Close
Showing posts with label প্রবন্ধ. Show all posts
Showing posts with label প্রবন্ধ. Show all posts

Monday, March 3, 2025

লক্ষ্য অর্জনে বার্ষিক পরিকল্পনা ২০২৫ -মু. আসাদুজ্জামান || মাসিক ছাত্রসংবাদ

লক্ষ্য অর্জনে বার্ষিক পরিকল্পনা-২০২৫ -মু. আসাদুজ্জামান
প্রত্যেক সফল আন্দোলনের জন্য প্রয়োজন সুসংগঠিত পরিকল্পনা এবং সুদৃঢ় লক্ষ্য। বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের জনশক্তিদের জন্য ২০২৫ সালকে একটি নতুন অধ্যায়ে রূপান্তর করার জন্য একটি সুপরিকল্পিত রূপরেখা প্রয়োজন। এটি কেবল ব্যক্তিগত উন্নতি এবং সংগঠনের অগ্রগতির জন্য নয়, বরং ইসলামী আদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

পরিকল্পনা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সফলতার মূল ভিত্তি। বলা হয়ে থাকে Well-planned is half done. তাই পরিকল্পনা গ্রহণের ক্ষেত্রে SMART কৌশল অনুসরণ করতে হবে। সুনির্দিষ্ট, পরিমাপযোগ্য, অর্জনযোগ্য, বাস্তবসম্মত ও সময়সীমার মধ্যে বাঁধা পরিকল্পনা বা SMART পরিকল্পনা (Specific, Measurable, Achievable, Realistic, Time-bound) মানুষকে সুসংগঠিত ও লক্ষ্যভেদী করে তোলে। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেন, “তোমরা ভালোভাবে লক্ষ্য করো, তোমরা নিজেদের জন্য আগে থেকে কী প্রেরণ করছো আগামী দিনের জন্য।” (সূরা হাশর : ১৮)

এটি আমাদের জীবন পরিচালনায় সুস্পষ্ট পরিকল্পনার গুরুত্ব বুঝিয়ে দেয়। রাসূলুল্লাহ সা. আমাদের শিখিয়েছেন পরিকল্পিত কাজের গুরুত্ব। তিনি বলেন, “মহান আল্লাহ এমন ব্যক্তিকে ভালোবাসেন, যে কোনো কাজ করলে দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করে।” (বায়হাকি : শুয়াবুল ঈমান)


SMART পরিকল্পনার উপাদানসমূহ:


Specific (সুনির্দিষ্ট): পরিকল্পনা সুনির্দিষ্ট ও পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। যেমন, “আমি বছরে ৫টি ভালো বই পড়ব।”
উপকারিতা: লক্ষ্য নির্ধারণ সহজ হয়।

Measurable (পরিমাপযোগ্য): পরিকল্পনাটি এমন হতে হবে যা মাপা যায়। যেমন, “প্রতি মাসে একটি বই পড়ব।”
উপকারিতা: উন্নতি পর্যবেক্ষণ সম্ভব।

Achievable (অর্জনযোগ্য): লক্ষ্য এমন হতে হবে যা বাস্তবায়নযোগ্য। উদাহরণস্বরূপ, “দিনে ৩০ মিনিট সময় সাহিত্য অধ্যয়নে ব্যয় করব।”
উপকারিতা: অহেতুক চাপ এড়ানো যায়।

Realistic (বাস্তবসম্মত): পরিকল্পনা হওয়া উচিত বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যেমন, “আমি প্রতিদিন ৮-১০ পৃষ্ঠা পড়ব।”
উপকারিতা : লক্ষ্য অর্জনে ইতিবাচক মনোভাব বজায় রাখা সহজ হয়।

Time-bound (সময়সীমাবদ্ধ): পরিকল্পনার জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করুন। যেমন, “এক বছরের মধ্যে পুরো কুরআন তাফসির পড়া শেষ করব।”
উপকারিতা: সময়মতো কাজ সম্পন্ন হয়।

•SMART পরিকল্পনার গুরুত্ব:

-ইসলামের দৃষ্টিকোণ: রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, “যে ব্যক্তি দুই দিনের আমল সমান রাখে, সে ক্ষতিগ্রস্ত (বায়হাকি)।” এটি প্রমাণ করে যে পরিকল্পনা ছাড়া উন্নতি অসম্ভব।

-মানব জীবনে প্রভাব: ইবনে খালদুন বলেন, “পরিকল্পনা মানুষকে লক্ষ্য অর্জনের সঠিক পথে নিয়ে যায়।” পরিকল্পিত কাজের মাধ্যমে আমরা সময়, দক্ষতা ও সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারি।

SMART পরিকল্পনা আমাদের জীবনকে সঠিক পথে পরিচালিত করে এবং তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি সফলতা অর্জনে সহায়তা করে। কুরআন, হাদিস এবং ইতিহাসের শিক্ষাগ্রহণের মাধ্যমে আমরা জ্ঞানী ও সংগঠিত জীবন গড়ে তুলতে পারি। আল্লাহর সাহায্য এবং একাগ্রতার সঙ্গে পরিকল্পিত জীবনযাপনই দুনিয়া ও আখিরাতে সাফল্যের চাবিকাঠি।

অধ্যয়ন, সাংগঠনিক দক্ষতা, দাওয়াতি কাজ, পেশাগত প্রস্তুতি এবং ইবাদতের পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা নিম্নে তুলে ধরা হলো-
একটি আদর্শিক ও সুসংগঠিত জীবন গড়ার জন্য প্রয়োজন কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে আত্মোন্নয়ন, অ্যাকাডেমিক শ্রেষ্ঠত্ব, সফ্ট স্কিল ও হার্ড স্কিলের দক্ষতা এবং দাওয়াতের কার্যক্রমকে বাস্তবমুখী করা। আমরা যদি এই স্তম্ভগুলো দৃঢ় করি, তবে ২০২৫ সাল আমাদের জন্য আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর হবে ইনশাআল্লাহ।


যে মৌলিক বিষয়সমূহকে সামনে রেখে পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন-

১. অধ্যয়ন পরিকল্পনা
২. অ্যাকাডেমিক পরিকল্পনা
৩. সফট্ ও হার্ড স্কিল উন্নয়ন পরিকল্পনা
৪. দাওয়াতি পরিকল্পনা
৫. সাংগঠনিক পরিকল্পনা
৬. ইবাদতের পরিকল্পনা
৭. প্রফেশনাল টার্গেট
৮. সামাজিক কাজের পরিকল্পনা


১. অধ্যয়ন পরিকল্পনা


অধ্যয়ন হলো ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের ভিত্তি। তাই এটি কুরআন, হাদীস, ইসলামী সাহিত্য এবং সাম্প্রতিক বিষয়ের সমন্বয়ে গড়ে তুলতে হবে।

i. কুরআন অধ্যয়ন

পবিত্র কুরআন ইসলামের মৌলিক জ্ঞানভাণ্ডার এবং একজন মুমিনের জন্য আল্লাহর সাথে সম্পর্কের প্রধান মাধ্যম। এটি কেবলমাত্র একটি পবিত্র কিতাব নয়; বরং এটি আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নির্দেশিকা এবং পথপ্রদর্শক। ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের জন্য কুরআনের সাথে গভীর সম্পর্ক স্থাপন অপরিহার্য। কারণ, কুরআনের আলোকে জীবন পরিচালনা করাই একজন মুমিনের লক্ষ্য হওয়া উচিত। আল্লাহ তায়ালা বলেন: “এটি একটি কল্যাণময় কিতাব, যা আমি আপনার প্রতি নাজিল করেছি, যাতে তারা এর আয়াতগুলো গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করে এবং বুদ্ধিমানরা উপদেশ গ্রহণ করে।” (সূরা সাদ: ২৯)

কুরআন নিয়মিত অধ্যয়ন করা মুমিনদের জন্য আত্মার পরিশুদ্ধি এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথ। কুরআনের প্রতিটি শব্দ আমাদের জন্য আলোর দিশা। এটি আমাদের শেখায় কোন কাজ আল্লাহর পছন্দনীয় এবং কোনটি অপছন্দনীয়। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “তোমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি সে, যে নিজে কুরআন শেখে এবং অন্যকে শেখায়।” (সহিহ বুখারি : ৫০২৭)

কুরআন পাঠ করার সাথে সাথে এর অর্থ ও ব্যাখ্যা বুঝতে চেষ্টা করা জরুরি। কুরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী নিজেকে গড়ে তোলার জন্য নিয়মিতভাবে এর অধ্যয়ন করা প্রয়োজন। লক্ষ্য হওয়া উচিত সময়ে সময়ে পুরো কুরআন অধ্যয়ন সম্পন্ন করা, যেন এটি আমাদের হৃদয়ে প্রোথিত হয় এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে পারি।

২০২৫ সালে অন্তত একটা তাফসির গ্রন্থ পড়ে শেষ করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। আমরা কীভাবে কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারি?

২০২৫ সালে একটি তাফসির গ্রন্থ পড়ে শেষ করার উদ্যোগ গ্রহণের জন্য সঠিক পরিকল্পনা এবং নিয়মিত অধ্যবসায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ধরুন, আপনি তাফহীমুল কুরআন গ্রন্থটি পড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যার মোট পৃষ্ঠাসংখ্যা ৩২৭৬। এক বছর ৩৬৪ দিন। তাহলে মাসিক ও দৈনিক লক্ষ্য নির্ধারণ করা যেতে পারে। মাসে ২৭০ পৃষ্ঠা এবং দিনে ৯ পৃষ্ঠা করে পড়লে বছরের মধ্যে তাফসির গ্রন্থটি শেষ করা সম্ভব হবে, ইনশাআল্লাহ।

তবে কিছু বিষয় বিবেচনা করতে হবে:

অবস্থা অনুযায়ী সময় ব্যবহার: বছরের প্রতিটি দিন সমান হবে না। কিছুদিন সময় বেশি পাওয়া যাবে, আবার কিছুদিন ব্যস্ততার কারণে পড়া সম্ভব নাও হতে পারে। এই ক্ষেত্রে দিনের পড়ার লক্ষ্য পূরণ না হলে পরবর্তী দিনের সাথে সেই পড়া যোগ করতে হবে।

মাসিক পর্যালোচনা ও সংশোধন: কোনো মাসে যদি লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হয়, তখন টার্গেটের অপঠিত পৃষ্ঠাগুলো পরবর্তী মাসের পরিকল্পনার সাথে যুক্ত করতে হবে। এভাবে ধারাবাহিকভাবে লক্ষ্য পূরণের জন্য সচেষ্ট হতে হবে।

সময় নির্ধারণ ও অগ্রাধিকার: প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করুন। বিশেষ করে ফজরের পর বা রাতের সময়টি এমন অধ্যয়ন কাজে খুব উপযোগী হতে পারে।

আত্মনিয়ন্ত্রণ ও আল্লাহর ওপর ভরসা: নিয়মিত অধ্যয়ন করার জন্য ধৈর্য ও নিয়মানুবর্তিতা বজায় রাখতে হবে। পাশাপাশি আল্লাহর সাহায্য কামনা করুন, কারণ তিনিই সকল কাজে বরকত দানকারী।

একটি দিকনির্দেশনা: প্রতিদিন একটি পরিকল্পনা তৈরি করতে পারেন, যেখানে পড়ার অগ্রগতি লিখে রাখবেন। যেমন: পৃষ্ঠা সংখ্যা, অধ্যায় এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি নোট করুন। এটি আপনাকে আপনার অবস্থান বুঝতে এবং লক্ষ্য পূরণে সহায়তা করবে। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন:
“যারা আমার পথে সংগ্রাম করে, তাদের আমি অবশ্যই আমার পথে পরিচালিত করব। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মশীলদের সঙ্গে আছেন।” (সূরা আনকাবুত: ৬৯)

ছোট ছোট ধাপে এগিয়ে গেলে এবং একটি সুনির্দিষ্ট রুটিন মেনে চললে তাফসির গ্রন্থটি এক বছরে পড়া সম্ভব হবে। আল্লাহ আপনাকে তাওফিক দিন। আমিন।

ii. হাদিস অধ্যয়ন

হাদিস ইসলামী জ্ঞানের দ্বিতীয় উৎস এবং কুরআনের ব্যাখ্যা। তাই কুরআনের পাশাপাশি প্রত্যহ হাদিস অধ্যয়নের অভ্যাস গড়ে তোলা প্রত্যেক মুমিনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাদিস আমাদের রাসূলুল্লাহ (সা)-এর জীবন ও আদর্শের সঠিক পথ দেখায় এবং প্রতিদিনের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কীভাবে চলতে হবে তা শিক্ষা দেয়।

রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “আমি তোমাদের মাঝে দু’টি জিনিস রেখে যাচ্ছি, যদি তোমরা তা আঁকড়ে ধরো, তবে কখনো পথভ্রষ্ট হবে না। এক হলো আল্লাহর কিতাব এবং অপরটি আমার সুন্নাহ।” (মুআত্তা মালিক: ১৬২৮)

পঠিত হাদিসের আলোকে নিজের জীবনকে সাজানো এবং চরিত্রকে সমৃদ্ধ করা ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আসুন, আমরা কুরআন ও হাদিসকে আমাদের জীবনধারার কেন্দ্রবিন্দু বানাই। কুরআনের ব্যাখ্যা হলো হাদিস। কুরআন ভালোভাবে অনুধাবন ও বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে হাদিস অধ্যয়নের বিকল্প নেই।

কতগুলো হাদিস গ্রন্থ অথবা সংখ্যা এই বছর পড়ে শেষ করতে চাই তা আগে নির্ধারণ করতে হবে। টার্গেট নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে সিহাহ সিত্তাহ, রিয়াদুস সালেহিন, সাথী ও সদস্য সিলেবাসের হাদিসগ্রন্থসমূহকে প্রাধান্য দেয়া যেতে পারে। টার্গেট নির্ধারণ হয়ে গেলে হিসাব করতে হবে বছরে কতগুলো হাদিস অধ্যয়ন করতে হবে? তারপর তাফসির গ্রন্থ অধ্যয়নের কার্যকরী উদ্যোগের আলোকে অধ্যয়ন সম্পন্ন করতে হবে।

iii. ইসলামী সাহিত্য

ইসলামী আন্দোলনের যোগ্য কর্মী হতে হলে ইসলামী আদর্শের গভীর জ্ঞান ও চরিত্র গঠনের পাশাপাশি সমকালীন ভ্রান্ত মতাদর্শের অসারতা সম্পর্কে সচেতন হওয়া অত্যন্ত জরুরি। এটি কেবল মুখস্থ বুলি বা প্রচলিত ধারণার ওপর নির্ভর করে সম্ভব নয়; বরং নিয়মিত ইসলামী সাহিত্য অধ্যয়নের মাধ্যমে আদর্শিক গভীরতা অর্জন করা অপরিহার্য।

ইসলামী সাহিত্য আমাদের কুরআন, হাদিস এবং ইসলামী ইতিহাসের আলোকে সঠিক দিকনির্দেশনা দেয়। এটি চিন্তার মৌলিকত্ব সৃষ্টি করে, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের শিক্ষা বাস্তবায়নে সহায়ক হয় এবং বাতিল মতাদর্শের ফাঁদ থেকে রক্ষা করে। সুতরাং, ইসলামী আদর্শে দৃঢ়তা ও নেতৃত্বের জন্য নিয়মিত সাহিত্য অধ্যয়ন অপরিহার্য।

যে বিষয়গুলোর ওপর অধ্যয়নের পরিকল্পনা থাকা চাই তা নিম্নে দেয়া হলো। প্রতিটি বিষয়ের ওপর একাধিক বই সিলেক্ট করে পরিকল্পনায় লিখে ফেলা এবং সব বই মিলে মোট পৃষ্ঠাসংখ্যা হিসাব করে কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করা। (যেভাবে তাফসির অধ্যয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।)

iv. সংগঠন ও দাওয়াত

* ইসলামের গৌরবময় ইতিহাস
* চরিত্র ও আদর্শ
* ইসলামী আদর্শ
* ইবাদাত ও তাযকিয়াতুন নফ্স
* ইসলামী জীবনব্যবস্থা
* ইসলামী আন্দোলন
* ইসলামী অর্থনীতি
* ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা
* ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা
* ইসলামী সংস্কৃতি
* ফিকাহ ও প্রাথমিক উসুলে ফিকাহ,
* মাসয়ালা-মাসায়েল

v. বুদ্ধিভিত্তিক অধ্যয়ন, ইতিহাস ও সাম্প্রতিক বিষয়সমূহ

ইসলামী আন্দোলনের সঠিক দিকনির্দেশনা ও অগ্রগতির জন্য বুদ্ধিভিত্তিক অধ্যয়ন, ইতিহাস, এবং সমকালীন বিষয় জানা অত্যন্ত জরুরি। ইতিহাস আমাদের অতীত ভুল থেকে শিক্ষা নিতে এবং সফলতাগুলো থেকে দিকনির্দেশনা পেতে সহায়তা করে। সমকালীন বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান থাকলে বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রস্তুতি নেওয়া সহজ হয়।

ইমাম গাজ্জালি (রহ) বলেন, “জ্ঞানের যে শাখাই হোক, তা আল্লাহর সৃষ্টিকে বুঝতে এবং তাঁর পথে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে।” বুদ্ধিভিত্তিক জ্ঞান চিন্তার গভীরতা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বাড়ায়, যা একটি আন্দোলনের জন্য অপরিহার্য। সুতরাং, ইসলামী আন্দোলনকে শক্তিশালী ও প্রাসঙ্গিক রাখতে এসব বিষয়ে গভীর জ্ঞান থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

* প্রতিদিন সংবাদ বিশ্লেষণ করা
* বিশ্বরাজনীতি ও সমাজে ইসলামের ভূমিকা বোঝার জন্য গবেষণা
* ইসলামফোবিয়ার প্রতিক্রিয়া জানার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জন
* ক্যারিয়ার ও দক্ষতা
* বিভিন্ন মতবাদ
* সমসাময়িক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয় সম্পর্কে জ্ঞানার্জন
* সাম্প্রতিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পলিসি ও পরিস্থিতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা অর্জন
* মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা (Human Resource Management)
* সময় ব্যবস্থাপনা (Time Management)
* চিরন্তন ও সমসাময়িককালের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয় সম্পর্কে জ্ঞানার্জন
* বিশ্বায়ন (Globalization)
* সুশাসন (Good Governance)
* আইন ও মানবাধিকার (Law & Human Rights)
* দুর্নীতি ও সন্ত্রাস (Corruption & Terrorism)
* স্বাস্থ্য সচেতনতা ও প্রাথমিক চিকিৎসা (Health Awareness and First Aid)

প্রতিটি বিষয়ের উপর একাধিক বই সিলেক্ট করে পরিকল্পনায় লিখে ফেলা এবং সব বই মিলে মোট পৃষ্ঠাসংখ্যা হিসাব করে অধ্যয়নের কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করা। (যেভাবে তাফসির অধ্যয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে)

২. অ্যাকাডেমিক অধ্যয়ন

“দ্বীন বিজয়ের লক্ষ্যে সুন্দর ক্যারিয়ার” এই স্লোগানকে সামনে রেখে পরিকল্পনা সাজাতে হবে। দ্বীন বিজয়ের জন্য একটি সুসংগঠিত, সফল ক্যারিয়ার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামিক মূল্যবোধ বজায় রেখে এমন একটি পেশা বেছে নিতে হবে যা সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং ইসলামের বার্তা ছড়িয়ে দিতে সহায়তা করে। একটি ভালো ক্যারিয়ার শুধু ব্যক্তিগত জীবনে স্থিতিশীলতা আনবে না, বরং দাওয়াহ ও মানবকল্যাণমূলক কাজকে এগিয়ে নিতে সহায়ক হবে। সততা, পরিশ্রম এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে কাজ করলে একজন মুমিন তার পেশাগত জীবনের মাধ্যমেও দ্বীন প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করতে পারে। অ্যাকাডেমিক শ্রেষ্ঠত্ব কেবল ক্যারিয়ার গঠনে নয়, বরং ইসলামী আন্দোলনের বার্তা পৌঁছানোর মাধ্যম হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ।

অ্যাকাডেমিক অধ্যয়নকে ফলপ্রসূ করতে যে বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন:

সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ: কী বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হতে চান বা কোন বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করতে চান, তা নির্ধারণ করুন। লক্ষ্য পরিষ্কার থাকলে অধ্যয়নে অগ্রগতি সহজ হয়।

