থেকে কিছু আওয়াজ শুনতে পান। তিনি ওপরের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই দেখতে পান যে, ফেরেশতা জিবরিল (আ) আকাশে একটি ঝুলন্ত আসনে উপবিষ্ট আছেন। ফেরেশতাকে এমতাবস্থায় দেখে তিনি ভীত-আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েন। তাড়াতাড়ি গৃহে ফিরে বললেন- زمِّلونى زمِّلونى (আমাকে চাদরাবৃত কর, আমাকে চাদরাবৃত কর।) অতঃপর তিনি চাদরাবৃত হয়ে শুয়ে পড়লেন।
সে অবস্থায় রিসালাতের দায়িত্ব পালনের জন্য তাঁকে ডেকে বলা হচ্ছে, হে আমার প্রিয় বান্দা মুহাম্মাদ সা.! আপনি চাদর জড়িয়ে শুয়ে আছেন কেন? আপনার ওপরে তো একটি বিরাট মহৎ কাজের গুরুদায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। এ দায়িত্ব পালন করার জন্য আপনাকে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে উঠে দাঁড়াতে হবে। অতঃপর তাঁকে ব্যক্তিগত ও সামাজিকভাবে ছয়টি কাজের নির্দেশ দেয়া হয়। (ইবনে জারির)

» দ্বিতীয় আয়াতের ব্যাখ্যা : قُمْ فَأَنْذِر “উঠুন অতঃপর সতর্ক করুন।”
এখানে ‘কুম’ (قُمْ) এবং ‘আনযির’ (أَنْذِر) দু’টি শব্দে একটি আয়াত। দু’টি শব্দই ‘আমর’ বা আদেশ সূচক। ‘কুম’ (قُمْ) অর্থ উঠুন, দ-ায়মান হোন, কর্মে তৎপর হোন ইত্যাদি। আর ‘আনযির’ (أَنْذِر) অর্থ সতর্ক করুন, ভয় দেখান ইত্যাদি।
এ আয়াতে মহান আল্লাহ নির্দেশ দেন, হে কম্বলজড়ানো ব্যক্তি! আপনার কম্বল জড়িয়ে শয্যা গ্রহণের অবকাশ কোথায়। আপনার প্রতি আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠা করার এক বিরাট দায়িত্ব চাপানো হয়েছে, আপনি উঠুন। আমার একত্ববাদ প্রচার করুন এবং যারা আমার সত্তায়, গুণে ও ক্ষমতায় আমার সাথে অন্যান্য বস্তুকে শরিক করে তাদেরকে এটার ভয়াবহ পরিণাম সম্পর্কে সতর্ক করুন।
রাসূলুল্লাহ সা.-এর প্রতি এ নির্দেশ এমন এক সময় ও পরিবেশে অবতীর্ণ হয়, যখন মক্কাসহ সমগ্র আরবের লোক ও জনপদগুলো শিরকে নিমজ্জিত ছিল আর তিনি ছিলেন একাকী। তাঁর সঙ্গী-সাথী কেউই ছিল না। এহেন পরিবেশে সর্বজন বিরোধী একটি মতাদর্শ নিয়ে দ-ায়মান হওয়া এবং তা জনসম্মুখে প্রচার করা কত বড় বিরাট ঝুঁকির ব্যাপার ছিল তা একটু চিন্তা করলেই বোধগম্য হয়। এহেন পরিবেশের মধ্যেই আল্লাহ বললেন, আপনি তৌহিদের পতাকা নিয়ে দ-ায়মান হোন এবং মানুষকে তৌহিদের পরিপন্থী আকিদা-বিশ^াসের ভয়াবহ পরিণাম সম্পর্কে সতর্ক করতে থাকুন। এটাই আপনার প্রথম কাজ। এ যেন মহা স্রােতের বিপরীতে চলার এক কঠিন নির্দেশ।
মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে রাসূলকে সা. ‘নাযির’ তথা সতর্ককারীর দায়িত্বসহ প্রেরণের কথা বলা হয়েছে।
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِنَّا أَرْسَلْنَاكَ شَاهِدًا وَمُبَشِّرًا وَنَذِيرًا.
“হে নবী! আমি তোমাকে পাঠিয়েছি সাক্ষ্যদাতা, সুসংবাদদাতা ও ভীতি প্রদর্শনকারী রূপে।” (সূরাহ আহযাব : ৪৫)
إِنَّا أَرْسَلْنَاكَ بِالْحَقِّ بَشِيرًا وَنَذِيرًا وَإِنْ مِنْ أُمَّةٍ إِلَّا خَلَا فِيهَا نَذِيرٌ.
“আমি তোমাকে সত্য সহকারে পাঠিয়েছি সুসংবাদদাতা ও ভীতি প্রদর্শনকারী বানিয়ে। আর এমন কোন সম্প্রদায় অতিক্রান্ত হয়নি যার মধ্যে কোন সতর্ককারী আসেনি।” (সূরাহ ফাতির : ২৪)
إِنَّا أَرْسَلْنَا نُوحًا إِلَى قَوْمِهِ أَنْ أَنْذِرْ قَوْمَكَ مِنْ قَبْلِ أَنْ يَأْتِيَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ (১) قَالَ يَا قَوْمِ إِنِّي لَكُمْ نَذِيرٌ مُبِينٌ.
“আমি নূহকে তার কওমের কাছে পাঠিয়েছিলাম, যেন তিনি তার কওমের লোকদের ওপর এক ভীষণ কষ্টদায়ক আযাব আসার পূর্বেই তাদেরকে সাবধান করে দেন। তিনি বলেছিলেন, হে আমার দেশবাসী! আমি তোমাদের জন্য সুস্পষ্ট সাবধানকারী।” (সূরা নূহ : ১-২)

