Close
Showing posts with label সাম্প্রতিক. Show all posts
Showing posts with label সাম্প্রতিক. Show all posts

Tuesday, January 21, 2025

মিডিয়াতে অপপ্রচার ও আমাদের দায়িত্ব - ইউনুছ আব্দুদ্দাইয়ান

আগেকার দিনে চিঠি বা দূত পাঠিয়ে সংবাদের আদান প্রদান হতো। আল্লাহর রাসূল (সা) মাঝে মধ্যে পাহাড়ের উপরে উঠে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা প্রদান করতেন যাতে করে দুরবর্তী লোকেরাও তাঁর কথা শুনতে পায় এবং তাঁকে দেখতে পান। রাসূলে কারীম (সা) মাঝে মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মাটিতে লাঠি দ্বারা চিত্র অংকন করে সাহাবায়ে কেরামকে বুঝাতেন। কালপরিক্রমায় প্রিন্টেড ও ইলেক্ট্রনিক এই দুই ধরনের মিডিয়ার সাথে আমরা পরিচতি হই। বর্তমানে এর সাথে যোগ হয়েছে অনলাইন ও সোশাল মিডিয়া। মূলত সংবাদপত্র, রেডিও, টেলিভিশন, লিফলেট, পোস্টার, ওয়েবসাইট প্রভৃতির মাধ্যমে ঘরে বসেই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের খবর জানা যায়। বিশেষভাবে অনলাইন ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে যেকোন সংবাদ বিশ্বের আনাচে কানাচে অতিদ্রুত ছড়িয়ে দেয়া সম্ভব। এরফলে জনমত গড়ে উঠে। আরব বসন্তের কথা আমরা জানি। আরব বসসন্ত ও পরবর্তীতে পৃথিবীর কয়েকটি দেশে সরকার পরিবর্তনে কিংবা সরকার বিরোধী বিক্ষোভে জনমত গঠনে সোশাল মিডিয়া তথা টুইটার, ফেইসবুক ও ব্লগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আজকের তরুণ সমাজ অনলাইন মিডিয়ার প্রতি বেশি আকৃষ্ট। অডিও, ভিডিও, কার্টুন ইউটিউবই ইন্টারনেটে প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুসারে বিশ্বের প্রায় ৮০% মানুষ টেলিভিশন দেখে। অতএব, মিডিয়া বর্তমান বিশ্বকে কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। জিম মরিসন যথার্থই মন্তব্য করেছেন যে, Whoever controles the media- controls the mind.

মিডিয়া কোনো একজন ব্যক্তি, বা সংগঠন কিংবা দেশের ইমেজ বৃদ্ধি বা নষ্ট করার ক্ষেত্রেও বিরাট ভূমিকা পালন করে। একজন ভালো মানুষও মিডিয়ার অব্যাহত অপপ্রচারের ফলে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের কাছে খারাপ মানুষ হিসেবে পরিচিত হতে পারে। আমরা দেখি অনেক সময় অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হারিয়ে যায় মিডিয়া কভারেজের অভাবে। আর মিডিয়া কভারেজ পেয়ে অনেক নন ইস্যুও ইস্যুতে পরিণত হতে সময় লাগেনা। অখ্যাত যে কোনো ব্যক্তি মিডিয়ার কভারেজ পেয়ে বিশ্ব পরিচিতি লাভ করতে পারে। আফগানিস্তানের কিশোরী মালালা মিডিয়ার বদৌলতেই বিশ্বে এতো খ্যতি অর্জন করেছেন। অথচ মালালার মতো লাখো শিশু-কিশোর পৃথিবীর আনাচে কানাচে নানাভাবে নির্যাতিত হচ্ছে তার খবরও কেউ জানেনা। মিডিয়ার প্রচারণার ফলেই অল্প সময়ে মানুষের মধ্যে কোনো আদর্শ জনপ্রিয়তা লাভ করতে পারে। আবার কোনো আদর্শ সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সন্দেহ ও সংশয় সৃষ্টি হতে পারে। এভাবে বিশ্বজনমত গঠনে মিডিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

কিন্তু দু:খজনক বাস্তবতা এই যে বর্তমান বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সংস্থাগুলো ইহুদীদের নিয়ন্ত্রণে। রয়টারের ৮০% কর্মকর্তা-কর্মচারী ইহুদী। এসোসিয়েট প্রেস (এপি) এর ৯০% পুঁজিই ইহুদীদের। আমেরিকান ব্রড কাস্টিং কর্পরোরেশান (এবিসি), ন্যাশনাল ব্রড কাস্টিং সিস্টেম (এনবি এস), ক্যাবল নিউজ নেটওয়ার্ক (সি এন এন), ফ্রান্স নিউজ এজেন্সেী, বিবিসি প্রভৃতি সংবাদ সংস্থা ইহুদী নিয়ন্ত্রিত। অঅন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ পত্রের মধ্যে লন্ডন টাইমস, ম্যাঞ্চেস্টার গার্ডিয়ান, অবজারভার প্রভৃতি পত্রপত্রিকাও ইহুদী নিয়ন্ত্রণাধীন। ইহুদীরা মুসলমানদের এক নম্বর শত্রু। তাই আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে মুসলমানদেরকে মৌলবাদী (Fundamentalist), সাম্প্রদায়িক (Communal) বর্বর সন্ত্রাসী (Terrorist) হিসেবে চিত্রিত করে বিশ্বব্যাপী ইসলামের নবজাগরণ ঠেকাতে চায়। মুসলিম দেশগুলোতেও তাদের দালালরা একই পরিভাষা ব্যবহার করে ইসলাম, ইসলামী অন্দোলন ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণায় লিপ্ত রয়েছে। পাশ্চাত্যের মিথ্যা প্রচারণায় মুসলমানরা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের শিকার হয়েও উল্টো ‘টেরোরিস্ট’ হিসেবে চিহিৃত হচ্ছে।

মিডিয়ার গুরুত্ব সম্পর্কে বর্তমানে কাউকে বুঝাতে হবে বলে আমার মনে হয়না। ইসলামের বিরোধিতা যেভাবেই করা হোকনা কেন তার মোকাবিলায় ভূমিকা পালন করা মুসলমানদের উপর অপরিহার্য। যদি মিডিয়ার মাধ্যমে ইসলামের বিরোধিতা করা হয় তাহলে মিডিয়ার মাধ্যমে তার জবাব দিতে হবে। যদি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিরোধিতা হয় সংস্কৃতির মাধ্যমে তার জবাব দিতে হবে। যদি বুদ্ধিবৃত্তিক কুট কৌশলে বিরোধিতা হয় বৃদ্ধিবৃত্তিক কুটকৌশলের মাধ্যমে তার জবাব দিতে হবে। কলমের মাধ্যমে বিরোধিতা হলে কলমের মাধ্যমে জবাব দিতে হবে। মিডিয়া অপপ্রচারের জবাব মিডিয়ার মাধমে না দিয়ে অন্যভাবে দেয়া যায়না। এই প্রসংগে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, “শত্রুর মোকাবিলার জন্য যত বেশি সম্ভব যুদ্ধ সরঞ্জাম ও সদাপ্রস্তুত অশ্ব বাহিনী সংগ্রহ করে রাখো। এসব নিয়ে তোমরা আল্লাহর শত্রুদের এবং তারা ছাড়া আরও কিছু লোককে যাদের তোমরা চেননা, আল্লাহ চেনেন, ভীত ও সন্ত্রস্ত করে দিতে পারবে। এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য তোমরা আল্লাহর পথে যা কিছু ব্যয় করো তা তোমরা পুরোপুরি ফেরত পাবে। তোমাদের উপর কোনোক্রমেই যুলম করা হবেনা’ -আনফাল ৬০।

আল্লাহ তায়ালা এখানে কুওয়াত বা শক্তি অর্জনের কথা বলেছেন। বর্তমানে আধুনিক যে সমরাস্ত্র আছে তার শক্তি, জ্ঞানের শক্তি, অর্থনৈতিক শক্তি সবই এর অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহর রাসূলের যুগে তীর ও অশ্ব যুদ্ধের জন্য প্রয়োজন ছিল তাই তিনি তা সংগ্রহ করেছেন। তাঁর সময় বৈষয়িক প্রস্তুতি কাফেরদের তুলনায় কম থাকলেও এমনটি কখনও হয়নি যে, তিনি আদৌ কোনো প্রস্তুতি গ্রহণ করেননি। তাই ইসলাম বিরোধীদের অপপ্রচার মোকাবিলায় বিকল্প মিডিয়া করার প্রস্তুতি গ্রহণ এবং তার বাস্তবায়নে চেষ্টা করা মিডিয়া জিহাদের অন্তর্ভুক্ত।

আফসোসের বিষয় হচ্ছে, অনেকেই মুসলমানদের শক্তিশালী মিডিয়া নাই কেন তার জন্য নানা ধরনের প্রশ্ন করছেন। অথচ তাঁদের সামনে যখন মিডিয়ার কোনো প্রজেক্ট প্রস্তাবনা দেয়া হয় তখন তাঁরা বলে বসেন, “টাকা মিডিয়াতে ইনভেস্ট করলে কি লাভ হবে”? অমুক ব্যবসাতে খাটালে এতো % লাভ হবে। আমি মনে করি শুধু নগদ জাগতিক লাভ নয় বরং মিডিয়া চ্যলেঞ্জ মোকাবিলায় মুসলিম ব্যবসায়ীদের একটি অংশকে আন্তর্জাতিক মানের অনলাইন, প্রিন্টেড ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া প্রতিষ্ঠা করা ও ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত মিডিয়া উদ্যোগসমূহকে সহযোগিতা করার জন্য এগিয়ে আসতে হবে। বর্তমানে ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্টেড কিছু মিডিয়াতে ইসলাম ও মুসলমানদের অবস্থা তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় নেহায়েতই কম। তবে ইউরোপে এখনও মূলধারার কোনো মিডিয়া মুসলমানদের নেই বললেই চলে। তাই মুসলমানদেরকে এই দিকে গুরুত্বের সাথে নজর দেয়া উচিত।

এছাড়া প্রতিনিয়ত মিডিয়াতে ইসলাম সম্পর্কে অনেক প্রশ্ন উপস্থাপন করা হয়। সে সম্পর্কে ভারসাম্যমূলক জবাব আসা দরকার। কিন্তু এক্ষেত্রে মুসলমানদের তেমন কোনো স্পোকসম্যান নেই। তাই মিডিয়াতে ভারসাম্যমূলক বক্তব্য তুলে ধরার মতো যোগ্য লোক তৈরি করতে হবে। মিডিয়াতে নেতিবাচক প্রচারণার ফলে অনেক মানুষ বিভ্রান্ত অবস্থায় রয়েছে। তাই মুসলিম হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে ইসলামের প্রকৃত রূপ মিডিয়াতে তুলে ধরা। কিন্তু কারো কারো প্রবণতা হচ্ছে বসে বসে শুধু সমালোচনা করা। আমাদেরকে মনে রাখতে হবে যে, সমালোচনা করা সহজ কিন্তু বাস্তব উদ্যোগ গ্রহণ করা এবং উক্ত উদ্যোগকে সফল করা কঠিন। এছাড়া মিডিয়াতে ভূমিকা রাখার মতো যাদের যোগ্যতা আছে তারা প্রতিনিয়ত লেখা-লেখি করা এবং শক্তিশালী মিডিয়া প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করা সময়ের দাবি।

মিডিয়া কর্মীদেরকে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করা দরকার। আর মুসলমানদেরকেও নিজস্ব মিডিয়া তৈরি করার প্রতি সিরিয়াস হতে হবে এবং মুসলিম মিডিয়া কর্মীদেরকে মেইনস্ট্রিম মিডয়াসমূহে কাজ করার প্রতি আগ্রহী হতে হবে। পাশ্চাত্যের মিডিয়ার নেতিবাচক প্রচারণার ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা মিডিয়া চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার আসল পথ নয়। এর আসল জবাব হচ্ছে ‘বিকল্প শক্তিশালী মিডিয়া’।

মিডিয়াতে ইসলাম সম্পর্কে নেতিবাচক প্রচারণার ইতিবাচক ফলও রয়েছে। পাশ্চাত্যের অনেক চিন্তাশীল মিডিয়াতে ঢালাওভাবে ইসলাম সম্পর্কে বিষোদাগার করায় তারা ইসলাম সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হয়ে উঠেন এবং তাদের মনের নানা প্রশ্নের জবাব অনুসন্ধান করতে গিয়ে সত্যের সন্ধ্যান খুঁজে পান। এছাড়া মুসলমানদের একটি অংশ যারা ইসলাম ভালোভাবে জানতোনা তারা সহকর্মী ও বন্ধুদের নানা প্রশ্নের সঠিক জবাব জানতে গিয়ে নিজেরা ভালোভাবে ইসলাম জানার চেষ্টা করছে। এরফলে যেসব মুসলমান আগে ইসলাম অনুশীলন করতেননা তাঁরা ইসলাম অনুশীলন শুরু করেন। যেসব মুসলিম মহিলা আগে হিজাব পরিধান করতেননা তাঁরা হিজাব পরিধান করা আরম্ভ করেন। তাঁদের মাঝে ইসলামের প্রতি মহব্বত ও আকর্ষণ অনেকগুণ বৃদ্বি পাচ্ছে।

ইসলাম সম্পর্কে মিডিয়ার নেতিবাচক প্রচারণার ফলে অমুসলিম চিন্তাশীলদের কেউ কেউ কুরআন অধ্যয়ন শুরু করেন এবং ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হন। এই প্রসংগে একটি ঘটনা উল্লেখ করছি। ২০০৯ সালের এপ্রিল মাসে আমি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি সেমিনারে অংশ গ্রহণ করি; তুরুষ্কের ততকালীন প্রধানমন্ত্রী ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট এরদোগান উক্ত সেমিনারে মূল বক্তা ছিলেন। রাত দশটার দিকে সেমিনার শেষ হওয়ার পর লন্ডন ফেরার পথে অক্সফোর্ড বিশ্বদিল্যায়ের একজন ছাত্রী ও দুইজন ছাত্রের সাথে পরিচয় হয়। আলাপ আলোচনার এক পর্যায়ে জানলাম উক্ত ছাত্রীর নাম মারইয়াম এবং সে নও মুসলিমাহ। আমি তার কাছে ইসলাম গ্রহণ করার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে জানতে চাইলাম। প্রতি উত্তরে সে জানায় যে তার বাড়ি ফ্রান্সে। তার পিতা-মাতা ও পুরো পরিবার প্রচ-ভাবে মুসলিম বিদ্বেষী ছিল। ৯/১১ এর পর তার পিতা একটি বই তাকে পড়ার জন্য দেয়। উক্ত বইতে মুসলমানদেরকে কুকুরের সাথে তুলনা করা প্রচ-ভাবে ঘৃণা ছড়ানো হয়। মারইয়াম এই ধরনের মন্তব্য পাঠ করার পর চিন্তা করে “আসলেই মুসলমানরা কি এতো বেশি খারাপ? সে এই প্রশ্নের জবাব জানার জন্য তার মুসলিম বন্ধুদের সাথে মত-বিনিময় করতে আগ্রহী হয়। মুসলিম বন্ধুরা তাকে তাদের সাথে আলাপ-আলোচনার পরিবর্তে তার সকল প্রশ্নের জবাব খুঁজে পাবার জন্য কুরআন অধ্যয়ন করার উপদেশ দেয়। সে তাদের উপদেশমতো কুরআন পাঠ করা শুরু করে। কিন্তু প্রথম তিন মাস কুরআন পাঠ করে কোনো মজা অনুভব করেনি। তার মতে ইসলাম সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব নিয়ে কুরআন পাঠের চেষ্টা করায় প্রথম তিন মাস সে কোনো মজা পায়নি। তিন মাস পর উন্মুক্ত মন-মগজ নিয়ে কুরআন পাঠ শুরু করার পর তার মনে হয়েছে কুরআনের প্রতিটি আয়াত যেন তার মনের নানা প্রশ্নের জবাব দিচ্ছে। এইভাবে ছয়মাস তিলাওয়াত করে কুরআন পাঠ শেষ করে। কুরআন পাঠ করতে গিয়েই সে নিজেকে ‘কুরআনী’ বলে পরিচয় দেয়া শুরু করে এবং এক পর্যায়ে ইসলাম কবুল করেন। মারইয়াম আল-কুরআন অধ্যয়ন করেই ইসলাম কবুল করে। কিন্তু তার মতে কুরআন পাঠ করে ইসলাম জানার চেষ্টা না করলে তার পক্ষে ইসলাম কবুল করা হয়তো বা সম্ভব হতোনা। কেননা কুরআনে ইসলামের যেসব বিধান চমৎকারভাবে বিবৃত আছে তা খুব কম মুসলমানই অনুসরণ করে।

উপরের ঘটনা থেকে এই বাস্তব সত্য ফুটে উঠেছে যে, অনেক অমুসলিম ইসলাম সম্পর্কে পরিচালিত অপপ্রচারের জবাব খুঁজতে গিয়েই ইসলামের সুমহান আদর্শের সন্ধান পায়। এছাড়াও মুসলমানদের সাথে উঠা-বসা, লেন-দেন করে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে অমুসলিমদের কেউ কেউ ইসলাম কবুল করছে। অতি সম্প্রতি ইস্ট লন্ডন মসজিদে একটি যুবক ইসলাম কবুল করে। ইসলাম কবুল প্রসংগে সে জানায় যে, দীর্ঘদিন ইসলাম নিয়ে পড়াশুনা করে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়। সে আরো জানায় যে, তার মুসলিম বন্ধুদের চলাফেরা, কথা-বার্তা, উঠা-বসা, লেন-দেন প্রভৃতি তাকে বিমোহিত করে। এইভাবে অনেক মুসলমান সত্যের সাক্ষ্য হিসেবে নিজেদের জীবন গড়ার চেষ্টা করছেন এবং তাঁদেরকে দেখেই চিন্তাশীল অনেক অমুসলিম এই কথা অকপটে স্বীকার করছেন যে, “মুসলিমরা সন্ত্রাসী নয় বরং পরোপকারী’’। এই প্রসংগে একটি বাস্তব ঘটনা উল্লেখ করতে চাই। কিছুদিন আগে যুক্তরাজ্যে একজন অমুসলিম তার ঘর বিক্রির সময় পার্শ্ববর্তী ঘরের চেয়ে তার ঘরের মুল্য ত্রিশ হাজার পাউন্ড বেশি দাবি করে। এজেন্ট বেশি মূল্য চাওয়ার কারণ জিজ্ঞাসা করার পর তিনি জবাব দেন যে, “আমার পার্শ্বে একজন পরোপকারী মুসলিম ভালো প্রতিবেশী রয়েছেন। তিনি কাউকে কষ্ট দেননা বরং সব সময় প্রতিবেশীর প্রতি যত্নশীল থাকেন। যেকোন স্থানে ঘর কেনা সম্ভব কিন্তু ভালো প্রতিবেশী পাওয়া কঠিন’।

পাশ্চাত্যে ও বিভিন্ন মুসলিম দেশে কিছু ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্টেড মিডিয়াতে অব্যাহতভাবে ইসলাম বিরোধী প্রচারণা পরিচালিত হচ্ছে। কিছু মিডয়াতে মুসলমানদেরকে টেরোরিস্ট হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করছে এবং ইসলামকে পাশ্চাত্যের জন্য হুমকি স্বরূপ হিসেবে উপস্থাপন করছে। ইউরোপে যে শতাব্দীকাল থেকে মুসলমানদের বসবাস রয়েছে সে কথা প্রকাশ না করে শুধু ইমিগ্র্যান্ট হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছে এবং মুসলানরা ইউরোপের মুলস্রোতধারা থেকে বিচ্ছিন্ন বলে তারা মনে করে। তাদের প্রচারণা হচ্ছে, ইসলাম আজকের যুগে অচল এবং মুসলমানরা রক্ষণশীল, উগ্র ও টেরোরিস্ট। মিডিয়াতে মুসলমানদের বিরদ্ধে এই ধরনের প্রচারণার ফলে মুসলমানদের উপর বিশেষভাবে মুসলিম ছাত্র-ছাত্রীদের উপর গ্যাং এ্যটাক বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই Q News এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ফুয়াদ নাহদী পাশ্চাত্যের মিডিয়ার সমালোচনা করে বলেন, A western news agenda dominated by hostile, careless coverage of islam distors reality and destroys trust. Western reports, when positive, are seen as selective and partisan; when negative, hypocritical and insensitive (Diana Abdel- Maged, The British Media: Fair or biased )