পরিকল্পিত রুটিন তৈরি: প্রতিদিনের পড়াশোনার জন্য একটি রুটিন তৈরি করুন। এতে নির্ধারিত সময়ে পড়ার অভ্যাস গড়ে উঠবে এবং সময়ের অপচয় কমবে।

নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিতি: নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত থাকা শিক্ষার্থীর শেখার প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এতে পাঠ্য বিষয়গুলোর সঠিক ধারণা পাওয়া যায় এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে সরাসরি প্রশ্নোত্তর ও আলোচনা করার সুযোগ তৈরি হয়। নিয়মিত উপস্থিতি পরীক্ষার প্রস্তুতি এবং অ্যাকাডেমিক পারফরম্যান্সকে উন্নত করে।

গভীর মনোযোগ ও মনোযোগ ধরে রাখা: পড়ার সময় মনোযোগ ধরে রাখুন। প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার বা অপ্রয়োজনীয় কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখুন।

ধারাবাহিক অধ্যয়ন: পড়ার চাপ এড়াতে প্রতিদিন অল্প করে অধ্যয়ন করুন। এতে জ্ঞান দীর্ঘমেয়াদে মস্তিষ্কে ধরে রাখা সহজ হয়।

গবেষণামূলক মনোভাব: কেবল মুখস্থ না করে, প্রতিটি বিষয়ের গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করুন। প্রশ্ন করতে শিখুন এবং নতুন বিষয় নিয়ে চিন্তা করুন।

নোট তৈরির অভ্যাস: পড়ার সময় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নোট করুন। এটি স্মৃতিশক্তি বাড়ায় এবং পরীক্ষার আগে সহজে পুনরায় পড়া সম্ভব হয়।

রিভিশন বা পুনরাবৃত্তি: নতুন জিনিস শিখলে তা বারবার পড়ুন। রিভিশন জ্ঞানকে দীর্ঘস্থায়ী করে এবং ভুলের সম্ভাবনা কমায়।

সঠিক রেফারেন্স ব্যবহার: অধ্যয়ন করার সময় নির্ভরযোগ্য বই, গবেষণাপত্র এবং অনলাইন সোর্স ব্যবহার করুন। ভুল তথ্য এড়িয়ে চলুন।

পড়ার পরিবেশ: পড়ার জন্য একটি শান্ত ও পরিষ্কার পরিবেশ বেছে নিন। এটি মনোযোগ ধরে রাখতে সহায়তা করে।

শিক্ষকের দিকনির্দেশনা: যে কোনো জটিল বিষয়ের ক্ষেত্রে শিক্ষকের সাহায্য নিন। তাদের দিকনির্দেশনা ভুল সংশোধন ও অগ্রগতি আনতে সহায়ক।

গ্রুপ স্টাডি: সহপাঠীদের সঙ্গে গ্রুপ স্টাডি করলে ধারণা স্পষ্ট হয় এবং নতুন দৃষ্টিভঙ্গি পাওয়া যায়।

বইয়ের বাইরে শেখা: অ্যাকাডেমিক বইয়ের পাশাপাশি ভিডিও লেকচার, অনলাইন কোর্স, এবং শিক্ষামূলক পডকাস্ট থেকে শেখার চেষ্টা করুন।

সময়ের সদ্ব্যবহার: অপ্রয়োজনীয় কাজে সময় অপচয় না করে, অধ্যয়ন ও বিশ্রামের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করুন।

স্বাস্থ্য সচেতনতা: স্বাস্থ্য ভালো না থাকলে পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়া কঠিন। সঠিক ডায়েট, পর্যাপ্ত ঘুম, এবং ব্যায়ামের মাধ্যমে সুস্থ থাকুন।

ইতিবাচক মানসিকতা: ব্যর্থতায় হতাশ না হয়ে বরং তা থেকে শিক্ষা নিন। ধৈর্য এবং আত্মবিশ্বাস অধ্যয়নকে সহজ করে তোলে।

আল্লাহর ওপর ভরসা: অধ্যয়নে সাফল্যের জন্য আল্লাহর ওপর ভরসা করুন এবং নিয়মিত দোয়া করুন। এতে অধ্যয়নে বরকত আসবে।

এই বিষয়গুলো মেনে চললে আপনার অ্যাকাডেমিক অধ্যয়ন আরও সুন্দর ও ফলপ্রসূ হবে, ইনশাআল্লাহ। ইসলামী আন্দোলনের কর্মীরা তাদের অ্যাকাডেমিক পারফরম্যান্স দিয়ে দাওয়াতের পরিবেশ তৈরি করতে পারেন। ভালো রেজাল্টের মাধ্যমে অন্যান্য ছাত্রদের ইসলামী আন্দোলনের প্রতি আকৃষ্ট করা যায়।

৩. সফট ও হার্ড স্কিল উন্নয়ন পরিকল্পনা

ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের জন্য নেতৃত্ব এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সফট স্কিল যেমন যোগাযোগ, নেতৃত্ব ও সমন্বয়, কর্মক্ষেত্রে সম্পর্ক উন্নত করে এবং দলগত কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে। অন্যদিকে, হার্ড স্কিল হলো নির্দিষ্ট পেশাগত দক্ষতা যা কর্মদক্ষতা বাড়ায় এবং কাজের মান উন্নত করে। দুই ধরনের দক্ষতা কর্মক্ষেত্রে সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলো ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে সাফল্য আনতে সাহায্য করে। সফট স্কিল ব্যক্তি হিসেবে মূল্যবান করে তোলে, আর হার্ড স্কিল চাকরি পাওয়ার যোগ্যতা বাড়ায়। সফল ক্যারিয়ারের জন্য উভয়ের ভারসাম্য প্রয়োজন।

সফট স্কিল উন্নয়ন পরিকল্পনা

যোগাযোগ দক্ষতা:
* প্রতিদিন নতুন শব্দভাণ্ডার শেখা।
* দ্বীনি এবং দাওয়াতি বিষয়ের সঠিক উপস্থাপনা শিখুন।
* স্পিচ প্র্যাকটিস এবং পাবলিক স্পিকিং কোর্স করা।

সময় ব্যবস্থাপনা: প্রতিদিনের কাজগুলো সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করা।

টিমওয়ার্ক: গ্রুপ প্রজেক্টে অংশগ্রহণ এবং নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা নেয়া।

সমস্যা সমাধান দক্ষতা:
* লজিক্যাল গেমস ও সমস্যা সমাধানের কেস স্টাডি করা।
* সংঘাত সমাধান এবং সংগঠন পরিচালনায় দক্ষতা।

ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স: আত্মজ্ঞান বাড়ানো ও অন্যদের অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করা।

হার্ড স্কিল উন্নয়ন পরিকল্পনা

প্রযুক্তিগত দক্ষতা:
* ডিজিটাল টুল ব্যবহারের দক্ষতা (যেমন: মাইক্রোসফট এক্সেল, গ্রাফিক ডিজাইন)।
* প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার শেখার জন্য অনলাইন কোর্স করা। প্রোগ্রামিং, ভিডিও এডিটিং বা ওয়েব ডেভেলপমেন্ট শিখুন।

ডাটা অ্যানালাইসিস: এক্সেল, পাইথন, এবং ডাটা ভিজ্যুয়ালাইজেশন টুল শেখা।

ভাষাগত দক্ষতা: ইংরেজি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ভাষার ওপর দক্ষতা অর্জনের জন্য নিয়মিত প্র্যাকটিস এবং ভাষা অ্যাপ ব্যবহার করা।

বিশেষায়িত দক্ষতা: পেশাগত কোর্স বা প্রশিক্ষণ এবং অনলাইনে সার্টিফিকেশন কোর্সে অংশগ্রহণ করুন।

সফট ও হার্ড স্কিল অর্জনের মাধ্যম

* অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে কোর্স করা।
* লাইভ ওয়ার্কশপ ও সেমিনারে অংশগ্রহণ।
* নিয়মিত প্র্যাকটিস এবং বাস্তব কাজে প্রয়োগ।
* মেন্টর ও পেশাদারদের পরামর্শ নেওয়া।
* স্ব-শিক্ষার জন্য বই, ভিডিও এবং ব্লগ থেকে জ্ঞান অর্জন।

৪. দাওয়াতি কাজের পরিকল্পনা


দাওয়াত অর্থ আল্লাহর পথে মানুষকে আহ্বান করা, যা প্রত্যেক মুসলিমের একটি দায়িত্ব ও ফরজ কাজ। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “তোমাদের মধ্য থেকে এমন একটি দল থাকা উচিত যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান জানাবে, সৎ কাজের আদেশ করবে এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে। এরা সফলকাম।” (সূরা আলে ইমরান: ১০৪)

রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, “যদি একজন মানুষও তোমার মাধ্যমে হেদায়েত পায়, তবে তা তোমার জন্য লাল উটের চেয়েও উত্তম।” (বুখারি: ৩০০৯, মুসলিম: ২৪০৬)

বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সদস্যরা “দাওয়াতি দিন প্রতিদিন” এবং “যেখানেই ছাত্র, সেখানেই দ্বীনের দাওয়াত” এই স্লোগান ধারণ করে নিয়মিতভাবে দাওয়াতি কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। সংগঠনের প্রত্যেক জনশক্তি বার্ষিক পরিকল্পনার আলোকে সুনির্দিষ্ট দাওয়াতি টার্গেট নির্ধারণ করবেন।

দাওয়াতি টার্গেট রেশিও:
সদস্য: বছরে ২০ জন বন্ধু ও ১২ জন সমর্থক।
সাথী: বছরে ১৫ জন বন্ধু ও ১০ জন সমর্থক।
কর্মী: বছরে ১০ জন বন্ধু ও ৫ জন সমর্থক।

দাওয়াতি কাজের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য:

প্রতিটি জনশক্তিকে এমন ছাত্রদের লক্ষ্যবস্তু করতে হবে যারা নিম্নোক্ত গুণাবলি ধারণ করে-

* মেধাবী, বুদ্ধিমান ও কর্মঠ
* চরিত্রবান, নেতৃত্বের গুণাবলি সম্পন্ন
* সমাজ বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রভাবশালী
* সিঙ্গেল ডিজিট রোলধারী, ষ জিপিএ ৫ প্রাপ্ত
* বিশ্ববিদ্যালয়ে প্লেসধারী

প্রত্যেক ক্যাটাগরি থেকে ছাত্রদের নাম, ঠিকানা, মোবাইল নম্বর, এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য সংগ্রহ করে তাদের দাওয়াতের তালিকা তৈরি করতে হবে। যেমন: জিপিএ ৫: আব্দুর রহমান, একাদশ শ্রেণি, মোবাইল নম্বর: ০১XXXXXXX, ঠিকানা: ঢাকেশ্বরী, ঢাকা।


দাওয়াত পৌঁছানোর আরো ধাপসমূহ:
পরিবার: ছোট ভাই-বোন, কাকা, ভাতিজা ইত্যাগি।
মুহাররমা: খালা, ফুফু, ভাগনি, ভাতিজি ইত্যাদি।
প্রতিবেশী: নিজের ঘরের চারপাশের মানুষ।
বন্ধু ও ক্লাসমেট: স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য বন্ধুরা।

তালিকা তৈরি করে তাদের সঙ্গে নিয়মিত সম্পর্ক বজায় রাখুন এবং বছরব্যাপী পরিকল্পিত দাওয়াতি কাজ চালিয়ে যান।

অতিরিক্ত দাওয়াতি উদ্যোগ

কুরআন শিক্ষা:
* অন্তত ২ জন সাধারণ ছাত্রকে শুদ্ধভাবে কুরআন শেখানো।
* ব্যক্তিগতভাবে একটি অর্থসহ কুরআন বিতরণ।

অ্যাকাডেমিক সহযোগিতা: অন্তত একজন সাধারণ ছাত্রকে অ্যাকাডেমিক দিক থেকে সাহায্য করা। দাওয়াতি কাজের মাধ্যমে ইসলামের সৌন্দর্য সমাজে ছড়িয়ে দেয়া যায়। এ কাজে ধৈর্য, আন্তরিকতা এবং পরিকল্পনার সমন্বয়ে কাজ করতে হবে। আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে একনিষ্ঠভাবে এ দায়িত্ব পালন করলে এটি দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতার পথ সুগম করবে এবং আগামী দিনে ইসলমী বিপ্লবের জন্য ময়দান প্রস্তুত করবে ইনশাআল্লাহ।

৫. সাংগঠনিক কাজের পরিকল্পনা


ইসলামী সংগঠনের মূল লক্ষ্য হলো আল্লাহ প্রদত্ত জীবনবিধান কায়েম করে মানবজাতিকে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করা। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “তিনিই সে সত্তা যিনি তাঁর রাসূলকে হিদায়াত ও সত্য দ্বীনসহ প্রেরণ করেছেন, যেন তা সকল দ্বীনের ওপর বিজয়ী হয়।” (সূরা তাওবা : ৩৩)

এ লক্ষ্য অর্জনে দায়িত্বশীলরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। একজন দায়িত্বশীল হলো আল্লাহর প্রতিনিধিত্বকারী, রাসূল (সা)-এর উত্তরসূরি এবং মানবতার মুক্তির দিশারি। তারা সংগঠনের মূল চালিকাশক্তি এবং আদর্শিক প্রতিচ্ছবি। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, “তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।” (সহিহ বুখারী: ৮৯৩)

সংগঠক হিসেবে পরিকল্পনা ও দায়িত্ব :

পরিকল্পনা গ্রহণ : পরিকল্পনা সাফল্যের প্রথম ধাপ। সংগঠনের লক্ষ্য ও প্রয়োজন বুঝে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তৈরি করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটি ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণ করে এবং লক্ষ্য অর্জনের সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদান করে। ইবনু খালদুন (রহ) বলেন,

“Planning is the key to organized progress, for a well-structured plan shapes the future.”

পরিকল্পনা হচ্ছে সংগঠিত অগ্রগতির চাবিকাঠি, কারণ একটি সুসংগঠিত পরিকল্পনা ভবিষ্যৎকে গড়ে তোলে। পরিকল্পনা গ্রহণের ক্ষেত্রে SMART কৌশল অনুসরণ করতে হবে।

কর্মবণ্টন : কাজের সুষ্ঠু বাস্তবায়নের জন্য দায়িত্বশীলদের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ ভাগ করে দেওয়া আবশ্যক। এটি কাজের গতি বাড়ায় এবং দক্ষতা বৃদ্ধি করে। রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, যখন কাজ সঠিক ব্যক্তিকে দেওয়া হয়, তখন তা সাফল্যের উৎস হয়ে দাঁড়ায়। (তিরমিজি)

তত্ত্বাবধান : যেকোনো কাজের অগ্রগতি নির্ভর করে সঠিক তদারকির ওপর। কাজের তদারকি ও প্রতিবন্ধকতা দূর করা সংগঠনের লক্ষ্য পূরণে সহায়ক। বিখ্যাত চিন্তাবিদ পিটার ড্রাকার বলেন, “Management is doing things right; leadership is doing the right things.” ‘‘ব্যবস্থাপনা হচ্ছে কাজটি সঠিকভাবে করা; নেতৃত্ব হচ্ছে সঠিক কাজটি করা।’’

রিপোর্টিং: সঠিক ও বাস্তবসম্মত প্রতিবেদন কাজের কার্যকারিতা মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি কর্মপদ্ধতির স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা গ্রহণে সহায়তা করে। এটা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

* রিপোর্ট বস্তুনিষ্ঠ ও সঠিক হওয়া দরকার।
* আন্দাজ, অনুমান করে কোনো রিপোর্ট দেওয়া বা নেওয়া ঠিক নয়।
* রিপোর্টে ময়দানের Orginal চিত্র আসা দরকার। রিপোর্ট পূরণের জন্য কর্মী, সাথী, সদস্য বানিয়ে বিপ্লব হবে না।

পুনর্মূল্যায়ন : পরিকল্পনার সাফল্য নির্ভর করে তার সময়োপযোগী পর্যালোচনার ওপর। প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে পরিকল্পনা পুনর্মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় সংশোধন অপরিহার্য। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “তোমরা ভালোভাবে লক্ষ্য করো, তোমরা নিজেদের জন্য কী প্রেরণ করছো আগামী দিনের জন্য।” (সূরা হাশর : ১৮)

বিখ্যাত দার্শনিক কনফুসিয়াস বলেছেন, “Reviewing the past helps guide the future.” অর্থাৎ অতীত পর্যালোচনা ভবিষ্যৎকে দিকনির্দেশনা দেয়।

উপরোক্ত বিষয়গুলো ছাড়াও আরো যে বিষয়গুলোতে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকা দরকার

সংগঠনের আদর্শিক মান নিশ্চিতকরণ : সংগঠনের আদর্শিক মান হচ্ছে ১:১০:১০০, অর্থাৎ কোনো শাখায় যদি ১ জন সদস্য থাকে ঐ শাখায় ১০ জন সাথী ও ১০০ জন কর্মী থাকবে। ভালো সংগঠকের প্লানে অন্তত একটা শাখা/থানা/ওয়ার্ড/ইউনিয়ন অথবা উপশাখাকে আদর্শ মানে নিয়ে আসার চেষ্টা করা। কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করে বছরব্যাপী কাজ করা।

সংগঠন বৃদ্ধি : সংগঠন নেই এমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আবাসিক এরিয়ায় কাজ সৃষ্টির লক্ষ্যে SMART প্ল্যান গ্রহণ করা। সেখানে অন্তত একটি উপশাখা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করা। Action plan নিয়ে কাজ শুরু করা।

* জনশক্তির মানোন্নয়ন ও মানসংরক্ষণে ভূমিকা পালন করা।
* ব্যাপক দাওয়াত সম্প্রসারণ ও গণভিত্তি রচনা করা।
* সাংগঠনিক শৃঙ্খলা সংরক্ষণ করা।
* সর্বপর্যায়ে গতিশীলতা সৃষ্টি করা (শাখা>থানা>ওয়ার্ড/ইউনিয়ন >উপশাখা)।

আমানতের সংরক্ষণ : আর্থিক লেনদেনে পরিচ্ছন্ন ভূমিকা পালন করা। কোনো অবস্থায়ই সংগঠনের কোনো টাকা, কোনো জিনিস, ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা যাবে না। আয়-ব্যয়ে ভারসাম্য থাকা। কম খরচে বেশি কাজ করা। নেতৃত্বের নিকট সংগঠনের সম্পদ ও জনশক্তি বড় আমানত।

৬. ইবাদাতের পরিকল্পনা


ইবাদাত হলো আল্লাহর প্রতি আনুগত্য ও ভালোবাসার প্রকাশ, যা মানুষকে আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথে পরিচালিত করে। এটি শুধু নামাজ, রোজা বা দোয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং জীবনের প্রতিটি কাজকেও ইবাদতে রূপান্তর করা সম্ভব, যদি তা আল্লাহর জন্য হয়। কুরআনে আল্লাহ বলেন, “আমি জিন এবং মানবজাতিকে কেবল আমার ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছি।” (সূরা আয-যারিয়াত: ৫৬)

ইবাদাত মানুষের অন্তরকে পবিত্র করে, পাপ থেকে দূরে রাখে এবং জীবনের প্রতি দায়িত্বশীলতা বৃদ্ধি করে। রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, “ইবাদাত মানুষের হৃদয়কে প্রশান্তি দেয় এবং আত্মাকে বিশুদ্ধ করে।” (বুখারি ও মুসলিম)

আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য প্রতিটি ইবাদাত মানুষকে আখিরাতের জন্য প্রস্তুত করে এবং তাকে জীবনের সঠিক পথে পরিচালিত করে। ইবাদাত হলো আত্মশুদ্ধি এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথ।

শববেদারি ও তাহাজ্জুদ:
* প্রতি সপ্তাহে অন্তত ২ দিন তাহাজ্জুদ পড়া।
* রাতের শেষ প্রহরে আল্লাহর কাছে দোয়া করা।

নফল রোজা:
* প্রতি সোমবার ও বৃহস্পতিবার রোজা রাখার অভ্যাস করা।
* প্রতি আরবি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে আইয়ামে বিজের রোজা রাখার পরিকল্পনা থাকা।

দান-সদকা:
* মাসিক আয় বা পকেটমানি থেকে দান করা।
* গোপনে এবং প্রকাশ্যে উভয়ভাবে দান করা।