» তৃতীয় আয়াতের ব্যাখ্যা : وَرَبَّكَ فَكَبِّرْ “আর আপনার রবের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করুন।”
সূরাহ আল-মুদ্দাসসিরে দ্বিতীয় নির্দেশনায় মহান আল্লাহ বলেন, হে নবী! মানুষ আমার মহানত্ব, বিরাটত্ব ও অসীমত্বের কথা ভুলে আমার জমিনে শয়তানের কথামত রাজত্ব পরিচালনা করছে। আমার জমিনে এখন বাতিলের রাজত্ব চলছে। লাত, মানতের পূজা-অর্চনা করা হচ্ছে। অথচ জমিনের মালিক হলাম আমি আল্লাহ। আমার জমিনে শয়তানের রাজত্ব চলতে পারে না। মানবরচিত মতবাদ চলতে পারে না। আপনি উঠুন এবং আল্লাহর তাকবির ঘোষণা করুন। ‘ওয়া রাব্বাকা ফাকাব্বির’ (وَرَبَّكَ فَكَبِّرْ) অর্থাৎ সব জায়গায় ‘আল্লাহু আকবার’ (الله اكبر) ধ্বনিত হবে। জগতের সর্বত্রই থাকবে আমার শ্রেষ্ঠত্বের ছাপ। মানুষের আকিদা-বিশ^াস হতে শুরু করে তাদের কর্মময় জীবনের প্রতিটি স্তরে থাকবে আমারই শ্রেষ্ঠত্বের ফলিতরূপ। একজন মু’মিন ‘আল্লাহু আকবার’ (الله اكبر)-এর তাকবির বা স্লোগান ছাড়া কোনো মানুষের তাকবির বা স্লোগান দিতে পারে না। এটি কুফরি স্লোগান। আল্লাহ বলেন, জমিনের মালিক আমি আল্লাহ। এ জমিন এবং এর মধ্যে যা কিছু আছে সবই আমার হুকুমে তৈরি হয়েছে। সুতরাং এ জমিনে আইন চলবে একমাত্র আল্লাহর। এ সম্পর্কে সূরাহ আরাফের ৫৪তম আয়াতে বলা হয়েছে,
أَلَا لَهُ الْخَلْقُ وَالْأَمْرُ تَبَارَكَ اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ
“সাবধান! সৃষ্টি যার, আইন চলবে একমাত্র তার। বরকতময় আল্লাহই বিশ^ জগতের মালিক।”
পৃথিবীতে যতজন নবী ও রাসূল আগমন করেছেন, এটিই ছিলো তাদের প্রথম ও প্রধান কাজ। এ ব্যাপারে সূরাহ আন-নাহলের ৩৬তম আয়াতে বলা হয়েছে,
وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ.
“প্রত্যেক জাতির মধ্যে আমি একজন রাসূল পাঠিয়েছি এবং তার মাধ্যমে সবাইকে জানিয়ে দিয়েছি যে, “আল্লাহর বন্দেগি করো এবং তাগুতের বন্দেগি পরিহার করো।”
সকল নবীরই প্রধান কাজ ছিলো মহান রবের একত্ববাদের দিকে আহ্বান করা। সূরাহ আরাফের ৫৯, ৬৫, ৭৩ ও ৮৫তম আয়াতে হযরত নূহ, হুদ, সালেহ, শুয়াইব (আ) এর দাওয়াত সম্পর্কে বলা হয়েছে,
يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُمْ مِنْ إِلَهٍ غَيْرُهُ.
“হে আমার দেশবাসী! আল্লাহর দাসত্ব কর। তিনি ছাড়া তোমাদের আর কোনো ইলাহ নেই।”
তাই একজন নবীর প্রথম কাজই হলো, অজ্ঞ ও মূর্খ লোকেরা এ পৃথিবীতে যাদের শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রতাপ মেনে চলছে তাদের সবাইকে অস্বীকার করবে এবং গোটা পৃথিবীর সামনে উচ্চকণ্ঠে এ কথা ঘোষণা করবে যে, এ বিশ্বজাহানে এক আল্লাহ ছাড়া আর কারো কোন শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রতাপ নেই।
ইসলামে ‘আল্লাহু আকবার’ (الله اكبر) তথা ‘আল্লাহই শ্রেষ্ঠ’ কথাটিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ‘আল্লাহু আকবার’ ঘোষণার মাধ্যমেই আযান শুরু হয়। ‘আল্লাহু আকবার’ এ কথাটি বলে মানুষ সালাত শুরু করে এবং বারবার ‘আল্লাহু আকবার’ বলে ওঠে ও বসে। কোন পশুকে জবাই করার সময়ও ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ বলে জবাই করে। জন্মের সময় শিশুর কানে দেয়া হয় ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি আবার মৃত্যুর পর সালাতু যানাজার মাধ্যমেও দেয়া হয় ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি। তাকবির ধ্বনি বর্তমান বিশ্বে মুসলমানদের সর্বাধিক স্পষ্ট ও পার্থক্যসূচক প্রতীক। কারণ, মহানবী সা. আল্লাহর বড়ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব¡ ঘোষণার মাধ্যমেই রিসালাতের কাজ শুরু করেছিলেন। অতএব একজন মুমিনের ‘আল্লাহু আকবার’ ছাড়া অন্য কোনো স্লোগান হতে পারে না।
» চতুর্থ আয়াতের ব্যাখ্যা : وَثِيَابَكَ فَطَهِّرْ “আর আপনার পোশাক পবিত্র রাখুন।”
এ আয়াতে ‘সিয়াব’ (ثِيَابْ) ও ‘তাহির’ (طَهِّرْ) দু’টি শব্দ রয়েছে। ‘সিয়াব’ (ثِيَابْ) শব্দটি ‘সাওবুন’ (ثَوْبً) এর বহুবচন। একে ‘লিবাস’ (لباس)ও বলা হয়। এর আসল অর্থ কাপড় বা পোশাক। এর রূপক অর্থ অন্তর, মন, দেহ, কর্ম ইত্যাদি।
অতএব, এ আয়াতে নবীকে সা. নির্দেশনা দেয়া হয়েছে, হে নবী! আপনি স্বীয় পোশাক ও দেহকে অপবিত্রতা থেকে পবিত্র রাখুন, পোশাকের নৈতিক দোষত্রুটি হতে মুক্ত রাখুন। অর্থাৎ পোশাকে অহংকার, গৌরব, রিয়া বা লৌকিকতা থেকে মুক্ত রাখুন। অনুরূপভাবে অন্তর ও মনকে ভ্রান্ত আকিদা বিশ্বাস ও চিন্তাধারা থেকে এবং অসৎচরিত্রতা থেকে মুক্ত রাখুন।
ইসলাম মানুষকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র হতে শিক্ষা দেয়। হাদিসে পবিত্রতাকে ঈমানের অংশ বলা হয়েছে। তাই মুমিনগণকে সর্বাবস্থায় দেহ, স্থান ও পোশাক বাহ্যিক অপবিত্রতা থেকে এবং অন্তরকে অভ্যন্তরীণ অপবিত্রতা থেকে পবিত্র রাখার প্রতি সচেষ্ট হতে হবে।
আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস রা., ইবরাহিম নাখয়ী, শা’বী, আতা, মুজাহিদ, কাতাদাহ, সায়ীদ ইবন যুবাইর, হাসান বসরী (রহ.) ও অন্যান্য বড় বড় মুফাসসির এ আয়াতের তাৎপর্যে বলেছেন, আপনার চরিত্র পবিত্র ও নিষ্কলুষ রাখুন ও সকল প্রকার দোষ-ত্রুটি হতে নিজেকে মুক্ত রাখুন।
রাসূলুল্লাহ সা. যে সমাজে ইসলামের দাওয়াতের কাজ শুরু করেছিলেন তা শুধু আকিদা-বিশ্বাস ও নৈতিক আবিলতার মধ্যেই নিমজ্জিত ছিল না বরং পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার প্রাথমিক ধারণা স¤পর্কে পর্যন্ত সে সমাজের লোক অজ্ঞ ছিল। এসব লোককে সব রকমের পবিত্রতা শিক্ষা দেয়া ছিল রাসূলুল্লাহ সা.-এর কাজ। তাই তাঁকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, তিনি যেন তাঁর বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ জীবনের সকল পবিত্রতার সর্বোচ্চ মান বজায় রাখেন।
নবী করীম সা. স্বভাবগতভাবেই পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা পছন্দ করতেন। তাই তিনি যেন সচেতনতার সাথে পোশাক পরিচ্ছদ পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন রাখেন তারই শিক্ষা রয়েছে এই আয়াতে। নৈতিক দিক দিয়ে পোশাক পবিত্রতার অর্থ হচ্ছে- পোশাক এমন হতে হবে যাতে অহংকার প্রকাশ পাবে না, তাতে কুরুচির ছাপও থাকবে না।
মহান আল্লাহ পবিত্রতাকে পছন্দ করেন। যেমন- পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে, “অবশ্যই মহান আল্লাহ অধিক হারে তাওবাকারী ও পবিত্রতা অর্জনকারীদেরকে ভালোবাসেন।” (সূরা আল-বাকারাহ : ২২২)
পরিচ্ছন্নতার গুরুত্ব স¤পর্কে রাসূল সা. বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ পরিচ্ছন্ন, তিনি পরিচ্ছন্নতা ভালোবাসেন।” (তিরমিজি)
অনুরূপভাবে সূরাহ মায়িদার ষষ্ঠ আয়াতে সালাতের পূর্বে পবিত্রতা তথা অজুর নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।
এক কথায় বলা যেতে পারে, এই আয়াতের তাৎপর্য হচ্ছে-
১. পোশাক পরিচ্ছদ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা।
২. পোশাক পরিচ্ছদ নৈতিক দোষত্রুটি থেকে পবিত্র রাখা।
৩. সকল প্রকার দোষ-ত্রুটি হতে নিজ চরিত্রকে পবিত্র রাখা।
অতএব দায়ী হিসেবে আমাদের সকলকে পবিত্রতার ক্ষেত্রে এ তিনটি দিকেই সতর্ক থাকতে হবে।