একশ্রেণীর পশ্চিমা মিডিয়ার ইসলাম সম্পর্কে ব্যাপক অপপ্রচারের কারণে বাস্তব অবস্থা খারাপভাবে চিহ্নিত হচ্ছে এবং আস্থা নষ্ট করছে। কোনো ইতিবাচক রিপোর্ট প্রকাশ করা হলে তা হয় বাছাই করা এবং একপেশে। আর যখন কোনো নেতিবাচক বিষয় তুলে ধরা হয় তা জয় মোনাফেকি সূলভ এবং অসংবেদনশীল। (ডায়ানা আবদেল মাজেদ. দি ব্রিটিশ মিডিয়া : ফেয়ার অর বায়াসড) কিছু মিডিয়া নিরপেক্ষতা বজায় রাখার নীতি পোষণ করলেও যেকোন সন্ত্রাসী ঘঁটনার জন্য মুসলমানদেরকে অভিযুক্ত করার একটা প্রবণতা প্রায় সকল মিডিয়াতেই রয়েছে। যেকোন ঘটনার জন্য ঢালাওভাবে সকল মুসলমানকে দায়ী করা যৌক্তিক নয়। ইতোপূর্বে সন্দেজনকভাবে বিভিন্ন ঘটনায় যাদেরকে আটক করা হয়েছিল তাদের অনেকেই পরবর্তীতে নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন; তাঁদের কেহই কথিত ঘটঁনার সাথে সম্পৃক্ত ছিলনা। তাই সন্ত্রাসের সাথে ইসলাম ও মুসলমানকে ঢালাওভাবে সম্পৃক্ত করার সুযোগ নেই। যেমনিভাবে খৃস্টান ও ইয়াহুদী কেউ সন্ত্রাসী কার্যক্রম করলে তার জন্য পুরো খৃস্টান বা ইয়াহুদী ধর্মাবলম্বীকে দায়ী করা যায়না। কতিপয় মিডিয়ার প্রবণতা হচ্ছে মুসলমান কেউ সন্ত্রাসের সাথে সম্পৃক্ত হবার সন্দেহের তালিকায় থাকলেও তা যেভাবে ফলাও করে ছাপা হয় অপরদিকে একই ধরনের ঘটনা কোনো নন-মুসলিম করলে তা মিডিয়াতে উপক্ষো করা হয়। এই সস্পর্কে বিগত ৭ই ডিসেম্বর ২০০৯ ’ দি মুসলিম পোস্ট পত্রিকায় এইভাবে শিরোনাম করা হয়, Media Silent as non-Muslim bomb makers pleads guilt। উক্ত রিপোর্ট অনুসারে Terence Gavan নামক বৃটিশ ন্যাশনালিষ্ট পার্টির জনৈক মেম্বার বোমা তৈরিসহ ২২ টি ঘটঁনায় অভিযুক্ত হয়। এর মাঝে ৬টি টেরোরিজম এ্যাক্টের অধীন ছিল। Woolwich Crown Court তাকে দোষী সাব্যস্ত করে রায় দেয়। অথচ বোমা সন্ত্রাসের মত ঘটনায় তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হলেও বৃটিশ মিডিয়া তা উপেক্ষা করে। কিন্তু শুধুমাত্র সন্দেহের তালিকায় থাকার কারণে অনেক মুসলমানের ছবি ফলাও করে ছাপা হয়। এধাধহ যদি মুসলমান হতো তাহলে প্রায় সকল পত্রিকাতেই সম্ভবত হেডলাইন করা হতো এভাবে ÒIslamic terrorist found guilty of possessibg bomb factory/Evil Muslim bomb maker admits guilty/Mastermind Muslim bomb expert Guilty ... বাংলাদেশে কিছু মিডিয়া আন্তর্জাতিক কতিপয় মিডিয়ার মতো জঙ্গি, টেরোরিস্ট, আল কায়েদা, তালেবানী রাষ্ট্র ইত্যাদি পরিভাষা একইভাবে ব্যবহার করে। ধর্মীয় সংখ্যা লঘুদের উপর নির্যাতনের কল্পিত কাহিণী প্রচার করে বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করতে চায়। প্রকৃত সত্য প্রকাশ না করে তারা ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলন সম্পর্কে তারা দেশে-বিদেশে নেতিবাচক ধারণা দিতে চায়। তারা ইসলামী আন্দোলনন ও তার নেতৃত্ব সম্পর্কে মনগড়া রিপোর্ট প্রচার করছে অথচ তাঁদের বক্তব্য, স্টেমেন্ট পত্রিকায় ছাপায়না। তারা আওয়ামী-ছাত্রলীগ কর্তৃক মন্দির ভাংগা হলেও জামায়াত-শিবেরর উপর তার দায় বর্তায় অথচ জামাত শিবিরের কর্মীরা বিভিন্ন জায়গায় যে মন্দির পাহারা দেয় তার সংবাদ ও ছবি ছাপায়না। অপরাধ সংক্রান্ত সংবাদ ব্কিৃত করে প্রচার করছে যার ফলে সত্যিকার অপরাধীরা আরও অপরাধ করতে উতসাহীত হয়। যেমন নারায়ণগঞ্জে ত্বকী হত্যার পর প্রথমেই জামায়াত-শিবিরের উপর দোষ চাপায়। অথচ ত্বকীর পিতা পরে স্পষ্ট করেই বলে দেয় যে, “এর সাথে জামাত শিবিরের কেউ সম্পৃক্ত নয়। আওয়ামী লীগের কতিপয় নেতাই জড়িত‘। আভ্যন্তরীন রাজনীেিত বিদেশেী হস্তক্ষেপের ক্ষেত্র তৈরি করে। কিছু পত্রিকায় বিদেশেী কয়েকজন রাষ্ট্রদুতের বক্তব্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী-ও বিরোধী দলের নেতার বক্তব্যের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়। কিছু মিডিয়াতে বাংলাদেশকে অকার্যকর জঙ্গি রাষ্ট্রে পরিণত করার প্রচারণা চালাতে দেখা যায়। এমনকি সংখ্যা গরিষ্ঠ মানুষের জীবন ধারা মুল্যবোধ কটাক্ষ করা হয়। দাঁড়ি টুপী ধারীদেরকে রেডিও টিভিতে নাটক উপন্যাসে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যাতে দর্শকের ঘৃণা জন্মে।

আন্তর্জাতিক মিডিয়া সাধারণত লোকাল মিডিয়াকে সোর্স হিসেবে ব্যবহার করে। এরফলে আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে নেতিবাচক প্রচারণা চলে যার ফলে প্রকারন্তরে বাংলাদেশের ইমেজ নষ্ট হচ্ছে। জাতি বিভক্ত হয়ে পড়ছে। অথচ দেশ গড়ার জন্য জাতীয় ঐক্য জরুরী। জঙ্গিবাদের উথ্যান হতে তা সহায়তা করছে। জনগনের মধ্যে দেশ সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি হচ্ছে অথচ বাংলাদেশ হচ্ছে অফুরন্ত সম্ভাবনার দেশ। আমাদের দেশের নদ-নদীতে মাছ আছে; বনে জংগলে কাঠ আছে। জমিতে হরেক রকমের ফসল ফলে। গ্যাস ও কয়লার খনি আছে। এই সকল প্রাকৃতিক সম্পদ কাজে লাগাবার জন্য আছে মানব সম্পদ। তাই মানব সমপদকে কাজে লাগানোর জন্য রাজনৈতিক স্থিতীশীলতার পাশাপাশি জাতীয় ঐক্য প্রয়োজন। মেধাবীদেরকে রাজনৈতিক দৃষ্টিভংগীতে না দেখে তাদেও মেধা দেশের উন্নয়নে কাজে লাগানো প্রয়োজন। পর্ণোগ্রাফী যুব চরিত্র নষ্ট করছে। অথচ যুবকরাই হচ্ছে দেশের কর্মক্ষম জনশক্তি।

মিডিয়াতে যারা কাজ করেন তাদের অনেকই বিশ্বাস ও চেতনায় ইসলাম বিদ্বেষী। ভিনদেশীদের এজেন্ট হিসেবে কেউ কেউ দায়িত্ব পালন করেন। এই জন্য তাঁরা মাসিক ভাতা পান। ব্যবসায়ী মিডিয়া মালিকরা নিজেদের স্বার্থের কারণে একজনের অপরাধ আরেকজনের উপর চাপিয়ে দিয়ে প্রকৃত ঘটনা ধামা চাপা দিতে চায়।

হতাশা বা সমালোচনা নয় প্রয়োজন বাস্তব উদ্যোগ ও সহযোগিতার : আফসোস হচ্ছে মুসলমানদের হাতে প্রচুর সম্পদ আছে। আলজাজিরা বাদ দিলে বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকার মত ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া নেই। দি টাইমস, দি গার্ডিয়ান, দি ইন্ডেপেন্ডেন্স এর মত আন্তর্জাতিক মানের কোনো পত্রিকা নেই। তাই মুসলমানেরা পাশ্চাত্যে মিডিয়ার আক্রমন ও অপপ্রচারের শিকার। কেননা অপপ্রচারের জবাব দেয়ার মত কোনো শক্তিশালী মাধ্যম মুসলমানদের হাতে নেই। এমতাবস্থায় মুসলিম তরূন সমাজের যাদের মিডিয়া স্টাডিজ পড়ার আগ্রহ আছে তাদেরকে মিডিয়া কর্মী হিসেবে ক্যারিয়ার গঠনের পরিকল্পনা নেয়া সময়ের অনিবার্য দাবি। রেডিও, টিভি ও পত্রপত্রিকায় কাজ করা মুসলিম তরূন সমাজের একটি অংশের ক্যারিয়ার ফিল্ড হওয়া উচিত। যারা সাংবাদিকতা পেশায় নিয়োজিত তাদের প্রশিক্ষন কর্মসুচী থাকা দরকার। এছাড়াও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদ সংস্থার প্রতিনিধি হওয়ার চেষ্টা করা যেতে পারে। নিজেদের সাধ্যমত অনলাইন পত্রিকা, ব্লগও ওয়েবসাইট চালু করা যায়। ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উদ্যোগ মিডিয়া হাউজ করা যেতে পারে। মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের সাথে যোগাযোগ ও সম্পর্ক বৃদ্ধি করে তাদের নানা লেখনীতে নিজেদের কিছু ইস্যু নিয়ে আসার চেষ্টা করা। সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট করে সাংবাদিকদের বৃত্তি ও চিকিতসা সেবা করা দরকার। গ্লোবাল মিডিয়া মনিটরিং টীম করা প্রয়োজন –তারা বিভিন্ন মিডিয়া মনিটরিং করবেন এবং অনলাইন আক্রাইভ রাখবেন। মিডিয়াতে স্পোকস পারসন হিসেবে বিভিন্ন ভাষায় পারদশী একটি গ্রুপ সৃষ্টি করতে হবে।

মিডিয়ার নাই নাই বলে হা হুতাশ করে যেমনি মিডিয়া অভাব পুরণ করা যাবেনা। তেমনিভাবে সফল মিডিয়া গড়ার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ খরচের মানসিকতা না থাকলে মিডিয়া প্রজেক্ট বাস্তবায়ন হবেনা। এই প্রসংগে অনেক দিন আগে শুনা একটি গল্প মনে পড়ছে। একজন লোক খাবার সহ কুকুরকে নিয়ে পথ চলছে। কিছু দুর যাওয়ার পর কুকুরটি ক্ষুধায় ছটফট কওে মারা যাওয়ার উপক্রম। লোকটি তা দেখে কাঁদছে। আরেকজন পথিক তার কান্নার কারণ জানতে চায়। তিিেন জবাবে বলেন, “ভাই আমার কুকুর ক্ষুধায় মারা যাচ্ছে তাই কাঁদছি”। লোকটি আবার জানতে চায় “তোমার সাথে এগুলো কি”? তিনি জবাব দেন “এগুলো খাবার”। পথিক তাকে বলে, “তোমার খাবার থেকে কিছু খাবার দিলেইতো কুকুরটির ক্ষুধা নিবারন হয়”। লোকটি জবাব দেয় “ভাই কাঁদতে পয়সা লাগেনা কিন্তু খাবার দিলেতো পয়সা খরচ হয়”। আমাদেরকে মিডিয়ার জন্য শুধু কাঁদলে হবেনা প্রূেয়াজনের আলোকে অর্থ খরচ করতে হবে।

বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও মিশনারী টাগেট নিয়ে কিছু মিডিয়া প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯০ সালের পর ব্যবসায়ীদের ইনভেস্টমেন্ট কিছু পত্রিকা ও স্যটেলাইট চ্যানেল চালু করা হয়। বিদেশী সাহায্যেও কিছু মিডিয়া প্রতিষ্ঠিত হয়। তাই তাদের অর্থের অভাব হয়না। কিন্তু যারা ইসলামী আদর্শে বিশ্বাসী তাদেরকে নিজের পকেটের টাকা খরচ করেই মিডিয়া করতে হবে। এই ক্ষেত্রে আল্লাহ পাক কিছু ব্যক্তিকে অর্থ উপর্জনের মেধা দিয়েছেন আর কিছু ব্যক্তিকে মিডিয়া কর্মী হওয়ার যোগ্যতা দান করেছেন। মিডিয়া কর্মীদের অনেকর কাছে অনকে সুন্দর পরিকল্পনা আছে কিন্তু উক্ত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ নাই। আর কিছু ব্যক্তির অর্থ আছে কিন্তু তাদের কাছে কোনো প্রজেক্ট নাই। যাদের অর্থ আছে তারা এমন জায়গায় ইনভেমস্ট করতে চান যেখান থেকে দ্রুত রিটার্ন আসবে। ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে তা সঠিক। কিন্তু মুসলিম কিছু ব্যবসায়ী ও সামর্থবান বিত্তশালীরা যদি মিডিয়া, রিসার্চ, থিঙ্ক ট্যাঙ্কসহ জ্ঞান গবেষনার কাজে বিনিয়োগ না করেন তাহলে তাদের অধিক মুনাফার জন্য বিনিয়োগকৃত অর্থ তাঁরা যে ভোগ করতে পারবেন তার কি কোনো নিশ্চিয়তা আছে? আমি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত অনেক ধনী ব্যক্তির কথা জানি যাঁরা দুনিয়ার মোড়লদের অনুমতি ছাড়া নিজের এ্যকাউন্ট থেকে নিজের খরচের জন্যও টাকা উত্তোলন করতে পারছেননা। তাই সময়ের অনিবার্য্য দাবি পুরণে ইলেক্ট্রনিক, প্রিন্টেড, অনলাইন ও সোশাল মিডিয়ায় কাংখিত ভূমিকা পালন করা জরুরী।

Monday, January 6, 2025

২০২৫ সেশনের জন্য ইসলামী ছাত্রশিবির ফেনী জেলা শাখার সেটআপ সম্পন্ন

২০২৫ সেশনের জন্য ইসলামী ছাত্রশিবির ফেনী জেলা শাখার সেটআপ সম্পন্ন

সভাপতি : আবু হানিফ হেলাল
সেক্রেটারি : ইমাম হোসেন আরমান

আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহর একান্ত মেহেরবানিতে ২০২৫ সেশনের জন্য বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির ফেনী জেলা শাখার সভাপতি ও সেক্রেটারি মনোনয়ন সম্পন্ন হয়েছে।

আজ ০৩ জানুয়ারী ২০২৫ বাদ জুমআ ফেনী দারুল ইসলাম মিলনায়তনে ছাত্রশিবির ফেনী জেলা শাখার সদস্যদের নিয়ে সদস্য সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সমাবেশে কেন্দ্রীয় আইন সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল নোমানের সঞ্চালনায় ও কেন্দ্রীয় ছাত্রআন্দোলন সম্পাদক আমিরুল ইসলামের পরিচালনায় নতুন সেশনের সেটআপ ঘোষনা করা হয়।

সমাপনী সেশনে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় ছাত্রআন্দোলন সম্পাদক আমিরুল ইসলাম সদস্যদের উদ্দেশ্যে দিক নির্দেশনামূলক বক্তব্য প্রদান করেন।

অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন নোয়াখালী শহর শাখার সভাপতি আবু সাঈদ সুমন, ফেনী শহর শাখার সভাপতি শরীফুল ইসলাম ও ছাত্রশিবির ফেনী জেলা শাখার সাবেক সভাপতিবৃন্দ।

বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামী কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাড. এসএম কামাল উদ্দিন, ফেনী জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি অ্যাড. জামাল উদ্দিন, ফেনী জেলা জামায়াতের প্রচার সেক্রেটারি আ.ন.ম আবদুর রহিম।

পরিশেষে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য ও ফেনী জেলা আমীর মুফতি আব্দুল হান্নান হুজুরের নসিহত ও মুনাজাত পরিচালনার মাধ্যমে প্রোগ্রামের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।

Sunday, December 8, 2024

বইনোট : ইসলামী রাষ্ট্র কিভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় (ইসলামী বিপ্লবের পথ) || সাইয়্যেদ আবুল আ'লা মওদুদী রহ.