৭. প্রফেশনাল টার্গেট


প্রফেশনাল টার্গেট হলো ক্যারিয়ার সফলতার জন্য নির্ধারিত লক্ষ্য, যা দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, ও অর্জনের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়। এটি স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে, যেমন নির্দিষ্ট দক্ষতা অর্জন, প্রমোশন, বা নতুন প্রকল্পে নেতৃত্ব দেয়া। টার্গেট নির্ধারণে নির্দিষ্ট, পরিমাপযোগ্য, বাস্তবসম্মত এবং সময়নির্ধারিত (ঝগঅজঞ) পরিকল্পনা অপরিহার্য। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “মানুষ যা চেষ্টা করে, তা-ই সে পায়।” (সূরা আন-নাজম: ৩৯) সুতরাং, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে পরিশ্রম করা পেশাগত উন্নতির মূল চাবিকাঠি। ভবিষ্যতে সফল পেশাগত জীবন গঠনে এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে।

পেশাগত পরিকল্পনা:
* যে পেশায় যেতে চান, সে বিষয়ে দক্ষতা অর্জন।
* প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি।

ইসলামী চিন্তাধারা বজায় রাখা:
* পেশাগত জীবনেও ইসলামের আদর্শ প্রচার।
* অফিস বা প্রতিষ্ঠানে দাওয়াতি পরিবেশ তৈরি।

নেটওয়ার্ক তৈরি:
* পেশাগত যোগাযোগ বৃদ্ধি করা এবং
* শিল্পের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন।

ধৈর্য ও স্থিরতা: লক্ষ্য অর্জনে প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলায় ধৈর্যশীল থাকা।

আল্লাহর ওপর ভরসা: কাজের সফলতার জন্য আল্লাহর প্রতি ভরসা রাখা এবং দুআ করা। আল্লাহ বলেন, “যারা চেষ্টা করে, আমি তাদের পথ দেখাই।” (সূরা আনকাবুত: ৬৯)

৮.সামাজিক পরিকল্পনা

ছাত্রশিবিরের সদস্য সম্মেলনে কেন্দ্রীয় সভাপতি বলেছিলেন ‘‘আমরা বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির সবার হয়ে উঠতে চাই’’। সমাজের প্রতিটি মানুষ নিয়েই আমাদের কাজ করতে হবে। সামাজিক কাজ মানুষকে একত্রিত করে এবং সমাজের কল্যাণ নিশ্চিত করে। এটি ব্যক্তির নৈতিক উন্নয়ন ঘটায় এবং দুঃস্থ ও অসহায়দের সাহায্যের সুযোগ সৃষ্টি করে। রাসূলুল্লাহ সা বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি সে, যে অন্যের উপকারে আসে।” ( সহিহ বুখারি)

সামাজিক কাজ সমাজে শান্তি, সহমর্মিতা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করে। এটি কেবল দুনিয়ার সেবা নয়, বরং আখিরাতের নেকি অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

শিক্ষা কার্যক্রম:
* গ্রামে বা সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় পাঠশালা প্রতিষ্ঠা।
* শিক্ষার্থীদের বই, খাতা ও অন্যান্য সরঞ্জাম বিতরণ।

স্বাস্থ্যসেবা উদ্যোগ:
* ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প আয়োজন।
* রক্তদান কর্মসূচি চালু করা।

দরিদ্রদের সহায়তা:
* ত্রাণ বিতরণ ও খাদ্য সহায়তা কার্যক্রম।
* গৃহহীনদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি।

পরিবেশ রক্ষা:
* বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি।
* পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা।

সামাজিক সচেতনতা:
* মাদকবিরোধী প্রচারণা।
* যৌতুক, ইভটিজিং, নারী ও পুরুষ নির্যাতন ইত্যাদির বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি।

যুব উন্নয়ন:
* দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ আয়োজন।
* উদ্যোক্তা উন্নয়ন কার্যক্রম।

ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার প্রচার:
* ইসলামি মূল্যবোধ নিয়ে কর্মশালা।
* কোরআন শিক্ষার ব্যবস্থা।
* মক্তব প্রতিষ্ঠা করা।

সেচ্ছাসেবক দল গঠন:
* জরুরি প্রয়োজনে সেবা প্রদানের জন্য প্রস্তুত একটি দল গঠন। যেমন: গ্রামের নিরক্ষর বৃদ্ধদের জন্য বিনামূল্যে কুরআন শিক্ষা ও গণশিক্ষা কার্যক্রম, সপ্তাহে একদিন স্বাস্থ্যসেবার উদ্যোগ এবং বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম ইত্যাদি।

বার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কৌশল:


ডেইলি চেকলিস্ট: প্রতিদিনের কাজগুলো নোট করে রাখুন।

সাপ্তাহিক বিশ্লেষণ: কোন কাজ অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে তা খুঁজে বের করুন।

মাসিক মূল্যায়ন: কাজের ধারাবাহিকতা রক্ষায় মাস শেষে নিজের অবস্থা পর্যালোচনা করুন।

স্মার্ট গোল: স্পেসিফিক, মেজারেবল, অ্যাচিভেবল, রিয়েলিস্টিক এবং টাইম-বাউন্ড লক্ষ্য নির্ধারণ করুন।

দোয়া ও তাওয়াক্কুল: আল্লাহর উপর ভরসা রেখে পরিশ্রম করুন।

২০২৫ সাল হোক ইসলামী আন্দোলনের কর্মী ভাইদের জন্য একটি নতুন সূচনা। সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, অধ্যবসায় এবং আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলের মাধ্যমে আমরা একটি আদর্শিক সমাজ গড়ে তুলতে পারি।

এই পরিকল্পনার প্রতিটি ধাপ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে করা উচিত। যদি আমরা আমাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করি, তবে নিশ্চিতভাবে আমরা একটি সুশৃঙ্খল এবং সফল ইসলামী আন্দোলনের অংশীদার হতে পারব ইনশাআল্লাহ।

লেখক :
কেন্দ্রীয় ফাউন্ডেশন সম্পাদক,
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

মুল লেখা: মাসিক ছাত্রসংবাদ

Tuesday, January 21, 2025

মিডিয়াতে অপপ্রচার ও আমাদের দায়িত্ব - ইউনুছ আব্দুদ্দাইয়ান

আগেকার দিনে চিঠি বা দূত পাঠিয়ে সংবাদের আদান প্রদান হতো। আল্লাহর রাসূল (সা) মাঝে মধ্যে পাহাড়ের উপরে উঠে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা প্রদান করতেন যাতে করে দুরবর্তী লোকেরাও তাঁর কথা শুনতে পায় এবং তাঁকে দেখতে পান। রাসূলে কারীম (সা) মাঝে মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মাটিতে লাঠি দ্বারা চিত্র অংকন করে সাহাবায়ে কেরামকে বুঝাতেন। কালপরিক্রমায় প্রিন্টেড ও ইলেক্ট্রনিক এই দুই ধরনের মিডিয়ার সাথে আমরা পরিচতি হই। বর্তমানে এর সাথে যোগ হয়েছে অনলাইন ও সোশাল মিডিয়া। মূলত সংবাদপত্র, রেডিও, টেলিভিশন, লিফলেট, পোস্টার, ওয়েবসাইট প্রভৃতির মাধ্যমে ঘরে বসেই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের খবর জানা যায়। বিশেষভাবে অনলাইন ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে যেকোন সংবাদ বিশ্বের আনাচে কানাচে অতিদ্রুত ছড়িয়ে দেয়া সম্ভব। এরফলে জনমত গড়ে উঠে। আরব বসন্তের কথা আমরা জানি। আরব বসসন্ত ও পরবর্তীতে পৃথিবীর কয়েকটি দেশে সরকার পরিবর্তনে কিংবা সরকার বিরোধী বিক্ষোভে জনমত গঠনে সোশাল মিডিয়া তথা টুইটার, ফেইসবুক ও ব্লগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আজকের তরুণ সমাজ অনলাইন মিডিয়ার প্রতি বেশি আকৃষ্ট। অডিও, ভিডিও, কার্টুন ইউটিউবই ইন্টারনেটে প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুসারে বিশ্বের প্রায় ৮০% মানুষ টেলিভিশন দেখে। অতএব, মিডিয়া বর্তমান বিশ্বকে কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। জিম মরিসন যথার্থই মন্তব্য করেছেন যে, Whoever controles the media- controls the mind.

মিডিয়া কোনো একজন ব্যক্তি, বা সংগঠন কিংবা দেশের ইমেজ বৃদ্ধি বা নষ্ট করার ক্ষেত্রেও বিরাট ভূমিকা পালন করে। একজন ভালো মানুষও মিডিয়ার অব্যাহত অপপ্রচারের ফলে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের কাছে খারাপ মানুষ হিসেবে পরিচিত হতে পারে। আমরা দেখি অনেক সময় অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হারিয়ে যায় মিডিয়া কভারেজের অভাবে। আর মিডিয়া কভারেজ পেয়ে অনেক নন ইস্যুও ইস্যুতে পরিণত হতে সময় লাগেনা। অখ্যাত যে কোনো ব্যক্তি মিডিয়ার কভারেজ পেয়ে বিশ্ব পরিচিতি লাভ করতে পারে। আফগানিস্তানের কিশোরী মালালা মিডিয়ার বদৌলতেই বিশ্বে এতো খ্যতি অর্জন করেছেন। অথচ মালালার মতো লাখো শিশু-কিশোর পৃথিবীর আনাচে কানাচে নানাভাবে নির্যাতিত হচ্ছে তার খবরও কেউ জানেনা। মিডিয়ার প্রচারণার ফলেই অল্প সময়ে মানুষের মধ্যে কোনো আদর্শ জনপ্রিয়তা লাভ করতে পারে। আবার কোনো আদর্শ সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সন্দেহ ও সংশয় সৃষ্টি হতে পারে। এভাবে বিশ্বজনমত গঠনে মিডিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

কিন্তু দু:খজনক বাস্তবতা এই যে বর্তমান বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সংস্থাগুলো ইহুদীদের নিয়ন্ত্রণে। রয়টারের ৮০% কর্মকর্তা-কর্মচারী ইহুদী। এসোসিয়েট প্রেস (এপি) এর ৯০% পুঁজিই ইহুদীদের। আমেরিকান ব্রড কাস্টিং কর্পরোরেশান (এবিসি), ন্যাশনাল ব্রড কাস্টিং সিস্টেম (এনবি এস), ক্যাবল নিউজ নেটওয়ার্ক (সি এন এন), ফ্রান্স নিউজ এজেন্সেী, বিবিসি প্রভৃতি সংবাদ সংস্থা ইহুদী নিয়ন্ত্রিত। অঅন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ পত্রের মধ্যে লন্ডন টাইমস, ম্যাঞ্চেস্টার গার্ডিয়ান, অবজারভার প্রভৃতি পত্রপত্রিকাও ইহুদী নিয়ন্ত্রণাধীন। ইহুদীরা মুসলমানদের এক নম্বর শত্রু। তাই আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে মুসলমানদেরকে মৌলবাদী (Fundamentalist), সাম্প্রদায়িক (Communal) বর্বর সন্ত্রাসী (Terrorist) হিসেবে চিত্রিত করে বিশ্বব্যাপী ইসলামের নবজাগরণ ঠেকাতে চায়। মুসলিম দেশগুলোতেও তাদের দালালরা একই পরিভাষা ব্যবহার করে ইসলাম, ইসলামী অন্দোলন ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণায় লিপ্ত রয়েছে। পাশ্চাত্যের মিথ্যা প্রচারণায় মুসলমানরা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের শিকার হয়েও উল্টো ‘টেরোরিস্ট’ হিসেবে চিহিৃত হচ্ছে।

মিডিয়ার গুরুত্ব সম্পর্কে বর্তমানে কাউকে বুঝাতে হবে বলে আমার মনে হয়না। ইসলামের বিরোধিতা যেভাবেই করা হোকনা কেন তার মোকাবিলায় ভূমিকা পালন করা মুসলমানদের উপর অপরিহার্য। যদি মিডিয়ার মাধ্যমে ইসলামের বিরোধিতা করা হয় তাহলে মিডিয়ার মাধ্যমে তার জবাব দিতে হবে। যদি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিরোধিতা হয় সংস্কৃতির মাধ্যমে তার জবাব দিতে হবে। যদি বুদ্ধিবৃত্তিক কুট কৌশলে বিরোধিতা হয় বৃদ্ধিবৃত্তিক কুটকৌশলের মাধ্যমে তার জবাব দিতে হবে। কলমের মাধ্যমে বিরোধিতা হলে কলমের মাধ্যমে জবাব দিতে হবে। মিডিয়া অপপ্রচারের জবাব মিডিয়ার মাধমে না দিয়ে অন্যভাবে দেয়া যায়না। এই প্রসংগে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, “শত্রুর মোকাবিলার জন্য যত বেশি সম্ভব যুদ্ধ সরঞ্জাম ও সদাপ্রস্তুত অশ্ব বাহিনী সংগ্রহ করে রাখো। এসব নিয়ে তোমরা আল্লাহর শত্রুদের এবং তারা ছাড়া আরও কিছু লোককে যাদের তোমরা চেননা, আল্লাহ চেনেন, ভীত ও সন্ত্রস্ত করে দিতে পারবে। এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য তোমরা আল্লাহর পথে যা কিছু ব্যয় করো তা তোমরা পুরোপুরি ফেরত পাবে। তোমাদের উপর কোনোক্রমেই যুলম করা হবেনা’ -আনফাল ৬০।

আল্লাহ তায়ালা এখানে কুওয়াত বা শক্তি অর্জনের কথা বলেছেন। বর্তমানে আধুনিক যে সমরাস্ত্র আছে তার শক্তি, জ্ঞানের শক্তি, অর্থনৈতিক শক্তি সবই এর অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহর রাসূলের যুগে তীর ও অশ্ব যুদ্ধের জন্য প্রয়োজন ছিল তাই তিনি তা সংগ্রহ করেছেন। তাঁর সময় বৈষয়িক প্রস্তুতি কাফেরদের তুলনায় কম থাকলেও এমনটি কখনও হয়নি যে, তিনি আদৌ কোনো প্রস্তুতি গ্রহণ করেননি। তাই ইসলাম বিরোধীদের অপপ্রচার মোকাবিলায় বিকল্প মিডিয়া করার প্রস্তুতি গ্রহণ এবং তার বাস্তবায়নে চেষ্টা করা মিডিয়া জিহাদের অন্তর্ভুক্ত।

আফসোসের বিষয় হচ্ছে, অনেকেই মুসলমানদের শক্তিশালী মিডিয়া নাই কেন তার জন্য নানা ধরনের প্রশ্ন করছেন। অথচ তাঁদের সামনে যখন মিডিয়ার কোনো প্রজেক্ট প্রস্তাবনা দেয়া হয় তখন তাঁরা বলে বসেন, “টাকা মিডিয়াতে ইনভেস্ট করলে কি লাভ হবে”? অমুক ব্যবসাতে খাটালে এতো % লাভ হবে। আমি মনে করি শুধু নগদ জাগতিক লাভ নয় বরং মিডিয়া চ্যলেঞ্জ মোকাবিলায় মুসলিম ব্যবসায়ীদের একটি অংশকে আন্তর্জাতিক মানের অনলাইন, প্রিন্টেড ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া প্রতিষ্ঠা করা ও ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত মিডিয়া উদ্যোগসমূহকে সহযোগিতা করার জন্য এগিয়ে আসতে হবে। বর্তমানে ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্টেড কিছু মিডিয়াতে ইসলাম ও মুসলমানদের অবস্থা তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় নেহায়েতই কম। তবে ইউরোপে এখনও মূলধারার কোনো মিডিয়া মুসলমানদের নেই বললেই চলে। তাই মুসলমানদেরকে এই দিকে গুরুত্বের সাথে নজর দেয়া উচিত।

এছাড়া প্রতিনিয়ত মিডিয়াতে ইসলাম সম্পর্কে অনেক প্রশ্ন উপস্থাপন করা হয়। সে সম্পর্কে ভারসাম্যমূলক জবাব আসা দরকার। কিন্তু এক্ষেত্রে মুসলমানদের তেমন কোনো স্পোকসম্যান নেই। তাই মিডিয়াতে ভারসাম্যমূলক বক্তব্য তুলে ধরার মতো যোগ্য লোক তৈরি করতে হবে। মিডিয়াতে নেতিবাচক প্রচারণার ফলে অনেক মানুষ বিভ্রান্ত অবস্থায় রয়েছে। তাই মুসলিম হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে ইসলামের প্রকৃত রূপ মিডিয়াতে তুলে ধরা। কিন্তু কারো কারো প্রবণতা হচ্ছে বসে বসে শুধু সমালোচনা করা। আমাদেরকে মনে রাখতে হবে যে, সমালোচনা করা সহজ কিন্তু বাস্তব উদ্যোগ গ্রহণ করা এবং উক্ত উদ্যোগকে সফল করা কঠিন। এছাড়া মিডিয়াতে ভূমিকা রাখার মতো যাদের যোগ্যতা আছে তারা প্রতিনিয়ত লেখা-লেখি করা এবং শক্তিশালী মিডিয়া প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করা সময়ের দাবি।

মিডিয়া কর্মীদেরকে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করা দরকার। আর মুসলমানদেরকেও নিজস্ব মিডিয়া তৈরি করার প্রতি সিরিয়াস হতে হবে এবং মুসলিম মিডিয়া কর্মীদেরকে মেইনস্ট্রিম মিডয়াসমূহে কাজ করার প্রতি আগ্রহী হতে হবে। পাশ্চাত্যের মিডিয়ার নেতিবাচক প্রচারণার ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা মিডিয়া চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার আসল পথ নয়। এর আসল জবাব হচ্ছে ‘বিকল্প শক্তিশালী মিডিয়া’।

মিডিয়াতে ইসলাম সম্পর্কে নেতিবাচক প্রচারণার ইতিবাচক ফলও রয়েছে। পাশ্চাত্যের অনেক চিন্তাশীল মিডিয়াতে ঢালাওভাবে ইসলাম সম্পর্কে বিষোদাগার করায় তারা ইসলাম সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হয়ে উঠেন এবং তাদের মনের নানা প্রশ্নের জবাব অনুসন্ধান করতে গিয়ে সত্যের সন্ধ্যান খুঁজে পান। এছাড়া মুসলমানদের একটি অংশ যারা ইসলাম ভালোভাবে জানতোনা তারা সহকর্মী ও বন্ধুদের নানা প্রশ্নের সঠিক জবাব জানতে গিয়ে নিজেরা ভালোভাবে ইসলাম জানার চেষ্টা করছে। এরফলে যেসব মুসলমান আগে ইসলাম অনুশীলন করতেননা তাঁরা ইসলাম অনুশীলন শুরু করেন। যেসব মুসলিম মহিলা আগে হিজাব পরিধান করতেননা তাঁরা হিজাব পরিধান করা আরম্ভ করেন। তাঁদের মাঝে ইসলামের প্রতি মহব্বত ও আকর্ষণ অনেকগুণ বৃদ্বি পাচ্ছে।