» পঞ্চম আয়াতের ব্যাখ্যা : وَالرُّجْزَ فَاهْجُرْ “প্রতিমা থেকে দূরে থাকুন।”
অত্র আয়াতে ‘আর-রুজ্যুন’ (الرُّجْزَ) থেকে দূরে থাকার নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। ‘আর-রুজ্যুন’ (الرُّجْزَ) শব্দটি ব্যাপক অর্থবোধক একটি শব্দ।
- প্রসিদ্ধ তাবিঈ মুজাহিদ, ইকরামা, কাতাদাহ, যুহরী, ইবন যায়েদ, আবূ সালামা (রহ.) প্রমুখ বলেছেন, ‘আর-রুজ্যুন’ (الرُّجْزَ) অর্থ মূর্তি। অর্থাৎ মূর্তিগুলোকে বর্জন করো, এগুলোর কাছেও যেয়ো না।
- ইবন আব্বাস রা. বলেছেন, এর অর্থ হলো পাপাচার।
- আবু আলিয়া এবং রবী (রহ.) বলেছেন, এর অর্থ অপবিত্রতা এবং গুনাহ।
- ইমাম যাহহাক বলেছেন, এর অর্থ শিরক।
- কালবী বলেছেন, এর অর্থ আজব।
- আল্লামা সাবুনি বলেছেন, এর দ্বারা সর্বপ্রকার খারাপ জিনিস উদ্দেশ্য হতে পারে।
অতএব আয়াতের অর্থ হলো, হে নবী! আপনি প্রতিমা পূজা এবং যাবতীয় গুনাহ ও অপবিত্রতা পরিত্যাগ করুন।
এখানে অপবিত্রতা বলতে, আকিদা-বিশ্বাস ও ধ্যান-ধারণার অপবিত্রতা হতে পারে, নৈতিক চরিত্র ও কাজ-কর্মের অপবিত্রতা হতে পারে আবার শরীর ও পোশাক-পরিচ্ছদ এবং ওঠা-বসা চলাফেরার অপবিত্রতাও হতে পারে। অর্থাৎ চিন্তা-চেতনা, আচার- ব্যবহার, ও দৈনন্দিন জীবনের সকল কাজকর্ম পরিচালনা করার ক্ষেত্রে জাহেলিয়াতের সামান্যতমও যেন অনুপ্রবেশ না ঘটে সে বিষয়ে সতর্ক থাকার জন্য মুহাম্মাদ সা.-কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্তর ও মনকে ভ্রান্ত বিশ্বাস ও চিন্তাধারা থেকে এবং কুচরিত্র থেকে মুক্ত রাখুন।
এ বিষয়ে যদি কেউ প্রশ্ন করে, রাসূলুল্লাহ সা. তো আগে থেকেই প্রতিমা পূজা ও যাবতীয় গুনাহ থেকে মুক্ত ছিলেন, তার ধারে কাছেও ছিলেন না। তাহলে তাঁকে এ আদেশ দেয়ার অর্থ কী? এর উত্তরে আমরা সংক্ষেপে বলতে পারি যে, রাসূলুল্লাহ সা.-কে নির্দেশের মাধ্যমে উম্মতে মুহাম্মাদীকে শিক্ষা দেয়া উদ্দেশ্য।

» ষষ্ঠ আয়াতের ব্যাখ্যা : وَلَا تَمْنُنْ تَسْتَكْثِرُ “অধিক প্রতিদানের আশায় কারো প্রতি অনুগ্রহ করো না।”
এ আয়াতের মাধ্যমে আমাদেরকে কয়েকটি মেসেজ দেয়া হয়েছে।
১. আল্লাহর সন্তুষ্টি ছাড়া পার্থিব বিনিময়ের আশায় সকল প্রকার দান-খয়রাত এবং মানব কল্যাণমূলক কাজ করতে এখানে নিষেধ করা হয়েছে। অর্থাৎ বাহ্যিকভাবে কোনো কাজ যদিও ভালো মনে হয়, আর সে কাজের মধ্যে যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্য না থাকে, তবে সে কাজ আল্লাহর কাছে ভালো বলে গণ্য হবে না।
২. আমরা যারা ইসলামী আন্দোলনের কাজ করছি, এটি নিঃসন্দেহে আল্লাহর একটি বড় হুকুম পালন করছি। তবে এ কাজটি যদি ব্যক্তিস্বার্থের জন্য হয় বা নিজের কোনো উপকার হাসিলের জন্য হয়, তাহলে এ আন্দোলন করার মাধ্যমে নাজাত পাওয়া যাবে না।
৩. আমরা যারা সার্বক্ষণিকভাবে দ্বীনের পথে বা দ্বীনি আন্দোলনের পথে কাজ করছি তাদের এ কথা ভাবার বা মনে করার সুযোগ নেই যে, আমি দ্বীনের অনেক উপকার করলাম। বরং মনে রাখতে হবে যে, কোনো নেক কাজ কিংবা দ্বীনের কাজ করে আল্লাহর কোনো উপকার হয় না, যা উপকার বা কল্যাণ হয় তা নিজেরই উপকার বা কল্যাণ হয়।
এ বিষয়ে কুরআন ও হাদিসের দিকে দৃষ্টি দিলে আমাদের ধারণা আরো পরিষ্কার হবে।
১.قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ.
“বলুন, আমার সালাত, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও মৃত্যু প্রতিপালক আল্লাহরই জন্য।” (সূরা আনআম : ১৬২)
২.إِنِّي وَجَّهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِي فَطَرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ حَنِيفًا وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ.
“আমি একমুখী হয়ে ¯¦ীয় লক্ষ্য ঐ সত্তার দিকে করেছি, যিনি নভোম-ল ও ভূম-ল সৃষ্টি করেছেন এবং আমি মুশরেকদের মধ্যে শামিল নই।” (সূরা আনআম, ৬ : ৭৯)
৩. يَمُنُّونَ عَلَيْكَ أَنْ أَسْلَمُوا قُلْ لَا تَمُنُّوا عَلَيَّ إِسْلَامَكُمْ بَلِ اللَّهُ يَمُنُّ عَلَيْكُمْ أَنْ هَدَاكُمْ لِلْإِيمَانِ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ (১৭)
“তারা মুসলমান হয়ে আপনাকে ধন্য করেছে মনে করে। বলুন, তোমরা মুসলমান হয়ে আমাকে ধন্য করেছ মনে করো না। বরং আল্লাহ্ ঈমানের পথে পরিচালিত করে তোমাদেরকে ধন্য করেছেন, যদি তোমরা সত্যনিষ্ঠ হয়ে থাক।”
. ৪وَمَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ مِنْ أَجْرٍ إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَى رَبِّ الْعَالَمِينَ.
“(নূহ, হুদ, সালেহ, লূত, শুআইব (আ) জাতির উদ্দেশ্যে বলেন) এ কাজে আমি তোমাদের কাছে কোন প্রতিদানের প্রত্যাশী নই। আমাকে প্রতিদান দেয়ার দায়িত্ব তো রাব্বুল আলামিনের।” (শুআ’রা : ১০৯; ১২৭; ১৪৫, ১৬৪, ১৮০)
৫.عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ্রإِنَّ اللهَ لَا يَنْظُرُ إِلَى صُوَرِكُمْ وَأَمْوَالِكُمْ، وَلَكِنْ يَنْظُرُ إِلَى قُلُوبِكُمْ وَأَعْمَالِكُمْ.
আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ তোমাদের চেহারা এবং ধন-সম্পদের দিকে তাকান না। তিনি দেখেন তোমাদের অন্তর ও ‘আমলসমূহের দিকে। (সহীহ মুসলিম; সুনানু ইবন মাজাহ)
৬.أَلاَ وَإِنَّ فِي الجَسَدِ مُضْغَةً: إِذَا صَلَحَتْ صَلَحَ الجَسَدُ كُلُّهُ، وَإِذَا فَسَدَتْ فَسَدَ الجَسَدُ كُلُّهُ، أَلاَ وَهِيَ القَلْبُ.
নুমান ইবন বাশীর রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, জেনে রাখ, নিশ্চয়ই মানুষের শরীরে একটি গোশতের টুকরা আছে- তা বিশুদ্ধ থাকলে গোটা শরীর সুস্থ থাকে। আর তা বিনষ্ট হলে গোটা শরীরই ব্যাধিগ্রস্ত হয়ে যায়। জেনে রাখো ঐ গোশতের টুকরাটি হলো মানুষের কলব বা আত্মা। (সহীহ বুখারী; সহীহ মুসলিম)
৭. عَنِ الْعَبَّاسِ بْنِ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ، أَنَّهُ سَمِعَ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، يَقُولُ: ্রذَاقَ طَعْمَ الْإِيمَانِ مَنْ رَضِيَ بِاللهِ رَبًّا، وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا، وَبِمُحَمَّدٍ رَسُولًا.
আব্বাস ইবন আব্দুল মুত্তালিব রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা.-কে বলতে শুনেছি, রাসূল সা. বলেছেন, সে ব্যক্তি ঈমানের প্রকৃত স্বাদ লাভ করেছে, যে ব্যক্তি পূর্ণ আন্তরিকতার সাথে আল্লাহকে রব, ইসলামকে দ্বীন এবং মুহাম্মাদ সা.-কে নবী হিসেবে মেনে নিয়েছে। (জামি তিরমিজি; সহীহ মুসলিম)
৮.عَنْ أَبِي أُمَامَةَ، عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ قَالَ: مَنْ أَحَبَّ لِلَّهِ، وَأَبْغَضَ لِلَّهِ، وَأَعْطَى لِلَّهِ، وَمَنَعَ لِلَّهِ فَقَدِ اسْتَكْمَلَ الْإِيمَانَ.
আবু উমামা আল-বাহলি রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেছেন, যে ব্যক্তির ভালোবাসা ও শত্রুতা, দান করা ও না করা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যই হয়ে থাকে, প্রকৃতপক্ষে সে-ই পূর্ণ ঈমানদার। (সুনানু আবি দাউদ)