এটি ১৯৪০ সনের বক্তৃতা, জামায়াতে ইসলামী তখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। 
[বইয়ের মুল নাম: ইসলামী হুকুমাত কিসতারাহ কায়েম হোতি হ্যাঁয়]

• ভূমিকা:
ইসলামী বিপ্লবের পথ বইটির মূল কথা হল 'ইসলামী রাষ্ট্র কিভাবে প্রতিষ্ঠা হবে' এই লক্ষ্যে বইটির লেখক মরহুম মাওলানা মওদুদী (র) ১৯৪০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভারতের আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্ট্রেচী হলে এ সম্পর্কে এক অনুপম বক্তব্য পেশ করেন। বক্তব্যের শিরোনাম ছিল '
ইসলামী হুকুমাত কিসতারাহ কায়েম হোতি হ্যাঁয়' এর অর্থ হল ইসলামী রাষ্ট্র কিভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

• মূল আলোচনা:
বইটির মূল আলোচনাকে ৮টি অংশে বিভক্ত করা হয়েছে। যথা.
১. ইসলামী রাষ্ট্র কিভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়
২. রাষ্ট্র ব্যবস্থার স্বাভাবিক বিবর্তন
৩. আদর্শিক রাষ্ট্র
৪. আল্লাহর সার্বভৌমত্ব এবং মানুষের প্রতিনিধিত্ব ভিত্তিক রাষ্ট্র।
৫. ইসলামী বিপ্লবেরপদ্ধতি বা পন্থা
৬. অবাস্তব কল্পনা বা ধারনা
৭. ইসলামী আন্দোলনের সঠিক কর্মপন্থা
৮. সংযোজন

 ইসলামী রাষ্ট্র কিভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়:
১. বর্তমানে ‘ইসলামী রাষ্ট্র’ নাম শিশুদের হাতের খেলনায় পরিণত হয়েছে।
২. যারা ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চান তারা এটা জানেন না কিভাবে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হয় এবং জানার চেষ্টাও করেন না।
৩. যারা ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায় তারা যে প্রস্তাব দেয় মোটর সাইকেলে যেমন আমেরিকায় পৌঁছানো সম্ভব নয় তেমনি তাদের প্রস্তাবে মূল লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

• রাষ্ট্র ব্যবস্থার স্বাভাবিক বিবর্তন:
“কৃত্রিম ও অস্বাভাবিক উপায়ে কোন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয় না।”
১. একজায়গা থেকে তৈরি করে এনে অন্য জায়গায় প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।
২. কোন একটি সমাজের মধ্যকার নৈতিক চরিত্র, চিন্তা-চেতনা, মন-মানসিকতা, সভ্যতা-সংস্কৃতি এবং ইতিহাস-ঐতিহ্যগত কার্যকারণের সমন্বিত কর্মপ্রক্রিয়ার ফলশ্রতিতে।
৩. সম্পূর্ণ স্বাভাবিক নিয়মে জন্মলাভ করে ইসলামী রাষ্ট্র।
৪. সামাজিক উদ্যম, উদ্দীপনা, ঝোঁক-প্রবণতা প্রভৃতি নিবিড় সম্পর্ক রাষ্ট্র গঠনের পূর্বশর্ত।
৫. প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নেতৃত্ব প্রয়োজন।
৬. সামাজিক কার্যক্রম ও পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।
৭. দীর্ঘ প্রানান্তকর চেষ্টা (যেমন বীজ হতে ফল)।

• আদর্শিক রাষ্ট্র:
১. ইসলামী রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য

(i) ইসলামী রাষ্ট্র একটি আদর্শিক রাষ্ট্র।
(ii) সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের প্রভাবমুক্ত।

২. ফরাসী বিপ্লবের আদর্শিক রাষ্ট্রের ক্ষীণ রশ্মি দেখা গেলেও জাতীয়তাবাদের প্রভাবে চাপা পড়ে তা বিলুপ্ত হয়। 
(i) রাশিয়ার কম্যুনিজম ও সমাজতন্ত্রের মৌলিক নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত হলেও অতিসত্ত্বর তা আদর্শচ্যুত হয়। 
(ii) মুসলিম দেশের কতৃত্বশীল লোকেরা জাতীয়তাবাদের আখড়ায় পড়ে ইসলামী ভাবধারা ও আদর্শভিত্তিক রাষ্ট্রের ধারণা হারিয়ে ফেলেছে। 

৩. আদর্শ রাষ্ট্র বাস্তবায়নের প্রয়োজন:
ক) ভিত্তি স্থাপন হতে চূড়ান্ত পর্যায় পর্যন্তপ্রায় অস্তিত্ব রক্ষা করা। উত্তরোত্তর শক্তি বৃদ্ধি করা।
খ) জাতীয়তাবাদী চিন্তা-পদ্ধতি সংগঠন প্রণালী পরিহার করা।

৪. আদর্শভিত্তিক রাষ্ট্রের লক্ষ্যে:
ক) জাতি-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সকলের কাছে এর আদর্শ পেশ করা। 
খ) সেই আদর্শ অনুযায়ী সমাজ এবং রাষ্ট্র গঠন করে কল্যাণ সাধন।

• আল্লাহর সার্বভৌমত্ব এবং মানুষের প্রতিনিধিত্ব ভিত্তিক রাষ্ট্র:
(ক) ইহার বৈশিষ্ট্যঃ
১. ইসলামী রাষ্ট্রের মূল বুনিয়াদ
২. নিখিল বিশ্ব জগৎ আল্লাহতাআলার রাজ্য। তিনি ইহার প্রভূ, শাসক ও বিধানদাতা।
৩. মানুষ এই দুনিয়ায় আল্লাহরপ্রতিনিধি।
৪. খেলাফতের এই দায়িত্বের জন্য প্রত্যেককেই আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।

(খ) ইসলামী রাষ্ট্রের স্বরূপঃ
১. এটা ধর্মহীন রাষ্ট্র হতে সম্পূর্ণ আলাদা।
২. এটা পরিচালনার জন্য এক বিশেষ মনোবৃত্তি বিশেষ প্রকৃতি এবং বিশেষ ধরনের নির্ধারন আবশ্যক।
৩. ধর্মহীন রাষ্ট্রের জজ ও প্রধান বিচার প্রতি ইসলামী রাষ্ট্রের কেরানী হওয়ার যোগ্যতা রাখে না।
৪. ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিটি বিভাগের জন্য খোদাভীতি, নিজ কর্তব্য পালন ও সেজন্য আল্লাহরকাছে জবাব দিহির তীব্র অনুভূতি ও উন্নত চরিত্রের অধিকারী লোকের প্রয়োজন।

(গ) ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনা কারীদের বৈশিষ্ট্যঃ
• পৃথিবীর বিপুল পরিমান সম্পত্তি হস্তগত থাকলেও তারা তার পূর্ন আমানতদার।
• রাজশক্তি করায়ত্ত হলেও সুখ নিদ্রা ত্যাগ করে জনস্বার্থে রক্ষণাবেক্ষণ।
• যুদ্ধে বিজয়ী দেশে হিংসাত্মক কাজে লিপ্ত না হয়ে তাদের ইজ্জত আব্রর হেফাজতকারী।
• নিজেদের স্বার্থকে ধুলিস্যাৎ করে অপরের স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়া।
• আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তারা এমন মর্যাদার অধিকারী হবে যে, তাদের সততা, সত্যবাদীতা, ন্যায়পরয়নতা, নৈতিক ও চারিত্রিক, মূল নীতির অনুসরণ এবং প্রতিশ্রুতিও চুক্তি পালনের ব্যাপারে গোটা বিশ্ব তাদের উপর আস্থাশীল হবে।

• ইসলামী বিপ্লবের পদ্ধতি বা পন্থা:
১. ইসলামী রাষ্ট্রের অলৌকিক আবির্ভাব ঘটনা
• ইসলামী জীবন দর্শন চরিত্র ও প্রকৃতির বিশেষ মাপকাঠি অনুযায়ী গঠিত ব্যাপক আন্দোলন সৃষ্টি করা। নেতা ও কর্মীদের এই বিশিষ্ট আদর্শে আত্মগঠন করা।
• সমাজ জীবনে অনুরূপ মনোবৃত্ত ও নৈতিক উদ্দীপনা জাগ্রত করা।
• ইসলামী আদর্শে নাগরিকদের গড়ে তুলতে একটি অভিনব শিক্ষা পদ্ধতি চালু করা।
• জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রত্যেকটি শাখায় ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে চিন্তা ও কাজ করতে সক্ষম এমন লোক গড়ে তোলা।
• ইসলামী আদর্শের চিন্তা-চেতনা ও কর্ম জীবনের একটি পরিপূর্ণ পরিকল্পনা প্রণয়ন।
• ইসলামী আন্দোলন চতুপার্শ্বে যাবতীয় অবাঞ্চিত জীবন-ধারার বিরূদ্ধে প্রকাশ্যে সংগ্রাম করবে।

২. ইহাতে নিম্নোক্ত ফল পাওয়া যাবে:
• পরীক্ষার অগ্নিদহনে উত্তীর্ণ ত্যাগী লোক তৈরি হবে।
• এ আন্দোলনে এমনসব লোক পর্যায়ক্রমে যোগদান করবে যাদের প্রকৃতিতে সত্য-ন্যায়ের উপাদান অন্তর্নিহিত রয়েছে।
• সর্বশেষে কাঙ্খিত রাষ্ট্র ব্যবস্থার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে।

৩. যে কোন ধরনের বিপ্লব সৃষ্টি করার জন্য প্রয়োজন:
• একটি বিশেষ ধরনের আন্দোলন।
• বিশেষ ধরনের সামাজিক চেতনা সম্পন্ন নৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ সৃাষ্ট। উদাহরণ, রুশ বিপব, জার্মানির সমাজতন্ত্রের বিপব।

• অবাস্তবকল্পনা বা ধারনা:
১. কিছু লোকের ধারণা মুসলিম জাতিকে একটি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অধীনে একই পাটফর্মে সংগঠিত ও পরিচালিত করতে পারলেই ইসলামী রাষ্ট্র আপনা আপনিই প্রতিষ্ঠিত হবে। 
২. মুসলমানদের বর্তমান নৈতিক ও ধর্মীয় অবস্থার স্বরূপ যেমন- চরিত্রগত দিক থেকে দুনিয়ার মুসলিম ও অমুসলিম জাতিগুলোর সবগুলোর অবস্থা প্রায় একই। উদাহরণঃ আদালতে মিথ্যা সাক্ষী দেওয়া, ব্যবসা-বাণিজ্যে দুর্নীতি, রোজার দিনে একই সাথে খাওয়া, সুদ, ঘুষ, জেনা ইত্যাদির সাথে লিপ্ত হওয়া।

• ইসলামী আন্দোলনের সঠিক কর্মপন্থা:
হযরত মুহাম্মদ (সা) এর কর্মপন্থাই হচ্ছে ইসলামী আন্দোলনের সঠিক কর্মপন্থা। তার অনুসৃত বিশিষ্ট কর্মপন্থাগুলো নিম্নরূপ:

১. ইসলাম হলো সেই আন্দোলনের নাম যা মানব জীবনের গোটা ইমারত নির্মান করতে চায় এক আলাহর সার্বভৌমত্বের দৃষ্টিভঙ্গির উপর।
২. ইসলামী আন্দোলনের লক্ষ্য কোন ইস্যুকে কেন্দ্র করে নয়।
৩. মূল লক্ষ্য আলাহর একত্ব ও সার্বভৌমত্বের দাওয়াত দেওয়া।

• ইসলামী আন্দোলনের সঠিক কর্মনীতির চারটি দিক রয়েছেঃ
ক) আলাহর সার্বভৌমত্ব মেনে নেওয়ার আহবান।
খ) অগ্নী পরীক্ষায় নিখাঁদ প্রমানিত হওয়া।
গ) নেতা ছিলেন আদর্শের মডেল।
ঘ) আদর্শের কার্যকর স্বাভাবিক বিপব।

ক) আল্লাহর সার্বভৌমত্ব মেনে নেওয়ার আহবান:
১. বুদ্ধিমান ও বাস্তববাদী হয়ে থাকা তবে বুদ্ধিমত্তা ও বাস্তববাদীতার দাবী হলো সেই মহান সম্রাটের হুকুমের সম্মুখে মাথা নত করে দাও তার একান্ত আনুগত্য দাস হয়ে যাও।
২. গোটা জাতির একজনই সম্রাট মালিক এবং সার্বভৌম কর্তা রয়েছেন। অন্য কারো কতৃত্ব করার কোন অধিকার নাই।
৩. আলাহ ছাড়া আমি সকলের বিরূদ্ধে বিদ্রোহী এবং যারা আলাহকে মানে তারা ব্যতিত] ৪. এই ঘোষণা উচ্চারণ করার সাথে সাথে বিশ্ববাসী আপনার শত্রুহবে এবং চতুর্দিক থেকে সাপ, বিচ্ছু আর হিংস্র পশুরা আপনাকে নির্মমভাবে আক্রমণ করছে।

খ) অগ্নি পরীক্ষায় নিখাঁদ প্রমাণিত হওয়াঃ
১. লা ইলাহা ইলালাহ এই ঘোষণা হওয়ার সাথে সাথে পোপ (খৃস্টান) ঠাঁকুরদের সকল শক্তি ঐক্যবদ্ধ হলো এগুলো গঠন করে হলো ঐক্যজোট।
২. তাদের উপর নেমে আসে কঠিন অত্যাচার এবং এর ফলেই ইসলামী আন্দোলন মজবুত হয় এবং ক্রমবিকাশ ও প্রসার লাভ করে।
৩. এর ফলেই সমাজের মনি-মুক্তাগুলো আন্দোলনে শরিক হয়।
৪. একদিকে এই বিপ্লবী কাফেলায় যারা শরিক হচ্ছিল বাস্তবে ময়দানে তাদের হতে থাকে যথার্থ প্রশিক্ষণ।
৫. কিছু লোক দিনের পর দিন মার খাচ্ছে এ দেখে কিছু মানুষ উৎসাহী হয় এরা কি কারণে মার খাচ্ছে।

গ) নেতা ছিলেন আদর্শের মডেলঃ
১. বর্তমান ইসলামী আন্দোলনের নেতা কর্মীদের সেই মহান নেতার নেতৃত্ব আদর্শ, সহানুভূতি এবং সার্বিকভাবে তার মডেলকে অনুসরণ করা একান্ত দরকার।
২. এই নেতার স্ত্রী ছিলেন বিপুল ঐশ্বর্যের মালিক।
৩. কালিমার দাওয়াত কবুল ও মানুষকে এ দাওয়াত দেওয়ার সাথে সাথে তাদের সম্পদ শেষ হয়ে যায়।
৪. নেতা ছিলেন অত্যন্ত ধৈর্যশীল ও সহনশীল।
৫. সমকালীন সময়ে তাকে ইসলামী আন্দোলনের কাজ না করার প্রতিফল হিসাবে আরব জাহানের বাদশাহী এবং আরবের শ্রেষ্ঠ সুন্দরী নারী দিতে চেয়ে ছিল। কিন্তু তিনি তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করেন এবং তিরস্কার আর প্রস্তাব্যগত সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করেন।
৬. অত্যন্ত গরমের সময় মরুভূমির মধ্য দিয়ে পায়ে হেঁটে দ্বীনের দাওয়াত দিতেন সাথীদের সাথে নিয়ে।
৭. হাশেমী গোত্রের লোকেরা এই আন্দোলনের প্রতি অনীহা ছিল।

ঘ) আদর্শের কার্যকর স্বাভাবিক বিপ্লব:
ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য একদল লোককে সম্পূর্ণভাবে তৈরি করা হয়েছিল যারা ইসলামের পূর্ণ প্রশিক্ষণ পেয়ে এতটা যোগ্য হয়েছিল যে তারা যেকোন অবস্থা ও পরিস্থিতিতে মুসলমান হিসেবে দায়িত্ব পালনে সক্ষম ছিল। উদাহরণ, মদীনায় একটি ইসলামী রাষ্ট্র।

একথা সত্য যে, একাজের জন্য প্রযোজন ঈমান, ইসলামীক চেতনা, ঐকান্তিক নিষ্ঠা, মজবুত ইচ্ছাশক্তি এবং ব্যক্তিগত আবেগ, উচ্ছাস ও স্বার্থের নিঃশর্ত কুরবাণী। 

 

একাজের জন্য এমন একদল দুঃসাহসী যুবকের প্রয়োজন যারা সত্যের প্রতি ঈমান এনে তার উপর পাহাড়ের মত অটল হয়ে থাকবে। অন্যকোন দিকে তাদের দৃষ্টি নিবন্ধ হবে না। পৃথিবীতে যা-ই ঘটুকনা কেন, তারা নিজেদের লক্ষ্য- উদ্দেশ্যের পথ থেকে এক ইঞ্চিও বিচ্যুত হবে না।

Tuesday, December 3, 2024

বইনোট : একটি আদর্শবাদী দলের পতনের কারণ ও তার থেকে বাঁচার উপায় || মরহুম আব্বাস আলী খান রহ.



লেখক পরিচিতি || মরহুম আব্বাস আলী খান রহ.

•জন্মঃ ১৩২১ সালের ফাল্গুন মাসের শেষ সপ্তাহে।
•স্থানঃ জয়পুরহাট।
•পড়ালেখাঃ প্রথমে নিজ ঘরে কোরআনের ছবক নেন। ১৯২১ সালে ২য় শ্রেনিতে ভতি হন। ৬ষ্ঠ শ্রেনির পর হুগলী মাদ্রাসায় পড়তে যান। রাজশাহী ও কারমাইকেল কলেজে পড়েন। ১৯৩৫ সালে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ডিস্টিংশনসহ বি.এ. পাশ করেন।
•স্কলারশীপঃ ৬ষ্ঠ শ্রেনিতে ১ বছরের গভর্নমেন্ট বৃত্তি ও চারবার মেয়াদী বৃত্তি লাভ করেন।

•কর্মজীবনঃ ১৯৩৫ সালে তিনি চাকুরী গ্রহণ করেন। কিন্তু নামাযে বাধা দেয়ায় চাকুরীতে ইস্তফা দেন। ১৯৩৬ সালে বেঙ্গল সেক্রেটারিয়েট যোগ দেন এবং শেরে বাংলার সেক্রেটারি হন। দেশ বিভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানের সার্কেল অফিসার হন। ১৯৫২ সালে জয়পুরহাট স্কুলের প্রধান শিক্ষক হন।

•রাজনীতি ও আন্দোলনঃ
১৯৫৫ সালে তিনি মুত্তাফিক ফরম পূরন করেন।
১৯৫৬ সালে জামায়াতের রুকন হন।
১৯৫৭ সালে রাজশাহী বিভাগীয় আমীর হন।
১৯৭৯ সালে থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সিনিয়র নায়েবে আমীর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭৯ থেকে ৯২ পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত আমীরের দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭৯ থেকে ৯২ পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত আমীরের দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৬২ সালে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য হন। আইয়ুব খানের মুসলিম পারিবারিক আইন বাতিলের জন্য আন্দোলন করেন।
১৯৭১ সালের মন্ত্রী পরিষদের শিক্ষামন্ত্রী হন।
১৯৮০ সালের ৭ ডিসেম্বর ইসলামী বিপ্লবের ৭ দফা গণদাবী ঘোষণা করেন।

ষাটের দশকের পাকিস্তান ডেমোক্রেটিভ মুভমেন্টের অন্যতম নেতা ছিলেন। গণ আন্দোলন কর্মসূচী ও কেয়ারটেকার সরকারের জন্য আন্দোলন করেন।
১৯৭৯ সালে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর যান।
১৯৮৪ সালে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে আমন্ত্রিত হয়ে বৃটেন যান।

•সাহিত্য চর্চাঃ অনুবাদ ও মৌলিক রচনা ৩৫টি। মৌলিক গ্রন্থ মধ্যে উল্লেখযোগ্যঃ

১. বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস
২. সমাজতন্ত্র ও শ্রমিক
৩. মুসলিম উম্মাহ
৪. ইসলামী আন্দোলন ও তার দাবী এবং অনূদিত গ্রন্থের মধ্যে অন্যতম
৫. সুদ ও আধুনিক ব্যাংকিং
৬. জাতীয় ঐক্য ও গণতন্ত্রের ভিত্তি
৭. ইসলামী অর্থনীতি উল্লেখযোগ্য
৮. পর্দা ও ইসলাম

ইন্তেকালঃ ৩ অক্টোবর ১৯৯৯ সালে ১:২৫ মিনিটে ইন্তেকাল করেন।


১. যে আদর্শের হাতে রাষ্ট্র ব্যবস্থার ক্ষমতা নেই জগতের কোথাও তার জন্য একটুও স্থান নেই। বিজয়ী সভ্যতার সমূহ কর্ম জগত থেকে দূরে সরে পরে। তার ব্যাপারে দুর দৃষ্টি ভঙ্গির অধিকারী ব্যক্তিদের মনেও এ পদ্ধতি দুনিয়ায় চলতে পারে কিনা সে ব্যাপারে সন্দেহ জাগে।

২. কাজেই হুকুমতে এলাহিয়া কায়েম করে খোদার তরফ থেকে নবীগন যে ব্যবস্থা নিয়ে এসে ছিলেন তাকে পুরোপুরি বাস্তবায়ন করাই ছিল নবীদের মিশনের চূড়ান্ত লক্ষ্য।

৩. জাহেলিয়াত পন্থিদের তারা এতটুকু অধিকার দিতে প্রস্তুত ছিলেন যে, ইচ্ছা করলে তারা জাহেলি আকিদা বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারে। কিন্তু কর্তৃত্বের চাবিকাঠি তাদের হাতে তুলে দেয়া যাবে না।

৪. এ জন্যই প্রত্যেক নবী রাজনৈতিক বিপ্লব সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন।

নবীদের কাজঃ
১. সাধারণ মানুষের মাঝে চিন্তার বিপ্লব সৃষ্টি করা।
২. নির্ভেজাল ইসলামী শিক্ষায় প্রভাবিত একটি শক্তিশালী দল গঠন।
৩. ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েম করে তমুদ্দুনের সমস্ত বিভাগকে নির্ভেজাল ইসলামের ভিত্তিতে পুনর্গঠিত করা।

খেলাফতে রাশেদাঃ
১. হযরত মুহাম্মদ (সঃ) তেইশ বছর নবুয়াতী জিন্দেগীতে যে সমস্ত কাজ পূর্ণরূপে সম্পাদন করেন।
২. আবু বকর সিদ্দিক (রা.) ও ওমর ফারুক (রা.) এর নেতৃত্ব।
৩. উসমান (রা.) এর শাসনামলের ১ম দিককার সময়।


১। একটি আদর্শবাদী দলের পরিচয়:

উত্তর: প্রতিষ্ঠিত সমাজ ব্যবস্থা সমুলে উৎপাটিত করে তার স্থলে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করতে হলে একটি আদর্শ বেছে নিতে হয়। এর সাথে পৃথক চিন্তাধারাও থাকে। এ চিন্তা ও আদর্শের সাথে যারা সকল দিক দিয়ে একমত পোষণ করে তারা একটি দল গঠন করে। একে বলা হয় আদর্শবাদী দল।

২। আদর্শবাদী দলের পতনের কারণ বইয়ে উন্মাদ ও দেওয়ানা বলতে কি বোঝানো হয়েছে?