ইসলাম সম্পর্কে মিডিয়ার নেতিবাচক প্রচারণার ফলে অমুসলিম চিন্তাশীলদের কেউ কেউ কুরআন অধ্যয়ন শুরু করেন এবং ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হন। এই প্রসংগে একটি ঘটনা উল্লেখ করছি। ২০০৯ সালের এপ্রিল মাসে আমি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি সেমিনারে অংশ গ্রহণ করি; তুরুষ্কের ততকালীন প্রধানমন্ত্রী ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট এরদোগান উক্ত সেমিনারে মূল বক্তা ছিলেন। রাত দশটার দিকে সেমিনার শেষ হওয়ার পর লন্ডন ফেরার পথে অক্সফোর্ড বিশ্বদিল্যায়ের একজন ছাত্রী ও দুইজন ছাত্রের সাথে পরিচয় হয়। আলাপ আলোচনার এক পর্যায়ে জানলাম উক্ত ছাত্রীর নাম মারইয়াম এবং সে নও মুসলিমাহ। আমি তার কাছে ইসলাম গ্রহণ করার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে জানতে চাইলাম। প্রতি উত্তরে সে জানায় যে তার বাড়ি ফ্রান্সে। তার পিতা-মাতা ও পুরো পরিবার প্রচ-ভাবে মুসলিম বিদ্বেষী ছিল। ৯/১১ এর পর তার পিতা একটি বই তাকে পড়ার জন্য দেয়। উক্ত বইতে মুসলমানদেরকে কুকুরের সাথে তুলনা করা প্রচ-ভাবে ঘৃণা ছড়ানো হয়। মারইয়াম এই ধরনের মন্তব্য পাঠ করার পর চিন্তা করে “আসলেই মুসলমানরা কি এতো বেশি খারাপ? সে এই প্রশ্নের জবাব জানার জন্য তার মুসলিম বন্ধুদের সাথে মত-বিনিময় করতে আগ্রহী হয়। মুসলিম বন্ধুরা তাকে তাদের সাথে আলাপ-আলোচনার পরিবর্তে তার সকল প্রশ্নের জবাব খুঁজে পাবার জন্য কুরআন অধ্যয়ন করার উপদেশ দেয়। সে তাদের উপদেশমতো কুরআন পাঠ করা শুরু করে। কিন্তু প্রথম তিন মাস কুরআন পাঠ করে কোনো মজা অনুভব করেনি। তার মতে ইসলাম সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব নিয়ে কুরআন পাঠের চেষ্টা করায় প্রথম তিন মাস সে কোনো মজা পায়নি। তিন মাস পর উন্মুক্ত মন-মগজ নিয়ে কুরআন পাঠ শুরু করার পর তার মনে হয়েছে কুরআনের প্রতিটি আয়াত যেন তার মনের নানা প্রশ্নের জবাব দিচ্ছে। এইভাবে ছয়মাস তিলাওয়াত করে কুরআন পাঠ শেষ করে। কুরআন পাঠ করতে গিয়েই সে নিজেকে ‘কুরআনী’ বলে পরিচয় দেয়া শুরু করে এবং এক পর্যায়ে ইসলাম কবুল করেন। মারইয়াম আল-কুরআন অধ্যয়ন করেই ইসলাম কবুল করে। কিন্তু তার মতে কুরআন পাঠ করে ইসলাম জানার চেষ্টা না করলে তার পক্ষে ইসলাম কবুল করা হয়তো বা সম্ভব হতোনা। কেননা কুরআনে ইসলামের যেসব বিধান চমৎকারভাবে বিবৃত আছে তা খুব কম মুসলমানই অনুসরণ করে।

উপরের ঘটনা থেকে এই বাস্তব সত্য ফুটে উঠেছে যে, অনেক অমুসলিম ইসলাম সম্পর্কে পরিচালিত অপপ্রচারের জবাব খুঁজতে গিয়েই ইসলামের সুমহান আদর্শের সন্ধান পায়। এছাড়াও মুসলমানদের সাথে উঠা-বসা, লেন-দেন করে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে অমুসলিমদের কেউ কেউ ইসলাম কবুল করছে। অতি সম্প্রতি ইস্ট লন্ডন মসজিদে একটি যুবক ইসলাম কবুল করে। ইসলাম কবুল প্রসংগে সে জানায় যে, দীর্ঘদিন ইসলাম নিয়ে পড়াশুনা করে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়। সে আরো জানায় যে, তার মুসলিম বন্ধুদের চলাফেরা, কথা-বার্তা, উঠা-বসা, লেন-দেন প্রভৃতি তাকে বিমোহিত করে। এইভাবে অনেক মুসলমান সত্যের সাক্ষ্য হিসেবে নিজেদের জীবন গড়ার চেষ্টা করছেন এবং তাঁদেরকে দেখেই চিন্তাশীল অনেক অমুসলিম এই কথা অকপটে স্বীকার করছেন যে, “মুসলিমরা সন্ত্রাসী নয় বরং পরোপকারী’’। এই প্রসংগে একটি বাস্তব ঘটনা উল্লেখ করতে চাই। কিছুদিন আগে যুক্তরাজ্যে একজন অমুসলিম তার ঘর বিক্রির সময় পার্শ্ববর্তী ঘরের চেয়ে তার ঘরের মুল্য ত্রিশ হাজার পাউন্ড বেশি দাবি করে। এজেন্ট বেশি মূল্য চাওয়ার কারণ জিজ্ঞাসা করার পর তিনি জবাব দেন যে, “আমার পার্শ্বে একজন পরোপকারী মুসলিম ভালো প্রতিবেশী রয়েছেন। তিনি কাউকে কষ্ট দেননা বরং সব সময় প্রতিবেশীর প্রতি যত্নশীল থাকেন। যেকোন স্থানে ঘর কেনা সম্ভব কিন্তু ভালো প্রতিবেশী পাওয়া কঠিন’।

পাশ্চাত্যে ও বিভিন্ন মুসলিম দেশে কিছু ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্টেড মিডিয়াতে অব্যাহতভাবে ইসলাম বিরোধী প্রচারণা পরিচালিত হচ্ছে। কিছু মিডয়াতে মুসলমানদেরকে টেরোরিস্ট হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করছে এবং ইসলামকে পাশ্চাত্যের জন্য হুমকি স্বরূপ হিসেবে উপস্থাপন করছে। ইউরোপে যে শতাব্দীকাল থেকে মুসলমানদের বসবাস রয়েছে সে কথা প্রকাশ না করে শুধু ইমিগ্র্যান্ট হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছে এবং মুসলানরা ইউরোপের মুলস্রোতধারা থেকে বিচ্ছিন্ন বলে তারা মনে করে। তাদের প্রচারণা হচ্ছে, ইসলাম আজকের যুগে অচল এবং মুসলমানরা রক্ষণশীল, উগ্র ও টেরোরিস্ট। মিডিয়াতে মুসলমানদের বিরদ্ধে এই ধরনের প্রচারণার ফলে মুসলমানদের উপর বিশেষভাবে মুসলিম ছাত্র-ছাত্রীদের উপর গ্যাং এ্যটাক বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই Q News এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ফুয়াদ নাহদী পাশ্চাত্যের মিডিয়ার সমালোচনা করে বলেন, A western news agenda dominated by hostile, careless coverage of islam distors reality and destroys trust. Western reports, when positive, are seen as selective and partisan; when negative, hypocritical and insensitive (Diana Abdel- Maged, The British Media: Fair or biased )

একশ্রেণীর পশ্চিমা মিডিয়ার ইসলাম সম্পর্কে ব্যাপক অপপ্রচারের কারণে বাস্তব অবস্থা খারাপভাবে চিহ্নিত হচ্ছে এবং আস্থা নষ্ট করছে। কোনো ইতিবাচক রিপোর্ট প্রকাশ করা হলে তা হয় বাছাই করা এবং একপেশে। আর যখন কোনো নেতিবাচক বিষয় তুলে ধরা হয় তা জয় মোনাফেকি সূলভ এবং অসংবেদনশীল। (ডায়ানা আবদেল মাজেদ. দি ব্রিটিশ মিডিয়া : ফেয়ার অর বায়াসড) কিছু মিডিয়া নিরপেক্ষতা বজায় রাখার নীতি পোষণ করলেও যেকোন সন্ত্রাসী ঘঁটনার জন্য মুসলমানদেরকে অভিযুক্ত করার একটা প্রবণতা প্রায় সকল মিডিয়াতেই রয়েছে। যেকোন ঘটনার জন্য ঢালাওভাবে সকল মুসলমানকে দায়ী করা যৌক্তিক নয়। ইতোপূর্বে সন্দেজনকভাবে বিভিন্ন ঘটনায় যাদেরকে আটক করা হয়েছিল তাদের অনেকেই পরবর্তীতে নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন; তাঁদের কেহই কথিত ঘটঁনার সাথে সম্পৃক্ত ছিলনা। তাই সন্ত্রাসের সাথে ইসলাম ও মুসলমানকে ঢালাওভাবে সম্পৃক্ত করার সুযোগ নেই। যেমনিভাবে খৃস্টান ও ইয়াহুদী কেউ সন্ত্রাসী কার্যক্রম করলে তার জন্য পুরো খৃস্টান বা ইয়াহুদী ধর্মাবলম্বীকে দায়ী করা যায়না। কতিপয় মিডিয়ার প্রবণতা হচ্ছে মুসলমান কেউ সন্ত্রাসের সাথে সম্পৃক্ত হবার সন্দেহের তালিকায় থাকলেও তা যেভাবে ফলাও করে ছাপা হয় অপরদিকে একই ধরনের ঘটনা কোনো নন-মুসলিম করলে তা মিডিয়াতে উপক্ষো করা হয়। এই সস্পর্কে বিগত ৭ই ডিসেম্বর ২০০৯ ’ দি মুসলিম পোস্ট পত্রিকায় এইভাবে শিরোনাম করা হয়, Media Silent as non-Muslim bomb makers pleads guilt। উক্ত রিপোর্ট অনুসারে Terence Gavan নামক বৃটিশ ন্যাশনালিষ্ট পার্টির জনৈক মেম্বার বোমা তৈরিসহ ২২ টি ঘটঁনায় অভিযুক্ত হয়। এর মাঝে ৬টি টেরোরিজম এ্যাক্টের অধীন ছিল। Woolwich Crown Court তাকে দোষী সাব্যস্ত করে রায় দেয়। অথচ বোমা সন্ত্রাসের মত ঘটনায় তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হলেও বৃটিশ মিডিয়া তা উপেক্ষা করে। কিন্তু শুধুমাত্র সন্দেহের তালিকায় থাকার কারণে অনেক মুসলমানের ছবি ফলাও করে ছাপা হয়। এধাধহ যদি মুসলমান হতো তাহলে প্রায় সকল পত্রিকাতেই সম্ভবত হেডলাইন করা হতো এভাবে ÒIslamic terrorist found guilty of possessibg bomb factory/Evil Muslim bomb maker admits guilty/Mastermind Muslim bomb expert Guilty ... বাংলাদেশে কিছু মিডিয়া আন্তর্জাতিক কতিপয় মিডিয়ার মতো জঙ্গি, টেরোরিস্ট, আল কায়েদা, তালেবানী রাষ্ট্র ইত্যাদি পরিভাষা একইভাবে ব্যবহার করে। ধর্মীয় সংখ্যা লঘুদের উপর নির্যাতনের কল্পিত কাহিণী প্রচার করে বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করতে চায়। প্রকৃত সত্য প্রকাশ না করে তারা ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলন সম্পর্কে তারা দেশে-বিদেশে নেতিবাচক ধারণা দিতে চায়। তারা ইসলামী আন্দোলনন ও তার নেতৃত্ব সম্পর্কে মনগড়া রিপোর্ট প্রচার করছে অথচ তাঁদের বক্তব্য, স্টেমেন্ট পত্রিকায় ছাপায়না। তারা আওয়ামী-ছাত্রলীগ কর্তৃক মন্দির ভাংগা হলেও জামায়াত-শিবেরর উপর তার দায় বর্তায় অথচ জামাত শিবিরের কর্মীরা বিভিন্ন জায়গায় যে মন্দির পাহারা দেয় তার সংবাদ ও ছবি ছাপায়না। অপরাধ সংক্রান্ত সংবাদ ব্কিৃত করে প্রচার করছে যার ফলে সত্যিকার অপরাধীরা আরও অপরাধ করতে উতসাহীত হয়। যেমন নারায়ণগঞ্জে ত্বকী হত্যার পর প্রথমেই জামায়াত-শিবিরের উপর দোষ চাপায়। অথচ ত্বকীর পিতা পরে স্পষ্ট করেই বলে দেয় যে, “এর সাথে জামাত শিবিরের কেউ সম্পৃক্ত নয়। আওয়ামী লীগের কতিপয় নেতাই জড়িত‘। আভ্যন্তরীন রাজনীেিত বিদেশেী হস্তক্ষেপের ক্ষেত্র তৈরি করে। কিছু পত্রিকায় বিদেশেী কয়েকজন রাষ্ট্রদুতের বক্তব্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী-ও বিরোধী দলের নেতার বক্তব্যের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়। কিছু মিডিয়াতে বাংলাদেশকে অকার্যকর জঙ্গি রাষ্ট্রে পরিণত করার প্রচারণা চালাতে দেখা যায়। এমনকি সংখ্যা গরিষ্ঠ মানুষের জীবন ধারা মুল্যবোধ কটাক্ষ করা হয়। দাঁড়ি টুপী ধারীদেরকে রেডিও টিভিতে নাটক উপন্যাসে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যাতে দর্শকের ঘৃণা জন্মে।

আন্তর্জাতিক মিডিয়া সাধারণত লোকাল মিডিয়াকে সোর্স হিসেবে ব্যবহার করে। এরফলে আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে নেতিবাচক প্রচারণা চলে যার ফলে প্রকারন্তরে বাংলাদেশের ইমেজ নষ্ট হচ্ছে। জাতি বিভক্ত হয়ে পড়ছে। অথচ দেশ গড়ার জন্য জাতীয় ঐক্য জরুরী। জঙ্গিবাদের উথ্যান হতে তা সহায়তা করছে। জনগনের মধ্যে দেশ সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি হচ্ছে অথচ বাংলাদেশ হচ্ছে অফুরন্ত সম্ভাবনার দেশ। আমাদের দেশের নদ-নদীতে মাছ আছে; বনে জংগলে কাঠ আছে। জমিতে হরেক রকমের ফসল ফলে। গ্যাস ও কয়লার খনি আছে। এই সকল প্রাকৃতিক সম্পদ কাজে লাগাবার জন্য আছে মানব সম্পদ। তাই মানব সমপদকে কাজে লাগানোর জন্য রাজনৈতিক স্থিতীশীলতার পাশাপাশি জাতীয় ঐক্য প্রয়োজন। মেধাবীদেরকে রাজনৈতিক দৃষ্টিভংগীতে না দেখে তাদেও মেধা দেশের উন্নয়নে কাজে লাগানো প্রয়োজন। পর্ণোগ্রাফী যুব চরিত্র নষ্ট করছে। অথচ যুবকরাই হচ্ছে দেশের কর্মক্ষম জনশক্তি।

মিডিয়াতে যারা কাজ করেন তাদের অনেকই বিশ্বাস ও চেতনায় ইসলাম বিদ্বেষী। ভিনদেশীদের এজেন্ট হিসেবে কেউ কেউ দায়িত্ব পালন করেন। এই জন্য তাঁরা মাসিক ভাতা পান। ব্যবসায়ী মিডিয়া মালিকরা নিজেদের স্বার্থের কারণে একজনের অপরাধ আরেকজনের উপর চাপিয়ে দিয়ে প্রকৃত ঘটনা ধামা চাপা দিতে চায়।

হতাশা বা সমালোচনা নয় প্রয়োজন বাস্তব উদ্যোগ ও সহযোগিতার : আফসোস হচ্ছে মুসলমানদের হাতে প্রচুর সম্পদ আছে। আলজাজিরা বাদ দিলে বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকার মত ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া নেই। দি টাইমস, দি গার্ডিয়ান, দি ইন্ডেপেন্ডেন্স এর মত আন্তর্জাতিক মানের কোনো পত্রিকা নেই। তাই মুসলমানেরা পাশ্চাত্যে মিডিয়ার আক্রমন ও অপপ্রচারের শিকার। কেননা অপপ্রচারের জবাব দেয়ার মত কোনো শক্তিশালী মাধ্যম মুসলমানদের হাতে নেই। এমতাবস্থায় মুসলিম তরূন সমাজের যাদের মিডিয়া স্টাডিজ পড়ার আগ্রহ আছে তাদেরকে মিডিয়া কর্মী হিসেবে ক্যারিয়ার গঠনের পরিকল্পনা নেয়া সময়ের অনিবার্য দাবি। রেডিও, টিভি ও পত্রপত্রিকায় কাজ করা মুসলিম তরূন সমাজের একটি অংশের ক্যারিয়ার ফিল্ড হওয়া উচিত। যারা সাংবাদিকতা পেশায় নিয়োজিত তাদের প্রশিক্ষন কর্মসুচী থাকা দরকার। এছাড়াও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদ সংস্থার প্রতিনিধি হওয়ার চেষ্টা করা যেতে পারে। নিজেদের সাধ্যমত অনলাইন পত্রিকা, ব্লগও ওয়েবসাইট চালু করা যায়। ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উদ্যোগ মিডিয়া হাউজ করা যেতে পারে। মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের সাথে যোগাযোগ ও সম্পর্ক বৃদ্ধি করে তাদের নানা লেখনীতে নিজেদের কিছু ইস্যু নিয়ে আসার চেষ্টা করা। সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট করে সাংবাদিকদের বৃত্তি ও চিকিতসা সেবা করা দরকার। গ্লোবাল মিডিয়া মনিটরিং টীম করা প্রয়োজন –তারা বিভিন্ন মিডিয়া মনিটরিং করবেন এবং অনলাইন আক্রাইভ রাখবেন। মিডিয়াতে স্পোকস পারসন হিসেবে বিভিন্ন ভাষায় পারদশী একটি গ্রুপ সৃষ্টি করতে হবে।

মিডিয়ার নাই নাই বলে হা হুতাশ করে যেমনি মিডিয়া অভাব পুরণ করা যাবেনা। তেমনিভাবে সফল মিডিয়া গড়ার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ খরচের মানসিকতা না থাকলে মিডিয়া প্রজেক্ট বাস্তবায়ন হবেনা। এই প্রসংগে অনেক দিন আগে শুনা একটি গল্প মনে পড়ছে। একজন লোক খাবার সহ কুকুরকে নিয়ে পথ চলছে। কিছু দুর যাওয়ার পর কুকুরটি ক্ষুধায় ছটফট কওে মারা যাওয়ার উপক্রম। লোকটি তা দেখে কাঁদছে। আরেকজন পথিক তার কান্নার কারণ জানতে চায়। তিিেন জবাবে বলেন, “ভাই আমার কুকুর ক্ষুধায় মারা যাচ্ছে তাই কাঁদছি”। লোকটি আবার জানতে চায় “তোমার সাথে এগুলো কি”? তিনি জবাব দেন “এগুলো খাবার”। পথিক তাকে বলে, “তোমার খাবার থেকে কিছু খাবার দিলেইতো কুকুরটির ক্ষুধা নিবারন হয়”। লোকটি জবাব দেয় “ভাই কাঁদতে পয়সা লাগেনা কিন্তু খাবার দিলেতো পয়সা খরচ হয়”। আমাদেরকে মিডিয়ার জন্য শুধু কাঁদলে হবেনা প্রূেয়াজনের আলোকে অর্থ খরচ করতে হবে।

বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও মিশনারী টাগেট নিয়ে কিছু মিডিয়া প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯০ সালের পর ব্যবসায়ীদের ইনভেস্টমেন্ট কিছু পত্রিকা ও স্যটেলাইট চ্যানেল চালু করা হয়। বিদেশী সাহায্যেও কিছু মিডিয়া প্রতিষ্ঠিত হয়। তাই তাদের অর্থের অভাব হয়না। কিন্তু যারা ইসলামী আদর্শে বিশ্বাসী তাদেরকে নিজের পকেটের টাকা খরচ করেই মিডিয়া করতে হবে। এই ক্ষেত্রে আল্লাহ পাক কিছু ব্যক্তিকে অর্থ উপর্জনের মেধা দিয়েছেন আর কিছু ব্যক্তিকে মিডিয়া কর্মী হওয়ার যোগ্যতা দান করেছেন। মিডিয়া কর্মীদের অনেকর কাছে অনকে সুন্দর পরিকল্পনা আছে কিন্তু উক্ত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ নাই। আর কিছু ব্যক্তির অর্থ আছে কিন্তু তাদের কাছে কোনো প্রজেক্ট নাই। যাদের অর্থ আছে তারা এমন জায়গায় ইনভেমস্ট করতে চান যেখান থেকে দ্রুত রিটার্ন আসবে। ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে তা সঠিক। কিন্তু মুসলিম কিছু ব্যবসায়ী ও সামর্থবান বিত্তশালীরা যদি মিডিয়া, রিসার্চ, থিঙ্ক ট্যাঙ্কসহ জ্ঞান গবেষনার কাজে বিনিয়োগ না করেন তাহলে তাদের অধিক মুনাফার জন্য বিনিয়োগকৃত অর্থ তাঁরা যে ভোগ করতে পারবেন তার কি কোনো নিশ্চিয়তা আছে? আমি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত অনেক ধনী ব্যক্তির কথা জানি যাঁরা দুনিয়ার মোড়লদের অনুমতি ছাড়া নিজের এ্যকাউন্ট থেকে নিজের খরচের জন্যও টাকা উত্তোলন করতে পারছেননা। তাই সময়ের অনিবার্য্য দাবি পুরণে ইলেক্ট্রনিক, প্রিন্টেড, অনলাইন ও সোশাল মিডিয়ায় কাংখিত ভূমিকা পালন করা জরুরী।

Sunday, December 29, 2024

ইবনে আল-হাইসাম: জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোকবর্তিকা ও আধুনিক বিজ্ঞানের পথিকৃৎ