» সপ্তম আয়াতের ব্যাখ্যা : وَلِرَبِّكَ فَاصْبِرْ “এবং তোমার রবের জন্য ধৈর্য অবলম্বন করো।”
অত্র আয়াতে সবর সম্পর্কে নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। সবর বা ধৈর্য তিন প্রকার।
১. ‘আস-সাবরু আলাল মা‘আসী’ তথা অপরাধ থেকে বেঁচে থাকার জন্য ধৈর্য।
২. ‘আস-সাবরু আলাত ত্বাওয়া’ তথা আনুগত্যে ওপর ধৈর্য।
৩. ‘আস-সাবরু আলাল মাসিবাহ’ তথা বিপদ-মুসিবতে ধৈর্য ধারণ। অতএব সকল অবস্থায় ধৈর্য ধারণ করা আবশ্যক।
এ আয়াতটি নবুয়তের একেবারে প্রথম দিকের আয়াত এবং মহান রবের শ্রেষ্ঠত্ব¡ ও বড়ত্ব ঘোষণা নিয়ে মুহাম্মাদ সা. এখনো ময়দানে নামেননি। তাই তিনি এই ঘোষণা নিয়ে ময়দানে নামলে তার সাথে কী কী নেতিবাচক ঘটনা ঘটতে পারে সে বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা মুহাম্মাদ সা.-কে আগেই সবরের শিক্ষা দিয়েছেন।
এ পথে চলতে গিয়ে যে কোন বিপদ-মুসিবতই আসুক না কেন প্রভুর উদ্দেশ্যে সেসব বিপদের মুখে ধৈর্য অবলম্বন করতে হবে এবং অত্যন্ত অটল ও দৃঢ়চিত্ত হয়ে নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করতে হবে।
আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণা বা প্রতিষ্ঠার কাজ করতে গেলেই খোদাদ্রোহী শক্তির সাথে বিরোধ হবেই। এ জন্যই সকল নবী বা রাসূলের সাথে সমসাময়িক শাসকদের বিরোধ হয়েছে। আজও যারা বলে আল্লাহর আইন চাই, সৎ লোকের শাসন চাই। তাদের ওপরও জুলুম নির্যাতন চলে। অতএব এ বাধা, নির্যানত ছিল, আছে এবং থাকবে। এ অবস্থায় ধৈর্যের সাথে সামনে অগ্রসর হতে হবে।
রাসূলুল্লাহ সা. প্রথম অহি প্রাপ্ত হয়ে বাড়ি ফিরে গিয়ে খাদিজা রা.-কে ঘটনাটি বর্ণনা করলে তিনি তাঁকে ওয়ারাকা ইবন নওফিলের কাছে নিয়ে গেলে ওয়ারাকা সব কথা শুনেই রাসূল সা.-কে বলেছিলেন, ইনি সে দূত (النَّامُوسُ) যাঁকে আল্লাহ মূসা (আ) এর কাছে পাঠিয়েছিলেন। আফসোস! আমি যদি সেদিন যুবক থাকতাম। আফসোস! আমি যদি সেদিন জীবিত থাকতাম, যেদিন তোমার কাওম তোমাকে বের করে দেবে। রাসূলুল্লাহ সা. বললেন, তাঁরা কি আমাকে বের করে দিবে? তিনি বললেন, হ্যাঁ, অতীতে যিনিই তোমার মত কিছু নিয়ে এসেছেন তাঁর সঙ্গেই শত্রুতা করা হয়েছে। সেদিন যদি আমি থাকি, তবে তোমাকে প্রবলভাবে সাহায্য করব। এর কিছুদিন পর ওয়ারাকা রা. ইন্তেকাল করেন।
মহাগ্রন্থ আল-কুরআন ও আল-হাদিসে সবরের গুরুত্ব ও ফজিলত সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা পেশ করা হয়েছে। আমরা এ আয়াতের ব্যাখ্যার জন্য এ সংক্রান্ত আয়াত ও হাদিস অধ্যয়ন করতে পারি। (যেমন- সূরা আল-বাকারাহ : ১৫৩; আলে ইমরান : ২০০; আনফাল : ৪৬; সোয়াদ : ১৭; কাফ : ৩৯)

✦ আয়াতসমূহের শিক্ষা
১. আল্লাহর দ্বীনি দায়িত্ব পালনে কোনো প্রকার ভয়-ভীতি কিংবা মনের কষ্টের কারণে ঘরে শুয়ে বসে থাকা যাবে না।
২. রাসূল সা.-এর অনুকরণে আমাদেরকে আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব, বড়ত্ব ও মাহাত্ম্য দৃঢ়চিত্তে ঘোষণা দিতে হবে এবং আল্লাহর একত্ববাদ প্রতিষ্ঠায় আন্তরিক প্রচেষ্টা চালাতে হবে।
৩. আয়াতে পবিত্রতার শিক্ষা আমাদের পরিধেয় বস্ত্র পর্যন্তই সীমাবদ্ধ নয়। বরং মুমিন ও দায়ী হিসেবে বাহ্যিক পবিত্রতার পাশাপাশি সকল প্রকার শিরক, কুফর, ভ্রান্ত বিশ্বাস থেকে অন্তর ও চরিত্রকে পবিত্র রাখতে হবে।
৪. আল্লাহর একত্ববাদ ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার কাজ করতে হবে নিঃস্বার্থভাবে। বৈষয়িক কোন উদ্দেশ্য এখানে থাকবে না।
৫. পার্থিব বিনিময় পাওয়ার আশায় অন্যকে দান করা যাবে না। কারো কোনো উপকার করলে তার বিনিময়ের আশা করা যাবে না। হাদিয়া বা উপঢৌকন বিনিময় পাওয়ার আশায় দেয়া যাবে না। এমনকি আল্লাহর কোনো বন্দেগি বা নেক কাজ করে কিংবা দ্বীনের কাজ করে মনে করা যাবে না যে, আল্লাহর মহা উপকার করলাম। কেননা কোনো নেক কাজ কিংবা দ্বীনের কাজ করে আল্লাহর কোনো উপকার হয় না, যা উপকার বা কল্যাণ হয় তা নিজেরই উপকার বা কল্যাণ হয় মনে করতে হবে।
৬. এ কাজ করতে গিয়ে বাতিলের আক্রমণ ও বাধার সম্মুখীন হলে চুপ থাকা যাবে না; বরং দৃঢ়পদে আল্লাহর প্রতি আস্থা ও বিশ্বাসের সাথে সবর অবলম্বনের মাধ্যমে কাজ চালিয়ে যেতে হবে।
পরিশেষে আমরা সবাই মহান আল্লাহর দরবারে দোয়া করি, হে আল্লাহ! আমাদেরকে সকল প্রকার বাহ্যিক ও আত্মিক পাপাচার ও অপবিত্রতা থেকে দূরে থাকার মাধ্যমে দৃঢ়তার সাথে আপনার শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে টিকে থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।