উন্মাদ: ময়দান নিশ্চিত হাতছাড়া হয়ে গেছে। এ অবস্থায় ময়দানে নেমে পড়া আর জেনে শুনে আগুনে ঝাঁপ দেয়া সমান। উম্মাদেরাই শুধু এটা সম্ভব করতে পারে।

দেওয়ানা: দুর্দান্ত কুফরী শক্তির কর্তৃত্ব দেখার পরও যে ব্যক্তি দারুল ইসলাম কায়েমের জন্য ময়দানে নেমে পড়বে সে অবশ্যই দেওয়ানী।


৩। একটি আদর্শবাদী দলের পতনের কারণ:

১. দলের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হিসেবে গ্রহণ না করা।
২. কুরআন হাদীস ও ইসলামী সাহিত্য অধ্যয়ন না করা।
৩. সময় ও আর্থিক কোরবানীর প্রতি অবহেলা করা।
৪. দলীয় মূলনীতি মেনে না চলা।
৫. ইনসাফ প্রতিষ্ঠা না করা।
৬. ভ্রাতৃত্ববোধের অভাব।
৭. জনশক্তির মধ্যেনৈরাশ্য ও হতাশা সৃষ্টি হওয়া।
৮. নেতৃত্বের অভিলাষ।
৯. অর্থ - সম্পদের প্রতি লালসা।
১০. জীবনমান উন্নত করার প্রবণতা।
১১. সহজ সরল জীবন যাপন না করা।
১২. মৌলিক বিষয়ে ঐক্যমত পোষন করতে না পারা।
১৩. নেতৃত্বের দুর্বলতা
১৪. নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থা আন্দোলনের পতন ডেকে আনে।
১৫. বায়তুলমাল সম্পর্কে আমানতদারীর অভাব এবং আর্থিক লেনদেনে সততার অভাব।
১৬. সহজ সরল জীবনযাপন না করা।


৪। তার থেকে বাচাঁর উপায়:

১. নামাযের মাধ্যমে আল্লাহর সাথে গভীর সম্পর্ক স্থাপন করা।
২. অতিরিক্ত যিকির আযকার করা
৩. আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন
৪. আত্মসমালোচনা করা
৫. ক্রোধ দমন করা
৬. মৌলিক বিষয়ে ঐক্যমত পোষন করা।
৭. বিরোধী পরিবেশ পরিস্থিতি দ্বারা প্রভাবিত না হওয়া।
৮. ত্যাগ ও কোরবানী করা
৯. সমস্যার ত্বরিত ও সঠিক সমাধান না করা।

৫। পারস্পরিক সম্পর্ক বিনষ্ঠ হওয়ার কারন:

১. পারস্পরিক হিংসা বিদ্বেষ।
২. গীবত, পরনিন্দা, পরচর্চা।
৩. পরশ্রীকাতরতা।
৪. একে অন্যকে সন্দেহের চোখে দেখা।
৫. কারো বিপদে আপদে তার খোঁজ খবর না নেয়া।
৬. পরস্পরবৈষয়িক স্বার্থে ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত হওয়া।
৭. অযথা কারো প্রতি কু-ধারনা পোষণকরা।
৮. এসব কারণে শুধু একটি দলই নয়, বরং মুসলিম জাতিসত্তার ভিত্তি ও ন্নড়ে হয়ে পড়ে।

৬। দারুল ইসলাম ট্রাষ্ট গঠনের পটভূমি:-

১৯৩৭ সালে আল্লামা ইকবাল হায়দ্রাবাদ থেকে পাঞ্জাবে হিজরত করার জন্য মাওলানা মওদূদীকে আহ্বান জানান। আল্লামা ইকবাল তরজুমানুল কোরআনের মাধ্যমে মাওলানার গুনমুগ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। অসুস্থতা ও শারীরিক দুর্বলতার কারণে তিনি কখনো সাইয়্যেদ নাযির নিয়াযী এবং কখনো মিয়া মুহাম্মদ শফিকে দিয়ে তরজমানুল কোরআন পড়াতেন এবং মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। ঠিক এই সময়ে জনৈক অবসরপ্রাপ্ত এস.ডিও চৌধুরী নিয়ায আলী তার ৬০/৭০ একর জমি ইসলামের খেদমতের জন্য ওয়াক্ত করেছিলেন। সেখানে বিভিন্ন ধরনের পাকা ঘর বাড়ি তৈরি করে বিশেষ পরিকল্পনার অধীনে দ্বীনের বৃহত্তর খেদমতের অভিলাষী ছিলেন। এ ব্যপারে তিনি আল্লামা ইকবালের পরামর্শ চাইলে তিনি একমাত্র মাওলানা মওদূদীকে এ কাজের জন্য যথাযোগ্য ব্যক্তি মনে করেন। মাওলানা মওদূদী ড. ইকবালের অনুরোধে তার সাথে বিস্তারিত আলোচনার পর এ কাজের দায়িত্ব গ্রহন করতে রাজি হন এবং চিরদিনের জন্য হায়দ্রাবাদ পরিত্যাগ করে ১৯৩৮ সালের ১৬ মার্চ পূর্ব পাঞ্জাবের পাঠানকোর্ট নামক স্থানে হিজরত করেন। অতপর দারুল ইসলাম নামে একটা ট্রাষ্ট গঠন করে তার মহান কাজের সূচনা করেন।

Tuesday, October 29, 2024

আধুনিক সভ্যতার সূতিকাগার || আবুল আসাদ || একুশ শতকের এজেন্ডা


সেই ষাটের দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির ক্লাসে প্রথম শুনি যে, ধর্ম-জ্ঞান, গবেষণা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিরোধী। তারপর এই কথা নানাভাবে আরও অনেকের কাছে শুনেছি। লেখা-পড়া যাদের মূর্খ বানিয়েছে, তারা এখনও এসব কথা বলে থাকেন সুযোগ পেলেই। এদের রাগ ইসলামের উপরই বেশি। খ্রিস্টান ধর্ম প্রধানত পাশ্চাত্যের এবং হিন্দুধর্ম ভারতের, তাই এসব ধর্ম ওদের কাছে প্রগতিশীল। কিন্তু মুসলিম দেশগুলো অনুন্নত ও দরিদ্র বলে ইসলামকেও ওরা জ্ঞান-বিজ্ঞান বিমুখ ও অনুন্নয়নের প্রতীক বলে চলছে। অথচ ইসলাম সবচেয়ে বিজ্ঞানমুখী ও সবচেয়ে প্রগতিশীল ধর্ম। ইতিহাসের সাক্ষ্যও এটাই। Prof. Joseph Hell বলেন, "মানব জাতির ইতিহাসে স্বীয় ছাপ মুদ্রিত করা সব ধর্মেরই প্রধান বৈশিষ্ট্য। কিন্তু ইসলাম যতটা দ্রুতবেগে ও অকপটভাবে বিশ্ব মানবের হৃদয় স্পর্শকারী মহা পরিবর্তন সাধন করেছে, জগতের অন্যকোন ধর্ম তা পারেনি।" এই কথাই আরও স্পষ্ট করে বলেছেন ঐতিহাসিক O. J. Thatcher Ph. D এবং F. Schwill Ph. D তাদের ইতিহাস গ্রন্থে, "পয়গম্বর মোহাম্মদের মৃত্যুর পর পাঁচশ' বছর তার অনুগামিরা এমন এক সভ্যতার পত্তন ঘটায় যা ইউরোপের সবকিছু থেকে বহুগুণ অগ্রগামী।" আর Meyrs তার Mediaeval and Modern History' তে বলেন, "সেখানে এমন এক সভ্যতার উত্থান ঘটে, দুনিয়া যা দেখেছে এমন সবকিছুকেই তা অতিক্রম করে যায়।"


সত্যই ইসলামের উত্থানের সাথে সাথে জ্ঞান-বিজ্ঞানের জগতে এবং সভ্যতার গতিধারায় এক বিস্ময়কর পরিবর্তন সূচিত হয়। ইউরোপ যখন অজ্ঞতা, অশিক্ষা, কুসংস্কার ও স্বৈরাচারের গভীর ঘুমে অচেতন তখন এশিয়া-আফ্রিকায় ইসলামের আলোকধারা জ্ঞান ও সভ্যতামণ্ডিত নতুন এক বিশ্বের জন্ম দেয়। মানবাধিকার, গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক সুবিচার ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নয়ন সবদিক থেকেই মানব জাতিকে ইসলাম এক অন্যান্য সভ্যতা দান করে।

পাশ্চাত্যের ওরা এখন গণতন্ত্র ও গণতন্ত্রের সাংঘাতিক প্রবক্তা সেজেছেন। আর ইসলামকে বলা হচ্ছে মানবতা বিরোধী, অসহিষ্ণু ইত্যাদি। এসব কথা বলার সময় তারা অতিতের দিকে তাকায় না এবং নিজের চেহারার উপর একবারও নজর ফেলেনা। যে গ্রীক ও রোমান সভ্যতা আজকের পাশ্চাত্য সভ্যতার দার্শনিক ভিত্তি, সে সভ্যতায় গণতন্ত্রতো দূরের কথা কোনপ্রকার সহিষ্ণুতা ও সহাবস্থানের কোন স্থান নেই। আভ্যন্তরীণভাবে তাদের নীতি ছিল 'সারভাইভেল অব দা ফিটেস্ট/ এবং আন্তর্জাতিকভাবে তারা অনুসারী ছিল 'মাইট ইজ রাইট'। গ্রীকরা বলতো 'যারা গ্রীক নয় তারা গ্রীকদের কৃতদাস হবে এটা প্রকৃতির ইচ্ছা।' আর রোমানরা মনে করতো, তারাই পৃথিবীর মালিক, পৃথিবীর সব সম্পদ তাদের জন্যই। ইউরোপের এই অন্ধকার যুগে মানবাধিকার বলতে কোন ধারণার অস্তিত্ব ছিল না। পরাজিত ও ভাগ্যাহতদের নিহত হওয়া অথবা চিরতরে দাসত্বের নিগড়ে বন্দী হওয়াই ছিল ভবিতব্য। নারীদের অর্থনৈতিক ও অন্যবিধ অধিকার থাকা দূরের কথা তারা পূর্ণ মানুষ কিনা তা নিয়েই ছিল বিতর্ক। শত্রু ও বাদী জাতীয় লোকদের কোন মানবিক অধিকার স্বীকৃত ছিলনা।

এই দুঃসহ অন্ধকারের হাত থেকে ইসলাম মানুষকে মুক্ত করে, পৃথিবীকে নিয়ে আসে আইনী শাসনের আলোকে। চৌদ্দশ' বছর আগে ইসলাম ঘোষণা করে, বংশ, বর্ণ, জাতি, দেশ নির্বিশেষে সব মানুষ সমান। এই নীতি হিসেবে ইসলাম সব মানুষকেই আইনের অধীনে নিয়ে এসেছে এবং মানুষকে রক্ষা করেছে যথেচ্ছচার থেকে। শত্রু ও পরাজিত বন্দীদেরকেও ইসলাম মানুষ হিসাবে দেখতে বলে। কোন যুদ্ধবন্দীকে হত্যা করা ইসলাম নিষিদ্ধ করেছে এবং তাদের স্থানে মানবসুলভ, মেহমানসুলভ ব্যবহার করতে বলেছে। নির্দেশ দেয়া হয়েছে বন্দীদের সুখাদ্য দিতে হবে, বন্দীদের উত্তাপ ও শৈত্য থেকে রক্ষা করতে হবে, কোন কষ্ট অনুভব করলে দ্রুত তা দূর করতে হবে, বন্দীদের মধ্যে কোন মাতাকে তার সন্তান থেকে, কোন আত্মীয়কে অন্য আত্মীয় থেকে আলাদা করা যাবে না। বন্দীদের মান-মর্যাদা রক্ষাসহ তাদের কাছ থেকে জবরদস্তী কোন কাজ নেয়া যাবে না। যুদ্ধবন্দী সংক্রান্ত এ নীতিমালা ইসলাম দেয় চৌদ্দশ' বছর আগে, পাশ্চাত্য এই শিক্ষা, আংশিকভাবে, গ্রহণ করে মাত্র ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের এক প্রস্তাব আকারে। ইসলাম চৌদ্দশ' বছর আগে বিধান দেয় যে, চিকিৎসা পুরাপুরি মানবীয় সেবা। চিকিৎসক ও সেবাদানকারীদের কোন অনিষ্ট করা যাবে না। ইসলামের এই শিক্ষা গ্রহণ করেই পাশ্চাত্য মাত্র ১৮৬৪ সালে রেডক্রস গঠনের মাধ্যমে চিকিৎসা সুযোগকে শত্রু-মিত্র বিবেচনার উর্ধ্বে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে। মানবতা বিরোধী দাস প্রথা বিলোপের ব্যবস্থা করে ইসলাম চৌদ্দশ' বছর আগে। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দাস প্রথা বিলুপ্ত হয় ১৮৬৩ সালে। ইসলামে পুরুষের মতই নারী শিক্ষা বাধ্যতামূলক ইসলামের এই শিক্ষার পরও ১১শ' বছর পর্যন্ত পাশ্চাত্য নারীদের শিক্ষার উপযুক্ত ভাবেনি। অবশেষে ১৮৩৫ সালে মার্কিন মেয়েরা প্রথম স্কুলে যাবার সুযোগ পায়। আর নিজ নামে সম্পত্তি ভোগের অধিকার পায় ১৮৪৮ সালে। অথচ ইসলাম নারীদের এ অধিকার দেয় চৌদ্দশ' বছর আগে। পাশ্চাত্য যেখানে ১৯৪৮ সালের জেনেভা কনভেনশনের আগ পর্যন্ত বিজিত দেশের মানুষকে দাস মনে করতো এবং এখনও লুটতরাজের যোগ্য মনে করে, সেখানে ইসলাম বিজিত দেশের মানুষকে সম্মানিত নাগরিক হিসেবে দেখে। খিলাফতে রাশেদার যুগে কোন নতুন ভূখণ্ড মুসলমানদের দখলে এলে সেখানকার মানুষকে আর শত্রুর দৃষ্টিতে দেখা হতোনা। মুক্ত মানুষ হিসাবে তাদের এ অধিকার দেয়া হতো যে, তারা একবছর সময়কালের মধ্যে যেন সিদ্ধান্ত নেয় যে, তারা পছন্দের কোন দেশে চলে যাবে, না মুসলিম দেশের নাগরিক হিসাবে বসবাস করবে।

মানবতাকে ইসলাম সম্মান করে বলেই ইসলাম ও মুসলমানরা সহিষ্ণুতার প্রতীক। একটা উদাহরণ এখানে যথেষ্ট। ক্রুসেডের যুদ্ধে খ্রিস্টানরা যখন মুসলমানদের হাত থেকে জেরুজালেম দখল করে, তখন তারা ৭০ হাজার নাগরিককে হত্যা করে। আর মুসলমানরা যখন খ্রিস্টানদের হাত থেকে জেরুজালেম উদ্ধার করে, তখন একজন খ্রিস্টানের গায়েও হাত দেয়া হয়নি। চৌদ্দশ' বছর ইসলাম যে বিচার ব্যবস্থা পত্তন করে, বিশ্ব সভ্যতায় তা অন্যান্য সংযোজন। ইসলামের বিচার ব্যবস্থায় মানুষে মানুষে কোন পার্থক্য করা হয়নি। শুরু থেকেই ইসলাম শাসন বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে আলাদা করেছে। ইসলামি রাষ্ট্রের প্রধান বিচারপতিদের নিয়োগ করতেন, কিন্তু বিচারপতিরা শাসন-কর্তৃত্বের অধীন হতেন না। ইসলামি রাষ্ট্রের প্রধান কিংবা শাসনকর্তারা অভিযুক্ত হলে তারা সাধারণ আসামিদের মতই কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বিচারের সম্মুখিন হতেন। অনেক মামলায় নিরপেক্ষ সাক্ষীর অভাবে খলিফারা হেরেছেন। এবং এই হেরে যাওয়াকে তারা মাথা পেতে নিয়েছেন।

মানবাধিকারের মত সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও ইসলাম বিশ্ব সভ্যতায় অনন্য এক কল্যাণ ধারার সৃষ্টি করে। পাশ্চাত্য ব্যবস্থায় তখন পর্যন্ত ক্ষমতাসীন ব্যক্তিস্বার্থ সমূহের পদতলে সামষ্টিক স্বার্থ নিক্ষেপ হতো। ইসলাম ব্যক্তি স্বার্থ ও সামষ্টিক স্বার্থ উভয়কেই সমান গুরুত্বপূর্ণ বলে অভিহিত করে এবং উভয়ের মধ্যে কল্যাণকর এক ভারসাম্য বিধান করে। সমাজের একক ইউনিট হিসেবে ইসলাম পরিবার ব্যবস্থাকে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে। তারপর পরিচয় ও সহযোগিতার জন্য বংশ ও সামাজিকতাকে এবং শাসন ব্যবস্থার জন্য রাষ্ট্রকে গুরুত্বপূর্ণ আখ্যায়িত করেছে। আর অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অর্থনীতির বিতরণধর্মীতা ও পুঁজিগঠন উভয়কেই সমান গুরুত্ব দিয়েছে। তবে ইসলামে ম্যাক্রো অর্থনীতি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মাইক্রো অর্থনীতি। ব্যক্তিগত বৈধ সম্পত্তির ব্যাপারে কোন হস্তক্ষেপ ইসলাম করেনি, কিন্তু শর্ত দিয়েছে প্রতিবেশী কেউ যেন না খেয়ে না থাকে এবং সঞ্চয়ের বদলে সম্পদ যেন বিনিয়োগমুখী হয়। চৌদ্দশত বছর আগের ইসলামের এই অর্থনীতি আজকের আধুনিক অর্থনীতির চেয়েও আধুনিক ও কল্যাণকর।

সবশেষে আগে জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে বিশ্ব সভ্যতায় ইসলামের অবদানের কথা।