ইবনে আল-হাইসাম (৯৬৫–১০৪০): সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

আবু আলী আল-হাসান ইবনে আল-হাইসাম, যিনি আলহাজেন (Alhazen) নামে বেশি পরিচিত, ছিলেন ইসলামের স্বর্ণযুগের একজন কিংবদন্তি বিজ্ঞানী। তার গবেষণায় অপটিক্স, জ্যামিতি, জ্যোতির্বিদ্যা, গণিত ও পদার্থবিজ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। ইরাকের বসরায় জন্মগ্রহণকারী এই বিজ্ঞানী তার গবেষণা ও আবিষ্কারের জন্য আজও সম্মানিত।

• ইবনে আল-হাইসামের বৈজ্ঞানিক অবদান

১. অপটিক্স ও আলোর গতি
ইবনে আল-হাইসামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ "কিতাব আল-মানাযির" (Book of Optics)। এতে তিনি আলোর প্রতিফলন ও প্রতিসরণ ব্যাখ্যা করেন।

চোখের গঠন ও দৃষ্টির ব্যাখ্যা: তিনি প্রথম ব্যাখ্যা করেন যে চোখ থেকে রশ্মি বের হয় না; বরং আলোর রশ্মি চোখে প্রবেশ করে চিত্র তৈরি করে।

পিনহোল ক্যামেরা আবিষ্কার: তার গবেষণা থেকেই আধুনিক ক্যামেরার ধারণা গড়ে ওঠে।

আলোর বক্রতা ও প্রতিবিম্ব: তিনি বক্র ও সমতল আয়নার মাধ্যমে আলোর প্রতিফলন এবং প্রতিবিম্বের বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করেন।

লেন্সের ধারণা: পরবর্তীতে এই গবেষণা থেকেই চশমা, টেলিস্কোপ ও মাইক্রোস্কোপের ভিত্তি তৈরি হয়।

২. গণিত ও জ্যামিতি:
পার্থিব জ্যামিতির ব্যবহার: ইবনে আল-হাইসাম পরিপ্রেক্ষিত ও আলোর গতি বোঝার জন্য জ্যামিতির ব্যবহার করেন।

অপরিবর্তনশীল রশ্মি: তার গবেষণাগুলো গণিতের ত্রিভুজ ও কোণের তত্ত্বে ব্যাপক প্রভাব ফেলে।

ইন্টিগ্রাল ক্যালকুলাসের ভিত্তি: গণিতের এই শাখায় তার কাজ আধুনিক গাণিতিক গবেষণার পথ দেখিয়েছে।

৩. জ্যোতির্বিদ্যা:
তিনি চাঁদের আলোর প্রতিবিম্ব ও গ্রহের গতি নিয়ে গবেষণা করেন।

তার আবিষ্কারগুলো ইউরোপের মধ্যযুগীয় জ্যোতির্বিদ্যায় বিশেষ ভূমিকা রাখে।

চাঁদের প্রকৃতি ও আলোক বিচ্ছুরণ নিয়ে তিনি পরীক্ষামূলক গবেষণা চালান।

৪. পদার্থবিজ্ঞান:
তরল পদার্থের চাপ ও গতিবিধি নিয়ে তিনি গবেষণা করেন।

তিনি পানির প্রবাহ বিশ্লেষণ করেন যা আধুনিক জলবিদ্যুৎ প্রকৌশলের ভিত্তি স্থাপন করে।

ভারসাম্য ও মাধ্যাকর্ষণ নিয়ে তার গবেষণাগুলো নিউটনের গতিসূত্রের ভিত্তি গড়ে তোলে।

৫. বিজ্ঞান পদ্ধতির জনক:
ইবনে আল-হাইসামই প্রথম বিজ্ঞানকে পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে যাচাইয়ের ধারায় নিয়ে আসেন।

তিনি পরীক্ষামূলক পদ্ধতির ওপর জোর দেন, যা আধুনিক বিজ্ঞানীদের জন্য পথপ্রদর্শক।

তার এই পদ্ধতি পরবর্তীতে গ্যালিলিও ও বেকনের 
গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।


• ইবনে আল-হাইসাম ও ইসলামিক দর্শন:
ইবনে আল-হাইসাম কুরআনের জ্ঞান ও চিন্তার নির্দেশনাকে অনুসরণ করে গবেষণায় ব্রতী হন।

১. কুরআনের প্রেরণা:
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"তারা কি দৃষ্টি দেয় না আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি বিষয়ে?" (সূরা আল-আ’রাফ: ১৮৫)

এ আয়াত তাকে মহাবিশ্বের রহস্য উদঘাটনে অনুপ্রাণিত করে।

২. জ্ঞান অর্জনের নির্দেশ:
"তোমরা বল, যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা কি সমান হতে পারে?" (সূরা যুমার: ৯)

এই আয়াত ইবনে আল-হাইসামকে সত্যের অনুসন্ধানে অনুপ্রাণিত করে।


• পশ্চিমা বিশ্বের শ্রদ্ধা ও স্বীকৃতি:
ইউরোপে তার প্রভাব:
১২ শতাব্দীতে ইবনে আল-হাইসামের গ্রন্থগুলো ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয়।

রজার বেকন, কেপলার, এবং গ্যালিলিও তার গবেষণা থেকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত হন।

তার "Book of Optics" ৭০০ বছরের বেশি সময় ধরে ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পাঠ্যবই হিসেবে পড়ানো হয়।

• আধুনিক সম্মাননা:
২০১৫ সালে ইউনেস্কো তার সম্মানে "International Year of Light" ঘোষণা করে।

নাসা তার নাম অনুসারে চাঁদে একটি গর্তের নাম রেখেছে—"Alhazen Crater"।

বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানী ও গবেষকরা তাকে ‘আধুনিক অপটিক্সের জনক’ বলে অভিহিত করেন।

উপসংহার:
ইবনে আল-হাইসাম শুধু একজন বিজ্ঞানী ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন চিন্তাবিদ এবং অনুসন্ধানী মননশীলতা ও কুরআনের নির্দেশনার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। তার গবেষণা এবং অবদান আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তি গড়েছে।

কুরআনের আয়াত দিয়ে শেষ করি:
"তোমরা বল, হে আমার রব! আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করুন।" (সূরা ত্বাহা: ১১৪)

ইবনে আল-হাইসাম আমাদের শিক্ষা দেন কীভাবে বিশ্বাস ও যুক্তির সমন্বয়ে আলোকিত ভবিষ্যৎ গড়া যায়। তার গবেষণা ইসলামের বিজ্ঞানমনস্ক ঐতিহ্য এবং আজকের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ভিত্তি স্থাপনের অন্যতম ভিত্তিপ্রস্তর।

Sunday, December 8, 2024

বইনোট : ইসলামী রাষ্ট্র কিভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় (ইসলামী বিপ্লবের পথ) || সাইয়্যেদ আবুল আ'লা মওদুদী রহ.



এটি ১৯৪০ সনের বক্তৃতা, জামায়াতে ইসলামী তখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। 
[বইয়ের মুল নাম: ইসলামী হুকুমাত কিসতারাহ কায়েম হোতি হ্যাঁয়]

• ভূমিকা:
ইসলামী বিপ্লবের পথ বইটির মূল কথা হল 'ইসলামী রাষ্ট্র কিভাবে প্রতিষ্ঠা হবে' এই লক্ষ্যে বইটির লেখক মরহুম মাওলানা মওদুদী (র) ১৯৪০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভারতের আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্ট্রেচী হলে এ সম্পর্কে এক অনুপম বক্তব্য পেশ করেন। বক্তব্যের শিরোনাম ছিল '
ইসলামী হুকুমাত কিসতারাহ কায়েম হোতি হ্যাঁয়' এর অর্থ হল ইসলামী রাষ্ট্র কিভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

• মূল আলোচনা:
বইটির মূল আলোচনাকে ৮টি অংশে বিভক্ত করা হয়েছে। যথা.
১. ইসলামী রাষ্ট্র কিভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়
২. রাষ্ট্র ব্যবস্থার স্বাভাবিক বিবর্তন
৩. আদর্শিক রাষ্ট্র
৪. আল্লাহর সার্বভৌমত্ব এবং মানুষের প্রতিনিধিত্ব ভিত্তিক রাষ্ট্র।
৫. ইসলামী বিপ্লবেরপদ্ধতি বা পন্থা
৬. অবাস্তব কল্পনা বা ধারনা
৭. ইসলামী আন্দোলনের সঠিক কর্মপন্থা
৮. সংযোজন

 ইসলামী রাষ্ট্র কিভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়:
১. বর্তমানে ‘ইসলামী রাষ্ট্র’ নাম শিশুদের হাতের খেলনায় পরিণত হয়েছে।
২. যারা ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চান তারা এটা জানেন না কিভাবে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হয় এবং জানার চেষ্টাও করেন না।
৩. যারা ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায় তারা যে প্রস্তাব দেয় মোটর সাইকেলে যেমন আমেরিকায় পৌঁছানো সম্ভব নয় তেমনি তাদের প্রস্তাবে মূল লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

• রাষ্ট্র ব্যবস্থার স্বাভাবিক বিবর্তন:
“কৃত্রিম ও অস্বাভাবিক উপায়ে কোন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয় না।”
১. একজায়গা থেকে তৈরি করে এনে অন্য জায়গায় প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।
২. কোন একটি সমাজের মধ্যকার নৈতিক চরিত্র, চিন্তা-চেতনা, মন-মানসিকতা, সভ্যতা-সংস্কৃতি এবং ইতিহাস-ঐতিহ্যগত কার্যকারণের সমন্বিত কর্মপ্রক্রিয়ার ফলশ্রতিতে।
৩. সম্পূর্ণ স্বাভাবিক নিয়মে জন্মলাভ করে ইসলামী রাষ্ট্র।
৪. সামাজিক উদ্যম, উদ্দীপনা, ঝোঁক-প্রবণতা প্রভৃতি নিবিড় সম্পর্ক রাষ্ট্র গঠনের পূর্বশর্ত।
৫. প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নেতৃত্ব প্রয়োজন।
৬. সামাজিক কার্যক্রম ও পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।
৭. দীর্ঘ প্রানান্তকর চেষ্টা (যেমন বীজ হতে ফল)।

• আদর্শিক রাষ্ট্র:
১. ইসলামী রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য

(i) ইসলামী রাষ্ট্র একটি আদর্শিক রাষ্ট্র।
(ii) সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের প্রভাবমুক্ত।

২. ফরাসী বিপ্লবের আদর্শিক রাষ্ট্রের ক্ষীণ রশ্মি দেখা গেলেও জাতীয়তাবাদের প্রভাবে চাপা পড়ে তা বিলুপ্ত হয়। 
(i) রাশিয়ার কম্যুনিজম ও সমাজতন্ত্রের মৌলিক নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত হলেও অতিসত্ত্বর তা আদর্শচ্যুত হয়। 
(ii) মুসলিম দেশের কতৃত্বশীল লোকেরা জাতীয়তাবাদের আখড়ায় পড়ে ইসলামী ভাবধারা ও আদর্শভিত্তিক রাষ্ট্রের ধারণা হারিয়ে ফেলেছে। 

৩. আদর্শ রাষ্ট্র বাস্তবায়নের প্রয়োজন:
ক) ভিত্তি স্থাপন হতে চূড়ান্ত পর্যায় পর্যন্তপ্রায় অস্তিত্ব রক্ষা করা। উত্তরোত্তর শক্তি বৃদ্ধি করা।
খ) জাতীয়তাবাদী চিন্তা-পদ্ধতি সংগঠন প্রণালী পরিহার করা।

৪. আদর্শভিত্তিক রাষ্ট্রের লক্ষ্যে:
ক) জাতি-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সকলের কাছে এর আদর্শ পেশ করা। 
খ) সেই আদর্শ অনুযায়ী সমাজ এবং রাষ্ট্র গঠন করে কল্যাণ সাধন।

• আল্লাহর সার্বভৌমত্ব এবং মানুষের প্রতিনিধিত্ব ভিত্তিক রাষ্ট্র:
(ক) ইহার বৈশিষ্ট্যঃ
১. ইসলামী রাষ্ট্রের মূল বুনিয়াদ
২. নিখিল বিশ্ব জগৎ আল্লাহতাআলার রাজ্য। তিনি ইহার প্রভূ, শাসক ও বিধানদাতা।
৩. মানুষ এই দুনিয়ায় আল্লাহরপ্রতিনিধি।
৪. খেলাফতের এই দায়িত্বের জন্য প্রত্যেককেই আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।

(খ) ইসলামী রাষ্ট্রের স্বরূপঃ
১. এটা ধর্মহীন রাষ্ট্র হতে সম্পূর্ণ আলাদা।
২. এটা পরিচালনার জন্য এক বিশেষ মনোবৃত্তি বিশেষ প্রকৃতি এবং বিশেষ ধরনের নির্ধারন আবশ্যক।
৩. ধর্মহীন রাষ্ট্রের জজ ও প্রধান বিচার প্রতি ইসলামী রাষ্ট্রের কেরানী হওয়ার যোগ্যতা রাখে না।
৪. ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিটি বিভাগের জন্য খোদাভীতি, নিজ কর্তব্য পালন ও সেজন্য আল্লাহরকাছে জবাব দিহির তীব্র অনুভূতি ও উন্নত চরিত্রের অধিকারী লোকের প্রয়োজন।

(গ) ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনা কারীদের বৈশিষ্ট্যঃ
• পৃথিবীর বিপুল পরিমান সম্পত্তি হস্তগত থাকলেও তারা তার পূর্ন আমানতদার।
• রাজশক্তি করায়ত্ত হলেও সুখ নিদ্রা ত্যাগ করে জনস্বার্থে রক্ষণাবেক্ষণ।
• যুদ্ধে বিজয়ী দেশে হিংসাত্মক কাজে লিপ্ত না হয়ে তাদের ইজ্জত আব্রর হেফাজতকারী।
• নিজেদের স্বার্থকে ধুলিস্যাৎ করে অপরের স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়া।
• আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তারা এমন মর্যাদার অধিকারী হবে যে, তাদের সততা, সত্যবাদীতা, ন্যায়পরয়নতা, নৈতিক ও চারিত্রিক, মূল নীতির অনুসরণ এবং প্রতিশ্রুতিও চুক্তি পালনের ব্যাপারে গোটা বিশ্ব তাদের উপর আস্থাশীল হবে।

• ইসলামী বিপ্লবের পদ্ধতি বা পন্থা:
১. ইসলামী রাষ্ট্রের অলৌকিক আবির্ভাব ঘটনা
• ইসলামী জীবন দর্শন চরিত্র ও প্রকৃতির বিশেষ মাপকাঠি অনুযায়ী গঠিত ব্যাপক আন্দোলন সৃষ্টি করা। নেতা ও কর্মীদের এই বিশিষ্ট আদর্শে আত্মগঠন করা।
• সমাজ জীবনে অনুরূপ মনোবৃত্ত ও নৈতিক উদ্দীপনা জাগ্রত করা।
• ইসলামী আদর্শে নাগরিকদের গড়ে তুলতে একটি অভিনব শিক্ষা পদ্ধতি চালু করা।
• জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রত্যেকটি শাখায় ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে চিন্তা ও কাজ করতে সক্ষম এমন লোক গড়ে তোলা।
• ইসলামী আদর্শের চিন্তা-চেতনা ও কর্ম জীবনের একটি পরিপূর্ণ পরিকল্পনা প্রণয়ন।
• ইসলামী আন্দোলন চতুপার্শ্বে যাবতীয় অবাঞ্চিত জীবন-ধারার বিরূদ্ধে প্রকাশ্যে সংগ্রাম করবে।

২. ইহাতে নিম্নোক্ত ফল পাওয়া যাবে:
• পরীক্ষার অগ্নিদহনে উত্তীর্ণ ত্যাগী লোক তৈরি হবে।
• এ আন্দোলনে এমনসব লোক পর্যায়ক্রমে যোগদান করবে যাদের প্রকৃতিতে সত্য-ন্যায়ের উপাদান অন্তর্নিহিত রয়েছে।
• সর্বশেষে কাঙ্খিত রাষ্ট্র ব্যবস্থার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে।

৩. যে কোন ধরনের বিপ্লব সৃষ্টি করার জন্য প্রয়োজন:
• একটি বিশেষ ধরনের আন্দোলন।
• বিশেষ ধরনের সামাজিক চেতনা সম্পন্ন নৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ সৃাষ্ট। উদাহরণ, রুশ বিপব, জার্মানির সমাজতন্ত্রের বিপব।

• অবাস্তবকল্পনা বা ধারনা:
১. কিছু লোকের ধারণা মুসলিম জাতিকে একটি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অধীনে একই পাটফর্মে সংগঠিত ও পরিচালিত করতে পারলেই ইসলামী রাষ্ট্র আপনা আপনিই প্রতিষ্ঠিত হবে। 
২. মুসলমানদের বর্তমান নৈতিক ও ধর্মীয় অবস্থার স্বরূপ যেমন- চরিত্রগত দিক থেকে দুনিয়ার মুসলিম ও অমুসলিম জাতিগুলোর সবগুলোর অবস্থা প্রায় একই। উদাহরণঃ আদালতে মিথ্যা সাক্ষী দেওয়া, ব্যবসা-বাণিজ্যে দুর্নীতি, রোজার দিনে একই সাথে খাওয়া, সুদ, ঘুষ, জেনা ইত্যাদির সাথে লিপ্ত হওয়া।

• ইসলামী আন্দোলনের সঠিক কর্মপন্থা:
হযরত মুহাম্মদ (সা) এর কর্মপন্থাই হচ্ছে ইসলামী আন্দোলনের সঠিক কর্মপন্থা। তার অনুসৃত বিশিষ্ট কর্মপন্থাগুলো নিম্নরূপ:

১. ইসলাম হলো সেই আন্দোলনের নাম যা মানব জীবনের গোটা ইমারত নির্মান করতে চায় এক আলাহর সার্বভৌমত্বের দৃষ্টিভঙ্গির উপর।
২. ইসলামী আন্দোলনের লক্ষ্য কোন ইস্যুকে কেন্দ্র করে নয়।
৩. মূল লক্ষ্য আলাহর একত্ব ও সার্বভৌমত্বের দাওয়াত দেওয়া।

• ইসলামী আন্দোলনের সঠিক কর্মনীতির চারটি দিক রয়েছেঃ
ক) আলাহর সার্বভৌমত্ব মেনে নেওয়ার আহবান।
খ) অগ্নী পরীক্ষায় নিখাঁদ প্রমানিত হওয়া।
গ) নেতা ছিলেন আদর্শের মডেল।
ঘ) আদর্শের কার্যকর স্বাভাবিক বিপব।

ক) আল্লাহর সার্বভৌমত্ব মেনে নেওয়ার আহবান:
১. বুদ্ধিমান ও বাস্তববাদী হয়ে থাকা তবে বুদ্ধিমত্তা ও বাস্তববাদীতার দাবী হলো সেই মহান সম্রাটের হুকুমের সম্মুখে মাথা নত করে দাও তার একান্ত আনুগত্য দাস হয়ে যাও।
২. গোটা জাতির একজনই সম্রাট মালিক এবং সার্বভৌম কর্তা রয়েছেন। অন্য কারো কতৃত্ব করার কোন অধিকার নাই।
৩. আলাহ ছাড়া আমি সকলের বিরূদ্ধে বিদ্রোহী এবং যারা আলাহকে মানে তারা ব্যতিত] ৪. এই ঘোষণা উচ্চারণ করার সাথে সাথে বিশ্ববাসী আপনার শত্রুহবে এবং চতুর্দিক থেকে সাপ, বিচ্ছু আর হিংস্র পশুরা আপনাকে নির্মমভাবে আক্রমণ করছে।

খ) অগ্নি পরীক্ষায় নিখাঁদ প্রমাণিত হওয়াঃ
১. লা ইলাহা ইলালাহ এই ঘোষণা হওয়ার সাথে সাথে পোপ (খৃস্টান) ঠাঁকুরদের সকল শক্তি ঐক্যবদ্ধ হলো এগুলো গঠন করে হলো ঐক্যজোট।
২. তাদের উপর নেমে আসে কঠিন অত্যাচার এবং এর ফলেই ইসলামী আন্দোলন মজবুত হয় এবং ক্রমবিকাশ ও প্রসার লাভ করে।
৩. এর ফলেই সমাজের মনি-মুক্তাগুলো আন্দোলনে শরিক হয়।
৪. একদিকে এই বিপ্লবী কাফেলায় যারা শরিক হচ্ছিল বাস্তবে ময়দানে তাদের হতে থাকে যথার্থ প্রশিক্ষণ।
৫. কিছু লোক দিনের পর দিন মার খাচ্ছে এ দেখে কিছু মানুষ উৎসাহী হয় এরা কি কারণে মার খাচ্ছে।