Thursday, November 23, 2023

দারসুল কুরআনঃ সূরা আল ইমরান | ১৩৩নং থেকে ১৪৮নং আয়াত

দারসুল কুরআন | সূরা আল ইমরান | ১৩৩-১৪৮ নং আয়াত 

মূল আয়াত ও বাংলা অনুবাদ:

আয়াত: ১৩৩

وَ سَارِعُوْۤا اِلٰى مَغْفِرَةٍ مِّنْ رَّبِّكُمْ وَ جَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمٰوٰتُ وَ الْاَرْضُ١ۙ اُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِیْنَۙ

দৌঁড়াও তোমাদের রবের ক্ষমার পথে এবং সেই পথে যা পৃথিবী ও আকাশের সমান প্রশস্ত জান্নাতের দিকে চলে গেছে, যা এমন সব আল্লাহভীরু লোকদের জন্য তৈরী করা হয়েছে।


আয়াত: ১৩৪

الَّذِیْنَ یُنْفِقُوْنَ فِی السَّرَّآءِ وَ الضَّرَّآءِ وَ الْكٰظِمِیْنَ الْغَیْظَ وَ الْعَافِیْنَ عَنِ النَّاسِ١ؕ وَ اللّٰهُ یُحِبُّ الْمُحْسِنِیْنَۚ

যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল সব অবস্থায়ই অর্থ-সম্পদ ব্যয় করে এবং যারা ক্রোধ দমন করে ও অন্যের দোষ–ত্রুটি মাফ করে দেয়। এ ধরনের সৎলোকদের আল্লাহ‌ অত্যন্ত ভালোবাসেন।


আয়াত: ১৩৫

وَ الَّذِیْنَ اِذَا فَعَلُوْا فَاحِشَةً اَوْ ظَلَمُوْۤا اَنْفُسَهُمْ ذَكَرُوا اللّٰهَ فَاسْتَغْفَرُوْا لِذُنُوْبِهِمْ١۪ وَ مَنْ یَّغْفِرُ الذُّنُوْبَ اِلَّا اللّٰهُ١۪۫ وَ لَمْ یُصِرُّوْا عَلٰى مَا فَعَلُوْا وَ هُمْ یَعْلَمُوْنَ

আর যারা কখনো কোন অশ্লীল কাজ করে ফেললে অথবা কোন গোনাহের কাজ করে নিজেদের ওপর জুলুম করে বসলে আবার সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর কথা স্মরণ হয়ে তাঁর কাছে নিজেদের গোনাহ খাতার জন্য মাফ চায় – কারণ আল্লাহ‌ ছাড়া আর কে গোনাহ মাফ করতে পারেন – এবং জেনে বুঝে নিজেদের কৃতকর্মের ওপর জোর দেয় না,

আয়াত: ১৩৬

اُولٰٓئِكَ جَزَآؤُهُمْ مَّغْفِرَةٌ مِّنْ رَّبِّهِمْ وَ جَنّٰتٌ تَجْرِیْ مِنْ تَحْتِهَا الْاَنْهٰرُ خٰلِدِیْنَ فِیْهَا١ؕ وَ نِعْمَ اَجْرُ الْعٰمِلِیْنَؕ

এ ধরনের লোকদের যে প্রতিদান তাদের রবের কাছে আছে তা হচ্ছে এই যে, তিনি তাদের মাফ করে দেবেন এবং এমন বাগীচায় তাদের প্রবেশ করাবেন যার পাদদেশে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত হবে, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। সৎকাজ যারা করে তাদের জন্য কেমন চমৎকার প্রতিদান!


আয়াত: ১৩৭

قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِكُمْ سُنَنٌ١ۙ فَسِیْرُوْا فِی الْاَرْضِ فَانْظُرُوْا كَیْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُكَذِّبِیْنَ

তোমাদের আগে অনেক যুগ অতিক্রান্ত হয়েছে। পৃথিবীতে ঘোরাফেরা করে দেখে নাও যারা (আল্লাহর বিধান ও হিদায়াতকে) মিথ্যা বলেছে তাদের পরিণাম কি হয়েছে।


আয়াত: ১৩৮

هٰذَا بَیَانٌ لِّلنَّاسِ وَ هُدًى وَّ مَوْعِظَةٌ لِّلْمُتَّقِیْنَ

এটি মানব জাতির জন্য একটি সুস্পষ্ট সতর্কবাণী এবং যারা আল্লাহকে ভয় করে তাদের জন্য পথনির্দেশ ও উপদেশ।


আয়াত: ১৩৯

وَ لَا تَهِنُوْا وَ لَا تَحْزَنُوْا وَ اَنْتُمُ الْاَعْلَوْنَ اِنْ كُنْتُمْ مُّؤْمِنِیْنَ

মনমরা হয়ো না, দুঃখ করো না, তোমরাই বিজয়ী হবে, যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাকো।


আয়াত: ১৪০

اِنْ یَّمْسَسْكُمْ قَرْحٌ فَقَدْ مَسَّ الْقَوْمَ قَرْحٌ مِّثْلُهٗ١ؕ وَ تِلْكَ الْاَیَّامُ نُدَاوِلُهَا بَیْنَ النَّاسِ١ۚ وَ لِیَعْلَمَ اللّٰهُ الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا وَ یَتَّخِذَ مِنْكُمْ شُهَدَآءَ١ؕ وَ اللّٰهُ لَا یُحِبُّ الظّٰلِمِیْنَۙ

এখন যদি তোমাদের আঘাত লেগে থাকে, তাহলে এর আগে এমনি ধরনের আঘাত লেগেছে তোমাদের বিরোধী পক্ষের গায়েও। এ–তো কালের উত্থান-পতন, মানুষের মধ্যে আমি এর আবর্তন করে থাকি। এ সময় ও অবস্থাটি তোমাদের ওপর এ জন্য আনা হয়েছে যে, আল্লাহ‌ দেখতে চান তোমাদের মধ্যে সাচ্চা মুমিন কে? আর তিনি তাদেরকে বাছাই করে নিতে চান, যারা যথার্থ (সত্য ও ন্যায়ের) সাক্ষী হবে -কেননা জালেমদেরকে আল্লাহ‌ পছন্দ করেন না


আয়াত: ১৪১

وَ لِیُمَحِّصَ اللّٰهُ الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا وَ یَمْحَقَ الْكٰفِرِیْنَ

– এবং তিনি এই পরীক্ষার মাধ্যমে সাচ্চা মুমিনদের বাছাই করে নিয়ে কাফেরদের চিহ্নিত করতে চাইছিলেন।


আয়াত: ১৪২

اَمْ حَسِبْتُمْ اَنْ تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ وَ لَمَّا یَعْلَمِ اللّٰهُ الَّذِیْنَ جٰهَدُوْا مِنْكُمْ وَ یَعْلَمَ الصّٰبِرِیْنَ