ইসলাম জ্ঞান ও যুক্তি নির্ভর ধর্ম বলেই জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ইসলাম বিশ্বসভ্যতাকে নতুন সাজে সজ্জিত করেছে। খ্রিস্টায় এগার শতক থেকে সপ্তদশ শতক পর্যন্ত বিজ্ঞান চর্চার অপরাধে পাশ্চাত্য যেখানে প্রায় ৩৫ হাজার মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করেছে, সেখানে অষ্টম শতক থেকে ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত কাল ছিল মুসলমানদের বিজ্ঞান চর্চা ও আবিষ্কারের স্বর্ণযুগ। বিজ্ঞানের ইতিহাসকার জর্জ মার্টন তার পাঁচ খণ্ডে সমাপ্ত বিজ্ঞানের ইতিহাসে বিজ্ঞান ও আবিষ্কারে ইসলামের অবদানকে সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত করেছেন। ৪ তাঁর এই ইতিহাস বলে, ৭৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১১০০ খ্রিস্টাব্দ- নিরবচ্ছিন্ন এই ৩৫০ বছর জ্ঞান-বিজ্ঞানে মুসলমানদের চূড়ান্ত আধিপত্যের যুগ। এই সময় যেসব 
মুসলিম বিজ্ঞানী পৃথিবীকে আলোকিত করেছেন, তাদের মধ্যে রয়েছেন জারীর, খাওয়ারিজাম, রাজী, মাসুদী, ওয়াফা, বিরুনী, ইবনে সিনা, ইবনে আল হাইয়াম এবং ওমর খৈয়াম। এই বিজ্ঞানীরা যখন পৃথিবীতে আলো ছড়াচ্ছিল, তখন সে আলোকে স্নাত হচ্ছিল অন্ধকার ও ঘুমন্ত ইউরোপ। ইউরোপীয় ছাত্ররা তখন স্পেন ও বাগদাদের মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মুসলিম বিজ্ঞানীদের পদতলে বসে জ্ঞান আহরণ করছিল। মুসলিম বিজ্ঞানীদের এই ইউরোপীয় ছাত্ররাই জ্ঞানের আলোক নিয়ে ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। এরই ফল হিসেবে ১১০০ খ্রিস্টাব্দের পর ইউরোপে ক্রিমোনোর জেরার্ড, রজার বেকন- এর মত বিজ্ঞানীদের নাম সামনে আসতে থাকে। বিজ্ঞানের ইতিহাসকার জর্জ মাটনের মতে ১১০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দু'শ পঞ্চাশ বছরের এ সময়ে বিজ্ঞানে অবদান রাখার সম্মানটা মুসলমানরা ও ইউরোপ ভাগাভাগি করে নেয়। এই সময়ের মুসলিম বিজ্ঞানীদের মধ্যে রয়েছেন নাসিরউদ্দিন তুসী, ইবনে রুশদ এবং ইবনে নাফিসের মত বিজ্ঞানীরা। ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দের পর মুসলমানদের বিজ্ঞান চর্চায় গৌরবপূর্ণ সূর্য অস্তমিত হয় এবং পাশ্চাত্যের কাছে হারতে শুরু করে মুসলমানরা। অবশ্য এর পরেও মুসলমানদের মধ্যে বৈজ্ঞানিক চমক কখনও কখনও দেখা গেলেও (যেমন ১৪৩৭ সালে সমরখন্দে আমির তাইমুর পৌত্র উলুগ বেগের দরবার এবং ১৭২০ সালে মোগল সম্রাটের দরবারে জীজ মোহাম্মদ শাহীর সংকলন) তা ছিল খুবই ক্ষণস্থায়ী।

তবে বিজ্ঞানে ছয়'শ বছরের যে মুসলিম অবদান তা ছিল আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তি এবং বিজ্ঞান-রেনেসাঁর জনক। মুসলমানরা ছিল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থারও জনক। 'ইউরোপ যখন গির্জা ও মঠ ব্যতীত অপর সকল শিক্ষালয়ের কথা কল্পনাও করেনি, তার শত শত বছর আগে মুসলমানরা বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেছিল, যেখানে হাজারো ছাত্র উন্নত পরিবেশে পাঠগ্রহণ করতো। গ্রন্থাগার ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়নও ইসলামি সভ্যতার অবদান। মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ছিল লাখো গ্রন্থে ঠাসা। ব্যক্তিগত লাইব্রেরীর তখন ব্যাপক উন্নয়ন ঘটেছিল। ঐতিহাসিক Dosy-এর মতে স্পেনের আলমেরিয়ার ইবনে আব্বাসের ব্যক্তিগত লাইব্রেরীতে অসংখ্য পুস্তিকা ছাড়া শুধু গ্রন্থের সংখ্যাই ছিল ৪ লাখ। এসব মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় ও গ্রন্থাগারটি ছিল বিজ্ঞান-

চর্চা ও বৈজ্ঞানিক সৃষ্টির সুতিকাগৃহ। বিজ্ঞানের সকল শাখাতেই ছিল মুসলমানদের গৌরবজনক বিচরণ। গণিত শাস্ত্রে রয়েছে মুসলমানদের মৌলিক অবদান। আমরা যে ৯ পর্যন্ত নয়টি সংখ্যা ব্যবহার করি, তার অস্তিত্ব আগে থেকেই ছিল। কিন্তু 'শূন্য' (Zero)-এর বিষয়টি সম্পূর্ণ অপরিচিত ছিল। দ্বাদশ শতাব্দীতে মোহাম্মদ ইবনে মুসা সর্বপ্রথম 'শূন্য' আবিষ্কার করেন। গণিত শাস্ত্রে ইনিই সর্বপ্রথম 'দশমিক বিন্দু' (decimal notation) ব্যবহার করেন। সংখ্যার স্থানীয় মান' (value of position) তারই আবিষ্কার। বীজগণিত বা 'এলজেব্রা' মুসলমানদের সৃষ্টি। মুসলিম গণিতজ্ঞ আল জাবের-এর নাম অনুসারে'এলজেব্রা' নামকরণ হয়। শিঞ্জিনী (sine), সার্শ-জ্যা (tangent) ও প্রতি স্পর্শ-ক্যক (co-tangent) প্রভৃতি আবিষ্কার করে বর্তুলাকার ক্রিকোণমিতির উন্নতি করেন মুসলিম বিজ্ঞানীরা। আলোক বিজ্ঞানে focus' নির্ণয়, চশমা আবিষ্কার মুসলিম বিজ্ঞানী আল হাজানের কীর্তি। কিন্তু রজার বেকন এই আবিষ্কার পাশ্চাত্যে আমদানি করে নিজেই এর আবিষ্কারক সেজেছেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানে 'মানমন্দির' (observatory) ব্যবহার মুসলিম বিজ্ঞানীদের আবিষ্কার। এর আগে 'মানমন্দির' সম্পর্কে কোন ধারণা কারও ছিল না। গণনা দ্বারা রাশি- চক্রের কোণ (angle of the ecliptic), সমরাত্রি দিনের প্রাগয়ন (pre- cission of the equinoxes), Almanac (পঞ্জিকা), Azimuth (দিগন্তবৃত্ত), Zenith (মন্ত্রকোর্দ্ধ নভোবিন্দু), Nadir (অধঃস্থিত নভোবিন্দু), প্রভৃতির উদ্ভাবন মুসলিম বিজ্ঞানীদের কীর্তি। মুসলিম বিজ্ঞানীরাই চিকিৎসার বিজ্ঞানকে প্রকৃত বিজ্ঞানে রূপ দান করেন।
ইউরোপ যখন খ্রিস্টান গির্জা ঔষধের ব্যবহার নিষিদ্ধ করে ধর্মানুষ্ঠান দ্বারা রোগের ব্যবস্থা দিতেন, তখন চিকিৎসা বিজ্ঞান মুসলমানদের হাতে এক নতুন যুগে প্রবেশ করে। চিকিৎসা বিজ্ঞানীয় আল রাজীর চিকিৎসা বিষয়ক 'বিশ্বকোষ' দশখণ্ডে সমাপ্ত। এই চিকিৎসা বিশ্ব-কোষ ও ইবনে সিনা'র ব্যবস্থা' ইউরোপী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্য ছিল। বিজ্ঞানের অন্যতম শাখা কেমিস্ট্রির নামকরণই হয় মুসলিম বিজ্ঞানী 'আল কেমী'র নাম অনুসারে। কেমিস্ট্রি'-এর সুবাসার (Alcohol), কাঠ ভষ্ম-ক্ষারের ধাতার্বকমূল (patassium), পারদ বিশেষ (corrosive sublimate), কার্ষকি (Nitrate of silver, যবক্ষার দ্রাবক (Nitric Acid) গন্ধক দ্রাবক (Sulphuric Acid), জুলাপ (Julep), অন্তসার (Elixer), কপূর (Caurphar), এবং সোমামুখী (senna), প্রভৃতি। মুসলিম বিজ্ঞানীদের আবিষ্কার। ভূগোল শাস্ত্রে মুসলমানদের অবদান অবিস্মরণীয়। ইউরোপ যখন মনে করতো পৃথিবী সমতল, তখন বাগদাদে গোলাকার পৃথিবীর পরিধী নির্ণিত হয়েছিল। চন্দ্র যে সূর্যের আলোকে আলোকিত হয়, একথা মুসলিম বিজ্ঞানীরা জানতেন। মুসলিম বিজ্ঞানীরাই চন্দ্র, সূর্য ও অন্যান্য গ্রহের কক্ষ নির্ধারিত করেন। অতি গুরুত্বপূর্ণ কম্পাস যন্ত্র মুসলিম বিজ্ঞানির আবিষ্কার। মুসলমানরা নকশার বৈচিত্র ও সৌন্দর্য এবং শিল্প কৌশলের পূর্ণতা বিধানে ছিলো অপ্রতিদ্বন্দ্বি। স্বর্ণ, রৌপ্য, তাম্র, পিতল, লৌহ, ইস্পাত, প্রভৃতির কাজে তারা ছিলো দক্ষ। বস্ত্র শিল্পে এখনও মুসলমানদের কেউ অতিক্রম করতে পারেনি। উত্তম কাচ, কালী, মাটির পাত্র, নানা প্রকার উৎকৃষ্ট কাগজ প্রস্তুত করাসহ রং পাকা করার কৌশল ও চর্ম-সংস্কারের বহুবিধ পদ্ধতি সম্পর্কে মুসলিম কুশলীরা ভালোভাবে অবহিত ছিলেন। তাদের এসব কাজ ইউরোপে খুব জনপ্রিয় ছিল। সিরাপ ও সুগন্ধি দ্রব্য তৈরিতে মুসলমানদের ছিল একাধিপত্য। মুসলমানদের কৃষি পদ্ধতি ছিল খুবই উন্নত। তারা স্পেনে যে কৃষি পদ্ধতির প্রচলন করেন, ইউরোপের জন্য তা তখনও বিস্ময়। পানি সেচ পদ্ধতি তাদের উৎকৃষ্ট ছিল। মাটির গুণাগুণ বিচার করে তারা ফসল বপন করতেন। সারের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে তারা জানতেন। 'কলম' করা ও নানা প্রকার ফল-ফুলের উৎপাদন কৌশল উদ্ভাবনে তারা ছিলেন খুবই অভিজ্ঞ।

বহু শতাব্দী পর্যন্ত মুসলমানরা বাণিজ্য-জগতের ছিল একচ্ছত্র সম্রাট। নৌ যুদ্ধে তারা ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তারা ছিলেন অতুলনীয় সমুদ্রচারী। তাদের জাহাজ ভূমধ্যসাগর, আটলান্টিক মহাসাগর, ভারত সাগর ও চীন সাগরে এককভাবে চষে ফিরত। মুসলিম নাবিকদের ছাত্র হিসাবেই ইউরোপীয়রা গভীর সমুদ্রে প্রথম পদচারণা করে। ভন ক্রেমার বলেন, আরব নৌবহর ছিল বহু বিষয়ে খ্রিস্টানদের আদর্শ।' মুসলমানদের যুদ্ধ-পদ্ধতি ও যুদ্ধ বিদ্যাও ইউরোপকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে। ইউরোপের Chivalry স্পেনীয় মুসলিম বাহিনীর অনুকরণ।


মোট কথা, বলা যায়, মুসলমান ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্রসহ জ্ঞান-বিজ্ঞানের সকল শাখার যে অবদান রাখেন, তা এক নতুন সভ্যতার জন্ম দেয়, বিশ্ব সভ্যতাকে করে নতুন এক রূপে রূপময় যা চিন্তা, চেতনা, আচার-আচরণ, জীবন-যাপন, জীবনাপোকরণ সবদিক দিয়েই আধুনিক। ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দে সভ্যতার এই নতুন-উত্থান- যাত্রা থেমে না গেলে আরও কয়েকশ' বছর অগেই বিশ্ব আধুনিক বিজ্ঞান যুগে প্রবেশ করতো। কিন্তু তা হয়নি। না হলেও তাদেরই ছাত্র ইউরোপীয় বিজ্ঞানীরা আরও কয়েকশ' বছর পরে হলেও মুসলমানদের কাজ সম্পন্ন করেছে। ইসলামি সভ্যতাকে বাদ দিলে বা মুসলমানদের অবদান মাইনাস করলে ইউরোপীয় রেনেসাঁ আর থাকে না, তার সভ্যতাও অন্ধকারে তলিয়ে যায়।


লিওনার্দো এজন্যই লিখেছেন, "আরবদের মধ্যে উচ্চ শ্রেণীর সভ্যতা, জ্ঞানচর্চা, সামাজিক ও মানসিক সমৃদ্ধি এবং অভ্রান্ত শিক্ষা-প্রথা বিদ্যমান না থাকলে ইউরোপকে আজও অজ্ঞতার অন্ধকারে নিমগ্ন থাকতে হতো।


রেফারেন্স:
১। S. Khuda Bakhsh, M. A. BCL. Bar-at Law, প্রণীত 'Arab civilization গ্রন্থে উদ্ধৃত, পৃ. ১৬
২। 'A general History of Europe, Vol-1 Page-172 ৩। Mayers, 'Mediaeval and Modern History' Page-54
৪। নোবেল বিজ্ঞানী আবদুস সালাম' এর 'Ideas and Realities' গ্রন্থে উদ্ধৃত
(বাংলা অনুবাদঃ 'আদর্শ ও বাস্তবতা,' পৃষ্ঠা, ২৬৮ ৫। Mayers, "Mediaeval and Modern History, Page, 56
৬। Dozy, Spanish Islam'. Page 610
৭। Thateher Ph. D and F. Schwill Ph. D. 'A general History Europe', vol-1 page, 173
৮। Von Kremar এই উক্তি S. khuda Bakhsh এর 'Arab civilization' এর উদ্বৃত, Page, 72
৯। Thatcher and F. Schwill, 'A general History of Europe, Vol-1 pages, 174-188

Wednesday, October 9, 2024

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ হতে যুগান্তকারী ‘রাষ্ট্র সংস্কার প্রস্তাবনা’



৯ অক্টোবর বুধবার দুপুরে ঢাকার গুলশানস্থ হোটেল ওয়েস্টিনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ‘রাষ্ট্র সংস্কার প্রস্তাবনা’ জাতির সামনে উপস্থাপন করা হয়। আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান দেশের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী, সম্পাদক, সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও গবেষকদের সামনে স্বাগত বক্তব্য পেশ করেন। আমীরে জামায়াতের পক্ষ থেকে ‘রাষ্ট্র সংস্কার প্রস্তাবনা’ উপস্থাপন করেন নায়েবে আমীর ও সাবেক এমপি ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোঃ তাহের।

কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য এবং প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি মতিউর রহমান আকন্দ-এর সঞ্চালনায় সভায় উপস্থিত ছিলেন নায়েবে আমীর ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মুজিবুর রহমান ও মাওলানা আ ন ম শামসুল ইসলাম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মাছুম, মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, জনাব হামিদুর রহমান আযাদ সাবেক এমপি, এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের ও মাওলানা আবদুল হালিম, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য জনাব সাইফুল আলম খান মিলন ও জনাব মোবারক হোসাইন, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমীর জনাব নূরুল ইসলাম বুলবুল, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমীর জনাব সেলিম উদ্দিন, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি মঞ্জুরুল ইসলাম প্রমুখ।

শুভেচ্ছা বক্তব্যে আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “আমরা সকলেই জানি দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছর একটি দল ও তাদের দোসররা ক্ষমতায় ছিলেন। তারা দেশকে যে শাসন উপহার দিয়েছিলেন তা বাংলাদেশের মানুষকে অতীষ্ঠ করে তুলেছিল। এর লক্ষ্যবস্তু বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিক হয়েছিলেন। তাদের অপশাসনের হাত থেকে কেউই রেহাই পায়নি। এমনকি রাস্তার ভিক্ষুকও তাদের হাত থেকে রেহাই পায়নি। শিশু-বৃদ্ধ সকলেই এই কুশাসনের নজরে পড়েছিলেন। গত জুলাই মাসে ছাত্ররা বৈষম্যবিরোধী কোটা পদ্ধতি বাতিলের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলে। পরবর্তীতে এ আন্দোলন ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনে রূপ নেয় এবং সরকারের পতন ঘটে। বহু মানুষ জীবন দিয়েছেন, আহত হয়েছেন, পঙ্গু হয়েছেন, চোখ হারিয়েছেন। অনেকেই হাজারো মামলায় পড়েছেন, ঘরবাড়ি ছাড়া হয়েছেন, অনেকের ওপর আঘাত এসেছে, আমরা তাদের সকলের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই।

আমরা মনে করি সকলের সম্মিলিত প্রয়াসেই দেশে এমন একটি কাক্সিক্ষত পরিবর্তন এসেছে। যার সূচনা হয়েছিল ২০০৯ সালের ১০ জানুয়ারির পর। তার পূর্ণতা পেয়েছে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। এটা ঠিক রাজনৈতিক দল এবং পক্ষ দফায় দফায় নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। আর সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত দলের নাম বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এই দলের ১১ জন শীর্ষ নেতাকে মিথ্যা অযুহাতে সাজানো আদালতের মাধ্যমে সাজা দিয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, তাদের অপশাসনের প্রতিবাদ করেছেন এমন হাজারো মানুষকে দুনিয়া থেকে তুলে নেয়া হয়েছে। অসংখ্য মানুষকে গুম করা হয়েছে। আয়নাঘর নামক কুখ্যাত কূপখানায় থাকতে বাধ্য করা হয়েছে অসংখ্য মানুষকে। তাদেরকে দিনের পর দিন নয়, সপ্তাহের পর সপ্তাহ নয়, মাসের পর মাস নয়, বছরের পর বছর ধরে আটকিয়ে রাখা হয়েছে। তাদের পরিবার জানতো না, আদৌ তারা বেঁচে আছেন নাকি দুনিয়া থেকে চলে গেছেন। যদি তারা চলে গিয়ে থাকেন তাহলে তাদের লাশটি কোথায়? কখন কীভাবে তাদেরকে দাফন করা হয়েছে কিছুই তারা জানেন না। খুব অল্প সংখ্যক সৌভাগ্যবান মানুষ ফিরে এসেছেন সেই কুখ্যাত আয়নাঘর থেকে। বাকীদের ভাগ্যে কী ঘটেছে এ জাতি জানে না এবং তাদের আপনজনও জানে না। এইসব ব্যথিত আপনজনদের সাথে আমরাও সমানভাবে ব্যথিত।

তিনি আরও বলেন, অপশাসনের কালো অধ্যায় আল্লাহ তাআলা তার মেহেরবানী দিয়ে সাহায্য করে অপসারিত করেছেন গত ৫ আগস্ট। এজন্য মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করছি আরেকবার আলহামদুলিল্লাহ। শেষ পর্যন্ত আমাদের তরুণ-তরুণীদের হাতে এই আন্দোলন চূড়ান্ত পরিণতি পেয়েছে। আমি আরেকবার তাদের ভালবাসা, শ্রদ্ধা এবং শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করছি।

উপস্থিত প্রিয় সাংবাদিক এবং দেশের সম্মানিত ব্যক্তিবর্গের উদ্দেশে তিনি বলেন, আমাদের প্রিয় সংগঠনের পক্ষ থেকে আপনাদের এবং জাতির জন্য আমাদের ভালবাসা। আমরা মৌলিক কী কী সংস্কার প্রয়োজন মনে করি সেই ভাবনা এখনই আপনাদের সামনে তুলে ধরব ইনশাআল্লাহ। আমাদের ভাবনাগুলো অনলাইনের মাধ্যমে আপনাদের হাউজ-এ আমরা পৌঁছাব। আমরা আপনাদের প্রতি আবারো শুভেচ্ছা এবং কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ‘রাষ্ট্র সংস্কার প্রস্তাবনা’ জাতির উদ্দেশে তুলে ধরা হলো:

“রাষ্ট্র সংস্কার প্রস্তাবনা
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী
৯ অক্টোবর ২০২৪

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

স্বৈরশাসনের কবল থেকে মুক্ত বাংলাদেশে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রস্তাবনা তুলে ধরার সুযোগ পেয়ে মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি- আলহামদুলিল্লাহ। গত জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণআন্দোলনে যারা জীবন দিয়েছেন মহান রাব্বুল আলামীন তাদেরকে শহীদ হিসেবে কবুল করুন। যারা আহত হয়েছেন তাদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করছি। নিহত ও আহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি।