গ) নেতা ছিলেন আদর্শের মডেলঃ
১. বর্তমান ইসলামী আন্দোলনের নেতা কর্মীদের সেই মহান নেতার নেতৃত্ব আদর্শ, সহানুভূতি এবং সার্বিকভাবে তার মডেলকে অনুসরণ করা একান্ত দরকার।
২. এই নেতার স্ত্রী ছিলেন বিপুল ঐশ্বর্যের মালিক।
৩. কালিমার দাওয়াত কবুল ও মানুষকে এ দাওয়াত দেওয়ার সাথে সাথে তাদের সম্পদ শেষ হয়ে যায়।
৪. নেতা ছিলেন অত্যন্ত ধৈর্যশীল ও সহনশীল।
৫. সমকালীন সময়ে তাকে ইসলামী আন্দোলনের কাজ না করার প্রতিফল হিসাবে আরব জাহানের বাদশাহী এবং আরবের শ্রেষ্ঠ সুন্দরী নারী দিতে চেয়ে ছিল। কিন্তু তিনি তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করেন এবং তিরস্কার আর প্রস্তাব্যগত সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করেন।
৬. অত্যন্ত গরমের সময় মরুভূমির মধ্য দিয়ে পায়ে হেঁটে দ্বীনের দাওয়াত দিতেন সাথীদের সাথে নিয়ে।
৭. হাশেমী গোত্রের লোকেরা এই আন্দোলনের প্রতি অনীহা ছিল।

ঘ) আদর্শের কার্যকর স্বাভাবিক বিপ্লব:
ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য একদল লোককে সম্পূর্ণভাবে তৈরি করা হয়েছিল যারা ইসলামের পূর্ণ প্রশিক্ষণ পেয়ে এতটা যোগ্য হয়েছিল যে তারা যেকোন অবস্থা ও পরিস্থিতিতে মুসলমান হিসেবে দায়িত্ব পালনে সক্ষম ছিল। উদাহরণ, মদীনায় একটি ইসলামী রাষ্ট্র।

একথা সত্য যে, একাজের জন্য প্রযোজন ঈমান, ইসলামীক চেতনা, ঐকান্তিক নিষ্ঠা, মজবুত ইচ্ছাশক্তি এবং ব্যক্তিগত আবেগ, উচ্ছাস ও স্বার্থের নিঃশর্ত কুরবাণী। 

 

একাজের জন্য এমন একদল দুঃসাহসী যুবকের প্রয়োজন যারা সত্যের প্রতি ঈমান এনে তার উপর পাহাড়ের মত অটল হয়ে থাকবে। অন্যকোন দিকে তাদের দৃষ্টি নিবন্ধ হবে না। পৃথিবীতে যা-ই ঘটুকনা কেন, তারা নিজেদের লক্ষ্য- উদ্দেশ্যের পথ থেকে এক ইঞ্চিও বিচ্যুত হবে না।

Tuesday, December 3, 2024

বইনোট : একটি আদর্শবাদী দলের পতনের কারণ ও তার থেকে বাঁচার উপায় || মরহুম আব্বাস আলী খান রহ.



লেখক পরিচিতি || মরহুম আব্বাস আলী খান রহ.

•জন্মঃ ১৩২১ সালের ফাল্গুন মাসের শেষ সপ্তাহে।
•স্থানঃ জয়পুরহাট।
•পড়ালেখাঃ প্রথমে নিজ ঘরে কোরআনের ছবক নেন। ১৯২১ সালে ২য় শ্রেনিতে ভতি হন। ৬ষ্ঠ শ্রেনির পর হুগলী মাদ্রাসায় পড়তে যান। রাজশাহী ও কারমাইকেল কলেজে পড়েন। ১৯৩৫ সালে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ডিস্টিংশনসহ বি.এ. পাশ করেন।
•স্কলারশীপঃ ৬ষ্ঠ শ্রেনিতে ১ বছরের গভর্নমেন্ট বৃত্তি ও চারবার মেয়াদী বৃত্তি লাভ করেন।

•কর্মজীবনঃ ১৯৩৫ সালে তিনি চাকুরী গ্রহণ করেন। কিন্তু নামাযে বাধা দেয়ায় চাকুরীতে ইস্তফা দেন। ১৯৩৬ সালে বেঙ্গল সেক্রেটারিয়েট যোগ দেন এবং শেরে বাংলার সেক্রেটারি হন। দেশ বিভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানের সার্কেল অফিসার হন। ১৯৫২ সালে জয়পুরহাট স্কুলের প্রধান শিক্ষক হন।

•রাজনীতি ও আন্দোলনঃ
১৯৫৫ সালে তিনি মুত্তাফিক ফরম পূরন করেন।
১৯৫৬ সালে জামায়াতের রুকন হন।
১৯৫৭ সালে রাজশাহী বিভাগীয় আমীর হন।
১৯৭৯ সালে থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সিনিয়র নায়েবে আমীর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭৯ থেকে ৯২ পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত আমীরের দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭৯ থেকে ৯২ পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত আমীরের দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৬২ সালে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য হন। আইয়ুব খানের মুসলিম পারিবারিক আইন বাতিলের জন্য আন্দোলন করেন।
১৯৭১ সালের মন্ত্রী পরিষদের শিক্ষামন্ত্রী হন।
১৯৮০ সালের ৭ ডিসেম্বর ইসলামী বিপ্লবের ৭ দফা গণদাবী ঘোষণা করেন।

ষাটের দশকের পাকিস্তান ডেমোক্রেটিভ মুভমেন্টের অন্যতম নেতা ছিলেন। গণ আন্দোলন কর্মসূচী ও কেয়ারটেকার সরকারের জন্য আন্দোলন করেন।
১৯৭৯ সালে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর যান।
১৯৮৪ সালে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে আমন্ত্রিত হয়ে বৃটেন যান।

•সাহিত্য চর্চাঃ অনুবাদ ও মৌলিক রচনা ৩৫টি। মৌলিক গ্রন্থ মধ্যে উল্লেখযোগ্যঃ

১. বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস
২. সমাজতন্ত্র ও শ্রমিক
৩. মুসলিম উম্মাহ
৪. ইসলামী আন্দোলন ও তার দাবী এবং অনূদিত গ্রন্থের মধ্যে অন্যতম
৫. সুদ ও আধুনিক ব্যাংকিং
৬. জাতীয় ঐক্য ও গণতন্ত্রের ভিত্তি
৭. ইসলামী অর্থনীতি উল্লেখযোগ্য
৮. পর্দা ও ইসলাম

ইন্তেকালঃ ৩ অক্টোবর ১৯৯৯ সালে ১:২৫ মিনিটে ইন্তেকাল করেন।


১. যে আদর্শের হাতে রাষ্ট্র ব্যবস্থার ক্ষমতা নেই জগতের কোথাও তার জন্য একটুও স্থান নেই। বিজয়ী সভ্যতার সমূহ কর্ম জগত থেকে দূরে সরে পরে। তার ব্যাপারে দুর দৃষ্টি ভঙ্গির অধিকারী ব্যক্তিদের মনেও এ পদ্ধতি দুনিয়ায় চলতে পারে কিনা সে ব্যাপারে সন্দেহ জাগে।

২. কাজেই হুকুমতে এলাহিয়া কায়েম করে খোদার তরফ থেকে নবীগন যে ব্যবস্থা নিয়ে এসে ছিলেন তাকে পুরোপুরি বাস্তবায়ন করাই ছিল নবীদের মিশনের চূড়ান্ত লক্ষ্য।

৩. জাহেলিয়াত পন্থিদের তারা এতটুকু অধিকার দিতে প্রস্তুত ছিলেন যে, ইচ্ছা করলে তারা জাহেলি আকিদা বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারে। কিন্তু কর্তৃত্বের চাবিকাঠি তাদের হাতে তুলে দেয়া যাবে না।

৪. এ জন্যই প্রত্যেক নবী রাজনৈতিক বিপ্লব সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন।

নবীদের কাজঃ
১. সাধারণ মানুষের মাঝে চিন্তার বিপ্লব সৃষ্টি করা।
২. নির্ভেজাল ইসলামী শিক্ষায় প্রভাবিত একটি শক্তিশালী দল গঠন।
৩. ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েম করে তমুদ্দুনের সমস্ত বিভাগকে নির্ভেজাল ইসলামের ভিত্তিতে পুনর্গঠিত করা।

খেলাফতে রাশেদাঃ
১. হযরত মুহাম্মদ (সঃ) তেইশ বছর নবুয়াতী জিন্দেগীতে যে সমস্ত কাজ পূর্ণরূপে সম্পাদন করেন।
২. আবু বকর সিদ্দিক (রা.) ও ওমর ফারুক (রা.) এর নেতৃত্ব।
৩. উসমান (রা.) এর শাসনামলের ১ম দিককার সময়।


১। একটি আদর্শবাদী দলের পরিচয়:

উত্তর: প্রতিষ্ঠিত সমাজ ব্যবস্থা সমুলে উৎপাটিত করে তার স্থলে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করতে হলে একটি আদর্শ বেছে নিতে হয়। এর সাথে পৃথক চিন্তাধারাও থাকে। এ চিন্তা ও আদর্শের সাথে যারা সকল দিক দিয়ে একমত পোষণ করে তারা একটি দল গঠন করে। একে বলা হয় আদর্শবাদী দল।

২। আদর্শবাদী দলের পতনের কারণ বইয়ে উন্মাদ ও দেওয়ানা বলতে কি বোঝানো হয়েছে?

উন্মাদ: ময়দান নিশ্চিত হাতছাড়া হয়ে গেছে। এ অবস্থায় ময়দানে নেমে পড়া আর জেনে শুনে আগুনে ঝাঁপ দেয়া সমান। উম্মাদেরাই শুধু এটা সম্ভব করতে পারে।

দেওয়ানা: দুর্দান্ত কুফরী শক্তির কর্তৃত্ব দেখার পরও যে ব্যক্তি দারুল ইসলাম কায়েমের জন্য ময়দানে নেমে পড়বে সে অবশ্যই দেওয়ানী।


৩। একটি আদর্শবাদী দলের পতনের কারণ:

১. দলের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হিসেবে গ্রহণ না করা।
২. কুরআন হাদীস ও ইসলামী সাহিত্য অধ্যয়ন না করা।
৩. সময় ও আর্থিক কোরবানীর প্রতি অবহেলা করা।
৪. দলীয় মূলনীতি মেনে না চলা।
৫. ইনসাফ প্রতিষ্ঠা না করা।
৬. ভ্রাতৃত্ববোধের অভাব।
৭. জনশক্তির মধ্যেনৈরাশ্য ও হতাশা সৃষ্টি হওয়া।
৮. নেতৃত্বের অভিলাষ।
৯. অর্থ - সম্পদের প্রতি লালসা।
১০. জীবনমান উন্নত করার প্রবণতা।
১১. সহজ সরল জীবন যাপন না করা।
১২. মৌলিক বিষয়ে ঐক্যমত পোষন করতে না পারা।
১৩. নেতৃত্বের দুর্বলতা
১৪. নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থা আন্দোলনের পতন ডেকে আনে।
১৫. বায়তুলমাল সম্পর্কে আমানতদারীর অভাব এবং আর্থিক লেনদেনে সততার অভাব।
১৬. সহজ সরল জীবনযাপন না করা।


৪। তার থেকে বাচাঁর উপায়:

১. নামাযের মাধ্যমে আল্লাহর সাথে গভীর সম্পর্ক স্থাপন করা।
২. অতিরিক্ত যিকির আযকার করা
৩. আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন
৪. আত্মসমালোচনা করা
৫. ক্রোধ দমন করা
৬. মৌলিক বিষয়ে ঐক্যমত পোষন করা।
৭. বিরোধী পরিবেশ পরিস্থিতি দ্বারা প্রভাবিত না হওয়া।
৮. ত্যাগ ও কোরবানী করা
৯. সমস্যার ত্বরিত ও সঠিক সমাধান না করা।

৫। পারস্পরিক সম্পর্ক বিনষ্ঠ হওয়ার কারন:

১. পারস্পরিক হিংসা বিদ্বেষ।
২. গীবত, পরনিন্দা, পরচর্চা।
৩. পরশ্রীকাতরতা।
৪. একে অন্যকে সন্দেহের চোখে দেখা।
৫. কারো বিপদে আপদে তার খোঁজ খবর না নেয়া।
৬. পরস্পরবৈষয়িক স্বার্থে ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত হওয়া।
৭. অযথা কারো প্রতি কু-ধারনা পোষণকরা।
৮. এসব কারণে শুধু একটি দলই নয়, বরং মুসলিম জাতিসত্তার ভিত্তি ও ন্নড়ে হয়ে পড়ে।

৬। দারুল ইসলাম ট্রাষ্ট গঠনের পটভূমি:-

১৯৩৭ সালে আল্লামা ইকবাল হায়দ্রাবাদ থেকে পাঞ্জাবে হিজরত করার জন্য মাওলানা মওদূদীকে আহ্বান জানান। আল্লামা ইকবাল তরজুমানুল কোরআনের মাধ্যমে মাওলানার গুনমুগ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। অসুস্থতা ও শারীরিক দুর্বলতার কারণে তিনি কখনো সাইয়্যেদ নাযির নিয়াযী এবং কখনো মিয়া মুহাম্মদ শফিকে দিয়ে তরজমানুল কোরআন পড়াতেন এবং মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। ঠিক এই সময়ে জনৈক অবসরপ্রাপ্ত এস.ডিও চৌধুরী নিয়ায আলী তার ৬০/৭০ একর জমি ইসলামের খেদমতের জন্য ওয়াক্ত করেছিলেন। সেখানে বিভিন্ন ধরনের পাকা ঘর বাড়ি তৈরি করে বিশেষ পরিকল্পনার অধীনে দ্বীনের বৃহত্তর খেদমতের অভিলাষী ছিলেন। এ ব্যপারে তিনি আল্লামা ইকবালের পরামর্শ চাইলে তিনি একমাত্র মাওলানা মওদূদীকে এ কাজের জন্য যথাযোগ্য ব্যক্তি মনে করেন। মাওলানা মওদূদী ড. ইকবালের অনুরোধে তার সাথে বিস্তারিত আলোচনার পর এ কাজের দায়িত্ব গ্রহন করতে রাজি হন এবং চিরদিনের জন্য হায়দ্রাবাদ পরিত্যাগ করে ১৯৩৮ সালের ১৬ মার্চ পূর্ব পাঞ্জাবের পাঠানকোর্ট নামক স্থানে হিজরত করেন। অতপর দারুল ইসলাম নামে একটা ট্রাষ্ট গঠন করে তার মহান কাজের সূচনা করেন।

Tuesday, October 29, 2024

আধুনিক সভ্যতার সূতিকাগার || আবুল আসাদ || একুশ শতকের এজেন্ডা


সেই ষাটের দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির ক্লাসে প্রথম শুনি যে, ধর্ম-জ্ঞান, গবেষণা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিরোধী। তারপর এই কথা নানাভাবে আরও অনেকের কাছে শুনেছি। লেখা-পড়া যাদের মূর্খ বানিয়েছে, তারা এখনও এসব কথা বলে থাকেন সুযোগ পেলেই। এদের রাগ ইসলামের উপরই বেশি। খ্রিস্টান ধর্ম প্রধানত পাশ্চাত্যের এবং হিন্দুধর্ম ভারতের, তাই এসব ধর্ম ওদের কাছে প্রগতিশীল। কিন্তু মুসলিম দেশগুলো অনুন্নত ও দরিদ্র বলে ইসলামকেও ওরা জ্ঞান-বিজ্ঞান বিমুখ ও অনুন্নয়নের প্রতীক বলে চলছে। অথচ ইসলাম সবচেয়ে বিজ্ঞানমুখী ও সবচেয়ে প্রগতিশীল ধর্ম। ইতিহাসের সাক্ষ্যও এটাই। Prof. Joseph Hell বলেন, "মানব জাতির ইতিহাসে স্বীয় ছাপ মুদ্রিত করা সব ধর্মেরই প্রধান বৈশিষ্ট্য। কিন্তু ইসলাম যতটা দ্রুতবেগে ও অকপটভাবে বিশ্ব মানবের হৃদয় স্পর্শকারী মহা পরিবর্তন সাধন করেছে, জগতের অন্যকোন ধর্ম তা পারেনি।" এই কথাই আরও স্পষ্ট করে বলেছেন ঐতিহাসিক O. J. Thatcher Ph. D এবং F. Schwill Ph. D তাদের ইতিহাস গ্রন্থে, "পয়গম্বর মোহাম্মদের মৃত্যুর পর পাঁচশ' বছর তার অনুগামিরা এমন এক সভ্যতার পত্তন ঘটায় যা ইউরোপের সবকিছু থেকে বহুগুণ অগ্রগামী।" আর Meyrs তার Mediaeval and Modern History' তে বলেন, "সেখানে এমন এক সভ্যতার উত্থান ঘটে, দুনিয়া যা দেখেছে এমন সবকিছুকেই তা অতিক্রম করে যায়।"


সত্যই ইসলামের উত্থানের সাথে সাথে জ্ঞান-বিজ্ঞানের জগতে এবং সভ্যতার গতিধারায় এক বিস্ময়কর পরিবর্তন সূচিত হয়। ইউরোপ যখন অজ্ঞতা, অশিক্ষা, কুসংস্কার ও স্বৈরাচারের গভীর ঘুমে অচেতন তখন এশিয়া-আফ্রিকায় ইসলামের আলোকধারা জ্ঞান ও সভ্যতামণ্ডিত নতুন এক বিশ্বের জন্ম দেয়। মানবাধিকার, গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক সুবিচার ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নয়ন সবদিক থেকেই মানব জাতিকে ইসলাম এক অন্যান্য সভ্যতা দান করে।

পাশ্চাত্যের ওরা এখন গণতন্ত্র ও গণতন্ত্রের সাংঘাতিক প্রবক্তা সেজেছেন। আর ইসলামকে বলা হচ্ছে মানবতা বিরোধী, অসহিষ্ণু ইত্যাদি। এসব কথা বলার সময় তারা অতিতের দিকে তাকায় না এবং নিজের চেহারার উপর একবারও নজর ফেলেনা। যে গ্রীক ও রোমান সভ্যতা আজকের পাশ্চাত্য সভ্যতার দার্শনিক ভিত্তি, সে সভ্যতায় গণতন্ত্রতো দূরের কথা কোনপ্রকার সহিষ্ণুতা ও সহাবস্থানের কোন স্থান নেই। আভ্যন্তরীণভাবে তাদের নীতি ছিল 'সারভাইভেল অব দা ফিটেস্ট/ এবং আন্তর্জাতিকভাবে তারা অনুসারী ছিল 'মাইট ইজ রাইট'। গ্রীকরা বলতো 'যারা গ্রীক নয় তারা গ্রীকদের কৃতদাস হবে এটা প্রকৃতির ইচ্ছা।' আর রোমানরা মনে করতো, তারাই পৃথিবীর মালিক, পৃথিবীর সব সম্পদ তাদের জন্যই। ইউরোপের এই অন্ধকার যুগে মানবাধিকার বলতে কোন ধারণার অস্তিত্ব ছিল না। পরাজিত ও ভাগ্যাহতদের নিহত হওয়া অথবা চিরতরে দাসত্বের নিগড়ে বন্দী হওয়াই ছিল ভবিতব্য। নারীদের অর্থনৈতিক ও অন্যবিধ অধিকার থাকা দূরের কথা তারা পূর্ণ মানুষ কিনা তা নিয়েই ছিল বিতর্ক। শত্রু ও বাদী জাতীয় লোকদের কোন মানবিক অধিকার স্বীকৃত ছিলনা।