তোমরা কি মনে করে রেখেছো তোমরা এমনিতেই জান্নাতে প্রবেশ করবে? অথচ এখনো আল্লাহ‌ দেখেনইনি, তোমাদের মধ্যে কে তাঁর পথে প্রাণপণ যুদ্ধ করতে প্রস্তুত এবং কে তাঁর জন্য সবরকারী।


আয়াত: ১৪৩

وَ لَقَدْ كُنْتُمْ تَمَنَّوْنَ الْمَوْتَ مِنْ قَبْلِ اَنْ تَلْقَوْهُ١۪ فَقَدْ رَاَیْتُمُوْهُ وَ اَنْتُمْ تَنْظُرُوْنَ۠

তোমরা তো মৃত্যুর আকাংখা করছিলে! কিন্তু এটা ছিল তখনকার কথা যখন মৃত্যু সামনে আসেনি। তবে এখন তা তোমাদের সামনে এসে গেছে এবং তোমরা স্বচক্ষে তা দেখছো। 

আয়াত: ১৪৪

وَ مَا مُحَمَّدٌ اِلَّا رَسُوْلٌ١ۚ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ١ؕ اَفَاۡئِنْ مَّاتَ اَوْ قُتِلَ انْقَلَبْتُمْ عَلٰۤى اَعْقَابِكُمْ١ؕ وَ مَنْ یَّنْقَلِبْ عَلٰى عَقِبَیْهِ فَلَنْ یَّضُرَّ اللّٰهَ شَیْئًا١ؕ وَ سَیَجْزِی اللّٰهُ الشّٰكِرِیْن

মুহাম্মাদ একজন রসূল বৈ তো আর কিছুই নয়। তার আগে আরো অনেক রসূলও চলে গেছে। যদি সে মারা যায় বা নিহত হয়, তাহলে তোমরা কি পেছনের দিকে ফিরে যাবে? মনে রেখো, যে পেছনের দিকে ফিরে যাবে সে আল্লাহর কোন ক্ষতি করবে না, তবে যারা আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দা হয়ে থাকবে তাদেরকে তিনি পুরস্কৃত করবেন।


আয়াত: ১৪৫

وَ مَا كَانَ لِنَفْسٍ اَنْ تَمُوْتَ اِلَّا بِاِذْنِ اللّٰهِ كِتٰبًا مُّؤَجَّلًا١ؕ وَ مَنْ یُّرِدْ ثَوَابَ الدُّنْیَا نُؤْتِهٖ مِنْهَا١ۚ وَ مَنْ یُّرِدْ ثَوَابَ الْاٰخِرَةِ نُؤْتِهٖ مِنْهَا١ؕ وَ سَنَجْزِی الشّٰكِرِیْنَ

কোন প্রাণীই আল্লাহর অনুমতি ছাড়া মরতে পারে না। মৃত্যুর সময় তো লেখা আছে। যে ব্যক্তি দুনিয়াবী পুরস্কার লাভের আশায় কাজ করবে আমি তাকে দুনিয়া থেকেই দেবো। আর যে ব্যক্তি পরকালীন পুরস্কার লাভের আশায় কাজ করবে সে পরকালের পুরস্কার পাবে এবং শোকরকারীদেরকে আমি অবশ্যি প্রতিদান দেবো।


আয়াত: ১৪৬

وَ كَاَیِّنْ مِّنْ نَّبِیٍّ قٰتَلَ١ۙ مَعَهٗ رِبِّیُّوْنَ كَثِیْرٌ١ۚ فَمَا وَ هَنُوْا لِمَاۤ اَصَابَهُمْ فِیْ سَبِیْلِ اللّٰهِ وَ مَا ضَعُفُوْا وَ مَا اسْتَكَانُوْا١ؕ وَ اللّٰهُ یُحِبُّ الصّٰبِرِیْنَ

এর আগে এমন অনেক নবী চলে গেছে যাদের সাথে মিলে বহু আল্লাহ‌ ওয়ালা লড়াই করেছে। আল্লাহর পথে তাদের ওপর যেসব বিপদ এসেছে তাতে তারা মনমরা ও হতাশ হয়নি, তারা দুর্বলতা দেখায়নি এবং তারা বাতিলের সামনে মাথা নত করে দেয়নি। এ ধরনের সবরকারীদেরকে আল্লাহ‌ ভালবাসেন।


আয়াত: ১৪৭

وَ مَا كَانَ قَوْلَهُمْ اِلَّاۤ اَنْ قَالُوْا رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا ذُنُوْبَنَا وَ اِسْرَافَنَا فِیْۤ اَمْرِنَا وَ ثَبِّتْ اَقْدَامَنَا وَ انْصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكٰفِرِیْنَ

তাদের দোয়া কেবল এতটুকুই ছিলঃ “হে আমাদের রব! আমাদের ভুল –ত্রুটিগুলো ক্ষমা করে দাও। আমাদের কাজের ব্যাপারে যেখানে তোমার সীমালংঘিত হয়েছে, তা তুমি মাফ করে দাও। আমাদের পা মজবুত করে দাও এবং কাফেরদের মোকাবিলায় আমাদের সাহায্য করো।”


আয়াত: ১৪৮

فَاٰتٰىهُمُ اللّٰهُ ثَوَابَ الدُّنْیَا وَ حُسْنَ ثَوَابِ الْاٰخِرَةِ١ؕ وَ اللّٰهُ یُحِبُّ الْمُحْسِنِیْنَ۠

শেষ পর্যন্ত আল্লাহ‌ তাদেরকে দুনিয়ার পুরস্কারও দিয়েছেন এবং তার চেয়ে ভালো আখেরাতের পুরস্কারও দান করেছেন। এ ধরনের সৎকর্মশীলদেরকে আল্লাহ‌ পছন্দ করেন।


সুরার পরিচয়:

নাম: আলে ইমরান। আয়াত সংখ্যা: ২০০। রুকু: ২০। আল কুরআনের সুরা ধারাবাহিকতায় ৩য় সুরা এটি।


আলোচ্য সূরার নামকরণ:

এই সূরার ৩৩ নং আয়াতে উল্লেখিত وَآلِ عِمْرَانَ "ইমরানের বংশধর” বাক্যটিকেই পরিচিতির জন্য চিহ্ন হিসেবে এই সূরার নামকরণ "আলে ইমরান" করা হয়েছে। কেননা, আল কুরআনে ১১৪ টি সূরার অধিকাংশ সূরাই শিরোনাম হিসেবে নয় বরং প্রতীকী বা চিহ্ন হিসেবেই নামকরণ করা হয়েছে। আর এই নামকরণ আল্লাহর নবী (সঃ) নিজে করেননি বরং আল্লাহই করেছেন যা অহীর মাধ্যমে জানিয়ে দেয়া হয়েছে।


এছাড়াও এ সূরাকে সূরা তাইবাহ, আল-কানুয, আল-আমান, আল-মুজাদালাহ, আল-ইস্তেগফার, আল-মানিয়াহ ইত্যাদি নাম দেয়া হয়েছে।

সূরা নাযিলের সময়কাল: আলোচ্য সূরাটি সর্বসম্মত মতে মাদানী। তবে একই সময় সম্পূর্ণ সূরাটি অবতীর্ণ হয়নি। চারটি ভাষণে সূরাটি সমাপ্ত হয়েছে।


প্রথম ভাষণ : প্রথম ভাষণটি সূরার প্রথম থেকে শুরু করে চতুর্থ রুকুর দ্বিতীয় আয়াত পর্যন্ত চলেছে। ১নং আয়াত থেকে ৩২নং আয়াত পর্যন্ত। এই ভাষণটি সম্ভবত বদর যুদ্ধের সমসাময়িক সময় নাযিল হয়।