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর তৎকালীন সেনা সমর্থিত সরকারের সাথে সমঝোতা করে অবৈধভাবে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা দখল করে। তারা দেশকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য সংবিধানসহ সিভিল প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচার বিভাগকে কুক্ষিগত করে একনায়কতন্ত্র কায়েম করে।তারা নিজেদের সুবিধামত সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদ পরিবর্তন করে। ২০১১ সালের ৩০ জুন পঞ্চদশ সংশোধনী পাশ করা হয়। এ সংশোধনীর মাধ্যমে কেয়ারটেকার সরকার পদ্ধতি বাতিল করে দেয়া হয়। নিজেদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার জন্য নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ, নির্বাচন ব্যবস্থা, সাংবিধানিক এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহ, শিক্ষা, সংস্কৃতি, দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং ধর্মীয় মূল্যবোধকে ধ্বংস করে দেয়। রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিরোধীমত দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়।দুর্নীতি, ব্যাংক লুটপাট, শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি ও বিদেশে অর্থ পাচারের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে দেয়। হত্যা, গুম এবং মিথ্যা, সাজানো ও ষড়যন্ত্রমূলক মামলার মাধ্যমে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মামলা দায়ের করে জেল-জুলুম ও নির্যাতন চালানো হয়।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে দেড় সহস্রাধিক প্রাণের বিনিময়ে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা ৫ আগস্ট পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে চলে যান। ৮ আগস্ট গঠিত হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এই সরকারের প্রধান দায়িত্ব হলো স্বল্পতম সময়ের মধ্যে মৌলিক সংস্কার সম্পন্ন করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও অর্থবহ করার জন্য নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানের ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন। সংস্কার ব্যতীত নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হতে পারে না। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ও প্রধান প্রধান সেক্টরের সংস্কারের জন্য প্রস্তাবনা তুলে ধরা হলো।

ডা. শফিকুর রহমান
আমীর
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।


১। আইন ও বিচার

● উচ্চ আদালতে বিচারপতি নিয়োগের জন্য সুষ্ঠু ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।

● বিচার বিভাগ থেকে দ্বৈত শাসন দূর করতে হবে।

● বিচার বিভাগ নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথকীকরণের কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

● আইন মন্ত্রণালয় থেকে আলাদা করে সুপ্রিম কোর্টের অধীনে পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

● ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার স্বার্থে বিদ্যমান আইনসমূহের প্রয়োজনীয় সংশোধনী ও গণমানুষের মূল্যবোধের সাথে সামঞ্জস্যশীল আইন প্রণয়ন করতে হবে।

● ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন-২০২৩’ওসকল কালো আইন বাতিল করতে হবে।

● বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা কমাতে বিভাগীয় পর্যায়ে হাইকোর্ট বেঞ্চ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

● নিম্ন আদালতের যথাযথ স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য পৃথক বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠন করতে হবে।

● সকল ফৌজদারি মামলা তদন্তের জন্য স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে।

● দেওয়ানি মামলার জন্য সর্বোচ্চ ৫ বছর এবং ফৌজদারি মামলাসমূহ সর্বোচ্চ ৩ বছরের মধ্যে নিষ্পত্তি করার বিধান করতে হবে।




২। সংসদ বিষয়ক সংস্কার

● সংসদের প্রধান বিরোধীদল থেকে একজন ডেপুটি স্পিকার মনোনীত করতে হবে।

● সংসদীয় বিরোধী দলীয় নেতার নেতৃত্বে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

● সংসদে বিরোধী দলীয় সদস্যদের পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে।




৩। নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার

● জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক ব্যবস্থা (Proportional Representation-PR) চালু করতে হবে।

● সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নির্বাচন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে স্থায়ীভাবে সন্নিবেশিত করতে হবে।

● নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন দেশে প্রত্যাখ্যাত ইভিএম ভোটিং ব্যবস্থা বাতিল করতে হবে।

● কোনো সরকারি চাকরিজীবী তাদের চাকরি ছাড়ার কমপক্ষে ৩ বছরের মধ্যে কোনো ধরনের নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না।

● স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয়ভাবে সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করতে হবে।

● অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক ২০০৮ সালে প্রবর্তিত রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন প্রথা বাতিল করতে হবে।

● নির্বাচন কমিশনারসহ অন্যান্য কমিশনার নিয়োগের জন্য প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা ও প্রধান বিচারপতির সমন্বয়ে সার্চ কমিটি গঠিত হবে।

● জাতীয় সংসদ নির্বাচন একাধিক দিনে অনুষ্ঠিত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

● NID-ব্যবস্থাপনা নির্বাচন কমিশনের অধীনে আনতে হবে।




৪। আইনশৃঙ্খলা সংস্কার

ক) পুলিশ বাহিনীর সংস্কার

● ১৮৬১ সালে ব্রিটিশ সরকার প্রণীত পুলিশ আইন পরিবর্তন এবং পুলিশের জন্য একটি পলিসি গাইডলাইন তৈরি করতে হবে।

● পুলিশ সদস্যদের নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি এবং চাকরিচ্যূতির জন্য স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন করতে হবে।

● নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি এবং চাকরিচ্যূতির ক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক ব্যক্তির সুপারিশের সুযোগ রাখা যাবে না তথা সর্বপ্রকার দলীয় ও ব্যক্তিগত প্রভাব বা হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে।

● পুলিশ ট্রেনিং ম্যানুয়ালের মধ্যে ধর্মীয় শিক্ষা ও নৈতিক অনুশাসন অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

● পুলিশের মধ্যে মারণাস্ত্রের ব্যবহার বাতিল করতে হবে।

● রিমান্ড চলাকালে জিজ্ঞাসাবাদের ক্ষেত্রে আসামি পক্ষের আইনজীবীর উপস্থিতি এবং মহিলা আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাদের অভিভাবকের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে।

● বিচার বিভাগীয় সদস্যদের দ্বারা পুলিশ ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিধান থাকতে হবে।

● পুলিশের ডিউটি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা উন্নত করতে হবে।

● ‘পুলিশ আইন’ পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও পরিমার্জনের মাধ্যমে আধুনিকায়ন করতে হবে।




খ) র‌্যাব বিষয়ক সংস্কার

● র‌্যাব ও অন্যান্য বিশেষায়িত বাহিনীর প্রতি জনসাধারণের আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পন্ন করতে হবে।

● গত সাড়ে ১৫ বছর যারা র‌্যাবে কাজ করেছে তাদেরকে স্ব স্ব বাহিনীতে ফিরিয়ে আনতে হবে এবং তাদেরকে পুনরায় র‌্যাবে নিয়োগ দেয়া যাবে না।

● বিচারবহির্ভূত সকল প্রকার হত্যাকা- বন্ধ করতে হবে।

● র‌্যাবের সামগ্রিক কার্যক্রম মনিটরিং-এর জন্য সেল গঠন করতে হবে। কোনো র‌্যাব সদস্য আইনবহির্ভূত কোনো কাজে জড়িত হলে এই সেল তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করবে।

● মিডিয়ার ক্ষেত্রে নীতিমালা প্রণয়ন ও অনুসরণ নিশ্চিত করতে হবে।




৫। জনপ্রশাসন সংস্কার

● জনবল নিয়োগ, বদলি, পদায়নে তদবির, সুপারিশ ও দলীয় আনুগত্যের পরিবর্তে যোগ্যতা, দক্ষতা ও সততাকে প্রাধান্য দিতে হবে।

● যে কোনো চাকরির নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি থেকে শুরু করে নিয়োগ পর্যন্ত সময়ক্ষেপণ না করে যৌক্তিক সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে।

● সরকারি চাকরিতে আবেদন বিনামূল্যে করতে হবে।

● চাকরিতে আবেদনের বয়সসীমা আগামী ২ বছরের জন্য ৩৫ বছর ও পরবর্তী বয়সসীমা স্থায়ীভাবে ৩৩ বছর এবং অবসরের বয়সসীমা ৬২ বছর নির্ধারণ করতে হবে।

● চাকরির আবেদনে সকল ক্ষেত্রে বয়সসীমার বৈষম্য নিরসন করতে হবে।

● সকল সরকারি দপ্তরে দুর্নীতি নিরোধকল্পে বিশেষ ব্যবস্থা তৈরি করা যাতে করে কেউ দুর্নীতি করার সুযোগ না পায়। এ জন্য প্রয়োজনীয় মনিটরিং-এর ব্যবস্থা করতে হবে।

● চাকরিতে বিরাজমান আন্তঃক্যাডার বৈষম্য দূর করতে হবে।

● বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে সরকারি চাকরিতে যারা প্রশ্নপত্র ফাঁস, দুর্নীতি, জালিয়াতি ও দলীয় বিবেচনায় চাকরি পেয়েছে তাদের নিয়োগ বাতিল করতে হবে।




৬। দুর্নীতি

● দুর্নীতি দমন কমিশনে পরীক্ষিত সৎ, ন্যায়পরায়ণ, দক্ষ ও যোগ্য লোক নিয়োগ দিতে হবে।

● রাষ্ট্রের সকল সেক্টরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।

● দুর্নীতি দমন কমিশনকে শক্তিশালী করে নিরপেক্ষভাবে কাজ করার স্বাধীনতা দিতে হবে।

● বিগত সরকারের আমলে দেশ থেকে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার উপযুক্ত বিধান প্রণয়ন ও তা কার্যকর করার পদক্ষেপ নিতে হবে।

● মন্ত্রণালয় ভিত্তিক দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন করতে হবে।

● দুর্নীতি দমন কমিশনের আইনসংস্কার, জনবল ও পরিধি বৃদ্ধি করতে হবে।

● রাষ্ট্রীয় ও জনগণের সম্পদ অবৈধভাবে ভোগ দখলকারীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সুস্পষ্ট আইন প্রণয়ন করতে হবে।




৭। সংবিধান সংস্কার

● রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য রাখার বিধান সংযুক্ত করতে হবে।

● একই ব্যক্তি পরপর দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না।




৮। শিক্ষা ও সংস্কৃতি সংস্কার

ক) বিরাজমান সমস্যার আলোকে শিক্ষা সংস্কার প্রস্তাব

● ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত মাধ্যমিক এবং একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিকে উচ্চমাধ্যমিক হিসেবে বলবৎ রাখতে হবে। অষ্টম শ্রেণির পাবলিক পরীক্ষা বাতিল করে পূর্বের পরীক্ষা পদ্ধতি ফিরিয়ে আনতে হবে।

● পাঠ্যপুস্তকে ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস গুরুত্বের সাথে তুলে ধরতে হবে।

● সকল শ্রেণির পাঠ্যপুস্তকে ধর্মীয় মূল্যবোধবিরোধী উপাদান বাদ দিতে হবে।

● সকল শ্রেণিতে নবী করিম সা. এর জীবনীসহ মহামানবদের জীবনী সংবলিত প্রবন্ধ সংযোজন করতে হবে।

● স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বিদ্যমান স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদরাসাগুলোকে সরকারিকরণ করতে হবে।

● প্রতিটি জেলায় কমপক্ষে একটি করে কামিল মাদরাসাকে সরকারিকরণ করতে হবে।

● কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষাকে সাধারণ শিক্ষার মূলধারায় যুক্ত করতে হবে।

● Department of Higher Education নামে একটি স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠন করতে হবে।

● শিক্ষা সংস্কারের লক্ষ্যে গঠিত শিক্ষা কমিশনের সকল ধারা তথা সাধারণ, আলিয়া, কওমীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে।




খ) সংস্কৃতি সংস্কার

● জাতির ঐতিহাসিক আন্দোলন-সংগ্রাম ও মূল্যবোধের আলোকেবিভিন্ন ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে হবে।

● জাতির ঐতিহাসিক দিনগুলোকে স্মরণীয় করার লক্ষ্যে বিশেষ দিবস হিসেবে ঘোষণা করে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় তা পালনের ব্যবস্থা করতে হবে।

● নাটক, সিনেমাসহ বিভিন্ন বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানগুলো অশ্লীলতামুক্ত করতে হবে। নাটক, সিনেমা ও বিভিন্ন কন্টেন্টে বিভিন্ন ধর্ম, বিশেষ করে ইসলামকে হেয় করা থেকে বিরত থাকার বিধান প্রণয়ন করতে হবে।

● প্রাণীর মূর্তিনির্ভর ভাস্কর্য নির্মাণ না করে দেশীয় প্রকৃতি, ঐতিহ্যকে বিভিন্ন চিত্রাঙ্কন-ভাস্কর্যে তুলে আনতে হবে।

● সকল গণমাধ্যমে শিক্ষামূলক প্রোগ্রাম প্রচার নিশ্চিত করতে হবে।




৯। পররাষ্ট্র বিষয়ক সংস্কার

● পররাষ্ট্রীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে সকল গণতান্ত্রিক দেশের সাথে সাম্য ও নায্যতার ভিত্তিতে পারস্পরিক সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।

● জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় চীন, নেপাল, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার আন্তর্জাতিক নদীসমূহের পানিবণ্টন চুক্তির উদ্যোগনিতে হবে।

● আসিয়ানভুক্ত দেশসমূহের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৃদ্ধি করতে হবে।

● অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে বিগত সরকারের আমলে সম্পাদিত সকল চুক্তি রিভিউ করতে হবে। এক্ষেত্রে একটিরিভিউ কমিশন গঠন করতে হবে।

● বাংলাদেশকে আসিয়ান জোটভুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

● শক্তিশালী SAARC পুনর্গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

● কোনো দেশের সাথে চুক্তি অথবা সমঝোতা চুক্তি হলে পরবর্তী সংসদঅধিবেশনে সেসব চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক উত্থাপন করে বিস্তারিত আলোচনা পূর্বক তা অনুমোদন করতে হবে।




১০। ধর্ম মন্ত্রণালয় সংস্কার

● ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশকে (ইফাবা) রাষ্ট্রের কল্যাণে অর্থবহ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

● ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমিকে স্বতন্ত্র সংস্থা বা দপ্তরে রূপান্তর করতে হবে, যাতে তারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে।

● ইসলামিক মিশনকে সরাসরি মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্বতন্ত্র সংস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

● হজ্জব্যবস্থাপনার জন্য স্বতন্ত্র অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

● হজ্জ ও উমরার খরচ কমানোর জন্য কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

● ইসলামিক ফাউন্ডেশনে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যেখানে দেশের বরণ্যে আলেমগণ সম্পৃক্ত থাকবেন।

● বিতর্কিত সকল বই বাতিল ও প্রকাশনা বন্ধ করতে হবে।

● সকল ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

Friday, October 4, 2024

জমকালো আয়োজনে অফিস উদ্বোধন ও কমিটি ঘোষণা হলো আনন্দীপুর পুষ্প স্পোর্টিং ক্লাবের


সোনাগাজীর মঙ্গলকান্দি ইউনিয়নের আনন্দীপুর গ্রামে “আনন্দীপুর পুষ্প স্পোর্টিং ক্লাব” নামক ঐতিহ্যবাহী সামাজিক সংগঠনের অফিস উদ্বোধন হয়েছে আজ। ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এই সংগঠনটির মধ্যখানে দীর্ঘদিন আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম বন্ধ থাকার পর নতুন করে জমকালো আয়োজনে অফিস উদ্বোধন ও কার্যনির্বাহী কমিটি ঘোষণা করেছে।

সংগঠনটির নতুন কমিটির সভাপতি আলাউদ্দিন রাবেলের সভাপতিত্বে ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জহির উদ্দিন তারেকের সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন মঙ্গলকান্দি ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান জনাব দাউদুল ইসলাম মিনার, সাবেক ছাত্রনেতা ও বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ জনাব কামরুল ইসলাম কামরুল, সাবেক ইউপি মেম্বার জনাব মাওলানা নুরুল ইসলাম সহ অন্যান্য অতিথিবৃন্দ।

সাবেক ইউপি মেম্বার মাওলানা নুরুল ইসলাম উক্ত সংগঠনের ২০২৪-২৬ সেশনের কার্যনির্বাহী কমিটির ঘোষণা দেন। ফিতা কেটে উদ্বোধন, কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে শুরু হওয়ার পর অতিথিদের ফুল দিয়ে বরণ করে নেন নেতৃবৃন্দ। অনুষ্ঠানে সংগঠনটির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ঘোষণা করেন সংগঠনের ধর্ম ও শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক ইমাম হোসেন আরমান। 

অনুষ্ঠানে অতিথিবৃন্দ উনাদের বক্তব্যে সাম্প্রতিক বন্যা পরিস্থিতিতে ক্লাবের সদস্যদের প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা, বিভিন্ন সময়ে সামাজিক কার্যক্রমসহ সকল কাজের ব্যাপক প্রসংশা করেন। এর পাশাপাশি ভবিষ্যতে যে কোন ভালো কাজে ক্লাবের পাশে থাকার আশ্বাস দেন। আমন্ত্রিত অতিথি সকলেই ক্লাবের উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি কামনা করেন। 


• ক্লাবের লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য:

১. গ্রাম/ইউনিয়ন কেন্দ্রিক অঞ্চলগুলোর
বর্তমান ছাত্র/ছাত্রীদের অন্তর্নিহিত সম্ভাবনাময় গুণাবলী বিকাশের পরিবেশ সৃষ্টিতে সহযোগিতা করা ও তাদের নৈতিক মূল্যবোধ, দেশপ্রেম ও সামাজিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত করে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলায় ভূমিকা রাখা।
২. সৃষ্টিশীল,সামাজিক মানুষ ও সুনাগরিক সৃষ্টির লক্ষে স্কুল-কলেজে বিভিন্ন কর্মশালা যেমন- বিতর্ক, কুইজ, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিনামূল্যে তথ্য সেবা ও সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন।
৩. এলাকার যেকোনো উন্নয়নমূলক কাজ 
যেমন রাস্তাঘাট মেরামত, অন্ধকারাচ্ছন্ন এলাকায় লাইটের মাধ্যমে আলো স্থাপন, জলাবদ্ধতা নিরসন সহ যাবতীয় উন্নয়নমূলক কাজে অংশগ্রহণ 
৪. গরীব, অসচ্ছল পরিবারের ছেলে/মেয়েদের বিবাহের কাজে সসহযোগিতা 
৫. এলাকার মানুষদের যেকোনো উন্নয়নমুখী ও সৃজনশীল  কাজে সংবর্ধনা প্রদান করা।
৬. প্রধানত সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করবে।
৭. সবসময় সমাজের দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষদের পাশে থাকবে এবং তাদের জন্য কাজ করা
৮. পরিবেশ এর ভারসাম্য রক্ষার্থে যেকোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
৯. সাহিত্য, সংস্কৃতি, ক্রীড়া, বিনোদন ইত্যাদি সৃজনশীল কাজে সহযোগিতা, উৎসাহ প্রদান এবং সংগঠন কর্তৃক আয়োজন করা 
১০. ঝরে পড়া স্কুল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ শিক্ষার ব্যবস্হা করা । 
১১. ব্লাড ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা।
১২. স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে সুন্দর শক্তিশালী যুব সমাজ প্রতিষ্টা করা।

• কার্যনির্বাহী কমিটির তালিকা:


Monday, March 11, 2024

একুশ শতকের এজেন্ডা || আবুল আসাদ



একুশ শতকের এজেন্ডা
আবুল আসাদ

অস্তায়মান বিশ শতকের উপসংহার থেকেই গড়ে উঠবে একুশ শতকের যাত্রাপথ। তাই এই উপসংহারের স্বরূপ সন্ধান খুবই জরুরী। আমেরিকান এক লেখক তার এক শতাব্দী-সিরিজ গ্রন্থে শতাব্দীর 'Mega Trend' গুলোকে তার মত করে চিহ্নিত করেছেন। এই 'Mega Trend' গুলোর মধ্য রয়েছেঃ

১. বিশ্ব অর্থনীতি
২. বিশ্ব রাজনীতি
৩. বিশ্ব সংস্কৃতি

এই 'Mega Trend' গুলো বিশ শতাব্দীর অনন্য কারিগরি, বৈষয়িক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নতি এবং এই উন্নয়নের স্রোতে বহমান জাতিসংঘের অনন্য ভূমিকার দ্বারা প্রতিপালিত ও পরিচালিত হয়ে আগামী শতাব্দীর সিংহদ্বারে এক বিশেষ রূপ নিয়ে হাজির হচ্ছে। এই রূপের নির্ণয়ই একবিংশ শতাব্দীর প্রকৃতিকে পরিষ্কার করে দিতে পারে।