এই দুঃসহ অন্ধকারের হাত থেকে ইসলাম মানুষকে মুক্ত করে, পৃথিবীকে নিয়ে আসে আইনী শাসনের আলোকে। চৌদ্দশ' বছর আগে ইসলাম ঘোষণা করে, বংশ, বর্ণ, জাতি, দেশ নির্বিশেষে সব মানুষ সমান। এই নীতি হিসেবে ইসলাম সব মানুষকেই আইনের অধীনে নিয়ে এসেছে এবং মানুষকে রক্ষা করেছে যথেচ্ছচার থেকে। শত্রু ও পরাজিত বন্দীদেরকেও ইসলাম মানুষ হিসাবে দেখতে বলে। কোন যুদ্ধবন্দীকে হত্যা করা ইসলাম নিষিদ্ধ করেছে এবং তাদের স্থানে মানবসুলভ, মেহমানসুলভ ব্যবহার করতে বলেছে। নির্দেশ দেয়া হয়েছে বন্দীদের সুখাদ্য দিতে হবে, বন্দীদের উত্তাপ ও শৈত্য থেকে রক্ষা করতে হবে, কোন কষ্ট অনুভব করলে দ্রুত তা দূর করতে হবে, বন্দীদের মধ্যে কোন মাতাকে তার সন্তান থেকে, কোন আত্মীয়কে অন্য আত্মীয় থেকে আলাদা করা যাবে না। বন্দীদের মান-মর্যাদা রক্ষাসহ তাদের কাছ থেকে জবরদস্তী কোন কাজ নেয়া যাবে না। যুদ্ধবন্দী সংক্রান্ত এ নীতিমালা ইসলাম দেয় চৌদ্দশ' বছর আগে, পাশ্চাত্য এই শিক্ষা, আংশিকভাবে, গ্রহণ করে মাত্র ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের এক প্রস্তাব আকারে। ইসলাম চৌদ্দশ' বছর আগে বিধান দেয় যে, চিকিৎসা পুরাপুরি মানবীয় সেবা। চিকিৎসক ও সেবাদানকারীদের কোন অনিষ্ট করা যাবে না। ইসলামের এই শিক্ষা গ্রহণ করেই পাশ্চাত্য মাত্র ১৮৬৪ সালে রেডক্রস গঠনের মাধ্যমে চিকিৎসা সুযোগকে শত্রু-মিত্র বিবেচনার উর্ধ্বে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে। মানবতা বিরোধী দাস প্রথা বিলোপের ব্যবস্থা করে ইসলাম চৌদ্দশ' বছর আগে। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দাস প্রথা বিলুপ্ত হয় ১৮৬৩ সালে। ইসলামে পুরুষের মতই নারী শিক্ষা বাধ্যতামূলক ইসলামের এই শিক্ষার পরও ১১শ' বছর পর্যন্ত পাশ্চাত্য নারীদের শিক্ষার উপযুক্ত ভাবেনি। অবশেষে ১৮৩৫ সালে মার্কিন মেয়েরা প্রথম স্কুলে যাবার সুযোগ পায়। আর নিজ নামে সম্পত্তি ভোগের অধিকার পায় ১৮৪৮ সালে। অথচ ইসলাম নারীদের এ অধিকার দেয় চৌদ্দশ' বছর আগে। পাশ্চাত্য যেখানে ১৯৪৮ সালের জেনেভা কনভেনশনের আগ পর্যন্ত বিজিত দেশের মানুষকে দাস মনে করতো এবং এখনও লুটতরাজের যোগ্য মনে করে, সেখানে ইসলাম বিজিত দেশের মানুষকে সম্মানিত নাগরিক হিসেবে দেখে। খিলাফতে রাশেদার যুগে কোন নতুন ভূখণ্ড মুসলমানদের দখলে এলে সেখানকার মানুষকে আর শত্রুর দৃষ্টিতে দেখা হতোনা। মুক্ত মানুষ হিসাবে তাদের এ অধিকার দেয়া হতো যে, তারা একবছর সময়কালের মধ্যে যেন সিদ্ধান্ত নেয় যে, তারা পছন্দের কোন দেশে চলে যাবে, না মুসলিম দেশের নাগরিক হিসাবে বসবাস করবে।

মানবতাকে ইসলাম সম্মান করে বলেই ইসলাম ও মুসলমানরা সহিষ্ণুতার প্রতীক। একটা উদাহরণ এখানে যথেষ্ট। ক্রুসেডের যুদ্ধে খ্রিস্টানরা যখন মুসলমানদের হাত থেকে জেরুজালেম দখল করে, তখন তারা ৭০ হাজার নাগরিককে হত্যা করে। আর মুসলমানরা যখন খ্রিস্টানদের হাত থেকে জেরুজালেম উদ্ধার করে, তখন একজন খ্রিস্টানের গায়েও হাত দেয়া হয়নি। চৌদ্দশ' বছর ইসলাম যে বিচার ব্যবস্থা পত্তন করে, বিশ্ব সভ্যতায় তা অন্যান্য সংযোজন। ইসলামের বিচার ব্যবস্থায় মানুষে মানুষে কোন পার্থক্য করা হয়নি। শুরু থেকেই ইসলাম শাসন বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে আলাদা করেছে। ইসলামি রাষ্ট্রের প্রধান বিচারপতিদের নিয়োগ করতেন, কিন্তু বিচারপতিরা শাসন-কর্তৃত্বের অধীন হতেন না। ইসলামি রাষ্ট্রের প্রধান কিংবা শাসনকর্তারা অভিযুক্ত হলে তারা সাধারণ আসামিদের মতই কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বিচারের সম্মুখিন হতেন। অনেক মামলায় নিরপেক্ষ সাক্ষীর অভাবে খলিফারা হেরেছেন। এবং এই হেরে যাওয়াকে তারা মাথা পেতে নিয়েছেন।

মানবাধিকারের মত সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও ইসলাম বিশ্ব সভ্যতায় অনন্য এক কল্যাণ ধারার সৃষ্টি করে। পাশ্চাত্য ব্যবস্থায় তখন পর্যন্ত ক্ষমতাসীন ব্যক্তিস্বার্থ সমূহের পদতলে সামষ্টিক স্বার্থ নিক্ষেপ হতো। ইসলাম ব্যক্তি স্বার্থ ও সামষ্টিক স্বার্থ উভয়কেই সমান গুরুত্বপূর্ণ বলে অভিহিত করে এবং উভয়ের মধ্যে কল্যাণকর এক ভারসাম্য বিধান করে। সমাজের একক ইউনিট হিসেবে ইসলাম পরিবার ব্যবস্থাকে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে। তারপর পরিচয় ও সহযোগিতার জন্য বংশ ও সামাজিকতাকে এবং শাসন ব্যবস্থার জন্য রাষ্ট্রকে গুরুত্বপূর্ণ আখ্যায়িত করেছে। আর অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অর্থনীতির বিতরণধর্মীতা ও পুঁজিগঠন উভয়কেই সমান গুরুত্ব দিয়েছে। তবে ইসলামে ম্যাক্রো অর্থনীতি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মাইক্রো অর্থনীতি। ব্যক্তিগত বৈধ সম্পত্তির ব্যাপারে কোন হস্তক্ষেপ ইসলাম করেনি, কিন্তু শর্ত দিয়েছে প্রতিবেশী কেউ যেন না খেয়ে না থাকে এবং সঞ্চয়ের বদলে সম্পদ যেন বিনিয়োগমুখী হয়। চৌদ্দশত বছর আগের ইসলামের এই অর্থনীতি আজকের আধুনিক অর্থনীতির চেয়েও আধুনিক ও কল্যাণকর।

সবশেষে আগে জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে বিশ্ব সভ্যতায় ইসলামের অবদানের কথা।

ইসলাম জ্ঞান ও যুক্তি নির্ভর ধর্ম বলেই জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ইসলাম বিশ্বসভ্যতাকে নতুন সাজে সজ্জিত করেছে। খ্রিস্টায় এগার শতক থেকে সপ্তদশ শতক পর্যন্ত বিজ্ঞান চর্চার অপরাধে পাশ্চাত্য যেখানে প্রায় ৩৫ হাজার মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করেছে, সেখানে অষ্টম শতক থেকে ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত কাল ছিল মুসলমানদের বিজ্ঞান চর্চা ও আবিষ্কারের স্বর্ণযুগ। বিজ্ঞানের ইতিহাসকার জর্জ মার্টন তার পাঁচ খণ্ডে সমাপ্ত বিজ্ঞানের ইতিহাসে বিজ্ঞান ও আবিষ্কারে ইসলামের অবদানকে সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত করেছেন। ৪ তাঁর এই ইতিহাস বলে, ৭৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১১০০ খ্রিস্টাব্দ- নিরবচ্ছিন্ন এই ৩৫০ বছর জ্ঞান-বিজ্ঞানে মুসলমানদের চূড়ান্ত আধিপত্যের যুগ। এই সময় যেসব 
মুসলিম বিজ্ঞানী পৃথিবীকে আলোকিত করেছেন, তাদের মধ্যে রয়েছেন জারীর, খাওয়ারিজাম, রাজী, মাসুদী, ওয়াফা, বিরুনী, ইবনে সিনা, ইবনে আল হাইয়াম এবং ওমর খৈয়াম। এই বিজ্ঞানীরা যখন পৃথিবীতে আলো ছড়াচ্ছিল, তখন সে আলোকে স্নাত হচ্ছিল অন্ধকার ও ঘুমন্ত ইউরোপ। ইউরোপীয় ছাত্ররা তখন স্পেন ও বাগদাদের মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মুসলিম বিজ্ঞানীদের পদতলে বসে জ্ঞান আহরণ করছিল। মুসলিম বিজ্ঞানীদের এই ইউরোপীয় ছাত্ররাই জ্ঞানের আলোক নিয়ে ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। এরই ফল হিসেবে ১১০০ খ্রিস্টাব্দের পর ইউরোপে ক্রিমোনোর জেরার্ড, রজার বেকন- এর মত বিজ্ঞানীদের নাম সামনে আসতে থাকে। বিজ্ঞানের ইতিহাসকার জর্জ মাটনের মতে ১১০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দু'শ পঞ্চাশ বছরের এ সময়ে বিজ্ঞানে অবদান রাখার সম্মানটা মুসলমানরা ও ইউরোপ ভাগাভাগি করে নেয়। এই সময়ের মুসলিম বিজ্ঞানীদের মধ্যে রয়েছেন নাসিরউদ্দিন তুসী, ইবনে রুশদ এবং ইবনে নাফিসের মত বিজ্ঞানীরা। ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দের পর মুসলমানদের বিজ্ঞান চর্চায় গৌরবপূর্ণ সূর্য অস্তমিত হয় এবং পাশ্চাত্যের কাছে হারতে শুরু করে মুসলমানরা। অবশ্য এর পরেও মুসলমানদের মধ্যে বৈজ্ঞানিক চমক কখনও কখনও দেখা গেলেও (যেমন ১৪৩৭ সালে সমরখন্দে আমির তাইমুর পৌত্র উলুগ বেগের দরবার এবং ১৭২০ সালে মোগল সম্রাটের দরবারে জীজ মোহাম্মদ শাহীর সংকলন) তা ছিল খুবই ক্ষণস্থায়ী।

তবে বিজ্ঞানে ছয়'শ বছরের যে মুসলিম অবদান তা ছিল আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তি এবং বিজ্ঞান-রেনেসাঁর জনক। মুসলমানরা ছিল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থারও জনক। 'ইউরোপ যখন গির্জা ও মঠ ব্যতীত অপর সকল শিক্ষালয়ের কথা কল্পনাও করেনি, তার শত শত বছর আগে মুসলমানরা বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেছিল, যেখানে হাজারো ছাত্র উন্নত পরিবেশে পাঠগ্রহণ করতো। গ্রন্থাগার ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়নও ইসলামি সভ্যতার অবদান। মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ছিল লাখো গ্রন্থে ঠাসা। ব্যক্তিগত লাইব্রেরীর তখন ব্যাপক উন্নয়ন ঘটেছিল। ঐতিহাসিক Dosy-এর মতে স্পেনের আলমেরিয়ার ইবনে আব্বাসের ব্যক্তিগত লাইব্রেরীতে অসংখ্য পুস্তিকা ছাড়া শুধু গ্রন্থের সংখ্যাই ছিল ৪ লাখ। এসব মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় ও গ্রন্থাগারটি ছিল বিজ্ঞান-

চর্চা ও বৈজ্ঞানিক সৃষ্টির সুতিকাগৃহ। বিজ্ঞানের সকল শাখাতেই ছিল মুসলমানদের গৌরবজনক বিচরণ। গণিত শাস্ত্রে রয়েছে মুসলমানদের মৌলিক অবদান। আমরা যে ৯ পর্যন্ত নয়টি সংখ্যা ব্যবহার করি, তার অস্তিত্ব আগে থেকেই ছিল। কিন্তু 'শূন্য' (Zero)-এর বিষয়টি সম্পূর্ণ অপরিচিত ছিল। দ্বাদশ শতাব্দীতে মোহাম্মদ ইবনে মুসা সর্বপ্রথম 'শূন্য' আবিষ্কার করেন। গণিত শাস্ত্রে ইনিই সর্বপ্রথম 'দশমিক বিন্দু' (decimal notation) ব্যবহার করেন। সংখ্যার স্থানীয় মান' (value of position) তারই আবিষ্কার। বীজগণিত বা 'এলজেব্রা' মুসলমানদের সৃষ্টি। মুসলিম গণিতজ্ঞ আল জাবের-এর নাম অনুসারে'এলজেব্রা' নামকরণ হয়। শিঞ্জিনী (sine), সার্শ-জ্যা (tangent) ও প্রতি স্পর্শ-ক্যক (co-tangent) প্রভৃতি আবিষ্কার করে বর্তুলাকার ক্রিকোণমিতির উন্নতি করেন মুসলিম বিজ্ঞানীরা। আলোক বিজ্ঞানে focus' নির্ণয়, চশমা আবিষ্কার মুসলিম বিজ্ঞানী আল হাজানের কীর্তি। কিন্তু রজার বেকন এই আবিষ্কার পাশ্চাত্যে আমদানি করে নিজেই এর আবিষ্কারক সেজেছেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানে 'মানমন্দির' (observatory) ব্যবহার মুসলিম বিজ্ঞানীদের আবিষ্কার। এর আগে 'মানমন্দির' সম্পর্কে কোন ধারণা কারও ছিল না। গণনা দ্বারা রাশি- চক্রের কোণ (angle of the ecliptic), সমরাত্রি দিনের প্রাগয়ন (pre- cission of the equinoxes), Almanac (পঞ্জিকা), Azimuth (দিগন্তবৃত্ত), Zenith (মন্ত্রকোর্দ্ধ নভোবিন্দু), Nadir (অধঃস্থিত নভোবিন্দু), প্রভৃতির উদ্ভাবন মুসলিম বিজ্ঞানীদের কীর্তি। মুসলিম বিজ্ঞানীরাই চিকিৎসার বিজ্ঞানকে প্রকৃত বিজ্ঞানে রূপ দান করেন।
ইউরোপ যখন খ্রিস্টান গির্জা ঔষধের ব্যবহার নিষিদ্ধ করে ধর্মানুষ্ঠান দ্বারা রোগের ব্যবস্থা দিতেন, তখন চিকিৎসা বিজ্ঞান মুসলমানদের হাতে এক নতুন যুগে প্রবেশ করে। চিকিৎসা বিজ্ঞানীয় আল রাজীর চিকিৎসা বিষয়ক 'বিশ্বকোষ' দশখণ্ডে সমাপ্ত। এই চিকিৎসা বিশ্ব-কোষ ও ইবনে সিনা'র ব্যবস্থা' ইউরোপী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্য ছিল। বিজ্ঞানের অন্যতম শাখা কেমিস্ট্রির নামকরণই হয় মুসলিম বিজ্ঞানী 'আল কেমী'র নাম অনুসারে। কেমিস্ট্রি'-এর সুবাসার (Alcohol), কাঠ ভষ্ম-ক্ষারের ধাতার্বকমূল (patassium), পারদ বিশেষ (corrosive sublimate), কার্ষকি (Nitrate of silver, যবক্ষার দ্রাবক (Nitric Acid) গন্ধক দ্রাবক (Sulphuric Acid), জুলাপ (Julep), অন্তসার (Elixer), কপূর (Caurphar), এবং সোমামুখী (senna), প্রভৃতি। মুসলিম বিজ্ঞানীদের আবিষ্কার। ভূগোল শাস্ত্রে মুসলমানদের অবদান অবিস্মরণীয়। ইউরোপ যখন মনে করতো পৃথিবী সমতল, তখন বাগদাদে গোলাকার পৃথিবীর পরিধী নির্ণিত হয়েছিল। চন্দ্র যে সূর্যের আলোকে আলোকিত হয়, একথা মুসলিম বিজ্ঞানীরা জানতেন। মুসলিম বিজ্ঞানীরাই চন্দ্র, সূর্য ও অন্যান্য গ্রহের কক্ষ নির্ধারিত করেন। অতি গুরুত্বপূর্ণ কম্পাস যন্ত্র মুসলিম বিজ্ঞানির আবিষ্কার। মুসলমানরা নকশার বৈচিত্র ও সৌন্দর্য এবং শিল্প কৌশলের পূর্ণতা বিধানে ছিলো অপ্রতিদ্বন্দ্বি। স্বর্ণ, রৌপ্য, তাম্র, পিতল, লৌহ, ইস্পাত, প্রভৃতির কাজে তারা ছিলো দক্ষ। বস্ত্র শিল্পে এখনও মুসলমানদের কেউ অতিক্রম করতে পারেনি। উত্তম কাচ, কালী, মাটির পাত্র, নানা প্রকার উৎকৃষ্ট কাগজ প্রস্তুত করাসহ রং পাকা করার কৌশল ও চর্ম-সংস্কারের বহুবিধ পদ্ধতি সম্পর্কে মুসলিম কুশলীরা ভালোভাবে অবহিত ছিলেন। তাদের এসব কাজ ইউরোপে খুব জনপ্রিয় ছিল। সিরাপ ও সুগন্ধি দ্রব্য তৈরিতে মুসলমানদের ছিল একাধিপত্য। মুসলমানদের কৃষি পদ্ধতি ছিল খুবই উন্নত। তারা স্পেনে যে কৃষি পদ্ধতির প্রচলন করেন, ইউরোপের জন্য তা তখনও বিস্ময়। পানি সেচ পদ্ধতি তাদের উৎকৃষ্ট ছিল। মাটির গুণাগুণ বিচার করে তারা ফসল বপন করতেন। সারের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে তারা জানতেন। 'কলম' করা ও নানা প্রকার ফল-ফুলের উৎপাদন কৌশল উদ্ভাবনে তারা ছিলেন খুবই অভিজ্ঞ।

বহু শতাব্দী পর্যন্ত মুসলমানরা বাণিজ্য-জগতের ছিল একচ্ছত্র সম্রাট। নৌ যুদ্ধে তারা ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তারা ছিলেন অতুলনীয় সমুদ্রচারী। তাদের জাহাজ ভূমধ্যসাগর, আটলান্টিক মহাসাগর, ভারত সাগর ও চীন সাগরে এককভাবে চষে ফিরত। মুসলিম নাবিকদের ছাত্র হিসাবেই ইউরোপীয়রা গভীর সমুদ্রে প্রথম পদচারণা করে। ভন ক্রেমার বলেন, আরব নৌবহর ছিল বহু বিষয়ে খ্রিস্টানদের আদর্শ।' মুসলমানদের যুদ্ধ-পদ্ধতি ও যুদ্ধ বিদ্যাও ইউরোপকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে। ইউরোপের Chivalry স্পেনীয় মুসলিম বাহিনীর অনুকরণ।


মোট কথা, বলা যায়, মুসলমান ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্রসহ জ্ঞান-বিজ্ঞানের সকল শাখার যে অবদান রাখেন, তা এক নতুন সভ্যতার জন্ম দেয়, বিশ্ব সভ্যতাকে করে নতুন এক রূপে রূপময় যা চিন্তা, চেতনা, আচার-আচরণ, জীবন-যাপন, জীবনাপোকরণ সবদিক দিয়েই আধুনিক। ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দে সভ্যতার এই নতুন-উত্থান- যাত্রা থেমে না গেলে আরও কয়েকশ' বছর অগেই বিশ্ব আধুনিক বিজ্ঞান যুগে প্রবেশ করতো। কিন্তু তা হয়নি। না হলেও তাদেরই ছাত্র ইউরোপীয় বিজ্ঞানীরা আরও কয়েকশ' বছর পরে হলেও মুসলমানদের কাজ সম্পন্ন করেছে। ইসলামি সভ্যতাকে বাদ দিলে বা মুসলমানদের অবদান মাইনাস করলে ইউরোপীয় রেনেসাঁ আর থাকে না, তার সভ্যতাও অন্ধকারে তলিয়ে যায়।