দ্বিতীয় ভাষণ : এই ভাষণটি সূরার চতুর্থ রুকুর তৃতীয় আয়াত থেকে শুরু হয়ে ষষ্ঠ রুকুর শেষ পর্যন্ত চলেছে। ৩২নং আয়াত থেকে ৬৩নং আয়াত পর্যন্ত। নবম হিজরীতে আল্লাহর নবীর নিকট নাজরানের প্রতিনিধি দলের আগমনের সময় এটি নাযিল হয়।


তৃতীয় ভাষণ : এই ভাষণটি সূরার সপ্তম থেকে শুরু করে দ্বাদশ রুকুর শেষ পর্যন্ত চলেছে। ৬৪নং আয়াত থেকে ১২০নং আয়াত পর্যন্ত। বিষয় অনুযায়ী প্রথম ভাষণের সাথে সাথেই এটি নাযিল হয় বলে মনে হয়।


চতুর্থ ভাষণ : এই ভাষণটি সূরার ত্রৈদশ রুকু থেকে শুরু করে সূরার শেষ পর্যন্ত চলেছে। ১২১নং আয়াত থেকে ২০০নং আয়াত পর্যন্ত। ওহুদ যুদ্ধের পর এটি নাযিল হয় বলে মনে হয়। (আল্লাহই বেশী ভাল জানেন)।

আজকের দারসের অংশটি চতুর্থ ভাষনে নাজিল হয়েছে।

সূরাটির বিষয়বস্তু বা আলোচ্য বিষয়ঃ এই সূরায় দু'টি দলকে সম্বোধন করা হয়েছে। একটি দল হলো 'আহলি কিতাব' তথা ইহুদী ও নাসারা (খৃষ্টান) এবং অপর দলটি হলো স্বয়ং রাসূল (সাঃ) এর অনুসারী মুসলমান। সূরার প্রথমে 'আহলি কিতাব' তথা ইহুদী ও খৃষ্টানদেরকে জোরাল ভাষায় তাদের আকীদাগত বিভ্রান্তি এবং চারিত্রীক দোষ-ত্রুটি সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়ে রাসূল (সঃ) এবং আল কুরআনকে মেনে নেয়ার আহবান জানানো হয়েছে।


অপর পক্ষে দ্বিতীয় দল আর্থাৎ রাসূল (সঃ) এর অনুসারী মুসলমানদেরকে শ্রেষ্ঠতম দলের মর্যাদার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তাদের মহান দায়-দায়িত্বের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সত্যের পতাকা বহন এবং বিশ্ব মানবতার সংস্কার ও সংশোধনের জন্য পূর্ববর্তী উম্মতদের ধর্মীয় ও চারিত্রীক অধঃপতনের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে তাদের পদাঙ্কনুসরণ না করে দূরে থাকার জন্য সতর্ক করা হয়েছে।

একটি সংস্কারবাদী দল হিসেবে তারা কিভাবে তাদের দায়-দায়িত্ব পালন করবে এবং যেসব আহলি কিতাব ও মুনাফিক নামধারী মুসলমানেরা আল্লাহর দ্বীনের পথে নানা প্রকারের বাধা সৃষ্টি করছে তাদের সাথে কি ধরণের আচরণ করতে হবে, তাদেরকে তা জানিয়ে দেয়া হয়েছে। ওহুদ যুদ্ধে মুসলমান দলটির মধ্যে যেসব দূর্বলতা দেখা দিয়েছিলো তার পর্যালোচনা করা হয়েছে এবং তাদের মধ্যে বিরাজমান দূর্বলতাকে দূর করার জন্য দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে।


আয়াতদ্বয়ের ব্যাখ্যা:

আয়াত: ১৩৩

وَ سَارِعُوْۤا اِلٰى مَغْفِرَةٍ مِّنْ رَّبِّكُمْ وَ جَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمٰوٰتُ وَ الْاَرْضُ١ۙ اُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِیْنَۙ

দৌঁড়াও তোমাদের রবের ক্ষমার পথে এবং সেই পথে যা পৃথিবী ও আকাশের সমান প্রশস্ত জান্নাতের দিকে চলে গেছে, যা এমন সব আল্লাহভীরু লোকদের জন্য তৈরী করা হয়েছে।


আয়াত: ১৩৪

الَّذِیْنَ یُنْفِقُوْنَ فِی السَّرَّآءِ وَ الضَّرَّآءِ وَ الْكٰظِمِیْنَ الْغَیْظَ وَ الْعَافِیْنَ عَنِ النَّاسِ١ؕ وَ اللّٰهُ یُحِبُّ الْمُحْسِنِیْنَۚ

যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল সব অবস্থায়ই অর্থ-সম্পদ ব্যয় করে এবং যারা ক্রোধ দমন করে ও অন্যের দোষ–ত্রুটি মাফ করে দেয়। এ ধরনের সৎলোকদের আল্লাহ‌ অত্যন্ত ভালোবাসেন।

আয়াত: ১৩৫

وَ الَّذِیْنَ اِذَا فَعَلُوْا فَاحِشَةً اَوْ ظَلَمُوْۤا اَنْفُسَهُمْ ذَكَرُوا اللّٰهَ فَاسْتَغْفَرُوْا لِذُنُوْبِهِمْ١۪ وَ مَنْ یَّغْفِرُ الذُّنُوْبَ اِلَّا اللّٰهُ١۪۫ وَ لَمْ یُصِرُّوْا عَلٰى مَا فَعَلُوْا وَ هُمْ یَعْلَمُوْنَ

আর যারা কখনো কোন অশ্লীল কাজ করে ফেললে অথবা কোন গোনাহের কাজ করে নিজেদের ওপর জুলুম করে বসলে আবার সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর কথা স্মরণ হয়ে তাঁর কাছে নিজেদের গোনাহ খাতার জন্য মাফ চায় – কারণ আল্লাহ‌ ছাড়া আর কে গোনাহ মাফ করতে পারেন – এবং জেনে বুঝে নিজেদের কৃতকর্মের ওপর জোর দেয় না,


আয়াত: ১৩৬

اُولٰٓئِكَ جَزَآؤُهُمْ مَّغْفِرَةٌ مِّنْ رَّبِّهِمْ وَ جَنّٰتٌ تَجْرِیْ مِنْ تَحْتِهَا الْاَنْهٰرُ خٰلِدِیْنَ فِیْهَا١ؕ وَ نِعْمَ اَجْرُ الْعٰمِلِیْنَؕ

এ ধরনের লোকদের যে প্রতিদান তাদের রবের কাছে আছে তা হচ্ছে এই যে, তিনি তাদের মাফ করে দেবেন এবং এমন বাগীচায় তাদের প্রবেশ করাবেন যার পাদদেশে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত হবে, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। সৎকাজ যারা করে তাদের জন্য কেমন চমৎকার প্রতিদান।

আয়াত: ১৩৭

قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِكُمْ سُنَنٌ١ۙ فَسِیْرُوْا فِی الْاَرْضِ فَانْظُرُوْا كَیْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُكَذِّبِیْنَ

তোমাদের আগে অনেক যুগ অতিক্রান্ত হয়েছে। পৃথিবীতে ঘোরাফেরা করে দেখে নাও যারা (আল্লাহর বিধান ও হিদায়াতকে) মিথ্যা বলেছে তাদের পরিণাম কি হয়েছে।


আয়াত: ১৩৮

هٰذَا بَیَانٌ لِّلنَّاسِ وَ هُدًى وَّ مَوْعِظَةٌ لِّلْمُتَّقِیْنَ

এটি মানব জাতির জন্য একটি সুস্পষ্ট সতর্কবাণী এবং যারা আল্লাহকে ভয় করে তাদের জন্য পথনির্দেশ ও উপদেশ।


আয়াত: ১৩৯

وَ لَا تَهِنُوْا وَ لَا تَحْزَنُوْا وَ اَنْتُمُ الْاَعْلَوْنَ اِنْ كُنْتُمْ مُّؤْمِنِیْنَ