প্রথমে বিশ্ব অর্থনীতির শতাব্দী শেষের গতি-প্রকৃতির প্রশ্ন আসে। আশির দশকের শুরুপর্যন্তবিশ্ব দুই অর্থনীতি- পুঁজিবাদ ও কম্যুনিজমের সংঘাতে সংক্ষুব্ধ ছিল। কিন্তু তারপর মুক্তবাজার অর্থনীতির অপ্রতিরোধ্য গ্রাসে সমাজবাদী অর্থনীতির পতন শুরুহলো। আশির দশকের সমাপ্তিতে এসে তা সমাপ্তও হয়ে গেল। আজ মুক্তবাজার অর্থনীতির গ্রাসে গোটা পৃথিবী। মুক্ত বাজার অর্থনীতির মূল কথা হলোঃ শক্তিমান অর্থনীতি বিজয় লাভ করবে, পরাজিত হবে দুর্বল অর্থনীতি। এই পরাজয়ের ভয় দুর্বল অর্থনীতিকে সবল করে তুলবে এবং সেও উন্নীত হবে বিজয়ীর আসনে। তাই সবাইকে মুক্ত বাজার অর্থনীতির স্রোতে নির্ভয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। এই তত্ত্ব কথায় উলিখিত 'আইডিয়াল সিশুয়েশন' হয়তো কোনদিন আসবে কিংবা আসবেই না। তবে তার আগেই শক্তিমান অর্থনীতির করাল গ্রাসে আত্মরক্ষার অধিকারহীন দুর্বল অর্থনীতি পরাধীন হয়ে মরার মত বেঁচে থাকার পর্যায়ে চলে যাবে। যেমন আমাদের বাংলাদেশ মুক্ত বাজার অর্থনীতি গলাধঃকরণ করে ইতোমধ্যেই বিদেশী পণ্য বিশেষ করে ভারতীয় পণ্যের বাজারে পরিণত হয়েছে। এই অবস্থায় বাজার না পাবার আশংকায় বিদেশী বিনিয়োগ এখানে আসবেনা বরং তা যাবে বাজার দখলকারী দেশের পুজিপতিদের কাছে। যাওয়া শুরুহয়েছে। যে বিদেশী বিনিয়োগ বাংলাদেশে আসার কথা ছিল তা গিয়ে বিনিয়োগ হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে। এর অন্যথা না ঘটলে অব্যাহত এই প্রবনতা বাংলাদেশকে শিল্প পণ্যের ক্রেতা এবং কৃষিপণ্যের বিক্রেতায় রূপান্তরিত করবে।

বলা হচ্ছে, এই বিনাশ হতে বাঁচাতে এগিয়ে আসবে 'ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশন' (W.T.O)। কিন্তু জাতিসংঘের মত এই সংস্থাও শক্তিমানদের দ্বারা পরিচালিত এবং শক্তিমান অর্থনীতিরই স্বার্থ পুরা করবে। শুধু তাই নয়, এই সংস্থা মুক্তবাজার বাণিজ্যের বিশ্বনিয়ন্ত্রক হিসেবে আত্মরক্ষায় উদ্বুদ্ধ দুর্বল অর্থনীতির বেয়াড়াপনাকে শায়েস্তা করার জন্য বাণিজ্য অবরোধ আরোপ করতে পারবে হয়তো 'মহান' মুক্তবাজার অর্থনীতির মূল্যবান স্বার্থেই।

মুক্তবাজার অর্থনীতির এই বিশ্বরূপ বিশ্বে একক অর্থনীতি গড়ার লক্ষেই। যার নিয়ন্ত্রনে থাকবে আজকের শক্তিমান অর্থনীতিগুলো, আর শোষিত হবে অনুন্নত ও উন্নয়নমুখী অর্থনীতির দেশসমূহ। আজকের বিশ্ব অর্থনীতির শতাব্দী শেষের এটাই প্রবণতা।
এই প্রবণতা তার লক্ষে পৌঁছতে পারলে, একক এক বিশ্ব অর্থনীতি গড়া এবং তাকে এককেন্দ্রীক নিয়ন্ত্রনে আনার প্রয়াস সফল হলে বিশ্বের মানুষের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে তার অশুভ প্রভাব নেমে আসবে।


অনুন্নত ও উন্নয়নমুখী মুসলিম অর্থনীতিগুলোর জন্য এটা একবিংশ শতাব্দীর প্রথম চ্যালেঞ্জ।
বিশ শতকের দ্বিতীয় 'Mega Trend' হিসেবে আসে বিশ্ব রাজনীতির কথা।

ইসরাইলের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেনগুরিয়ান একটা বিশ্ব রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিলেন। যার নেতৃত্ব দেবে ইহুদিরা এবং যার রাজধানী হবে জেরুজালেম। তার স্বপ্নের ভবিষ্যৎ আমি জানি না, তবে এক বিশ্ব অর্থনীতির মতই এক বিশ্ব রাষ্ট্র গড়ার ধীর ও ছদ্মবেশী প্রয়াস চলছে। এই প্রয়াসে ছাতা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে জাতিসংঘ এবং অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে গণতন্ত্র। গণতন্ত্র জয় করেছে যেমন কম্যুনিষ্ট সাম্রাজ্য, তেমনি জয় করবে গোটা বিশ্ব। বিশেষ সংজ্ঞায়িত এ গণতন্ত্রের আদর্শের কাছে জাতীয় স্বার্থ ও জাতীয় অধিকারকে বলি দিতে বলা হচ্ছে। বলি না দিলে শক্তি প্রয়াগেরও ব্যবস্থা রয়েছে। গণতন্ত্রের স্বার্থ রক্ষার জন্যই হাইতিতে আন্তর্জাতিক বাহিনী নামানো হয়েছে জাতিসংঘের নেতৃত্বে। এমন হাইতি ভবিষ্যতে আরও অনেক হতে পারে।

গণতন্ত্র কিন্তু সমস্যা নয়, সমস্যা হলো গণতন্ত্রের অর্থ ও রক্তস্রোতের উপর তাদের বর্তমান যে রাষ্ট্রসংহতি গড়ে তুলেছে, সে রক্তস্রোত প্রবাহিত না হলে এবং সে সময় গণতন্ত্রের নীতি অনুসৃত হলে তাদের এই রাষ্ট্রসংহতি গড়ে উঠতো না। এমনকি রেড ইন্ডিয়ানদেরও একাধিক রাষ্ট্র সৃষ্টি হতো। এই ইতিহাস তারা ভুলে গেছে। যেমন আমাদের প্রতি এখন তাদের নসীহত, বিদ্রোহী শান্তিবাহিনীর গায়ে আমাদের হাত দেয়া যাবে না। তথাকথিত আদিবাসি বলে তাদের মাটিতে আমাদের পা দেয়া যাবেনা। দেশের ভিতর কোন গ্রুপবা কোন ব্যক্তি যদি বিদেশী টাকার পুতুল সেজে ঐতিহ্য ও মূল্যবোধকে গলা টিপে মারতে চায়, তাহলেও গণতন্ত্রের আদর্শের স্বার্থে তাদের জামাই আদর দিয়ে যেতে হবে।

গণতন্ত্রের দায়িত্বহীন এই আদর্শ অনুন্নত ও উন্নয়নমুখী এবং সমস্যা পীড়িত দেশ ও জাতিকে দ্বন্দ্ব-সংঘাতে ক্ষত-বিক্ষত এমনকি খন্ড- বিখন্ড করতে পারে। অন্তত আর কিছু না হোক বহু মত ও পথে বিভক্ত এবং দুর্বলতো করবেই। এ ধরনের দেশ ও জাতিকে তাদের স্বকীয় আদর্শ ও মূল্যবোধ থেকে অনায়াসেই সরিয়ে আনা যায় এবং তাদের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির উপর বিদেশী নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা সহজ হয়।

এর সাথে যুক্ত হয়েছে এনজিও প্রভাব। এরা নামে 'নন-গভর্নমেন্টাল অর্গানাইজেশন' হলেও এদের সরকারি ভূমিকা ক্রমবর্ধমান হয়ে উঠেছে। এখনি এরা সরকারি বাজেটের একটা অংশ পাচ্ছে। নিকট ভবিষ্যতে এরা সরকারের গোটা সার্ভিস ও উন্নয়ন সেক্টর পরিচালনার অধিকার পেয়ে যাচ্ছে। তখন আইন শৃংখলা ও দেশ রক্ষা ছাড়া সরকারের হাতে আর কিছুই থাকবে না। জাতিসংঘের অনুসৃত নীতি রাষ্ট্রসমূহের দেশ রক্ষা ব্যবস্থাকে সংকুচিত অথবা বিলোপ করে দিতে পারে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষার কাজ অনেক আগেই শুরুকরেছে এবং শান্তিপ্রতিষ্ঠার কাজেও হাত দিয়েছে। অতএব জাতিসংঘ নিরাপত্তার গ্যারান্টি দিয়ে সংগত কারণেই রাষ্ট্রসমূহকে দেশ রক্ষা বাহিনী খাতে খরচ বন্ধ করতে বলতে পারে। সুতরাং সরকারের কাজ তখন হয়ে দাঁড়াবে শুধু শান্তি-শৃংখলা রক্ষা করা এবং সরকারের এই কাজও নিয়ন্ত্রিত হবে এনজিওদের দ্বারা। কারণ এনজিওরা গোটা সার্ভিস ও উন্নয়ন সেক্টরের মালিক হওয়ার ফলে দেশের রাজনীতি তারাই নিয়ন্ত্রন করবে। আর এনজিওরা, সবাই জানেন, আর্থিক ও আদর্শগত দিক থেকে মূলত জাতিসংঘ অথবা জাতিসংঘের পরিচালক শক্তিসমুহের আজ্ঞাবহ। এ অবস্থায় রাষ্ট্রসমুহ কার্যতই জাতিসংঘ নামের এককেন্দ্রীক এক শক্তির অধীনে চলে যাবে। রাষ্ট্রের অন্যতম নিয়ামক হলো জাতীয়তাবোধ। এই জাতীয়তাবোধ বিলোপ অথবা দুর্বল করারও একটা প্রচেষ্টা বিশ্বব্যাপী চলছে। জাতিসংঘ তার উন্নয়ন, সেবা ও শান্তিপ্রতিষ্ঠামুলক এজেন্সী সমুহের মাধ্যমে একটা আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোন গড়ে তুলছে এবং পারস্পরিক নির্ভরতার এক অপরিহার্য অবস্থা সৃষ্টি করছে। এ অবস্থা জাতীয় চিন্তাকে ধীরে ধীরে পেছনে ঠেলে দিবে এবং আন্তর্জাতিক বিবেচনাকে বড় করে তুলবে। জাতিসংঘের পিছনে 'নাটের গুরু' যারা, তাদের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য এই 'শূন্য জাতীয়বোধ' অবস্থা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।


এভাবেই পৃথিবীর আজকের শক্তিমানরা জাতিসংঘের ছায়ায় দাড়িয়ে জাতিসংঘকে নতুন এক বিশ্বরূপ দিতে চাচ্ছে। জাতিসংঘের জননন্দিত সেক্রেটারি জেনারেল দাগ হ্যামার শোল্ড বলেছিলেন, জাতিসংঘকে হতে হবে 'বিশ্ব সংস্থা', 'বিশ্ব সরকার' নয়। সে হবে উন্নয়ন ও শান্তির সহায়তাকারী। কোনক্রমেই জাতিসমূহের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কোন সিস্টেমের ডিক্টেশনকারী নয়। কিন্তু জাতিসংঘকে আজ রাষ্ট্রসমূহকে দুর্বল ও নিয়ন্ত্রিত করার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশ্বের দুর্বল জাতি সমুহের মত মুসলমানদেরকেও একবিংশ শতকের এই জটিল রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে।

বিশ্বে এক অর্থনীতি ও এক রাজনীতির মত গোটা বিশ্বকে এক সংস্কৃতির অধীনে আনারও দুর্দান্ত প্রয়াস চলছে। এই লক্ষে দুনিয়ার মানুষের জন্য একক এক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘ কাজ করছে। তারা চাচ্ছে গোটা দুনিয়ার জন্য মূল্যবোধের একক একটি মানদন্ডনির্ধারণ করতে। এই মানদন্ডের নাম দেয়া হচ্ছে 'সেক্যুলার হিউম্যানিজম'। জাতিসংঘের এ সংক্রান্ত দলিল দস্তাবেজে এই তত্ত্ব দাঁড় করানো হচ্ছে যে, মানবাধিকার সকলের উর্ধ্বে। জাতীয় ধর্ম, জাতীয় সংস্কৃতি, জাতীয় ঐতিহ্য ইত্যাদি অধিকার সবই এর অধীন। এই অধিকারগুলো ততটুকুই ভোগ করা যাবে, যতটুকু 'মানবাধিকার' অনুমতি দেয়। জাতিসংঘের এক দলিলে এভাবে বলা হয়েছে, সাংস্কৃতিক জীবন ও পরিচয়ের বিকাশসহ সাংস্কৃতিক অধিকার প্রতিটি ব্যক্তির জন্যেই স্বীকৃত। কিন্তু এই সাংস্কৃতিক অধিকারকে সীমাহীন করা যাবে না। যখনই তা মানুষের অধিকারের উপর হস্তক্ষেপকরে তখনই সাংস্কৃতিক অধিকার অচল হয়ে পড়ে। এর পরিষ্কার অর্থ এই যে, সাংস্কৃতিক অধিকার মানুষের মৌল স্বাধীনতা ও অধিকার খর্ব করার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। (United Nation Background Note-by Diana Ayten Shenker) এই দৃষ্টিভঙ্গিই জাতিসংঘের নাইরোবী সম্মেলন, কায়রোর জনসংখ্যা ও উন্নয়ন সম্মেলন, কোপেন হেগেনের সামাজিক শীর্ষ সম্মেলন, বেইজিং এর বিশ্ব নারী সম্মেলন ইত্যাদির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছে এবং আরও হবে। উদ্বেগের বিষয় এসব সম্মেলনে সুকৌশলে প্রণীত ধর্মনিরপেক্ষ মানবতাবাদ (Secular Humanism) প্রতিষ্ঠার দলিলে অধিকাংশ মুসলিম দেশও দস্তখত করেছে। অথচ জাতিসংঘ প্রচারিত 'ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদ' এর তত্ত্ব মেনে নিলে ইসলামকে কেটে ছোট বিকলাঙ্গ করে মসজিদে পুরে রাখতে হবে। তাদের বলা উচিত ছিল, তথাকথিত সার্বজনীন মানবাধিকার আইন নিশ্চিত ভাবেই মানব জীবন, তার স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার ঐতিহ্য সংরক্ষনকে বিপর্যন্ত ও বিপন্ন করে তুলতে পারে। ইসলামের আদর্শ ও সংস্কৃতির মাধ্যমে কার্যকরভাবে যদি মানব মর্যাদার প্রতিষ্ঠা হয়, সেটাই হয় সত্যিকারের মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা। কিন্তু এই কথা কেউ আমরা বলিনি।

এভাবে অন্য কেউও বলছে না, অন্য জাতি, অন্য ধর্মও নয়। তার ফলে, 'ধর্মনিরপেক্ষ মানবতাবাদ'-ই বিশ্ব সংস্কৃতির একমাত্র মানদন্ডহয়ে দাঁড়াচ্ছে। অন্য কথায় এটাই হয়ে দাঁড়াচ্ছে বিশ্ব সংস্কৃতি।

এর ফল হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। আমরা আমাদের ধর্ম পালন করতে পারবো না। উত্তরাধিকার আইনকে বলা হবে মানবাধিকার বিরোধী, শান্তিরআইন অভিহিত হবে বর্বর বলে, পর্দাকে বলা হবে মানবাধিকারের খেলাপ, কুরবানিকে বলা হবে অপচয় ইত্যাদি। এমনকি ইসলামের দাওয়াতকে নিষিদ্ধ করা হবে মানবাধিকারের পরিপন্থি বলে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, কোথাও জাতীয় আদর্শ ভিত্তিক রাষ্ট্রগঠিত হলে তাকে অভিহিত করা হবে মানবাধিকার বিরোধী সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে। 'সেকুলার হিউম্যানিজম' প্রকৃত পক্ষে সূদুরপ্রসারী একটা ষড়যন্ত্র। এর লক্ষ্য মানুষকে তার অলক্ষ্যে তার ধর্ম থেকে সরিয়ে নেয়া। মানুষের ধর্ম না থাকলে তার জাতীয়তা ধ্বসে পড়বে। জাতীয়তা ধ্বসে পড়লে তার রাষ্ট্রও ধ্বসে পড়বে। এটাই চাচ্ছে আজকের ছদ্মবেশ নিয়ে দাঁড়ানো বিশ্বনিয়ন্ত্রকরা।

বিশ্বে ধর্মসমুহকে বিশেষ করে ইসলামকে ধর্ম ও সংস্কৃতি বিরোধী এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে একবিংশ শতকে।

বিশেষ করে ইসলামকেই এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। কারণ, অন্য ধর্মগুলোর কোনটিই মানুষের পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা হিসেবে কার্যকরী নয়। সুতরাং তারা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করবে না, করতে চাইলেও তারা পারবে না। কিন্তু ইসলাম পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। শুধু ইসলামই তাদের চ্যালেঞ্জ করে টিকে থাকতে পারে। ইসলামের শত্রুরাও এ কথা বলছে। The End History- এর লেখক ফ্রান্সিস ফকুয়ামা কম্যুনিজমের ধ্বংসস্তুপের উপর দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, 'পাশ্চাত্য ও পাশ্চাত্য চিন্তা ধারার বিজয় প্রমান করছে যে, পশ্চিমা উদারনৈতিক মতবাদের প্রতিদ্বন্দ্বী সব ব্যবস্থাই আজ খতম হয়ে গেছে'। কিন্তু তিনি আবার বলেছেন, তবে প্রতিদ্বন্দ্বীতা একটা হবে ধর্মের সাথে আসছে একবিংশ শতাব্দীতে এবং তাঁর মতে সে ধর্ম 'ইসলাম'।

সুতরাং একবিংশ শতাব্দীর রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সংস্কৃতি যে চ্যালেঞ্জ নিয়ে হাজির হচ্ছে একবিংশ শতাব্দীতে, মানবতার সামনে, তার মোকাবিলা ইসলামকেই করতে হবে।

আর এ দায়িত্ব বিশ্বের মুসলমানদের। আনন্দের বিষয়, এ দায়িত্ব পালনের জন্য জাতীয় জীবনে যে রেনেসাঁর প্রয়োজন সে রেনেসাঁ আজ সৃষ্টি হয়েছে মুসলিম বিশ্বে। রেনেসাঁর নিশানবর্দার সংগঠনেরও সৃষ্টি হয়েছে মুসলিম দেশে দেশে। ক্রমবর্ধমান হারে তরুনদের সম্পৃক্ততায় এ সংগঠনগুলো বিকশিত হয়ে উঠছে। ত্যাগ ও কোরবানীর ক্ষেত্রেও রেনেসাঁ-কাফেলার নিশান বর্দাররা পিছিয়ে নেই। আজ গোটা দুনিয়ায় আদর্শের জন্য ও আদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন দিচ্ছে একমাত্র মুসলমানরাই।

তবে প্রয়োজনের তুলনায় এবং চ্যালেঞ্জের নিরিখে এটুকু যথেষ্ট নয়। এসব কাজকে আরও সংহত ও শক্তিশালী করার জন্য মৌল কিছু বিষয়ে মুসলিম তরুনদের নিজেদেরকে যোগ্য করে গড়ে তোলা প্রয়োজন। মৌল এই বিষয়কে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়.