লিওনার্দো এজন্যই লিখেছেন, "আরবদের মধ্যে উচ্চ শ্রেণীর সভ্যতা, জ্ঞানচর্চা, সামাজিক ও মানসিক সমৃদ্ধি এবং অভ্রান্ত শিক্ষা-প্রথা বিদ্যমান না থাকলে ইউরোপকে আজও অজ্ঞতার অন্ধকারে নিমগ্ন থাকতে হতো।


রেফারেন্স:
১। S. Khuda Bakhsh, M. A. BCL. Bar-at Law, প্রণীত 'Arab civilization গ্রন্থে উদ্ধৃত, পৃ. ১৬
২। 'A general History of Europe, Vol-1 Page-172 ৩। Mayers, 'Mediaeval and Modern History' Page-54
৪। নোবেল বিজ্ঞানী আবদুস সালাম' এর 'Ideas and Realities' গ্রন্থে উদ্ধৃত
(বাংলা অনুবাদঃ 'আদর্শ ও বাস্তবতা,' পৃষ্ঠা, ২৬৮ ৫। Mayers, "Mediaeval and Modern History, Page, 56
৬। Dozy, Spanish Islam'. Page 610
৭। Thateher Ph. D and F. Schwill Ph. D. 'A general History Europe', vol-1 page, 173
৮। Von Kremar এই উক্তি S. khuda Bakhsh এর 'Arab civilization' এর উদ্বৃত, Page, 72
৯। Thatcher and F. Schwill, 'A general History of Europe, Vol-1 pages, 174-188

Tuesday, July 9, 2024

মকবুল আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ : জীবন ও কর্ম

মকবুল আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ : জীবন ও কর্ম

ফেনী জেলার অন্তর্গত দাগনভূঞা উপজেলার ৩নং পূর্বচন্দ্রপুর ইউনিয়নের ছায়াঘেরা, পাখি ডাকা সবুজের সমারোহে বেষ্টিত এক সুন্দর গ্রামের নাম ওমরাবাদ। যার পূর্ব পাশ ঘেঁষে বয়ে যাচ্ছে সিলোনিয়া নদী। এ নদীর পশ্চিম পাশে অবস্থিত গ্রামের সম্ভ্রান্ত মুসলিম জোতদার পেশায় সার্ভেয়ার (আমিন) জনাব নাদেরুজ্জমানের বাড়ী। সে বাড়ীতে ১৯৩৯ সালের ৮ আগস্ট জনাব নাদেরুজ্জামান ও জনাবা আঞ্জিরের নেছার ঘর আলোকিত করে এক শিশু জন্মগ্রহণ করে। তারা এ প্রিয় সন্তানটির নাম রাখেন মকবুল আহমাদ। এ মকবুল আহমাদ ছিলেন ৫ ভাই ৩ বোনের মধ্যে পঞ্চম আর ভাইদের মধ্যে দ্বিতীয়। সে শিশুটি কালক্রমে বাংলাদেশের রাজনীতি ও ইসলামী আন্দোলনের ইতিহাসে একসময় যে বিখ্যাত হয়ে উঠবে সেদিন মা-বাবা, ভাই-বোন বা গ্রামবাসী কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। কিন্তু সেটাই আজ বাস্তব সত্য।

ওমরাবাদ গ্রামের নাম ওমরাবাদ কেন হলো সে ইতিহাস জানা নেই। তবে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর ফারুক (রা.) এর নামে নামকরণের পেছনে সে গ্রামের ভূমিপুত্রদের কেউ ইনসাফ আর আদলে সে গ্রামকে অনন্য হিসেবে অত্যুজ্জল ইতিহাস রচনায় কালের সাক্ষী করে রাখার মানসে করেছেন কিনা কে জানে? ওমরাবাদ গ্রামের সকল অধিবাসীই মুসলিম। সে গ্রামের শিশু মকবুল আহমাদ তার শৈশব, কৈশর, যৌবন আর বার্ধক্যের ক্রান্তিকালসহ পুরো জীবন ব্যাপী হযরত ওমরের মত ঈমানী দৃঢ়তা, অসীম সাহসীকতা, কঠিন আমানতদারী, ইনসাফ-আদল আর মানব কল্যাণে ভূমিকা রেখে ওমরের আদর্শকে আবাদ করে গেছেন এ জমিনে। এ মকবুল আহমাদের কারণে হয়তোবা ওমরাবাদ নামকরণের সার্থকতা একদিন ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকবে। রাহবারের পাঠকদের উদ্দেশ্যে জনাব মকবুল আহমাদের জীবন ও কর্ম সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলো:

শিক্ষা জীবন:
জনাব মকবুল আহমাদের যখন প্রাইমারী স্কুলে যাওয়ার বয়স তখন চলছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। বর্তমান বাংলাদেশ তখন ব্রিটিশ কলোনী। আর ফেনীতে ছিল ব্রিটিশদের বৃহৎ বিমান বন্দর। সে বিমান বন্দর এখন নেই। কিন্তু বিমান বন্দরের রানওয়ে আর হ্যাঙ্গারগুলো কালের স্বাক্ষী হয়ে আছে। এ বন্দর থেকে প্রতিনিয়ত বোমা নিয়ে উড়ে যাচ্ছে ব্রিটিশ বিমান। এখানে ওখানে বোমা পড়ছে, আকাশ লড়াইয়ে বিমান বিধ্বস্ত হচ্ছে। বিমানের ধ্বংসাবশেষ এদিক সেদিক ছিটকে পড়ছে। সে এক কঠিন পরিস্থিতি। এর মাঝে আবার সে সময় সুনসান পাকা রোড-ঘাট ছিল না। স্কুল ছিল অনেক দূরে দূরে। ভাগ্যবান ছাড়া বেশী শিশু স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পেত না সে সময়। আর যারা এসব দূর-দূরান্তের স্কুলে যেত তাদের ভরসা ছিল স্রষ্টার দেয়া দু'টি পা। মাইলকে মাইল মেঠো পথে ধুলো কাদা মাড়িয়ে সংগ্রাম করেই লেখা পড়া করতে হতো। মকবুল সাহেবের বাড়ীর পাশে নদীর উপর তখনকার সময় ভাল কোন পুল কালভার্ট ছিল না। এসব প্রাকৃতিক বাধা আর যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মকবুল সাহেবের প্রাইমারী শিক্ষা বর্তমানের শিশুদের চাইতে সম্ভবত দেরীতে শুরু হয়েছিল। তাই মকবুল সাহেব সংগ্রামী জীবন অতিক্রম করে প্রাইমারী শিক্ষা শেষ করেছেন পারিবারিক পরিসরে ও গ্রামীন স্কুলে।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর এক সময়কার অফিস সম্পাদক জনাব অধ্যাপক মাযহারুল ইসলাম ছিলেন মকবুল সাহেবের দীর্ঘ দিনের দ্বীনি আন্দোলনের সহকর্মী। তিনি স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে লিখেন- "পূর্বচন্দ্রপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয়। প্রাথমিক শিক্ষা শেষে দাগনভূঞার কামাল আতাতুর্ক হাইস্কুলে ভর্তি হন। অতঃপর তিনি ফেনী পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হন।" কিন্তু তিনি নবম শ্রেণিতে পাইলট হাইস্কুলে ভর্তি হয়েও সেখান থেকে ম্যাট্টিক পরীক্ষা দেননি। কারণ বাড়ী থেকে পাইলট হাইস্কুলে পায়ে হেটে ক্লাস করতে কি পরিমাণ কষ্টকর ছিল তা শুধু বর্তমানে কল্পনাই করা যায়। বর্তমান সময়ে মোটর সাইকেলে ফেনী থেকে মকবুল সাহেবের বাড়ী যেতে ৩০/৪০ মিনিটের বেশী সময় লাগে। যা হোক সে কারণে তিনি স্কুল পরিবর্তনে বাধ্য হয়ে জায়লস্কর হাইস্কুলে ভর্তি হন এবং ১৯৫৭ সালে কৃতিত্বের সাথে এ স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। তিনি ১৯৫৯ সালে ফেনী কলেজ থেকে ইন্টারমেডিয়েট পাস করেন এবং ১৯৬২ সালে বি.এ পাস করেন। এখানে মকবুল সাহেবের জাগতিক শিক্ষার সমাপ্তি। কিন্তু দ্বীনি শিক্ষা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।

কর্ম জীবন:
বি.এ পাশ করার পর তিনি শিক্ষকতার মত মহান পেশাকে গ্রহণ করেন। এ ব্যাপারে জনাব অধ্যাপক আবু ইউসুফ লিখেন- “প্রথমে তিনি ফেনী উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত ঐ সময়ের স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরিষাদি উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। কথিত আছে যে, উক্ত বিদ্যালয়ে বিভিন্ন নিয়ম কানুন শক্তভাবে পালন করা হতো। মকবুল সাহেব তখন জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করার কারণে তার আচার আচরণে ইসলামের রীতিনীতির প্রতিফলন ঘটেছিল। তাই উক্ত বিদ্যালয়ের ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারী জনাব আবদুল খালেককে তিনি নাম ধরে না ডেকে খালেক ভাই বলে সম্বোধন করার কারণে তাঁর বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানের নিয়মনীতির বিপরীত আচরণের অভিযোগ উঠলে তাৎক্ষণিক প্রধান শিক্ষক তাঁকে বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেন তখন তিনি উত্তরে বলেছিলেন আবদুল খালেক ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারী হলেও সে তো আমাদের মতোই একজন মানুষ। সুতরাং তাকে ভাই ডাকতে সমস্যা কোথায়? তিনি সরিষাদি উচ্চ বিদ্যালয়ে ৪ বছর শিক্ষকতা করেছিলেন। পরবর্তীতে বর্ণিত ঘটনার জের ধরে তিনি উক্ত বিদ্যালয়ের চাকুরী ত্যাগ করেন এবং শহরে অবস্থিত ফেনী সেন্ট্রাল হাইস্কুলে চাকুরী গ্রহণ করেন। ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ফেনী সেন্ট্রাল হাইস্কুলে শিক্ষকতা করেন।

সাংবাদিকতায় মকবুল আহমাদ:
অধ্যাপক মাযহারুল ইসলাম লেখেন- "১৯৭০ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত জাতীয় দৈনিক 'দৈনিক সংগ্রাম' পত্রিকার ফেনী মহকুমার নিজস্ব সংবাদদাতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সত্তর দশকের দিকে 'বাংলাদেশের হোয়াইটগোল্ড' শিরোনামে বাংলাদেশের কক্সবাজারের চিংড়ি মাছের উৎপাদনের ওপর তার লেখা একটি প্রতিবেদন ব্যবসায়ী জগতে বিশেষ আলোড়ন সৃষ্টি করে। বিষয় ছিল 'বাংলাদেশের হোয়াইট গোল্ড' (চিংড়ি

সম্পদ) সৌদি আরবের 'তরল সোনা (পেট্রোল)' কে হার মানাবে।" তিনি সুযোগ পেলে পত্র পত্রিকা বা সাময়িকীতে লেখালেখি করতেন এবং প্রতিভাবানদের লেখালেখি ও সাংবাদিকতায় উৎসাহিত করতেন। মিড়িয়ার গুরুত্ব তাঁর কাছে পরিষ্কার ছিল। তাই তাঁর পরিচিত কেউ সাংবাদিকতায় ঢুকলে এ পেশায় টিকে থাকার জন্য তাকে প্রণোদনা দিতেন। যত বাধা আসুক এ পেশা পরিত্যাগ করতে নিরুৎসাহিত করতেন।

সাংগঠনিক জীবন:

১৯৬২ সালে : জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান।

১৯৬৬ সালে : জামায়াতে ইসলামীর রুকন শপথ নেন।

১৯৬৭-৬৮ সালে : ফেনী শহর নাযেমের দায়িত্ব পালন।

১৯৬৮-৭০ সাল : ফেনী মহকুমা সভাপতির দায়িত্ব পালন।

১৯৭০ সালে : ফেব্রুয়ারী মাস থেকে ১৯৭১ সালের জুন মাস পর্যন্ত নোয়াখালী জেলা আমীরের দায়িত্ব পালন।

১৯৭১ সালে : বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত তিনি সংগঠনের চট্টগ্রাম বিভাগের দায়িত্ব পালন করেন। তখন চট্টগ্রাম বিভাগ ছিল চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, কুমিল্লা ও সিলেট এর বৃহত্তর জেলা নিয়ে। বিভাগ হিসেবে তখন দেশের এ বিভাগ ছিল সবচেয়ে বড়।

১৯৭৯ সাল : থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত তিনি সংগঠনের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৮৯ সাল : থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত তিনি সহকারী সেক্রেটারী জেনারেলের দায়িত্ব পালন করেন।

২০০৪ সালে : ২০১০ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

২০১০ সালের : ৩০ জুন থেকে ২০১৬ সালের ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত জামায়াতের তৎকালীন আমীরে জামায়াত মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীকে গ্রেফতার করা হলে ভারপ্রাপ্ত আমীরে জামায়াত হিসেবে সংকটকালীন সময়ে নেতৃত্ব দেন।

২০১৬ সালের : ১৭ অক্টোবর তিনি আমীর নির্বাচিত হন এবং ২০১৯ সালের ১২ নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর তৃতীয় নির্বাচিত আমীরে জামায়াত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।


বিভিন্ন সংস্থায় দায়িত্ব পালন:

১৯৮৪ সালে : তিনি ঢাকায় অবস্থিত জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান “ফালাহ- ই-আম ট্রাস্টের" চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।

১৯৯৭ সাল : থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত তিনি ইসলামী আন্দোলনের পতাকাবাহী জাতীয় পত্রিকা দৈনিক সংগ্রামের মালিকানা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পাবলিকেশন্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান ছিলেন। এছাড়া তিনি দৈনিক সংগ্রাম ট্রাস্টি বোর্ডের একজন ডাইরেক্টর ছিলেন।

২০০৪ সাল : তিনি বাংলাদেশ ইসলামিক ইনস্টিটিউটের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।


বিদেশ সফর:

১৯৭৬ ও ৭৯ সালে তিনি "রাবেতা আলম আল ইসলামীর” মেহমান হিসাবে দু'বার পবিত্র হজ্জব্রত পালনের জন্য সৌদী আরব সফর করেন।

• জাপান ইসলামী সেন্টারের দাওয়াতে জাপান সফর করেন।

কুয়েতে প্রবাসী ভাইদের দাওয়াতে তিনি একবার কুয়েত সফর করেন।


সামাজিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা:

> তাঁর সহযেগিতায় সিলোনিয়া মাদ্রাসা সংলগ্ন 'আল ফালাহ মসজিদ' ও 'উম্মুল মু'মেনীন আয়েশা (রা.) মহিলা মাদরাসা' প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

➤ ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ২০১৬ পর্যন্ত তিনি ফেনীর বিখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শাহীন একাডেমী স্কুল এন্ড কলেজ ফেনী এর নিয়ন্ত্রক ট্রাস্ট 'ফেনী ইসলামিক সোসাইটি'র চেয়ারম্যান ছিলেন।

১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত 'আঞ্জুমানে ফালাহিল মুসলেমিন' নামক ট্রাস্টের তিনি ফাউন্ডার ও আজীবন মেম্বার ছিলেন। এ ট্রাস্টের অধীনে পরিচালিত হয় দেশের টপটেন মাদরাসার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান 'আল-জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদরাসা ফেনী' এবং ফেনী সদর উপজেলার 'লক্ষীপুর বাইতুল আমিন দাখিল মাদরাসা'।

১৯৮৮ সালে দাগনভূঞা সিরাজাম মুনিরা সোসাইটির সভাপতি ছিলেন।

> দেশের অন্যতম বৃহৎ ইসলামী সাহিত্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান আধুনিক প্রকাশনী বি.আই ট্রাস্টের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

> এছাড়া তিনি ঢাকা রহমতপুরস্থ ডা. আবদুস সালাম কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত আশ-শেফা আর রাহমাহ নামক সমাজ কল্যাণ প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেন।


সমাজকল্যাণমূলক কার্যক্রম:

* অধ্যাপক মাযহারুল ইসলাম লেখেন- "ছাত্রজীবন থেকেই তিনি সমাজকল্যাণমূলক কাজের সাথে জড়িত ছিলেন। তার জীবনের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হলো মানুষের সেবা করা। ১৯৬২ সালে যুবকদের সহযোগিতায় নিজ গ্রাম ওমরাবাদে "ওমরাবাদ পল্লীমঙ্গল সমিতি" নামের একটি সমিতি গঠন করেন। তিনি উক্ত সমিতির ১০ (দশ) বছর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। সমিতির সভাপতি হিসেবে তিনি স্থানীয় অনেক রাস্তাঘাট নির্মাণ ও মেরামতের ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং গরিব ও অসহায় লোকদের সাহায্য-সহযোগিতা প্রদান করেন।

* ১৯৭৬ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত তিনি গজারিয়া হাফেজিয়া মাদরাসার ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।


রাজনৈতিক জীবন:

১৯৭০ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে জামায়াতের দলীয় প্রার্থী হিসেবে নিজ এলাকায় প্রতিদ্বন্ধিতা করেন।

১৯৮৬ সালে জামায়াতের দলীয় প্রতীক দাঁড়িপাল্লা নিয়ে ফেনী ২নং আসন থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন।

১৯৯১ সালে তিনি জামায়াতের দলীয় প্রার্থী হিসেবে আরও একবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন।

২০১০ সালের জুন মাসের শেষ দিকে জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমীর নিযুক্ত হয়ে দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য গঠিত ২০ দলীয় জোট গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

২০১৬ সালের ১০ অক্টোবর জামায়াতের আমীর নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে থেকে ২০১৯ সালের ১২ নভেম্বর পর্যন্ত দেশের কঠিনতম পরিস্থিতিতে জামায়াতের আমীর ও ২০ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতা হিসাবে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সরকারের স্বৈরাচারী আচরণের প্রতিবাদ, জনগণের ভোটাধিকার পুনরুদ্ধার, এদেশে ইসলামী কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং গণমানুষের আধিকার আদায়ের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।

পারিবারিক জীবন: জনাব মকবুল আহমাদ ১৯৬৬ সালে লক্ষীপুর জেলা নিবাসী প্রখ্যাত আলেম ও শিক্ষাবিদ ঢাকা আরমানিটোলা সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান মাওলানা ওহিদুল হকের কন্যা মুহতারামা সুরাইয়া বেগমের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তিনি ৩ ছেলে ও ২ মেয়ে সন্তানের জনক। তাঁর স্ত্রী একজন রুকন। ছেলে-মেয়েরাও ইসলামী আন্দোলনের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সংশ্লিষ্ট।

মৃত্যু:
মৃত্যু মানব জীবনের অনিবার্য পরিণতি। কোন মনিষী এমনকি নবী-রাসুলগণও অমরত্ব লাভ করেননি। সে কারণে একটি পরিণত বয়সে খলিফাতুল্লাহ হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে আল্লাহর একান্ত প্রিয় এ গোলাম ১৩ এপ্রিল ২০২১ইং, মঙ্গলবার, দুপুর ১.০০টায়, ইবনে সীনা হাসপাতালে চিকিৎসাধিন অবস্থায় মহান মনিবের দরবারে হাজিরা দেন। সেদিন ছিল ১৪৪২ হিজরীর ২৯ শে শাবান। দিন শেষে পহেলা রমজানের প্রস্তুতি, সালাতুত তারবীহ। পরদিন থেকে শুরু হচ্ছে করোনা পরিস্থিতির কারণে সর্বাত্বক কঠোর লক ডাউন। তাই ঐ দিন গভীর রাতে নামাজে জানাজা শেষে ওমরাবাদ গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে মরহুমকে সমাহিত করা হয়। জানাযায় ইমামতি করেন বর্তমান আমীরে জামায়াত জনাব ডা. শফিকুর রহমান।

মহান আল্লাহ মরহুমের কবরকে জান্নাতের টুকরায় পরিণত করুন, তাঁর নেক আমলগুলো কবুল করুন, ভুলত্রুটিগুলো নিজ অনুগ্রহে ক্ষমা করে দিন। তাঁর শোক সন্তপ্ত পরিবারকে সবরে জামিল ইখতিয়ারের তাওফিক দিন। তাঁর উত্তরসূরীদের আরো বেশী দক্ষতা ও যোগ্যতার সাথে বাংলাদেশের ইসলামী আন্দোলনকে কামিয়াবীর মঞ্জিলে পৌঁছে দেয়ার তাওফিক দিন। আমীন, ইয়া রাব্বাল আ'লামীন।