মনমরা হয়ো না, দুঃখ করো না, তোমরাই বিজয়ী হবে, যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাকো।

আয়াত: ১৪০

اِنْ یَّمْسَسْكُمْ قَرْحٌ فَقَدْ مَسَّ الْقَوْمَ قَرْحٌ مِّثْلُهٗ١ؕ وَ تِلْكَ الْاَیَّامُ نُدَاوِلُهَا بَیْنَ النَّاسِ١ۚ وَ لِیَعْلَمَ اللّٰهُ الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا وَ یَتَّخِذَ مِنْكُمْ شُهَدَآءَ١ؕ وَ اللّٰهُ لَا یُحِبُّ الظّٰلِمِیْنَۙ

এখন যদি তোমাদের আঘাত লেগে থাকে, তাহলে এর আগে এমনি ধরনের আঘাত লেগেছে তোমাদের বিরোধী পক্ষের গায়েও। এ–তো কালের উত্থান-পতন, মানুষের মধ্যে আমি এর আবর্তন করে থাকি। এ সময় ও অবস্থাটি তোমাদের ওপর এ জন্য আনা হয়েছে যে, আল্লাহ‌ দেখতে চান তোমাদের মধ্যে সাচ্চা মুমিন কে? আর তিনি তাদেরকে বাছাই করে নিতে চান, যারা যথার্থ (সত্য ও ন্যায়ের) সাক্ষী হবে -কেননা জালেমদেরকে আল্লাহ‌ পছন্দ করেন না।


আয়াত: ১৪১

وَ لِیُمَحِّصَ اللّٰهُ الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا وَ یَمْحَقَ الْكٰفِرِیْنَ

– এবং তিনি এই পরীক্ষার মাধ্যমে সাচ্চা মুমিনদের বাছাই করে নিয়ে কাফেরদের চিহ্নিত করতে চাইছিলেন।


আয়াত: ১৪২

اَمْ حَسِبْتُمْ اَنْ تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ وَ لَمَّا یَعْلَمِ اللّٰهُ الَّذِیْنَ جٰهَدُوْا مِنْكُمْ وَ یَعْلَمَ الصّٰبِرِیْنَ

তোমরা কি মনে করে রেখেছো তোমরা এমনিতেই জান্নাতে প্রবেশ করবে? অথচ এখনো আল্লাহ‌ দেখেনইনি, তোমাদের মধ্যে কে তাঁর পথে প্রাণপণ যুদ্ধ করতে প্রস্তুত এবং কে তাঁর জন্য সবরকারী।


আয়াত: ১৪৩

وَ لَقَدْ كُنْتُمْ تَمَنَّوْنَ الْمَوْتَ مِنْ قَبْلِ اَنْ تَلْقَوْهُ١۪ فَقَدْ رَاَیْتُمُوْهُ وَ اَنْتُمْ تَنْظُرُوْنَ۠

তোমরা তো মৃত্যুর আকাংখা করছিলে! কিন্তু এটা ছিল তখনকার কথা যখন মৃত্যু সামনে আসেনি। তবে এখন তা তোমাদের সামনে এসে গেছে এবং তোমরা স্বচক্ষে তা দেখছো। 

আয়াত: ১৪৪

وَ مَا مُحَمَّدٌ اِلَّا رَسُوْلٌ١ۚ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ١ؕ اَفَاۡئِنْ مَّاتَ اَوْ قُتِلَ انْقَلَبْتُمْ عَلٰۤى اَعْقَابِكُمْ١ؕ وَ مَنْ یَّنْقَلِبْ عَلٰى عَقِبَیْهِ فَلَنْ یَّضُرَّ اللّٰهَ شَیْئًا١ؕ وَ سَیَجْزِی اللّٰهُ الشّٰكِرِیْن

মুহাম্মাদ একজন রসূল বৈ তো আর কিছুই নয়। তার আগে আরো অনেক রসূলও চলে গেছে। যদি সে মারা যায় বা নিহত হয়, তাহলে তোমরা কি পেছনের দিকে ফিরে যাবে? মনে রেখো, যে পেছনের দিকে ফিরে যাবে সে আল্লাহর কোন ক্ষতি করবে না, তবে যারা আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দা হয়ে থাকবে তাদেরকে তিনি পুরস্কৃত করবেন।


আয়াত: ১৪৫

وَ مَا كَانَ لِنَفْسٍ اَنْ تَمُوْتَ اِلَّا بِاِذْنِ اللّٰهِ كِتٰبًا مُّؤَجَّلًا١ؕ وَ مَنْ یُّرِدْ ثَوَابَ الدُّنْیَا نُؤْتِهٖ مِنْهَا١ۚ وَ مَنْ یُّرِدْ ثَوَابَ الْاٰخِرَةِ نُؤْتِهٖ مِنْهَا١ؕ وَ سَنَجْزِی الشّٰكِرِیْنَ

কোন প্রাণীই আল্লাহর অনুমতি ছাড়া মরতে পারে না। মৃত্যুর সময় তো লেখা আছে। যে ব্যক্তি দুনিয়াবী পুরস্কার লাভের আশায় কাজ করবে আমি তাকে দুনিয়া থেকেই দেবো। আর যে ব্যক্তি পরকালীন পুরস্কার লাভের আশায় কাজ করবে সে পরকালের পুরস্কার পাবে এবং শোকরকারীদেরকে আমি অবশ্যি প্রতিদান দেবো।


আয়াত: ১৪৬

وَ كَاَیِّنْ مِّنْ نَّبِیٍّ قٰتَلَ١ۙ مَعَهٗ رِبِّیُّوْنَ كَثِیْرٌ١ۚ فَمَا وَ هَنُوْا لِمَاۤ اَصَابَهُمْ فِیْ سَبِیْلِ اللّٰهِ وَ مَا ضَعُفُوْا وَ مَا اسْتَكَانُوْا١ؕ وَ اللّٰهُ یُحِبُّ الصّٰبِرِیْنَ

এর আগে এমন অনেক নবী চলে গেছে যাদের সাথে মিলে বহু আল্লাহ‌ ওয়ালা লড়াই করেছে। আল্লাহর পথে তাদের ওপর যেসব বিপদ এসেছে তাতে তারা মনমরা ও হতাশ হয়নি, তারা দুর্বলতা দেখায়নি এবং তারা বাতিলের সামনে মাথা নত করে দেয়নি। এ ধরনের সবরকারীদেরকে আল্লাহ‌ ভালবাসেন।


আয়াত: ১৪৭

وَ مَا كَانَ قَوْلَهُمْ اِلَّاۤ اَنْ قَالُوْا رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا ذُنُوْبَنَا وَ اِسْرَافَنَا فِیْۤ اَمْرِنَا وَ ثَبِّتْ اَقْدَامَنَا وَ انْصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكٰفِرِیْنَ

তাদের দোয়া কেবল এতটুকুই ছিলঃ “হে আমাদের রব! আমাদের ভুল –ত্রুটিগুলো ক্ষমা করে দাও। আমাদের কাজের ব্যাপারে যেখানে তোমার সীমালংঘিত হয়েছে, তা তুমি মাফ করে দাও। আমাদের পা মজবুত করে দাও এবং কাফেরদের মোকাবিলায় আমাদের সাহায্য করো।”


আয়াত: ১৪৮

فَاٰتٰىهُمُ اللّٰهُ ثَوَابَ الدُّنْیَا وَ حُسْنَ ثَوَابِ الْاٰخِرَةِ١ؕ وَ اللّٰهُ یُحِبُّ الْمُحْسِنِیْنَ۠

শেষ পর্যন্ত আল্লাহ‌ তাদেরকে দুনিয়ার পুরস্কারও দিয়েছেন এবং তার চেয়ে ভালো আখেরাতের পুরস্কারও দান করেছেন। এ ধরনের সৎকর্মশীলদেরকে আল্লাহ‌ পছন্দ করেন।


শিক্ষা:
১. 
২. 
৩. 
৪. 
৫. 
৬.