১. নিজেদের জীবন ব্যবস্থা ও তার ইতিবৃত্ত সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞানার্জন, কোরআন-হাদীস এবং মহানবীর জীবন সম্পর্কেতো অবশ্যই, ইসলামের আইন ও ঐতিহ্য সম্পর্কে ও সম্যক জ্ঞানার্জন করতে হবে।

২. ইসলামী শিক্ষার আলোকে প্রতিটি মুসলিম তরুনকে তার চারপাশে যা আছে, যা ঘটছে তার প্রতি তীক্ষ্ণ নিরীক্ষনী দৃষ্টি রাখার যোগ্যতা অর্জন করতে হবে- রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক সব বিষয়ই এ নিরীক্ষনের ক্ষেত্রে তাদের মনে রাখতে হবে, দৃষ্টি-মনোহারীতা নয় সত্যই আসল কথা। আজ আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি যখন প্রচারণা জোরে খুব সহজেই মিথ্যাকে সত্য প্রতিপন্ন করা হচ্ছে। এই অবস্থায় গ্রহন বা বর্জনের ক্ষেত্রে ইসলামী নীতিবোধ সামনে রেখে অনুসন্ধান, অধ্যয়ন ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে সিদ্ধান্তগ্রহন করতে হবে।

৩. তীব্র সাংস্কৃতিক সংঘাতের এই যুগে মুসলিম তরুনদেরকে নিজেদের সাংস্কৃতিক নীতিবোধ ও পরিচয়কে ভালোভাবে হৃদয়ঙ্গম করতে হবে। আর্ট-আর্কিটেকচার থেকে শুরুকরে জীবন চর্চার সকল ক্ষেত্রে ইসলামের চিন্তা ও দর্শনকে ভালোভাবে বুঝে নিতে হবে এবং বুঝতে হবে ইসলামের সাথে অন্য সংস্কৃতিগুলোর মৌল পার্থক্য সমূহ। এই পর্যালোচনার জ্ঞান তাদেরকে নিজেদের এবং অন্যদের অবস্থানকে বুঝতে সাহায্য করবে এবং চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সমর্থ্য করে তুলবে।

৪. মুসলমানদের বিজ্ঞানের যে পতাকা ৯শ বছর আগে অবনমিত হয়েছিলো এবং সাড়ে ৬শ বছর আগে ভূলুণ্ঠিত হয়েছে, সেই ৪ পতাকার গর্বিত শির আবার উর্ধ্বে তুলে ধরার জন্য মুসলিম তরুনদের এগিয়ে আসতে হবে।

৫. ইসলাম সকল যুগের সর্বাধুনিক মতবাদ। এ মতবাদকে যুগপূর্ব অচল ভাষা বা কৌশল নয়, যুগশ্রেষ্ঠ ভাষায় যুগোত্তর লক্ষ্য সামনে রেখে উপস্থাপন করতে হবে। শুধু তাহলেই এই আদর্শ যুগ-চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে সকল মানুষের ঘরে গিয়ে পৌঁছতে পারবে।

এই করণীয় কাজগুলো সম্পন্ন করতে পারলে মুসলিম তরুনরা যে জ্ঞান ও সাংস্কৃতিক শক্তিতে সজ্জিত হবে তা একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য অবশ্যই প্রয়োজন।

একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মূলতই সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক। এই চ্যালেঞ্জর মধ্যে অবশ্যই অর্থনীতি, রাজনীতি ও সমরশক্তির মত দিকগুলো আছে। তবে এগুলোর অর্জন, অধিকার, ব্যবহার, কার্যকারিতা- সবকিছুই বুদ্ধির শক্তির উপর নির্ভরশীল। কম্যুনিজম রক্ষার সব অস্ত্র সব অর্থ সোভিয়েত ভান্ডারে থাকার পরও বৈরী জ্ঞান ও সংস্কৃতির সয়লাবে যেমন তা শেষ হয়ে গেছে, তেমনি, 'সেক্যুলার হিউম্যানিজম' এবং আগ্রাসী পুঁজি ও আধিপত্য রক্ষার 'গণতন্ত্র' তার ভান্ডারে সব অস্ত্র, সব অর্থ রেখেই শেষ হয়ে যেতে পারে, প্রয়োজন শুধু ইসলামের মহান মানবতাবাদী জ্ঞান ও সংস্কৃতির আধুনিকতম মানের প্রচন্ড এক সয়লাব।

লেখক-
আবুল আসাদ
সম্পাদক, দৈনিক সংগ্রাম 
বই- একুশ শতকের এজেন্ডা

Thursday, March 7, 2024

ইসলামী অর্থনীতিতে জাকাত ব্যবস্থার প্রবর্তন || জাকাত বিলি-বণ্টনে রাসুল সাঃ এর নিয়মনীতি

ইসলামী অর্থনীতিতে জাকাত ব্যবস্থার প্রবর্তন || জাকাত বিলি-বণ্টনে রাসুল সাঃ এর নিয়মনীতি


ইসলামী অর্থনীতিতে জাকাত ব্যবস্থার প্রবর্তন

জাকাত বিলি-বণ্টনে রাসুল সাঃ এর নিয়মনীতি 

জাকাত ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের একটি। আল-কুরআনে বারংবার নামাজ কায়েমের পরই জাকাত আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ রাব্বুল আ'লামিনের নির্দেশেই জাকাত আদায়ের ব্যাপারে রাসূলে করীম (সা) সাহাবীগণকে উদ্বুদ্ধ করেন এবং এজন্যে একটা প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলেন। কেন জাকাতের এই গুরুত্ব? ইসলামী সমাজ ব্যবস্থায় সম্পদ বন্টন তথা সামাজিক সাম্য অর্জনের অন্যতম মৌলিক প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা হিসেবেই জাকাত গণ্য হয়ে থাকে। সমাজে আয় ও সম্পদ বন্টনের ক্ষেত্রে বিরাজমান ব্যাপক পার্থক্য হ্রাসের জন্যে জাকাত একটি অত্যন্ত উপযোগী হাতিয়ার। জাকাতের সঙ্গে প্রচলিত অন্যান্য সব ধরনের করের মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। কারণ, ইসলামের এই মৌলিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একাধারে নৈতিক, ধর্মীয়, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক মূল্যবোধ অন্তর্নিহিত রয়েছে। কিন্তু সাধারণ করের ক্ষেত্রে কোন নৈতিক, ধর্মীয় ও সামাজিক তাগিদ নেই।

জাকাত ও প্রচলিত করের মধ্যে পার্থক্য:

জাকাত ও প্রচলিত করের মধ্যে অন্তত চারটি সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। যথা:


প্রথমত: নির্দিষ্ট আয়ের বিপরীতে বাধ্যতামূলকভাবে সরকারকে নির্ধারিত হারে কর প্রদান করতে হয়। এ জন্য করদাতা কোন প্রত্যক্ষ উপকার প্রত্যাশা করতে পারে না। সরকার করের মাধ্যমে অর্জিত এই অর্থ দরিদ্র ও অভাবী জনসাধারণের মধ্যে ব্যয়ের জন্যে বাধ্য থাকেন না। পক্ষান্তরে জাকাত হিসেবে আদায়কৃত অর্থ অবশ্যই আল-কুরআনে নির্দেশিত লোকদের মধ্যেই বন্টন করতে বা তাদের জন্যেই ব্যবহৃত হবে।


দ্বিতীয়ত: জাকাতের অর্থ রাষ্ট্রীয় সাধারণ উদ্দেশ্য সাধনের জন্যে ব্যয় করা যাবে না। কিন্তু করের অর্থ যেকোন কাজে ব্যয়ের ক্ষমতা ও স্বাধীনতা সরকারের রয়েছে।


তৃতীয়ত: জাকাত প্রদান শুধুমাত্র বিত্তশালী বা সাহেবে নিসাব মুসলিমদের জন্যেই বাধ্যতামূলক। কিন্তু কর বিশেষত পরোক্ষ কর, সর্বসাধারণের উপর আরোপিত হয়ে থাকে। অধিকন্তু প্রত্যক্ষ করেরও বিরাট অংশ জনসাধারণের উপর কৌশলে চাপিয়ে দেওয়া হয়।


চতুর্থত: জাকাতের হার পূর্বনির্ধারিত এবং স্থির। কিন্তু করের হার স্থির নয়। যে কোন সময়ে সরকারের ইচ্ছানুযায়ী করের হার ও করযোগ্য বস্তু বা সামগ্রীর পরিবর্তন হয়ে থাকে।


সুতরাং, জাকাতকে কোনক্রমেই প্রচলিত অর্থে সাধারণ কর হিসেবে গণ্য করা যায় না বা তার সঙ্গে তুলনীয় হতে পারে না।

যে সব বস্তুর উপর যাকাত ধার্য:

ইসলামী শরীয়াহ অনুসারে যে সমস্ত সামগ্রীর উপর জাকাত ধার্য হয়েছে সেগুলি হলো-


১. ব্যাংকে/ হাতে সঞ্চিত/ জমাকৃত অর্থ;

২. সোনা, রূপা, এবং সোনা-রূপা দ্বারা তৈরি অলংকার;

৩. ব্যবসায়ের পণ্য সামগ্রী:

৪. জমির ফসল;

৫. খনিজ উৎপাদন; এবং

৬. সব ধরনের গবাদি পশু।


উপরোক্ত দ্রব্যসামগ্রীর একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ যখন কোন মুসলমান অর্জন করে তখন তাকে জাকাত দিতে হয়। এই পরিমাণকে নিসাব বলে। নিসাবের সীমা বা পরিমাণ দ্রব্য হতে দ্রব্যে ভিন্নতর। একইভাবে জাকাতের হারও দ্রব্য হতে দ্রব্যে ভিন্নতর। জাকাতের সর্বনিম্ন হার শতকরা ২.৫%।

•জাকাতের খাত ও বন্টন নীতি:

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন জাকাত কাদের প্রাপ্য অর্থাৎ কাদের মধ্যে জাকাতের অর্থ বন্টন করে দিতে হবে সে সম্পর্কে সুস্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন-


"দান-খয়রাত তো পাওনা হলো দরিদ্র ও অভাবীগণের, যে সকল কর্মচারীর উপর আদায়ের ভার আছে তাদের, যাদের মন (সত্যের প্রতি) সম্প্রতি অনুরাগী হয়েছে, গোলামদের মুক্তির জন্যে, ঋণগ্রস্তদের জন্যে, আল্লাহর পথে এবং মুসাফিরদের জন্যে। এটি আল্লাহর তরফ হতে ফরজ এবং আল্লাহ সব জানেন ও বুঝেন।" (সূরা আত-তাওবা: ৬০ আয়াত)


উপরের আয়াত হতে আট শ্রেণীর লোকদের মধ্যে জাকাতের অর্থ ব্যবহারের জন্যে সুস্পষ্ট নির্দেশ পাওয়া যায়। সেগুলি হচ্ছে:


১. দরিদ্র জনসাধারণ;

২. অভাবী ব্যক্তি;

৩. যে সকল কর্মচারী জাকাত আদায়ে নিযুক্ত রয়েছে;

৪. নও-মুসলিম;

৫. ক্রীতদাস মুক্তি;

৬. ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি;

৭. আল্লাহর পথে, এবং

৮. মুসাফির।


এই আটটি খাতের মধ্যে ছয়টিই দারিদ্র্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত। অন্য দুটি খাতও (৩ ও ৭) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা জাকাত আদায় ও ব্যবস্থাপনা একটি কঠিন ও শ্রমসাপেক্ষ কাজ। এ কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের এটাই সার্বক্ষণিক দায়িত্ব। সুতরাং, তাদের বেতন এই উৎস হতেই দেওয়া বাঞ্ছনীয়। তাছাড়া যেসব ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় সংগ্রামে লিপ্ত তারাও অন্য কোনভাবে জীবিকা অর্জনের সুযোগ হতে বঞ্চিত। সুতরাং, উপরে বর্ণিত আটটি খাতেই যদি জাকাতের অর্থ ব্যয় হয় তাহলে দরিদ্রতা দূর হবে। একই সঙ্গে অন্যান্য বহু অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যার নিরসন হবে।

সুষ্ঠুভাবে জাকাত আদায়ে রাসুল সাঃ এর ভূমিকা:

রাসূলে করীম (সা) নিশ্চিতভাবেই জানতেন, ইসলামী রাষ্ট্রে মৌলিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে জাকাতের প্রতিষ্ঠা হলে বহুবিধ কল্যাণ সাধিত হবে। তাই তিনি জাকাত যথাযথ আদায় ও তার সুষ্ঠু বন্টনের জন্যে কঠোর তাগিদ দিয়ে গেছেন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সুষ্ঠুভাবে জাকাত আদায়ের জন্যে রাসূলে করীম (সা) নবম ও দশম হিজরিতে আরব ভূখন্ডের বারোটি এলাকায় বারোজন প্রখ্যাত সাহাবীকে দায়িত্ব প্রদান করেন।

অনুরূপভাবে পনেরোটি প্রধান গোত্র হতে জাকাত আদায়ের দায়িত্ব তিনি বারোজন খ্যাতনামা সাহাবীর উপর অর্পণ করেছিলেন।

রাসুল সাঃ এর বিলি বন্টন যারা করতেন:

জাকাত যথাযথ বিলি বন্টনের জন্যেও নবীজীর (সা) উদ্যোগেই বলিষ্ঠ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি হয়েছিল যা আজকের যেকোন উন্নত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সঙ্গে তুলনীয়। এ থেকেই বোঝা যায় জাকাত বায়তুলমালের কত বড় গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। এই প্রতিষ্ঠানে নিচে বর্ণিত আট শ্রেণীর কর্মচারী নিয়োজিত ছিল। এরা হচ্ছে-


১. সায়ী = গবাদি পশুর জাকাত সংগ্রাহক;

২. কাতিব = করণিক;

৩. কাসাম = বন্টনকারী;

৪. আশির = জাকাত প্রদানকারী ও জাকাত প্রাপকদের মধ্যে সম্বন্ধ স্থাপনকারী;

৫. আরিফ = জাকাত প্রাপকদের অনুসন্ধানকারী;

৬. হাসিব = হিসাব রক্ষক;

৭. হাফিজ = জাকাতের বস্তু ও অর্থ সংরক্ষক; এবং

৮. কায়াল = জাকাতের পরিমাণ নির্ণয় ও ওজনকারী।

জাকাতের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য:

জাকাতের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য বহুবিধ। তার মধ্যে সবচেয়ে প্রধান এবং মুখ্য হচ্ছে কতিপয় ব্যক্তির হাতে সম্পদ কেন্দ্রীভূত হতে না দেওয়া। ইসলাম সামাজিক শ্রেণী বৈষম্যকে শুধু নিন্দাই করে না, বরং তা দূরীভূত করার পদক্ষেপও অবলম্বন করতে বলে। তাই একটি সুখী, সুন্দর এবং উন্নত সামাজিক পরিবেশ সৃষ্টির জন্যে বিত্তশালী মুসলিমদের অবশ্যই তাঁদের সম্পদের একটা অংশ ব্যয় করা উচিত। এর ফলে শুধু অসহায় ও দুস্থ মানবতার কল্যাণ হবে তাই নয়, আয়-বন্টনের বৈষম্যও হ্রাস পাবে। জাকাত প্রদানের ফলে সম্পদশালী মুসলিমের মন হতে ধন-সম্পদের লালসা দূরীভূত হবে। দরিদ্রদের অভাব মোচনের জন্যে নিজেদের দায়-দায়িত্ব সম্বন্ধে তারা সচেতন হবে। বিত্তবান মুসলমানদের আল্লাহ সৎপথে তাদের সম্পদ ব্যয় করার নির্দেশ দিয়েছেন। বার্ষিক উদ্বৃত্ত অর্থ হতে নির্দিষ্ট হারে একটা অংশ দরিদ্র এবং দুর্দশাগ্রস্ত জনগণের মধ্যে তারা বিতরণ করবেন। এর ফলে তারা দুনিয়া ও আখিরাতে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করবেন।


জাকাত মজুতদারি বন্ধ করারও এক প্রধান ও বলিষ্ঠ উপায়। মজুতকৃত সম্পদের উপরই জাকাত হিসেব করা হয়ে থাকে। অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ এবং মজুত সম্পদ যেকোন অর্থনৈতিক কার্যক্রম গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রধান প্রতিবন্ধক হিসেবে বিবেচিত হয়ে তাকে। অবৈধভাবে অর্থ মজুত করার ফলে নানারকম সামাজিক সমস্যা দেখা দেয়। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা এর প্রকৃষ্ট নজির। অল্প কিছু লোকের হাতে বিপুল অবৈধ ও কালো টাকা জমেছিল। সরকারের এমন কোন কৌশল বা পদ্ধতি ছিল না যার দ্বারা এই অবৈধ অর্থের সঠিক পরিমাণ জানা সম্ভব ছিল। ফলে এসবের ব্যয় ও ব্যবহারের উপর কোন নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা যায়নি। পরিণামে সৃষ্টি হয়েছে ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতির ও সামাজিক শ্রেণী বৈষম্যের।


কোন পদ্ধতিই সার্থকভাবে উপরোক্ত সমস্যার মুকাবিলা করতে সক্ষম নয়। একমাত্র ইসলামেই তার সমাধান রয়েছে। কারণ বিত্তবানদের জন্যে তাদের মজুতকৃত অর্থ বা সম্পদের একটা অংশ নিছক বিলিয়ে দেবার মতো কোন পার্থিব কারণ নেই। কিন্তু একজন মুসলমানের আল্লাহ ও আখিরাতের ভয় রয়েছে। উপরন্তু ইসলামী রাষ্ট্রে আল-কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে প্রবর্তিত আইনে সরকারের হাতে প্রভূত ক্ষমতাও রয়েছে মজুত সম্পদকে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে ব্যয়, বিতরণ বা সরকারের কাছে সমর্পণে বাধ্য করতে। এর ফলে বিত্তবানদের সামনে দু'টি মাত্র পথ খোলা থাকবে-


১. শিল্প বা ব্যবসায়ে অর্থ বিনিয়োগ করা, অথবা

২. ইসলামী অনুশাসন অনুযায়ী তা ব্যয় করা।


জাকাতের অন্যতম অর্থনৈতিক ও সামাজিক উদ্দেশ্য হচ্ছে ইসলামী সমাজ হতে দারিদ্র্য দূর করা। দারিদ্র্য মানবতার পয়লা নম্বরের দুশমন। ক্ষেত্রবিশেষে তা কুফরি পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে। যে কোন সমাজ ও দেশের এটা সবচেয়ে জটিল ও তীব্র সমস্যা। সমাজে হতাশা ও বঞ্চনার অনুভূতির সৃষ্টি হয় দরিদ্রতার ফলে। পরিণামে দেখা দেয় সামাজিক সংঘাত। বহু সময়ে রাজনৈতিক অভ্যুত্থান পর্যন্ত ঘটে। অধিকাংশ অপরাধই সচরাচর ঘটে দরিদ্রতার জন্যে। এ সমস্যাগুলির প্রতিবিধান করার জন্যে জাকাত ইসলামের অন্যতম মুখ্য হাতিয়ার। যে আট শ্রেণীর লোকের কথা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, জাকাত লাভের ফলে তাদের দিনগুলি আনন্দ ও নিরাপত্তার হতে পারে। জাকাত যথাযথভাবে আদায় ও পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা হলে আজকের দিনেও এর মাধ্যমে দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব।


একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, পূর্বে বর্ণিত বিভিন্ন ধরনের লোকদের মধ্যে যখন জাকাতের অর্থসামগ্রী বন্টন করে দেওয়া হয় তখন শুধু যে অর্থনৈতিক সুবিচার প্রতিষ্ঠিত হয় তাই নয়, বরং অর্থনৈতিক কার্যক্রমেও গতিবেগ সঞ্চারিত হয়। দরিদ্র ও দুর্গত লোকদের ক্রয়ক্ষমতা থাকে না। বেকারত্ব তাদের নিত্যসঙ্গী। জাকাত প্রাপ্তির ফলে তাদের হাতে অর্থাগম হলে বাজারে কার্যকর চাহিদার সৃষ্টি হয়। এরই ফলে দীর্ঘ মেয়াদে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে থাকে। তখন অর্থনৈতিক কার্যক্রমে নতুন প্রেরণার সৃষ্টি হয়, ব্যবসা-বাণিজ্য ও নির্মাণ ক্ষেত্রেও সৃষ্টি হয় অনুকূল পরিবেশ। ফলশ্রুতিতে প্রচলিত সামাজিক শ্রেণীসমূহের মধ্যে আয়গত পার্থক্যও হ্রাস পেতে থাকে।